বাংলা ফন্ট

ছয় লাখ কোটি টাকা পাচার ১০ বছরে

30-06-2018
নিজস্ব প্রতিবেদক ঢাকারিপোর্টটোয়েন্টিফোর.কম

 ছয় লাখ কোটি টাকা পাচার ১০ বছরে

ঢাকা: প্রতি বছর দেশে যে হারে বিদেশি বিনিয়োগ আসছে, তার কয়েকগুণ বেশি টাকা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাচার হচ্ছে। আমদানি রফতানি, রেমিটেন্স সংগ্রহের নামেসহ নানাভাবে টাকা পাচার হচ্ছে।

গত ১০ বছরে দেশ থেকে প্রায় ছয় লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে। এই পরিমাণ টাকা দেশের জাতীয় বাজেটের দেড়গুণ। এ ছাড়াও এই টাকা দিয়ে ১৮টি পদ্মা সেতু নির্মাণ করা সম্ভব। কোনো কিছুর তোয়াক্কা করছে না পাচারকারীরা।

বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থার গবেষণা অনুসারে মোটা দাগে মোট চার কারণে টাকা পাচার হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে- বিনিয়োগের পরিবেশের অভাব, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার আশঙ্কা, রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর দুর্বল নজরদারি এবং বেপরোয়া দুর্নীতি।

সাম্প্রতিক সময়ে পরপর তিনটি সংস্থার রিপোর্টেই বাংলাদেশ থেকে ভয়াবহ আকারে টাকা পাচারের তথ্য উঠে এসেছে। এই সংস্থাগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ সুইস ব্যাংক, গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই) এবং যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের সংগঠন আইসিআইজে।

এই পাচার ঠেকাতে তেমন কার্যকর কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না সরকারসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, পাচার রোধে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব রয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে এক ভয়াবহ তথ্য পাওয়া গেছে। আমদানির নামে এলসি বিল পরিশোধ করছে, কিন্তু কোনো পণ্যই দেশে আসছে না। প্রভাবশালী মহল পণ্য জাহাজীকরণের কাগজ জাল করে এলসিকৃত পণ্যের পুরো টাকাই তুলে নিয়ে বিদেশে রেখে দিচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের যে বিভাগ থেকে বিদেশি লেনদেনের অনুমোদন দেয়া হয়, ওই বিভাগের নাম ফরেন এক্সচেঞ্জ পলিসি ডিপার্টমেন্ট। সাম্প্রতিক সময়ে ওই বিভাগে অডিট করা হয়েছে। আন্ডার ইনভয়েস ও ওভার ইনভয়েস টাকা পাচারের পুরনো পদ্ধতি।
বর্তমানে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে কোনো মূলধনী যন্ত্রপাতি দেশে না এনেই। অথচ মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির নামে এলসি খোলা হয়। কিন্তু বাস্তবে কোনো পণ্য আসে না। এসব কাজ মনিটর করার দায়িত্ব যাদের তারাই এর সঙ্গে জড়িত।

জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মানিত ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, দেশের ভেতরে অস্থিতিশীলতার কারণে নির্বাচনকালীন সময় টাকা পাচার বাড়ে। আর পাচার বন্ধের ব্যাপারে সরকারের কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত আছে বলে মনে হয় না।

এ ধরনের সিদ্ধান্ত থাকলে পানামা পেপার্স এবং প্যারাডাইস পেপার্সে যাদের নাম আছে, তাদের ধরে এনে শাস্তি দেয়া হতো। তিনি বলেন, পত্রিকায় নাম ঠিকানাসহ বিস্তারিত ছাপা হয়েছে। কিন্তু এদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রীয় সংস্থা এত লোকজনের বিরুদ্ধে খোঁজ খবর নেয়, কিন্তু পাচারকারীদের খোঁজখবর নেয় না। তার মতে, সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত না থাকলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) যতই বাহ্যিক তৎপরতার কথা বলুক, তাতে কোনো লাভ হবে না। তিনি বলেন, টাকা পাচার রোধে নির্বাচনের আগে কিছু করবে কোনো পদক্ষেপ আসবে বলে মনে হয় না। কিন্তু অন্তত এতটুকু আশা করছি, নির্বাচনী ইশতেহারে দলগুলো বলবে, আমরা অবৈধভাবে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে যথোপযুক্ত, দৃশ্যমান ও কার্যকর উদ্যোগ নেব।

বৃহস্পতিবার প্রকাশিত সুইস ব্যাংকের রিপোর্ট অনুসারে সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত চার হাজার ১০০ কোটি টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিদেশে টাকা স্থানান্তরের অনুমতি না দেয়ায় সুইস ব্যাংকে রাখা পুরো টাকাই বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়ে গেছে বলে ধরে নেয়া হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্টস (আইসিআইজে) পানামা এবং প্যারাডাইস পেপার্সে এ পর্যন্ত অর্থ পাচারকারী হিসেবে ৮২ জন ব্যবসায়ীর নাম প্রকাশ করেছে। এ ছাড়াও গত বছরের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত জিএফআই’র রিপোর্টে বলা হয়েছে, গত ১০ বছরে বাংলাদেশ থেকে ছয় লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আবু হেনা মোহাম্মদ রাজী হাসান বলেন, টাকা পাচার রোধে বাংলাদেশ ব্যাংক সবসময় কাজ করছে। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি। মানিলন্ডারিং প্রতিরোধে যেসব আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন রয়েছে, আমরা তা পুরোপুরি মেনে চলছি। আন্তর্জাতিকভাবে যেসব তথ্য আসছে, তা সংগ্রহ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সরবরাহ করছি। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের দিক থেকে চেষ্টায় কোনো ত্র“টি নেই।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার গবেষণা অনুসারে স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকে কয়েকটি পদ্ধতিতে টাকা পাচার হয়। এর মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ থেকে বেপরোয়া পদ্ধতিতে টাকা বিদেশে যায়। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ট্র্যাংকে ভরে সরাসরি ডলার নিয়ে যায় প্রভাবশালী মহল। আমদানির নামে এলসি খুলে বিল পরিশোধ করছে, কিন্তু কোনো পণ্যই দেশে আসছে না। এ ছাড়াও রয়েছে আমদানিতে মূল্য বেশি দেখানো (ওভার ইনভয়েসিং), রফতানি মূল্য কম দেখানো (আন্ডার ইনভয়েসিং), হুন্ডি। সম্প্রতি টাকা পাচারের আরও একটি বড় মাধ্যম হয়ে দেখা দিয়েছে রেমিটেন্স। বিদেশ থেকে বৈদেশিক মুদ্রায় প্রবাসীদের রেমিটেন্স একটি চক্র সংগ্রহ করে তা বিদেশেই রেখে দেয়। আর এ দেশে দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত টাকায় এর দায় শোধ করা হয়। একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার জরিপ অনুযায়ী এই প্রক্রিয়ায় প্রায় ৪০ শতাংশ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আসছে না। ওইগুলোও পাচার হয়ে বিদেশের কোনো ব্যাংকে রাখা হচ্ছে।

