বাংলা ফন্ট

ব্যাংকিং সেক্টরে হঠাৎ কঠোরতা: অর্থনীতিতে নামতে পারে বিপর্যয়

13-09-2018
নিজস্ব প্রতিবেদক ঢাকারিপোর্টটোয়েন্টিফোর.কম

 ব্যাংকিং সেক্টরে হঠাৎ কঠোরতা: অর্থনীতিতে নামতে পারে বিপর্যয়


ঢাকা: প্রায় সব সরকারি ব্যাংকগুলোতেই চলছে এক ধরনের কৃচ্ছতা। কোন কোন ব্যাংক প্রায় বন্ধই করে দিয়েছে নতুন করে ঋণ দান কার্যক্রম। সোনালী, জনতা, অগ্রণী রূপালীসহ প্রায় সবগুলো সরকারি ব্যাংকেই চলছে পুরনো ঋণ আদায়ে তোড়জোড়। যেন এই একপেশে কার্যক্রমটাই শুধু ব্যাংকিং এর মূল কাজ।
বিগত দিনে একটা অতি স্থূল বাস্তবতা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। যার ফলে এই খাতে ব্যাপক লুটপাটও হয়েছে। এটি যেমন একটি ক্ষতিকর ব্যাপার ছিল তেমনি হঠাৎ করেই অতি ভালো সাজতে গিয়ে অতি কঠোরতা অবলম্বনও আমাদের সার্বিক অর্থনীতির জন্য বিপদজনক সিদ্ধান্ত। এটি আজ সর্বজন বিধিত বিষয় যে বাংলাদেশের অর্থনীতি বিকাশে বিশেষ করে ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশনের ক্ষেত্রে সরকারি ব্যাংকগুলোর ভূমিকা প্রায় মায়ের মতো। বলতে গেলে দেশের পঁচানব্বই ভাগ শিল্প প্রতিষ্ঠান দাঁড়িয়েছে সরকারি ব্যাংকগুলোর প্রত্যক্ষ বা পরক্ষ সহযোগীতায়। এখানে বলে রাখা ভালো যে পুরনো ঋণ বা খেলাপি ঋণ আদায় একটি সময় উপযোগী সিদ্ধান্ত। কিন্তু একই সাথে যদি অন্যান্য কার্যক্রমগুলোকে সমান গুরুত্ব না দেওয়া হয় তবে ঋণ আদায় কার্যক্রমও সম্পূর্ণ রূপে ব্যর্থ হবে। কেননা অর্থনীতিতে মার্শাল'ল চলেনা। একটি উৎপাদন মুখি প্রতিষ্ঠানকে যথাযথভাবে নার্সিং না করে যদি কেবলই চাপ প্রয়োগে অসুস্থ করে ফেলা হয় তবে খুব একটা টাকা আদায় তো করা যাবেই না বরং মেরে ফেলা যাবে প্রতিষ্ঠানগুলোকে। ফলাফল যা হবে তা হলো সামগ্রিক অর্থনীতিতে নামবে বড় বিপর্যয়।
ধরাযাক কোন প্রতিষ্ঠানে যদি দুই হাজার লোক কাজ করে তাহলে ধরে নিতে হবে ওই প্রতিষ্ঠান অন্তত দুই হাজার পরিবারকে অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল রেখে সামগ্রিক অর্থনীতিতে কমবেশি অবদান রাখার চেষ্টা করছে। যদি দশ/বিশ কোটি টাকার ব্যাড লোনের জন্য প্রতিষ্ঠানটির মৃত্যু হয়- তাহলে এই দু'হাজার লোককে কাজের জন্য ছুটতে হবে মধ্যপ্রাচ্য সহ দুনিয়ার বিভিন্ন শ্রমবাজারে। এবার হিসাব করুন নূন্যতম সৌদিআরবেও যদি কোন শ্রমিক যেতে চায়- দু'বছরের ভিসার জন্য তাকে গুনতে হবে সাড়ে সাত লাখ টাকার উপরে। এ টাকাটা যোগার হবে তার অভ্যন্তরীণ সম্পদ ধ্বংস করে। তাহলে এই দু'হাজার মানুষের বিদেশ যাত্রার জন্য খোয়াতে হবে তাদের প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার সম্পদ। অন্যদিকে একটি লোক যদি সৌদিআরব গিয়ে পঁচিশ হাজার টাকা বেতনের চাকরিও করে তাহলে দু'বছরে থাকা খাওয়ার খরচের পর যা থাকবে তা তার খরচ করে যাওয়া অর্থের অর্ধেকও হবে না। তা হলে ওই দুই বছরের তার শ্রমজীবন হবে পয়সা দিয়ে উল্টো অন্যের দাসত্ব করা।
অতএব এমন বাস্তবতায় ব্যাংকিং খাতে অতি কঠোর নীতিমালা জাতীয় জীবন এবং অর্থনীতিতে ব্যাপক বিপর্যয় সৃষ্টি করতে পারে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মহলকে বিপর্যয়ের আগেই ভাবতে হবে।

