বাংলা ফন্ট

স্মরণকালের সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে মিডিয়া

11-05-2017
মাসকাওয়াথ আহসান

স্মরণকালের সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে মিডিয়া


সেই প্রাচীনকালে যখন কেবল গোত্র বা রাজ্যগুলোর মাঝে যুদ্ধের চল ছিলো; তখনও প্রাচীন যুদ্ধবাজ পক্ষগুলো একটি ”সোনালী” সূত্র মেনে চলতো; বার্তাবাহককে কখনো হত্যা করা যাবে না। অথচ গত দশবছরে গোটা পৃথিবীতে প্রায় ১ হাজার সাংবাদিককে হত্যা করা হয়েছে। অধিকাংশ হত্যাকান্ড ঘটেছে সিরিয়া, ইরাক, আফঘানিস্তান, পাকিস্তান, ফিলিপাইন, মেক্সিকোতে।
কারাগারে নিক্ষিপ্ত হয়েছে অসংখ্য সাংবাদিক। তুরস্ক যেন এখন সাংবাদিকদের গুয়ানতানামো। মিশর, চীনও পিছিয়ে নেই এ কাজে। সরকার তা কট্টর ইসলামপন্থী হোক, একদলীয় হোক, সেনাশাসক হোক কিংবা কথিত গনতান্ত্রিক হোক; সাংবাদিক নির্যাতনে কেউই পিছিয়ে নেই।
সাংবাদিকেরা যেহেতু সত্যান্বেষী; কিন্তু ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য মরিয়া শাসকেরা লুকিয়ে রাখতে চায় তাদের অপকীর্তি; তাই সাংবাদিক আর মিডিয়াকে হত্যা-নির্যাতনে একই রকম প্রবণতা দেশে দেশে নানা রকমের সরকারগুলোর মাঝে দৃশ্যমান।
মিডিয়ার ইতিহাসে বর্তমানে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পথে হাঁটছেন প্রতিটি সাংবাদিক। তাদের নানা-মুখী শত্রু; দুর্নীতিবাজ রাজনীতিক, অনৈতিক মুনাফাখোর ব্যবসায়ী, অস্ত্রবাজ সেনাবাহিনী ও অন্যান্য নিরাপত্তাবাহিনী, সন্ত্রাসী বা জঙ্গী এরা সবাই মিলে গত দশবছর ধরে চড়াও হয়েছে মিডিয়ার ওপর। ক্ষমতা কাঠামোর সঙ্গে জনগণের দরকষাকষিতে মিডিয়া সবসময়ই জনমানুষের পক্ষ নিয়েছে; কারণ সেটাই সাংবাদিকতার আদর্শ। ক্ষমতাকাঠামোকে জবাবদিহিতায় বাধ্য করতে মিডিয়া দেশে দেশে শক্ত অবস্থান নিয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক নেতা-ক্যাডার, ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট, সেনা ও অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনী, জঙ্গীদের "যা খুশী তাই করার পথে" বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে মিডিয়া। ফলে বিক্ষুব্ধ পক্ষগুলো ক্রমে ক্রমে সাহস সঞ্চয় করে এক পর্যায়ে মিডিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে।
রিপোটার্স উইদাউট বর্ডারস-এর সাম্প্রতিক প্রেস ফ্রিডম বা মাধ্যমের স্বাধীনতা বিষয়ক প্রতিবেদনে মিডিয়ার এই বিপদাপন্ন সময়টিকে তথ্য উপাত্তের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়েছে।
এই প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের কট্টর খ্রিস্টত্ববাদী শাসক ডোনাল্ড ট্রাম্পের মিডিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণাকে মিডিয়ার জন্য অশনি সংকেত হিসেবে দেখা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রের ইতিহাসে মিডিয়ার সঙ্গে রাষ্ট্রপ্রধানের এমন সাপে-নেউলে সম্পর্কের দৃষ্টান্ত আর নেই। এরকম পেশীপ্রদর্শনকারী রাজনীতিকের অভ্যুদয় দেশে দেশে ঘটে চলেছে। তুরস্কের কট্টর মুসলমানিত্ববাদী শাসক রেসিপ তাইয়েপ এরদোয়ান সাংবাদিকদের ব্যাপারে একইরকম মনোভাব পোষণ করেছেন। এরদোয়ান ৮১ জন সাংবাদিককে কারাগারে পাঠিয়েছেন। আর ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের সাংবাদিকদের ওপর এমন গোয়েন্দা নজরদারী শুরু করেছেন যে পুরো দেশটাই সাংবাদিকদের অদৃশ্য কারাগার যেন।
কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে) পুরো পৃথিবীতে সাংবাদিক নিরাপত্তা বিপন্নতার বিষয়ে একই রকম আশংকা প্রকাশ করেছে। বিশেষ করে বিভিন্ন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে যে সাংবাদিকরা কাজ করেন; তারা সীমাহীন ঝুঁকির মাঝে রয়েছেন; জীবনকে হাতের মুঠোয় নিয়ে তারা সংবাদ প্রেরণের দায়িত্ব পালন করছেন; এমন চিত্র উঠে এসেছে সিপিজে কর্মকর্তার বর্ণনায়।
রিপোর্টারস উইদাউট বর্ডারস-এর প্রতিবেদনে প্রেস ফ্রিডম সূচকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর অবস্থান বেশ খারাপ। ভারত-পাকিস্তানে সাংবাদিক নিরাপত্তার হাল নাজুক। প্রেস ফ্রিডম সূচকে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ নিম্নতম অবস্থানে। এটি গভীর পরিতাপের বিষয়। ভারতে কট্টর হিন্দুত্ববাদী শাসক নরেন্দ্র মোদী কিংবা পাকিস্তানে কট্টর মুসলমানিত্ববাদী শাসক নওয়াজ শরীফের শাসনামলে মিডিয়ার স্বাধীনতা খর্ব হওয়াটা খুব অস্বাভাবিক নয়; কারণ তারা বুশ কিংবা এরদোয়ানের মতোই জঙ্গীমনোভাবাপন্ন। কিন্তু বাংলাদেশের কথিত অসাম্প্রদায়িক শাসক শেখ হাসিনার শাসনামলে মিডিয়ার স্বাধীনতা খর্ব হওয়া নিঃসন্দেহে অস্বাভাবিক ঘটনা। আরো অস্বাভাবিক এই কারণে যে এই মিডিয়ার স্বাধীনতা খর্ব করার ব্যাপারটা ভারত-পাকিস্তানের চেয়ে খারাপ পর্যায়ে চলে গেছে রিপোর্টারস উইদাউট বর্ডারস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী।
রিপোর্টারস উইদাউট বর্ডারস এর প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করেই স্বৈরাচারী শাসকেরা তাদের গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে সাংবাদিকদের খুঁজে বের করে এবং তাদের হত্যা, নির্যাতন বা কারাগারে নিক্ষেপের মতো ঘটনাগুলো ঘটায়।
এছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফেইক নিউজ বহুল সংখ্যায় পরিবেশিত হওয়ায়; স্বৈরশাসকরা পেশাদার সাংবাদিকদের প্রতিবেদনও পছন্দ না হলেই "ফেইক নিউজ" বলে নাকচ করার চেষ্টা করে। ওদিকে নিজেরা যথেচ্ছ প্রোপাগান্ডা চালাতে থাকে এই ক্ষমতায় টিকে থাকতে মরিয়া শাসকেরা।
এরকম একটি প্রতিকূল নিরাপত্তাহীন পরিবেশে টিকে থাকতে মিডিয়া ও সাংবাদিকদের নিঃশর্ত ঐক্য ও সক্রিয়তা অত্যন্ত জরুরী হয়ে পড়েছে। পেশাগত ক্ষেত্রেও দায়িত্ব বেড়েছে তাদের। কারণ সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে নৈতিকতার জায়গা থেকে নির্ভুল থাকতে হবে প্রত্যেককে। যাতে "ফেইক নিউজ" খুঁজতে মরিয়া আগ্রাসী পক্ষগুলো কোনভাবেই "ফেইকনিউজ"-এর অজুহাত খুঁজে না পায়। মিডিয়াকে এই অশুভ সময়টি অতিক্রম করতে হবে জনমানুষের স্বার্থেই। কারণ জনমানুষের স্বার্থের স্বপক্ষে নিরাপোষ সত্যযুদ্ধই সাংবাদিকতার অঙ্গীকার।

সর্বশেষ সংবাদ