বাংলা ফন্ট

ঘরে ঘরে হোক পিঠা উৎসব

08-01-2018
নিজস্ব প্রতিবেদক ঢাকারিপোর্টটোয়েন্টিফোর.কম

 ঘরে ঘরে হোক পিঠা উৎসব
ঢাকা: পিঠা বাংলাদেশের একটি ঐতিহ্যবাহী খাবার। পৌষের হিমেল হাওয়া ছাড়া যেমন শীতকে কল্পনা করা যায় না, তেমন পিঠা ছাড়াও বাঙালির ঐতিহ্য ভাবা যায় না। তবে অঞ্চলভেদে ভিন্ন ভিন্ন পিঠা যেমন দেখা যায়, তেমনি একেকটি পিঠার বিভিন্ন নামও লক্ষ করা যায়। আর সেসব পিঠার নামের বাহার যেনও পিঠা খাওয়ার আকাক্সক্ষা আরো বাড়িয়ে দেয়। এসব পিঠার মধ্যে বেশ পরিচিত কিছু পিঠা-চিতই, ভাপা, পাটিসাপটা, নকশি, সেমাই, সাঁজের, রসের, তেলের, পাক্কূণ, ডালের, বিউটি পাপড়ি, মাংস, পুলিপিঠা ইত্যাদি ছাড়াও বিভিন্ন অঞ্চলে হরেক নামের বাহারি সব পিঠা দেখা যায়। গ্রামের মেঠোপথ, ঘোমটা পরা কুয়াশা, সকালের খেজুরের রস, সূর্যের উঁকি দেওয়া কোমল মিষ্টি রোদ, আর মায়ের হাতের পিঠা মনে পড়লে কার না গ্রামে ফিরে যেতে ইচ্ছে করে। শীতের আনাগোনায় যেনও পিঠার আধিক্য আরো অনেকাংশেই বেড়ে যায়, সে জন্য অনেকে শীতকালকে পিঠার মৌসুমও বলে থাকে। শীতের পিঠার মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় ভাপা, চিতই ও রসের পিঠা। শীতে সব জায়গাতেই ভাপা ও চিতই পিঠার আধিক্য থাকলেও রসের পিঠা গ্রামেই বেশি দেখা যায়। খেজুরের রসের সঙ্গে দুধ আর নারকেল দিয়ে, রসের পিঠার যে স্বাদ, তা বর্ণনাতে কোনোভাবেই প্রকাশ করা যায় না। তবে এখন শহরেও পিঠার জনপ্রিয়তা বেড়ে চলছে। প্রতিবছর শীতের মৌসুমে প্রায় সব শহরেই পিঠা উৎসবের দেখা মেলে, তবে ঢাকায় এর প্রভাবটা আরো বেশি। আমাদের প্রিয় এই ঢাকা শহরের প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষই গ্রামবাংলা থেকে ভিড় জমিয়েছে, তাই শীতের আবছা কুয়াশা আর মুহুর্মুহু হিমেল হাওয়ায়, শহরের ব্যস্ততার পরও সবারই মন চায় জননীর কিংবা প্রিয়তমার হাতের পিঠা খেতে। কিন্তু শহুরে জীবনে এই আকুলতা দূর করতে অনেকেই ছুটে যায় বিভিন্ন পিঠা উৎসবে। তবে কজনই বা পিঠা উৎসবে যাওয়ার সময় পায় বা সামর্থ্য রাখে। তাই ঢাকাবাসীর পিঠার চাহিদা মেটাতে রাস্তার মোড়ে, অলিগলিতে, বাসস্ট্যান্ডে বসেছে ছোট ছোট পিঠার দোকান। দোকানগুলোতে রয়েছে নানান রকম শীতের পিঠা, যেখানে বেশি চোখে পড়ে চিতই আর ভাপা। নানা পেশার লোকজনের ভিড়ও রয়েছে দোকানগুলো ঘিরে। আর এভাবেই শহরবাসী শীতের পিঠার আস্বাদন গ্রহণ করে। তবে দুঃখ যে, সাম্প্রতিক সময়ে পিঠার দোকানের প্রভাব বেড়ে যাওয়ায় বাড়িতে বাড়িতে পিঠা বানানোর ঐতিহ্য অনেক ম্লান হয়েছে। পিঠা সে তো আমাদেরই ঐতিহ্য, আমাদেরই সংস্কৃতি। এই ঐতিহ্য বাঁচিয়েও রাখতে হবে আমাদেরই। তাই ঘরে ঘরে উৎসবের জন্য রইলো পিঠা তৈরির প্রণালী-

