বাংলা ফন্ট

আমেরিকায় যেভাবে শুরু হয়েছিল 'স্পীড ডেটিং'

19-08-2017
নিজস্ব প্রতিবেদক ঢাকারিপোর্টটোয়েন্টিফোর.কম

 আমেরিকায় যেভাবে শুরু হয়েছিল 'স্পীড ডেটিং'
ঢাকা: জীবনসঙ্গী খুঁজে নেয়ার জন্য পশ্চিমা দেশগুলোতে স্পীড ডেটিং, অর্থাৎ একই দিনে এক জায়গাতেই অনেক কজনের সঙ্গে দেখা সাক্ষাতের ব্যাপারটা এখন বেশ জনপ্রিয়। কিন্তু এই স্পীড ডেটিং এর ধারণাটি প্রথম যার মাথা থেকে বেরিয়েছিল তিনি এক ইহুদী র‍্যাবাই বা ধর্মযাজক। কিভাবে তিনি আমেরিকার লস এঞ্জেলেসে প্রথম স্পীড ডেটিং চালু করেন, ইতিহাসের সাক্ষীর এই পর্বে শোনা যাক সেই কাহিনী:

ইয়াকভ ডেয়ো একজন র‍্যাবাই। ১৯৯৮ সালে তিনি লসএঞ্জেলেসে সদ্য কাজ শুরু করেছেন একজন ধর্মযাজক হিসেবে। অবিবাহিত ইহুদী নারী-পুরুষদের মধ্যে বিয়ের জন্য কিভাবে যোগাযোগ ঘটিয়ে দেয়া যায়, সেরকম একটি ঘটকালির আইডিয়া নিয়ে ভাবছিলেন তিনি। তখনই তার মাথায় আসে স্পীড ডেটিং এর আইডিয়া।

"আমি তখন সদ্য প্রশিক্ষণ নেয়া একজন র‍্যাবাই। কাজ করি আইশ হা-টোরা নামের একটি সংগঠনের জন্য। মানুষকে যেন তাদের ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত রাখা যায়, সেটা নিয়ে আমরা কাজ করছিলাম। এ নিয়ে আমাদের কিছু ক্লাশ চলছিল। সিনাগগে আমরা নানা সামাজিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করছিলাম। বেশ মজার ছিল সেসব।"

ইয়াকভ এবং তাঁর ছাত্র-ছাত্রীরা তখন ভাবছিলেন কিভাবে কমিউনিটির মানুষকে পরস্পরের সঙ্গে দেখা সাক্ষাতে সাহায্য করা যায়। ট্রাডিশনাল ম্যাচ-মেকিং বা ঘটকালিকে কিভাবে আরও আকর্ষণীয় করে তোলা যায় সেটা নিয়ে তারা চিন্তাভাবনা শুরু করলেন।

"স্পীড ডেটিং নামটা আমার মাথায় এলো এবং আমি সেটা প্রস্তাব করলাম। লোকজন কয়েক মিনিটের জন্য পরস্পরে মুখোমুখি বসবে। অনেকটা ভিক্টোরিয়ান যুগের ড্যান্স কার্ডের মতো। আমরা ব্যাপারটা নিজেরাও একটু প্র্যাকটিস করে দেখলাম। তারপর আমরা আইডিয়াটা লুফে নিলাম।"

ইয়াকভ ডেয়ো একজন ছাত্রের কাছ থেকে একটা ইমেল পেলেন।

"সে বললো, আমাদের একটা কফি হাউস আছে। আমরা সেখানে একটা আয়োজন করতে পারি। তারপর লোকজন আসলো। চার পাঁচ জন করে গ্রুপে গ্রুপে। তারা তাদের বন্ধুদের জানালো। সবাই বন্ধু। সেখানে কারও কোন প্রত্যাশা ছিল না। কেবলই বন্ধুত্ব। পুরো ব্যাপারটাই ছিল বেশ মজার।"

