বাংলা ফন্ট

নদীর বুকে উকি দিচ্ছে পদ্মাসেতু

07-12-2017
লোকমান তাজ

 নদীর বুকে উকি দিচ্ছে পদ্মাসেতু

পদ্মাসেতুর কাজ কতটুকু হয়েছে দেখার জন্য মনের আকুলতা ছিল অনেক দিন থেকেই। এর মধ্যে বন্ধু আকবরের ফোন পেলাম। পদ্মাসেতু দেখার ইচ্ছা প্রকাশ করলো সে। তার সাথে থাকবে এক প্রকৃতি পাগলও। সেই প্রকৃতি পাগলের জন্যই হয়তো আমাদেরও দেখার আগ্রহ একটু বেড়ে গিয়েছিল। তাই প্রকৃতি পাগল বৃদ্ধকে নিয়ে ভোর সকালে মাওয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম। গুলিস্তান এসে গাংচিল পরিবহণে উঠে পরলাম। পদ্মার বুকে এখন গাংচিল তেমন দেখা না গেলেও ঢাকা-মাওয়া-বালিগাঁও দিব্বি উড়ে বেড়ায় গাংচিল পরিবহণ। আমরাও তার পিঠি চরে উড়ে গেলাম মাওয়া। মাওয়ায় পদ্মা সেতুর যেই কাজ হয়েছে তা দেখে মন নিস্তেজ হয়ে উঠল। সংযোগ সড়ক ছাড়া দেখার মত তেমন কোনো কাজ চোখে পড়লো না। আমাদের সাথে থাকা প্রকৃতি প্রেমিক বৃদ্ধ তো বলেই বসলো-কোথায় হচ্ছে পদ্মা সেতুর কাজ। ১৫০ মিটার দীর্ঘ স্প্যানটিকেই কোথায় বসানো হয়েছে? তার প্রশ্নের উত্তর খোঁজতেই যেত হলো শিমুলিয়া ফেরিঘাট। ফেরিঘাটে গিয়ে কানা গলির মধ্য দিয়ে খুঁজে পাওয়া গেলো লোকাল লঞ্চ। টিকেট না কেটেই উঠে গেলাম লঞ্চে। তখন সকাল নয়টা পাঁচ মিনিট। লঞ্চ ভড়ে যাওয়ার সাথে সাথেই যাত্রা শুরু করলো কাওরাকান্দির উদ্দেশ্যে। যাত্রার সাথে সাথে টিকিট কাটা শুরু হয়ে গেলো। প্রতি টিকিটের মূল্য ত্রিশ টাকা। আমি তিনটি টিকিট কেটে বন্ধুকে ধরিয়ে দিলাম। লঞ্চ একটু যেতেই নদীর বুকে দেখা গেলো সেতু তৈরির বিশাল বিশাল যন্ত্রাংশ। আমি প্রকৃতি প্রেমী সেই বৃদ্ধকে আঙ্গুল উঁচিয়ে সেগুলো দেখাচ্ছিলাম। এর মধ্যে চোখে পড়লো পদ্মার বুক জেগে উঠা চর। চর বললে সম্ভবত ভুল বলা হবে, তাই প্রকৃতির স্বর্গ বলে নেয়াটাই ভালো। চরের বুকে মাথা উঁচু করে আছে দিগন্ত কাশফুল। দুচোখ যেদিক যায় শুধু কাশফুলে চোখ আটকে যায়। কাশফুল নয় যেন পদ্মার বুকে সাদা গালিচা বিছানো চারদিক। শরতের একটু বাতাসেই সাগরের ঢেউ খেলে যায় চরের বুকে। উপরে মেঘমুক্ত আকাশ নিচে কাশফুলের গালিচা আর নদীর মৃদু ঢেউ যেন স্বর্গ পুরীতে এক দিন। লঞ্চ এক বাঁক থেকে আরেক বাঁকে ঘোরতেই চোখে পড়লো ১৫০ মিটার দীর্ঘ স্প্যানটি। স্প্যানটি দেখে সেই বৃদ্ধ প্রকৃতি পাগলের মুখের কোনায় একটু হাসি দেখা গেলো। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আসার আনন্দটা হয়তো ওখানেই। আমাদের লঞ্চটা একটু ধীর গতির হওয়ায় এক ঘণ্টার পথ পাড়ি দিতে হলো আরও পঁচিশ মিনিট পরে। তবে পদ্মার বুকে জেগে উঠা চর আর কাশফুল দেখতে দেখতে মনের অজান্তে লঞ্চে দাঁড়িয়ে থেকেই সময়টা পাড় করে দিয়েছি। কাওরাকান্দি ঘাটে নেমে পায়ে হেঁটে রাস্তায় উঠে এলাম। ঢাকায় রিকশার ঠেলাঠেলি থাকলেও শরীয়তপুর রিকশার দেখা পাওয়া যায় না। সেখানকার ঐতিহ্যবাহী ভ্যানে চরে চলে গেলাম কাঁঠালবাড়ী ফেরি ঘাটে। পথে চোখ আটকে গিয়েছিল সংযোগ সড়ক দেখে। পিচ ঢালাই সড়কের দুই পাড়ে সবুজ পাতা নিয়ে ঘাসগুলো তরতরিয়ে উঠছে আকাশের দিকে চেয়ে। আকাশটাও যেন এক চিলতে হাসি হেসে হাত বাড়িয়ে ডাকছে। সংযোগ সড়ক ধরে চলে গেলাম ফেরি ঘাট এলাকায়। সেখানেই চোখে পড়লো পদ্মা সেতুর বিশাল কর্মযজ্ঞ। বিশাল বিশাল যন্ত্রাংশ এক পায়ে দাঁড়িয়ে আছে আকাশ পানে। চোখ আটকে যায় সেই কর্মযজ্ঞ দেখে। চোখে পড়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নির্ভীক সৈন্যদের। অক্লান্ত পরিশ্রম করে পদ্মা সেতু নির্মাণকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সাহসিক তত্ত্বাবধানের মধ্য দিয়ে। সেতুটির জাজিরা প্রান্তের ৩৭ ও ৩৮ নং খুঁটির ওপর বসিয়ে দেয়া ১৫০ মিটার দীর্ঘ স্প্যানটি সামনে থেকে দেখতে পায় আমাদের সাথে ঘোরতে যাওয়া প্রকৃতি প্রেমী বৃদ্ধ। দেখেই মনের কোনে বাসনা যাগে স্প্যানটি পেছনে রেখে একটি ছবি তোলার। আমার হাতে থাকা মোবাইল ক্যামেরায় ধরা পরে সেই দৃশ্য। প্রকৃতি প্রেমী একটি হাসি দিয়ে বলে- এতো দূর আসা এবার সফল হলো। পদ্মা সেতু নির্মাণ কাজ চোখে দেখার সাক্ষী হয়ে থাকলাম। সাক্ষী হয়ে থাকল আমার ছবি। এক দিন আমি থাকবো না কিন্তু বেয়াল্লিশটি পায়ে ঠিক দাঁড়িয়ে থাকবে দক্ষিণবঙ্গের সাথে যোগাযোগের বড় মাধ্যম এই পদ্মাসেতু।

সর্বশেষ সংবাদ