বাংলা ফন্ট

পান্তা ইলিশ সমাচার

13-04-2017
লোকমান তাজ

পান্তা ইলিশ সমাচার

ধাবমান এর সৌজন্যে: হাজারো ছন্দ-কবিতা ও প্রাণের উচ্ছ্বাসে বছর ঘুরে আসে পহেলা বৈশাখ। প্রতি বছর এ দিনকে ঘিরে বাঙ্গালি জাতি আয়োজন করে বিভিন্ন অনুষ্ঠান। থাকে বিভিন্ন প্রকারের খাবারের ব্যবস্থা। বৈশাখকে কেন্দ্র করে চারদিকে পান্তা-ইলিশ, পান্তা-ইলিশ রব পড়ে যায়। পান্তা-ইলিশ ছাড়া যেন বৈশাখে আর কিছু করার নেই। গগনচুম্বী দামের ইলিশ যেন বৈশাখের আগমুহূর্তে সোনার হরিণ। কখনো জোড়া ইলিশ ৪০ হাজার টাকায়ও ওঠে বলে শোনা যায়। এ তো গেল ইলিশের গরম, অন্যদিকে বাজার জমাতে গরম ভাতে পানি ঢেলে বানানো হয় পান্তা। মাটির সানকিতে করে ভাজা ইলিশসহ রাস্তাঘাটে, নগরের বটতলায়, অভিজাত রেস্তোরাঁয় চড়া দামে এসব খেয়ে উদযাপিত হয় বাংলা নববর্ষ। যার সঙ্গে বাংলা সংস্কৃতির আদৌ কোনো যোগসূত্র আছে বলে জানা নেই। পান্তাভাতের সঙ্গে ইলিশ মিশিয়ে খেয়ে বিলাসিতা করার মতো অর্থনৈতিক সচ্ছলতা এ অঞ্চলের আপামর জনসাধারণের কোনোকালেই ছিল না। তবে পান্তা ভাত গ্রামীণ বাঙালি জনগোষ্ঠীর একটি জনপ্রিয় খাবার। নৈশভোজের জন্য রান্না করা ভাত বেঁচে গেলে সংরক্ষণের জন্য পানিতে ভিজিয়ে রাখা হতো। পরদিন এই পানিতে রাখা ভাতের নাম হতো পান্তা ভাত।, পান্তা ভাত গ্রামীণ মানুষ সকালের নাশতা হিসাবে খেয়ে থাকে। সাধারণত লবণ, কাচা মরিচ ও পেঁয়াজ মিশিয়ে পান্তা ভাত খাওয়া হয়, অনেকেই আবার এর সাথে আলু ভর্তা, বেগুন ভর্তা, ডাউল ভর্তা, শুটকি ভর্তা বা সরিষার তেল দিয়ে পান্তা ভাতের রুচি বৃদ্ধি করে থাকে। এর সঙ্গে বিলাসিতা জড়িত নেই কোনোভাবেই। কেবল প্রয়োজনের তাগিদে গ্রামীণ মানুষের পান্তা খাওয়ার এই প্রচলন বহু পুরোনো। তাঁরা পান্তা খান একবেলার তরকারির খরচ বাঁচানোর জন্য। অল্প ভাতের সঙ্গে গামলাভর্তি পানিসহ খেয়ে বড় ক্ষুধা নিবারণের জন্যও পান্তা উপযোগী। এসব বিনে ইলিশ মাছ চড়া দামে কিনে পান্তাভাতের সঙ্গে খাওয়া হবে, এমনটা গ্রামীণ জনগণের স্বপ্নের পর্যায়েও পড়ে না। অথচ আজকাল পান্তা-ইলিশকে আবহমান গ্রামবাংলার ঐতিহ্য বলে বাজারজাতকরণের একটা জোড় প্রবণতা লক্ষ করা যায়, যার সঙ্গে বাংলা সংস্কৃতির যোগসূত্র কোনোকালেই ছিল না। এমন একটি বিষয়কে সংস্কৃতি বলে চালিয়ে দেওয়ার প্রবণতাকে ঐতিহ্য নয়, বরং গ্রামীণ মানুষের সঙ্গে, যাঁরা সারা বছর উদরপূর্তির নিমিত্তে পান্তা খায় বাধ্য হয়ে, তাঁদের সঙ্গে মশকরাই বলা চলে। শাসক শ্রেণির সুবিধার্থেই বাংলা সালের গোড়াপত্তন হয়েছিল বিষয়টি সকলেরই জানা। অবশ্য পরবর্তীকালে নতুন বছরকে স্বাগত জানানোটা বাঙালির স্বাতন্ত্র্য সংস্কৃতি ও রীতিতে পরিণত হয়। বাংলা নববর্ষের সঙ্গে