নারকেলের তিল পুলি

উপকরণ: ভাজা তিলের গুঁড়া আধা কাপ, খেজুরের গুড় ১ কাপ, এক চিমটি এলাচ গুঁড়া, দারচিনি ২-৩টা, আতপ চালের গুঁড়া ২ কাপ, পানি দেড় কাপ, লবণ সাধ্যমতো, ভাজার জন্য তেল দুই কাপ।

প্রণালী:
কুরানো নারকেলে গুড় দিয়ে ১৫-২০ মিনিট রান্না করতে হবে। একটু শক্ত হয়ে এলে এলাচ, তিল ও চালের গুঁড়া ছড়িয়ে আরও একটু রান্না করতে হবে। তেল উঠে পুর যখন পাকানোর মতো শক্ত হবে, তখন নামিয়ে ঠা-া করে লম্বাভাবে সব পুর বানিয়ে রাখতে হবে। এবার চালের গুঁড়া সেদ্ধ করে ভালোভাবে চুলার আঁচ কমিয়ে নাড়তে হবে, যাতে খামিরে কোনো চাকা না থাকে। একটু ঠা-া হলে পানি ছিটিয়ে ভালো করে ছেনে রুটি বানাতে হবে। রুটির এক কিনারে পুর রেখে বাঁকানো চাঁদের মতো উল্টে পিঠে আটকে দিতে হবে। এবার টিনের পাত অথবা পুলিপিঠা কাটার চাকতি দিয়ে কেটে নিতে হবে। কিনারে মুড়ি ভেঙে ও নকশা করা যায়। গরম তেলে মচমচে করে ভাজতে হবে।

চিতই পিঠা

উপকরণ: চালের গুড়া ২ কাপ, পানি ও লবণ পরিমাণমতো।

প্রণালী:
চালের গুড়ায় পানি মিশিয়ে তরল মিশ্রণ তৈরি করুন। খেয়াল রাখবেন বেশি পাতলা বা বেশি ঘন যেন না হয়। তবে পাতলা গোলা করলে পিঠা সুন্দর নরম হয়। যে পাত্রে পিঠা ভাজবেন সেটাতে সামান্য তেল মাখান। এখন পাত্রটি হালকা গরম করে ২ টেবিল চামচ চালগোলা দিয়ে ঢেকে দিন। ২-৩ মিনিট পর পিঠা তুলে ফেলুন। বিভিন্ন রকম ভর্তা, ভুনা মাংস দিয়ে এই পিঠা খেতে বেশ মজা।

ভাপা পিঠা

উপকরণ: সিদ্ধ চালের গুঁড়া ২ কাপ, ভেঙে নেওয়া খেজুরের গুড় ১ কাপ, নারিকেল কোরানো ১ কাপ, লবণ সাধ্যমতো।

প্রণালী:
চালের গুঁড়িতে লবণ মিশিয়ে হালকা করে পানি ছিটিয়ে ঝুরঝুরে করে মেখে নিতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে, যেন দলা না বাঁধে। এবার বাঁশের চালনিতে চেলে নিন। ভাপা পিঠা বানানোর হাঁড়িতে পানি দিন। এবার মুখ ছিদ্র ঢাকনা বসিয়ে আটা দিয়ে আটকে দিন। যাতে বাষ্প বের হতে না পারে। চুলায় বসিয়ে জ্বাল দিন। পাতলা সুতার দুই টুকরা কাপড় ও ছোট দুটি বাটি নিন। এবার বাটিতে চালা চালের গুঁড়ি দিয়ে মাঝখানে গর্ত করে গুড় ও নারিকেল দিন। আবার চালের গুঁড়া দিয়ে ঢেকে দিন। এবার এক টুকরা পাতলা সুতির কাপড় ভিজিয়ে পিঠার বাটি ঢেকে উল্টে মুখ ছিদ্র ঢাকনার ওপর পিঠা রেখে সাবধানে বাটি খুলে পিঠা ঢেকে দিন। সিদ্ধ হলে পিঠা উঠিয়ে গরম গরম পরিবেশন করুন।

