বাংলা ফন্ট

গ্যাসের দাম বাড়ানোর আভাস

03-03-2018
নিজস্ব প্রতিবেদক ঢাকারিপোর্টটোয়েন্টিফোর.কম

  গ্যাসের দাম বাড়ানোর আভাস
ঢাকা:  আরেক দফা গ্যাসের দাম বাড়ানোর তোড়জোড় শুরু করেছে পেট্রোবাংলা। দেশে প্রথমবারের মতো তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানিকে কেন্দ্র করে এ দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সংস্থাটির কর্মকর্তাদের মতে, দেশে উৎপাদিত গ্যাস স্থানীয় বাজারে যে দামে বিক্রি হচ্ছে, আমদানি করা এলএনজি তার দ্বিগুণ দামে বিক্রি করতে হবে। এ ধারণার ভিত্তিতে পেট্রোবাংলার পক্ষ থেকে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির উদ্যোগ নেয়ার পর তা বাস্তবায়নে কাজ শুরু করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। তেল-গ্যাস-খনিজসম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, সরকার অতিরিক্ত দামে গ্যাস আমদানি করছে। একটি কমিশনভোগী শ্রেণীকে আর্থিক সহযোগিতা করতে এটা করা হচ্ছে। যার সামগ্রিক দায় নিতে হবে দেশের জনগণকেই।

জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদও গ্যাসের দাম বাড়ানোর আভাস দিয়েছেন। তিনি শুক্রবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, এলএনজি এলে বিদ্যুৎসহ শিল্প ও বাণিজ্যিক সংযোগে মূল্য সমন্বয় করতে হবে। অবশ্য আবাসিক গ্রাহকদের ক্ষেত্রে দাম বাড়ানো হবে কি না, তা স্পষ্ট করেননি তিনি। এমনকি কবে থেকে গ্যাসের মূল্য বাড়ানো হবে, সে বিষয়েও সুনির্দিষ্ট কিছু বলেননি নসরুল হামিদ। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি বলতে পারি, এটা কমফোর্ট থাকা উচিত। শুনানি শেষে বিইআরসি এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। গ্যাসের দাম আবারও বাড়ানো হলে নির্বাচনের বছরে জীবনযাত্রার ব্যয় আরও একদফা বাড়বে। তবে তা যেন জনজীবনে বড় কোনো চাপ তৈরি না করে, সরকার সেদিকে নজর দেবে বলে আশ্বস্ত করেন প্রতিমন্ত্রী।

তিনি বলেন, আমরা এ বিষয় নিয়ে এক বছর ধরে পরিকল্পনা করছিলাম। স্টেকহোল্ডার যারা এ গ্যাস কিনবেন এবং ব্যবহার করবেন, তাদের সঙ্গে আমরা বসেছি। প্রচুর হিসাব-নিকাশ, গবেষণা ও অনুসন্ধান করেছি। গ্যাসের দাম বাড়লেও সেটি জীবনযাত্রার ক্ষেত্রে শকিং হবে না। প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশে যেসব ডুয়েল-ফুয়েল (দুই ধরনের জ্বালানিতে চালানো যায়) বিদ্যুৎ কেন্দ্র আছে, সেগুলো গ্যাসের অভাবে তেল দিয়ে চালানো হচ্ছে। এলএনজি এলে সেখানে গ্যাসের ব্যবহার বাড়ানো যাবে। তখন এ খাতে ব্যয় তেলের চেয়ে কম হবে। গ্যাসে চালালে বিদ্যুতের দাম বাড়াতে হবে না।

অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়া প্রসঙ্গে আরও বলেন, গ্যাসের দাম বাড়ানো হবে- এটা সরকারের পুরনো সিদ্ধান্ত। সরকারের পাওয়ার সেক্টর ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান বা পিএসএমপি’র মধ্যে এটা রয়েছে। সেখানে বেশি দামে গ্যাস আমদানি করা, নিয়মিত বিদ্যুতের দাম বাড়ানো ইত্যাদি বিষয়গুলো সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল। প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যের বিরোধিতা করে তিনি বলেন, গ্যাস আমদানি হলে বিদ্যুতের দাম কমবে, এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা। প্রাথমিক জ্বালানির দাম বেশি থাকলে উৎপাদিত জ্বালানির দাম কমার কোনো সুযোগ নেই। একটি কমিশনভোগী শ্রেণীকে আর্থিক সহযোগিতা করতে সরকার অতিরিক্ত দামে গ্যাস আমদানি করছে।

গত বছর ফেব্রুয়ারিতে গ্যাসের দাম গড়ে ২২ দশমিক ৭০ শতাংশ বাড়ানো হয়। মার্চ ও জুলাই থেকে দুই ধাপে তা বাস্তবায়িত হয়। এক বছরের মাথায় নতুন করে গ্যাসের দাম বাড়ানোর তোড়জোড়ের মূল কারণ এলএনজি আমদানি।

যুক্তরাষ্ট্রের এক্সিলারেট এনার্জি কক্সবাজারের মহেশখালীতে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে আসায় এপ্রিলের শেষ অথবা মে’র প্রথম সপ্তাহেই এলএনজি আমদানি শুরু করা যাবে বলে মনে করছে সরকার। ওই এলএনজি টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট (১৪ দশমিক ১৬ মিলিয়ন ঘনমিটার) গ্যাস সঞ্চালন লাইনে দেয়া যাবে।

সম্প্রতি পেট্রোবাংলা থেকে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড ও বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশনের চেয়ারম্যানকে জানানো হয়, এলএনজি আমদানির পর প্রতি ঘনমিটার গ্যাস (প্রাক্কলিত) গড়ে ১৩ টাকার কমে বিক্রি করা সম্ভব হবে না। বর্তমানে পেট্রোবাংলার প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের গড় মূল্য সাত টাকা ৩৫ পয়সা।

গত বছর দাম বাড়ানোর পর বিদ্যুৎ খাতে প্রতি ঘনমিটার গ্যাস ৩ টাকা ১৬ পয়সা, ক্যাপটিভ বিদ্যুতে ৯ টাকা ৬২৩ পয়সা, সার কারখানায় ২ টাকা ৭১ পয়সা, শিল্পে ৭ টাকা ৭৬ পয়সা ও বাণিজ্যিকে ১৭ টাকা ৪০ পয়সা দরে বিক্রি করা হচ্ছে।

পেট্রোবাংলার হিসাবে, বৃহস্পতিবার দেশে ২ হাজার ৬৬৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের পরও ঘাটতি ছিল এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি। এর মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ১ হাজার ৮৪১ মিলিয়ন ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে মাত্র ৯১৭ মিলিয়ন ঘনফুট ও সার কারখানায় ৩১৬ মিলিয়ন ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে ৯৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে।

২০১৬-১৭ অর্থবছরে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ভর্তুকিতে গ্যাস বিক্রি করে পেট্রোবাংলার লোকসান ৩৬২১ কোটি টাকা এবং সার উৎপাদনে গ্যাস বিক্রি করে ৫১১ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। এটা পেট্রোবাংলার হিসাব। গ্যাসের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় আগামী এপ্রিল থেকে যদি প্রতি ঘনমিটার ১৩ টাকা দরেও বিক্রি করা হয়, তারপরও তাদের লোকসান বাড়বে বলে সংস্থাটির কর্মকর্তারা দাবি করেন।

ঢাকারিপোর্টটোয়েন্টিফোর.কম/এইএমএল


সর্বশেষ সংবাদ