প্রথম স্পীড ডেটিং হয়েছিল যেখানটায়, সেটি ছিল বিভারলি হিলসের এক কফির দোকান, পিটস কফি হাউস।

"কফি হাউসটা ছিল খুব জমজমাট, সবকিছুর প্রাণকেন্দ্র। শহরের সব উঠতি নামকরা লোকজনের যাতায়ত সেখানে। কফি হাউসটা আমাদের সঙ্গে বেশ সহযোগিতা করছিল। এটি কোশের দোকান ছিল না। আমার ছাত্র-ছাত্রীরা ইহুদী। তাদের অনেকেই কোশের বা হালাল খাবার ছাড়া খায় না। কাজেই তাদের জন্য আমার খাবার কিনে আনতে হয়েছিল।"

র‍্যাবাই ডেয়ো এবং তাঁর ছাত্র-ছাত্রীরা পুরো অনুষ্ঠানের একটা ছক তৈরি করলেন।

"শুরুতেই ছিল কিছু রেজিস্ট্রেশন টেবিল। লোকজন রেজিষ্ট্রেশন শেষ করার পর তাদের একটি নেম ট্যাগ দেয়া হচ্ছে। টেবিল নাম্বার দেয়া হচ্ছে। এরপর তারা কিছুক্ষণ নার্ভাস ভঙ্গীতে কিছুক্ষণ এক সঙ্গে দাঁড়াচ্ছে, কফি কিনছে। তারপর হয়তো আমি মহিলাদের বলছি, তাদের যে নম্বর দেয়া হয়েছে, সেই নম্বরের টেবিলে গিয়ে বসতে হবে। এরপর পুরুষদেরও আমি একই অনুরোধ করছি। এরপর তাদের পরস্পরের সঙ্গে আলাপ-পরিচয় এবং কথাবার্তার জন্য সাত মিনিট সময় দেয়া হচ্ছে। এরপরই আমি বেল বাজাচ্ছি। অর্থাৎ সময় শেষ। এবার প্রত্যেককে তার পরের টেবিলে নতুন আরেকজনের সামনে গিয়ে বসতে হবে। তারা আবার পরস্পরের সঙ্গে পরিচিত হবে, কথাবার্তা বলবে। লোকজনের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ দেখেই কিন্তু আপনি বলতে পারেন, তারা একটা ভালো সময় কাটাচ্ছে কিনা।"

"কিছু কিছু বিষয় জানতে চাওয়া নিষেধ। যেমন আপনি কোথায় থাকেন, কি করেন। নতুন কারও সঙ্গে পরিচয় হলে লোকে কিন্তু প্রথম এই বিষয়গুলোই জানতে চায়। কাজেই স্পীড ডেটিং এর সময় যেহেতু এই বিষয়গুলো জানতে চাওয়া যাচ্ছে না, তাই সেখানে কিন্তু দুজনের মধ্যে একটা অদ্ভূত অনুভূতি কাজ করবে।"

কিন্তু নতুন কারও সঙ্গে আলাপে মানুষ যে প্রশ্ন সবার আগে করে, সেটা জানতে চাওয়া যাবে না কেন? কি উদ্দেশ্যে এই নিয়ম করা হয়েছে?

"প্রথম কারণ হচ্ছে, এই প্রশ্ন দিয়ে আসলে মানুষ মানুষকে মাপার চেষ্টা করে। কোন মেয়ে যখন জানতে চাইছে, আপনি কি করেন, এই প্রশ্নের উত্তরের ভিত্তিতে তখন কিন্তু মেয়েটি বোঝার চেষ্টা করে ছেলেটির আয়-উপার্জন কেমন। দ্বিতীয়ত, এ ধরণের প্রশ্ন করা না হলে, দুজনের মধ্যে কথাবার্তাটা অনেক বেশি প্রাণবন্ত হয়।"