দুধচিতই

উপকরণ: চালের গুড়া ২ কাপ, পানি ও লবণ পরিমাণমতো, ১ লিটার দুধ, গুড় ২ কাপ।

প্রণালী:
চালের গুড়ায় পানি মিশিয়ে তরল মিশ্রণ তৈরি করুন। খেয়াল রাখবেন বেশি পাতলা বা বেশি ঘন যেন না হয়। তবে পাতলা গোলা করলে পিঠা সুন্দর নরম হয়। যে পাত্রে পিঠা ভাজবেন সেটাতে সামান্য তেল মাখান। এখন পাত্রটি হালকা গরম করে ২ টেবিল চামচ চালগোলা দিয়ে ঢেকে দিন। ২-৩ মিনিট পর পিঠা তুলে ফেলুন। ১ লিটার দুধ জ্বাল দিয়ে সামান্য ঘন করুন। আলাদা করে দেড়কাপ পানিতে ২ কাপ গুড় জ্বাল দিয়ে গুড়ের সিরা তৈরি করুন। সিরায় পিঠা ছেড়ে চুলায় দিয়ে কিছুক্ষণ জ্বাল দিন। ঠা-া হলে দুধ দিয়ে কিছু সময় ভিজিয়ে রাখুন।সকালে এই পিঠা খেতে মজা।

দুধপুলি

উপকরণ: চালের গুঁড়া ৫০০ গ্রাম, দুধ ২ লিটার, খেজুরের গুড় ২ কাপ নারকেল কোরানো ২ কাপ, গুড় ২ কাপ

প্রণালী:
দুধ ও গুড় জ্বাল দিয়ে ঘন করতে হবে, নারকেল ও গুড় জ্বাল দিয়ে পুর তৈরি করতে হবে। চালের গুঁড়া সিদ্ধ করে ভালো করে মেখে নিতে হবে, এবার ছোট ছোট লুচি কেটে গোল করে মাঝখানে পুর ভরে ছোট ছোট পুলি পিঠা তৈরি করতে হবে। চুলায় দুধ থাকা অবস্থায় পিঠা দিয়ে অল্প জ্বাল দিয়ে পিঠা হলে নামিয়ে গরম অবস্থায় পরিবেশন করুন। ঠা-া করেও খাওয়া যায়।

নকশি পিঠা

উপকরণ: চালের গুঁড়া ৪ কাপ, পানি তিন কাপ, লবণ সামান্য, ঘি ১ টেবিল চামচ, ভাজার জন্য তেল ৫০০ গ্রাম

সিরার জন্য: গুড় ১ কাপ, চিনি ১ কাপ, পানি ২ কাপ জ্বাল দিয়ে সিরা বানাতে হবে।

প্রণালী:
পানিতে লবণ ও ঘি দিয়ে চুলায় দিন। ফুটে উঠলে চালের গুঁড়া দিয়ে সেদ্ধ করে কাই বানাতে হবে। আধা ইঞ্চি পুরু করে রুটি বানিয়ে পছন্দমতো আকার দিয়ে কেটে নিন। খেজুর কাঁটা দিয়ে রুটিতে পছন্দমতো নকশা করুন। এবার প্রথমে ডুবোতেলে ভেজে নিন। কিছুক্ষণ পর আবার তেলে ভেজে সিরায় দিয়ে ১ মিনিট রেখে তুলে নিন। ঠা-া হলে পরিবেশন করুন।

লাল পুয়াপিঠা

উপকরণ: আতপ চালের গুঁড়া ৩ কাপ, মিহি করে বাটা নারকেল আধা কাপ, ময়দা ১ টেবিল-চামচ, বেকিং পাউডার আধা চা-চামচ, খেজুরের গুঁড় বা রস মিষ্টি অনুযায়ী, পানি পরিমাণমতো, ডিম ২টি, এক চিমটি লবণ এবং তেল ১ কাপ।

প্রণালী:
তেল ছাড়া সবকিছু মিশিয়ে অন্তত ৩০ মিনিট রেখে দিতে হবে। এবার তেল গরম হলে গোল চামচে গোলা নিয়ে একটা একটা করে ভেজে তুলুন।

মালপোয়া

উপকরণ: খেজুর রস ১ কেজি, ময়দা ২৫০ গ্রাম, ক্ষীর ১ কাপ, খাবার সোডা ১ চিমটি, মৌরি আধা চামচ, লবণ সাধ্যমতো, ঘি ২৫০ গ্রাম।