পান্তা-ইলিশের যোগসূত্র ঠিক কবে থেকে তার সঠিক ইতিহাস পাওয়া যায় না। রমনা বটমূলে সঙ্গে পান্তা-ইলিশের সমন্বয় হওয়ার পর থেকে এ সংস্কৃতির বিস্তার ঘটে। এরপর থেকেই মূলত গ্রাম-শহর একাকার হয়ে যায় পান্তা-ইলিশ সংস্কৃতির সঙ্গে। বিভিন্ন পত্রিকার মাধ্যমে জানা যায়, সালটা ছিল ১৯৮৩। চৈত্রের কোন এক বিকালে আড্ডা দিচ্ছিলেন কয়েকজন সাংস্কৃতিক কর্মী। তাদের মধ্যে একজন ছিলেন সাংবাদিক বোরহান আহমেদ। রমনা বটমূলের বৈশাখী আয়োজনে পান্তা-ইলিশের প্রস্তাব করেন তিনিই প্রথম। এরপর অন্যরা সেটাকে সমর্থন করে এবং ওই বছর থেকেই রমনা বটমূলে পান্তা-ইলিশ শুরু হয়। অথচ বাঙালির নববর্ষের ঐতিহ্যের সঙ্গে এর দূরতম সম্পর্কও নেই; বরং আছে ঐতিহ্য ধ্বংস করার প্রয়াস। বাঙালির ইলিশ ঐতিহ্য ধ্বংসের পথে এই উন্মাদনা বিশেষ প্রণোদনার কাজ করে। ইলিশের প্রজনন মৌসুমে প্রচুর ইলিশ ধরা হয়। জাটকা নিধন চলে সমানে। ফলে ইলিশ মৌসুমে জেলেরা খালি হাতে ফেরে। আপামর বাঙালির রান্নাঘরে ইলিশ প্রবেশাধিকার হারায়। বৈশাখের বাংলা নববর্ষের ঐতিহ্য বলতে গেলে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর বৈশাখী মেলা, রাজধানীর রমনা বটমূলের ছায়ানট শিল্পীদের বৈশাখী আয়োজন, চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রাÑএগুলো যুগ যুগ ধরে। ১৯৬০-এর দশকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নিপীড়ন ও সাংস্কৃতিক সন্ত্রাসের প্রতিবাদে ১৯৬৭ সাল থেকে ছায়ানটের এই বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের সূচনা। সে সঙ্গে বৈশাখের এ আনন্দ আয়োজনের অনুষঙ্গ হিসেবে নানা ধরনের গ্রামীণ খাদ্যÑমিষ্টান্ন-ম-া-মিঠাই, চিড়া, মুড়ি, বিন্নিধানের খই, গুড়ের জিলাপি, নুকুল দানা, বাতাসা, কদমা, খিচুড়ি, ঝুড়ি, খেজুরের গুড়, দই, লুচি, রসগোল্লা, শৈল মাছ, কৈ মাছ, রুই মাছ এসব ছিল মুখ্য। তাও এগুলো নির্ভর করত আর্থিক সংগতির ওপর। সবাইকেই যে একই দ্রব্য খেয়ে বর্ষবরণ করতে হবে, এমন কোনো রেওয়াজও এ অঞ্চলে ছিল না। যে যেমন পারত, যার যার সাধ্যমতো নববর্ষের আনন্দে শামিল হওয়ার চেষ্টা করত। ছেলে-ছোকড়ারা বৈশাখী মেলা থেকে রঙিন হাঁড়ি, মাটির সরাই, ডুগডুগি, রঙিন বেলুন- এসব কিনে বেতের বাঁশিতে পুঁ-পাঁ আওয়াজ করতে করতে মেলা থেকে ফিরত। পান্তা-ইলিশের উপস্থিতি গ্রামীণ বৈশাখের কোনো স্তরেই পাওয়া যায় না। যেটুকু দেখা যায়, তা চাপিয়ে দেওয়া, বানোয়াট সংস্কৃতি। নগরকেন্দ্রিক কিছু অর্থশালী লোকজন ছাড়া সাধারণ নাগরিকের নাগালের বাইরে এই পান্তা-ইলিশ! বৈশাখ তো দূরের কথা, বছরের অন্যান্য সময়ই সাধারণ জনগণের কাছে ইলিশ দুর্লভ।


ঢাকারিপোর্টটোয়েন্টিফোর.কম/এইচএমএল


সর্বশেষ সংবাদ