বাংলা ফন্ট

পানির দরে চামড়া: পরস্পরকে দুষছেন ট্যানারি মালিক ও আড়তদাররা

25-08-2018
নিজস্ব প্রতিবেদক ঢাকারিপোর্টটোয়েন্টিফোর.কম

 পানির দরে চামড়া: পরস্পরকে দুষছেন ট্যানারি মালিক ও আড়তদাররা
ঢাকা: ঈদুল আজহায় কোরবানির পশুর চামড়া পানির দরে বিক্রি হয়েছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মতে, গত ৩০ বছরের মধ্যে এবার সবচেয়ে কম দামে চামড়া বিক্রি হয়েছে। ট্যানারি মালিকদের নির্ধারণ করে দেওয়া দরের অর্ধেক টাকাও মেলেনি। দেশের অনেক এলাকায় চামড়ার ক্রেতাই পাওয়া যায়নি। অবিশ্বাস্য কম দরের কারণে মাদ্রাসা ও এতিমখানা চামড়া বিক্রি থেকে নামমাত্র অর্থ পেয়েছে। কোরবানিদাতার দরিদ্র আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীরা হয়েছেন বঞ্চিত। এতে করে সারাদেশের মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে। এত কম দর হওয়ার কারণ হিসেবে আড়তদার ও ট্যানারি মালিকরা একে অপরকে দায়ী করছেন। এদিকে অবিশ্বাস্য কম দরে বেচাকেনা হওয়ায় চামড়া পাচারের আশঙ্কা করছেন অনেকেই।

ঈদের আগে ট্যানারি মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করে দর ঘোষণা করেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। নির্ধারিত দর হলো, প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত গরুর চামড়া ঢাকায় ৪৫ থেকে ৫০ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা। প্রতি বর্গফুট খাসির চামড়া ১৮ থেকে ২০ টাকা এবং প্রতি বর্গফুট বকরির চামড়া ১৩ থেকে ১৫ টাকা। এই দরে ৩০ থেকে ৩৫ বর্গফুটের লবণযুক্ত বড় গরুর চামড়া ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৭৫০ টাকায় ট্যানারি মালিকদের কেনার কথা। প্রতিটি চামড়া সংরক্ষণে লবণ, গুদামভাড়া, শ্রমিকের মজুরি, পরিবহনসহ মোট ব্যয় ১৫০ থেকে ২০০ টাকা এবং ১০০ টাকা মুনাফা ধরলেও ১ হাজার ২০০ থেকে দেড় হাজার টাকায় মাঠ পর্যায়ে কেনাবেচা হওয়ার কথা। কিন্তু মাত্র ৫০০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে ওই আকারের চামড়া। ১৫ থেকে ২৫ বর্গফুটের ছোট ও মাঝারি চামড়ার যৌক্তিক দাম ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা হলেও ১০০ থেকে ৪০০ টাকার বেশি দর পাওয়া যায়নি কোথাও। ছাগলের চামড়া বিক্রি হয়েছে নামমাত্র মূল্যে। নির্ধারিত দরের হিসাবে গড়ে ৫০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হওয়ার কথা থাকলেও তা ১০ থেকে ৩০ টাকার মধ্যেই বেচাকেনা হয়েছে। গরুর মাথার চামড়ার দর ছিল মাত্র ৫ টাকা, যা অনেকে বিক্রি করতে না পেরে ডাস্টবিনে ফেলে দিয়েছেন।

শুধু রাজধানী নয়, নির্ধারিত দরের চেয়ে অনেক কম দামেই সারাদেশে চামড়া বিক্রি হয়েছে। অন্য বছরে নাটোরে চামড়া ঢাকার প্রায় কাছাকাছি দামে কেনেন ট্যানারি মালিকরা। কিন্তু এবার নাটোরে প্রতিটি গরুর চামড়া মাত্র ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। মাগুরা, নরসিংদী, পটুয়াখালীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় চামড়ার দাম আরও কমে মাত্র ৩০০ থেকে ৫০০ টাকায় মাঠে কেনাবেচা হয়েছে।

ক্ষোভ ও হতাশা :ভালো দামের আশায় অনেক দূর থেকে রাজধানীর পোস্তার আড়তে এলেও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অনেকেই রিকশা ভাড়ার টাকাও ওঠাতে পারেননি। তখন তারা  রাগে ও ক্ষোভে চামড়া ফেলে রেখে গেছেন। পোস্তায় প্রবেশের আগে লালবাগের আব্দুল আলীম খেলার মাঠের পাশে থেকে শুরু করে আড়ত পর্যন্ত চামড়া কিনেছেন শত শত আড়তদার। সবাই আগেভাগে ঠিক করে নিয়ে একই দরে কিনেছেন। এ কারণে আড়ত থেকে আড়তে ঘুরেও দাম পাননি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। কম দাম জানাজানি হওয়ার পরে অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী চামড়া কিনতে বের হননি। চামড়া বিক্রি করতে না পারায় অনেকে স্থানীয় এতিমখানায় দান করেছেন। এতিমখানাগুলো থেকে একসঙ্গে অনেক চামড়া আড়তে নিয়ে গেলেও ছোট-বড় মিলিয়ে গড় দর ৪০০ থেকে ৫০০ টাকার বেশি পাওয়া যায়নি।