প্রণালী:
রস জাল দিয়ে ঘন করে নিন। ময়দা, ক্ষীর, মৌরি, খাবার সোডা, লবণ ও পানি দিয়ে ঘন গোলা তৈরি করুন। চুলার হাড়িতে দেওয়া ঘি গরম হলে পিঠা ভেজে গরম গরম খেজুর রসে চুবিয়ে নিন।

তেল পিঠা

উপকরণ: চালের গুঁড়ো, খেজুর গুড়, কালি জিরা, লবণ, গরম পানি, তেল

প্রণালী:
পানি ভালো মতো ফুটিয়ে তাতে সব উপকরণ একসঙ্গে মিশিয় খামি তৈরি করে নিন। আপনি চাইলে ডিমও ভেঙ্গে দিতে পারেন। এতে পিঠার স্বাদে ভিন্নতা আসবে। খামির ভালো করে ফেটে নিয়ে গরম তেলে ভাজুন। এই পিঠা ডুবো তেলে ভাজতে হয়। তেলের ভিতরে পিঠা গাঢ় বাদামী রঙ ধারণ করলে নামিয়া তা গরম গরম পরিবেশন করুন।

অনেকে এই পিঠা দুধের সিরায় ভিজিয়ে খেতেও পছন্দ করেন। এ জন্য অবশ্য আগে দুধ ও গুড় এক সঙ্গে করে জাল দিয়ে নিতে হয়। পিঠা ভাজার পর তা দুধে কয়েক ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখতে হয়।

দুধ পুলি পিঠা

উপকরণ: আড়াই কাপ চালের গুঁড়া, আধা কাপ ময়দা, দেড় কাপ পানি, আধা চা-চামচ লবণ, আধা চা-চামচ ঘি, দুধ দেড় কেজি, ১ কাপ চিনি (স্বাদ মতো), ১/৩ কাপ গুঁড়াদুধ (ইচ্ছা), ৪ টেবিল-চামচ কনডেন্সড মিল্ক, দেড় কাপ নারিকেল কুড়ানো, এলাচ ২,৩টি।

প্রণালী:
পিঠার ভেতরে পুরের জন্য দেড় কাপ নারিকেল কুড়ানো (সামান্য রেখে দিতে হবে পরে দুধের মধ্যে দেওয়ার জন্য)। এখন বাকি নারিকেলের সঙ্গে পাঁচ থেকে ছয় চামচ চিনি দিয়ে ফ্রাইপ্যানে সাত থেকে আট মিনিট ভেজে নিতে হবে (নারিকেলের পানি শুকাতে যতক্ষণ লাগে) এই পুর পিঠার ভেতরে দিতে হবে। দুধের সঙ্গে গুঁড়াদুধ, চিনি, কনডেন্সড মিল্ক আর এলাচ মিশিয়ে জ্বাল দিন। পিঠা বানানো হতে হতে দুধ খুব সুন্দর জ্বাল হয়ে হালকা রং হবে। অন্য পাতিলে পানির সঙ্গে লবণ এবং ঘি দিয়ে গরম করুন। ফুটানো পানির সঙ্গে চালের গুঁড়া ও ময়দা দিয়ে খুব ভালো করে মিশিয়ে নিয়ে চুলা বন্ধ করে দিয়ে খামির করতে হবে। রুটি বানানোর পিঁড়িতে গরম গরম খামির খুব ভালো করে মথে নিন। এখন খামিরটা ১০ ভাগ করুন। এক একটি ভাগ দিয়ে ছোট ছোট রুটি বেলে অথবা হাত দিয়ে চেপে পাতলা করে ভিতরে নারিকেলর পুর দিয়ে পুলিপিঠা তৈরি করুন। এভাবে সব পিঠাগুলো তৈরি করে নিন। এখন বানানো পুলিপিঠা, ফুটিয়ে রাখা দুধের মধ্যে দিয়ে চুলার আঁচ কম রেখে ১০ মিনিট রান্না করতে হবে। হাঁড়ি আস্তে ঝাঁকিয়ে পিঠার সঙ্গে দুধ মিশিয়ে নিন। ১০ মিনিট রান্নার পর কুড়ানো নারিকেল দিয়ে আরও দুই থেকে তিন মিনিট রান্না করে নামিয়ে পাত্রে ঢেলে পরিবেশন করুন মজাদার দুধ পুলি পিঠা।


ঢাকারিপোর্টটোয়েন্টিফোর.কম/এইএমএল


সর্বশেষ সংবাদ