ইয়াকব ডেয়োর প্রথম স্পীড ডেটিং এর অনুষ্ঠান ব্যাপক সাফল্য পেল।

"আমি ঠিক জানি না, প্রথম অনুষ্ঠানে ঠিক গত জনের মধ্যে আমরা মিল ঘটাতে পেরেছিলাম। হয়তো ২৫ বা ৪০ শতাংশ লোক সেই সন্ধ্যায় তাদের সঙ্গী খুঁজে পেয়েছিলেন। কিন্তু আমাদের প্রথম উদ্দেশ্য তো ছিল লস এঞ্জেলেসে ইহুদী নারী-পুরুষদের মধ্যে মেলামেশা জানাশোনার একটা ব্যবস্থা করে দেয়া। সেটা কিন্তু সফল হয়েছিল। এখন এরপর তাদের মধ্যে কি হবে, সেটা তো তাদের ব্যাপার।"

তরুণ ইহুদী নারী-পুরুষদের মধ্যে আলাপ-পরিচয় ঘটিয়ে দেয়ার জন্য যে স্পীড ডেটিং এর শুরু, সেটা কিন্তু খুব শীঘ্রই ডেটিং এ আগ্রহী সব নারী-পুরুষদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠলো। ইয়াকব ডেয়ো মনে করেন, কোন ক্লাবে বা বারে কারও পক্ষে তার জীবনসঙ্গী খুঁজে পাওয়াটা যেরকম কঠিন, সে কারণেই হয়তো স্পীড ডেটিং এর এই জনপ্রিয়তা।

"আপনি যদি সেরা দুই শতাংশ, পাঁচ শতাংশ বা দশ শতাংশের মধ্যে না পড়েন, যদি আপনার কোন সহজাত বাড়তি সুবিধা না থাকে, যদি আপনার একটা অভিজাত বেশভূষা না থাকে তখন আপনার কি করার আছে? আর এর সঙ্গে যদি একটা অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশ, যেখানে উচ্চলয়ে গান বাজছে, সেখানে আপনার কারও সঙ্গে কথা বলতে হয়, তখন কতটাই বা আপনি অন্যজনকে জানার সুযোগ পান। তখন আপনাকে তার পোশাকের ছায়া, তার শরীরের অবয়ব, তার চোখের দৃষ্টি, এসবের ওপরই হয়তো আপনাকে নির্ভর করতে হয়। আমরা আসলে এই বিষয়গুলোকেই পরিহার করতে চেয়েছি।"

পিটস ক্যাফেতে পর পর কয়েকটি সফল স্পীড ডেটিং অনুষ্ঠানের পর দ্রুত এর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়লো চারিদিকে। একদিন সেখানে এসে হাজির হলো টিভি সাংবাদিকরা।

"যখন এটা টেলিভিশন শোতে, টেলিভিশন সংবাদে প্রচার পেল, তখন আমরা প্রচুর কল পেতে লাগলাম। এরা সবাই স্পীড ডেটিং এর পরের অনুষ্ঠানের জন্য নাম লেখাতে চায়। তখন আমরা আরও কয়েকটি কফি হাউজ খুজে বের করলাম এই অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য। আমাকে কয়েকজন কর্মী নিয়োগ দিতে হলো।"

স্পীড ডেটিং নিয়ে আমেরিকা জুড়ে মাতামাতি শুরু হয়ে গেল। পত্রিকার পাতায়, টেলিভিশনে এটা নিয়ে তুমুল আলোচনা। জনপ্রিয় টিভি সিরিয়াল 'সেক্স এন্ড দ্যা সিটি'র একটি চরিত্রকেও স্পীড ডেটিং এর চেষ্টা করতে দেখা গেল। আমেরিকার নানা জায়গায় নানা ধরণের স্পীড ডেটিং শুরু হলো।

ঢাকারিপোর্টটোয়েন্টিফোর.কম/এইচএমএল






সর্বশেষ সংবাদ