তৈরি হচ্ছে নেতিবাচক উদাহরণ: দক্ষদের কপালে কলঙ্ক অকর্মার প্রমোশন

কর্মদক্ষ তৎপর এবং কল্যাণমুখী প্রায় সকল ব্যাংকারদের মধ্যেই রয়েছে একটি তীব্র ক্ষোভ। তাদের বক্তব্য হলো- দেশের জন্য, প্রতিষ্ঠানের জন্য কাজ করতে গেলেই বিপদ। যদি কোন ব্যাংকার একশটি প্রতিষ্ঠানে ঋণদান করেন এবং তার মধ্যে আটানব্বইটি যদি উৎপাদন মুখর হয়, ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সক্ষম হয় এবং ব্যাংক ও দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি লাভবান হয় তাহলে ওই ব্যাংকার এই কৃতিত্বের কোন ভাগ তো পানই না বরং যদি বাকি দুটো খারাপ হয় তাহলে তার দায়ে ব্যাংকারের মাথার উপর ঝুলতে থাকে জেল-জরিমানা এবং মামলার হুমকি। তাদের বক্তব্য হলো কাজ করতে গেলে সফলতার পাশাপাশি কিছু ব্যর্থতারও সৃষ্টি হতে পারে। এ সবই কাজের অংশ হিসেবে মেনে নিয়ে আগানো উচিত।
অন্যদিকে এর বিপরীত চিত্র দেখা গেছে সেই সব ব্যাংকারদের ক্ষেত্রে যারা ব্যাংকার হয়েও মূলধারার ব্যাংকিংএ সম্পৃক্ত নন বা কোন উদ্যোগ বা কোন তৎপরতায় সংশ্লিষ্ট থাকেন না, তাদের অকর্মা আমলনামা থাকে বেশ ফ্রেশ। এই সমস্ত অফিসারদের ব্যাংক পাড়ায় বলা হয় 'ছুপা রুস্তম'। মজার ব্যাপার হলো ব্যাংকিং খাতে কড়াকড়ির নামে যখন ডুব দিয়ে জল খাওয়ার সময় চলতে থাকে তখনই এই 'ছুপা রুস্তমদের' পদোন্নতি হতে থাকে শ্রেফ অকর্মা আমলনামার জন্য।

চলছে 'ছুপা রুস্তম' ব্যাংকারদের সততা বিক্রির মৌসুম

অতি স্থূলতার পর যখনই অর্থ প্রশাসনে জারি হয় অতি কঠোরতার নির্দেশ, দুঃখজনকভাবে দক্ষ-কর্মতৎপর ব্যাংকারদের সরিয়ে ফেলা হয় গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে। এবং গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে দেখা যায় তথাকথিত সৎ অদক্ষ অকর্মা 'ছুপা রুস্তম' ব্যাংকারদের। অবশ্য ততক্ষণে স্থূল কার্যক্রম তো থাকেই না বরং তারা গলা টিপে ধরেন ব্যাংকিং এর স্বাভাবিক কার্যক্রমের। ভালো, মোটামুটি ভালো, কিছুটা দুর্বল এমন ব্যবসায়ী এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নেমে আসে নিয়মের বিচিত্র বেহুদা খড়গ। তখন এ সমস্ত আসল ব্যবসায়ীরা ব্যবসা বাঁচানোর স্বার্থে দ্বারস্থ হন তথাকথিত সৎ 'ছুপা রুস্তম' ব্যাংকারের কাছে তার সততা কেনার জন্য। এবং ব্যবসায়ীদের অতি গোপনে অত্যন্ত চড়া মূল্যে কিনতে হয় 'ছুপা রুস্তম' ব্যাংকারের সততা। কাজেই আর্থিক খাতে যদি কখনো কঠোর নীতিমালা অবলম্বন করতেই হয় তবে অর্থ প্রশাসন এবং গোয়েন্দাদের উচিত হবে আগেই এই 'ছুপা রুস্তম' সনাক্ত করা। যারা দেশ জাতি এবং ব্যাংকিং খাতের জন্য অভিশাপ ছাড়া আর কিছুই না।

ঢাকারিপোর্টটোয়েন্টিফোর.কম/এইএমএল

সর্বশেষ সংবাদ