সূত্র জানায়, দেশে বিদেশে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন বন্ধ ও মানিলন্ডারিং প্রতিরোধে সহায়তায় তথ্যের আদান প্রদান করতে ২০১৩ সালের জুলাইয়ে এগমন্ট গ্রুপের সদস্য হয়েছে বাংলাদেশ। বর্তমানে ১৪৭টি দেশ ওই গ্রুপের সদস্য। বাংলাদেশ এই গ্রুপের সদস্য হওয়ায় এখন সব দেশ থেকে মানিলন্ডারিং, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন বা টাকা পাচার বিষয়ক যে কোনো তথ্য সংগ্রহ করতে পারবে। কিন্তু সে ক্ষেত্রে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই।

সাম্প্রতিক সময়ে এক ভয়াবহ তথ্য পাওয়া গেছে। আমদানির নামে এলসি বিল পরিশোধ করছে, কিন্তু কোনো পণ্যই দেশে আসছে না। প্রভাবশালী মহল পণ্য জাহাজীকরণের কাগজ জাল করে এলসিকৃত পণ্যের পুরো টাকাই তুলে নিয়ে বিদেশে রেখে দিচ্ছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের যে বিভাগ থেকে বিদেশি লেনদেনের অনুমোদন দেয়া হয়, ওই বিভাগের নাম ফরেন এক্সচেঞ্জ পলিসি ডিপার্টমেন্ট। সাম্প্রতিক সময়ে ওই বিভাগে অডিট করা হয়েছে।

আমদানির নামে মুদ্রা পাচার : শিল্প বিনিয়োগে মন্দার মধ্যেও শিল্পের যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানি বেড়েছে। চলতি অর্থবছরে আমদানিতে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২০ শতাংশ। কিন্তু অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে আমদানি হয়েছে ২৪ দশমিক ৫ শতাংশ। এ নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে। তাদের মতে, শিল্পের যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানির নামে দেশ থেকে টাকা পাচার করা হচ্ছে। কেননা যেভাবে শিল্পের যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানি হয়েছে, সেভাবে শিল্পের উৎপাদন বাড়েনি। তাহলে আমদানি করা ওইসব শিল্প উপকরণ কোথায় গেল। এ প্রসঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেছেন, শিল্পের যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল এবং চাল আমদানির নামে টাকা কোথায় যাচ্ছে তা খতিয়ে দেখা দরকার।

রফতানির নামে মুদ্রা পাচার : সাম্প্রতিক সময়ে ভুয়া রফতানি এলসি (ঋণপত্র) এবং ক্রয়চুক্তির মাধ্যমে টাকা পাচার হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্তে এ ধরনের বেশ কিছু ঘটনা ধরা পড়েছে। এ ছাড়াও রফতানি পণ্য মূল্য কম দেখিয়ে বিদেশে অর্থ পাচার হচ্ছে।

ঋণের টাকা পাচার : বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুসারে ব্যাংকিং খাতে মোট বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ আট লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ প্রায় ৮৯ হাজার কোটি টাকা। অবলোপন মিলিয়ে তা এক লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। এ ছাড়াও সাম্প্রতিক সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। চলতি মুদ্রানীতি লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ। কিন্তু গত মার্চ পর্যন্ত তা ১৮ দশমিক ৫ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। বিভিন্ন সংস্থা বলছে এই ঋণের বড় অংশই বিদেশে পাচার করা হয়েছে।

জানতে চাইলে দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, তিন কারণে বিদেশে টাকা পাচার হতে পারে। প্রথমত, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে কিছু লোক বিদেশে টাকা নিতে পারে। দ্বিতীয়ত, দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত কালো টাকা পাচার হতে পারে। এ ছাড়াও বিনিয়োগে মন্দা কারণে ব্যবসায়ীদের টাকা বিদেশে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি বলেন, কারণ যাই হোক, টাকা পাচার হওয়া দেশের জন্য সুখবর নয়। তার মতে, সরকারের দুটি বিষয় নিশ্চিত করতে হবে। টাকা ফিরিয়ে আনা এবং জড়িতদের কঠোর শান্তি নিশ্চিত করা। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক, দুর্নীতি দমন কমিশন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এবং অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিসকে একযোগে কাজ করতে হবে।
সূত্র: যুগান্তর

ঢাকারিপোর্টটোয়েন্টিফোর.কম/এইএমএল

সর্বশেষ সংবাদ