পুরান ঢাকার শেখ শাহ বাজারের ক্ষুদ্র চামড়া ব্যবসায়ী সঞ্চয় দাস গতকাল পোস্তার আড়তে ২৬ হাজার টাকা দামের দুটি খাসির চামড়া মাত্র ৭০ টাকায় বিক্রি করেছেন। ঈদের আগে যার দর ছিল ২০০ থেকে ২৫০ টাকা। তিনি ঈদের দিনে এক লাখ থেকে ৪ লাখ টাকার গরুর চামড়া মাত্র ৯৫০ টাকা দরে বিক্রি করেছেন। ঈদের আগে যার দাম দেড় হাজার থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা ছিল। পোস্তার আড়তে ২০ বর্গফুট আকারের দুটি গরুর চামড়া নিয়ে আসেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মো. জলিল। এর দাম পান মাত্র ২০০ টাকা। তিনি ক্ষোভে চিৎকার করে বললেন, তার কেনা দাম ও রিকশাভাড়া দিতে হবে। তখন আড়তদার অপারগতা প্রকাশ করলে তিনি অন্য আড়তে যান। সেখানে অনেক দর কষাকষির পরে দুটি চামড়ায় ৪০০ টাকা পেয়ে হতাশা প্রকাশ করে বলেন, এমন হলে কোনোভাবেই টিকে থাকবে না চামড়া ব্যবসা।

পটুয়াখালীর কুলসুম বেগম বিধবা। প্রতি বছর কোরবানিতে সহযোগিতা পান সবার কাছ থেকে। চামড়ার মাত্রাতিরিক্ত কম দামের কারণে এবার সহায়তার পরিমাণ সামান্য। হতাশার সুরে এ প্রতিবেদককে জিজ্ঞেস করলেন, গরিবের প্রতি এমন নিষ্ঠুর আচরণ কেন?

গতকাল দুপুরে হাজারীবাগ ট্যানারি মোড়ে ট্রাক বোঝাই করে গড়ে ৪০০ টাকার কেনা চামড়া সাভার চামড়া শিল্পনগরীতে নিয়ে যান ব্যবসায়ী বাবুল মিয়া। গত বছর ঈদে এ মানের চামড়া দেড় থেকে ২ হাজার টাকা করে কিনেছিলেন। হাজারীবাগের ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন, লালবাগের পোস্তার ব্যবসায়ী ফারুক হোসেন, শামীম মিয়াসহ অনেক ব্যবসায়ী জানান, গত ৩০ বছরে এত কম দামে চামড়া বিক্রি হয়নি। এবার চামড়ার দামে ধস নেমেছে। এ চামড়া থেকে তৈরি একটি ক্ষুদ্র পণ্য মানি ব্যাগের দামের চেয়েও চামড়ার দাম কম। এমন দামে চামড়া ধরে রাখতে পারবেন না ট্যানারি মালিকরা। বিভিন্ন স্থানে লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করা চামড়া পাচার হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেন তারা।

কেন এ অবস্থা :ঢাকা ও আশপাশ এলাকায় ১৫ লাখ পশুর চামড়া কেনাবেচা হয়েছে। এবার দাম কম থাকায় পোস্তার আড়ত চামড়ায় বোঝাই হয়ে গেছে। বেশিরভাগ আড়তের মধ্যে স্থান সংকুলান না হওয়ায় রাস্তায় লবণ দেওয়া হয়েছে। গত বছরের ৪ থেকে ৫ লাখ চামড়া পোস্তার আড়তগুলো কিনেছিল। এবার তারা ৭ থেকে ৮ লাখ চামড়া কিনেছেন। বাকি চামড়া ট্যানারি মালিকদের গোডাউন, আমিনবাজারের আড়ত ও ঢাকার চারপাশের ক্ষুদ্র আড়তে লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করা হয়েছে। আড়তদারদের সংগঠন বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব মো. টিপু সুলতান সমকালকে বলেন, ট্যানারি মালিকরা ১৫০ কোটি টাকা বকেয়া পাওনা পরিশোধ করেননি। এ কারণে বেশিরভাগ আড়তদারের হাতে পর্যাপ্ত টাকা না থাকায় চামড়া কেনার প্রস্তুতি নিতে পারেননি। শেষ সময়ে এসে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ টাকা দিলেও তা দিয়ে কেবল বাছাই করা চামড়া কিনেছেন আড়তদাররা। ফলে ছোট চামড়ার যৌক্তিক দাম মেলেনি।

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহীন আহমেদ সমকালকে বলেন, গত বছরের চেয়ে প্রতি বর্গফুটে মাত্র ৫ টাকা কমিয়ে ট্যানারি মালিকরা লবণযুক্ত চামড়ার দর নির্ধারণ করেছেন। কিন্তু ফড়িয়া ও আড়তদাররা সুযোগ নিয়ে কম দামে কিনেছেন। তিনি বলেন, ট্যানারি মালিকদের ব্যাংকগুলো যে পরিমাণ ঋণ দিয়েছে তা তিন কিস্তিতে দেওয়া হবে। প্রথম কিস্তিতে ৪০ শতাংশ টাকা দিয়েছে। এ টাকা দিয়ে চামড়া কেনার চাহিদা পূরণ হয়নি। তিনি বলেন, পরিবেশ দূষণের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার দাম মিলছে না। সাভারে বিনিয়োগ করে বেশিরভাগ ট্যানারি মালিকের হাতে টাকা নেই। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে রফতানি কমেছে। তাছাড়া চামড়ার রফতানির বড় বাজার চীন কৃত্রিম চামড়াজাত পণ্যের দিকে ঝুঁকেছে। এসব কারণে ট্যানারি মালিকদের দুর্দিন যাচ্ছে। ফলে এবার চামড়া কিনতে বকেয়া পরিশোধ করে অগ্রিম পর্যাপ্ত টাকা দেওয়া সম্ভব হয়নি। এর সুযোগ নিয়ে পাইকার ও আড়তদাররা কৃত্রিমভাবে দাম কমিয়ে চামড়া কিনেছেন।

ঢাকারিপোর্টটোয়েন্টিফোর.কম/এইএমএল



সর্বশেষ সংবাদ