বাংলা ফন্ট

ঐতিহ্যবাহী শিববাড়ি মন্দিরের মেলা

05-03-2017
নিজস্ব প্রতিবেদক ঢাকারিপোর্টটোয়েন্টিফোর.কম

ঐতিহ্যবাহী শিববাড়ি মন্দিরের মেলা

 
ঢাকা: প্রায় শতবর্ষ পুরাতন শিববাড়ি মন্দির বরিশালের ঐতিহাসিক স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম। প্রতি বছর বাংলা ফাল্গুন মাসের ১৪ তারিখ এই মন্দিরে তিনদিন ব্যাপি পূজা ও মেলার বিশাল আয়োজন করা হয়। এই উৎসবের প্রথমদিন হিন্দুধর্ম অনুযায়ী গনপ্রার্থনার আয়োজন করা হয় এবং পরের দুইদিন ধর্মীয় প্রথা অনুযায়ী বিভিন্ন উৎসব চলতে থাকে। হিন্দুধর্মের উৎসব হলেও মুসলিমরাও এই অংশ নিয়ে থাকেন।
নবম শতকের পাল বংশের শাসনামলে ঝালকাঠি জেলার পোনাবালিয়া শিববাড়ির মেলার উৎপত্তি। সৃষ্টির কথা বলতে সত্যযুগের আমল প্রচলিত। কন্যা সতী রাজা দক্ষের অমতে বিয়ে করেছিলেন যোগী মহাদেবকে। রাজা দক্ষ বৃহস্পতিযজ্ঞ করলে সেখানে মহাদেবকে দাওয়াত না করায় অপমানে দেহত্যাগ করেন দেবী দুর্গা। স্ত্রী বিয়োগের যন্ত্রণা আর ক্ষোভে সতীর মরদেহ কাঁধে নিয়ে শুরু করেন তাণ্ডব নৃত্য। অবশেষে বিষ্ণুদেব সুদর্শনচক্র দিয়ে দেবীর দেহ ছেদন করলে ৫১ খণ্ডের সৃষ্টি হয়। ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা আর তিব্বতের যেসব স্থানে দেহ খণ্ড পড়েছিল সেখানেই তৈরি হয় মন্দির। এর ধারাবাহিকতায় ঝালকাঠী জেলার পোনাবালিয়া ইউনিয়নের হাজারগাতি মৌজায় বহতা সুগন্ধা নদীর তীরে শিববাড়িতে পড়েছিল দেবীর নাসিকা।
শিবলিঙ্গ অবিষ্কারের সূত্র ধরলে আর তখন থেকে মেলার সূচনা হয়ে থাকলে তা হাজার বছরাধিক হবে বৈকি। কারো মতে ব্রিটিশ শাসনামলের গোড়াতেই মন্দির নির্মিত হয়েছিল। তাতে করেও আড়াই শতাধিক বছর পাড় হয়েছে পেনাবালিয়ার শিববাড়ির মেলার বয়স।
মেলার আয়োজক কমিটির সিনিয়র সহ-সভাপতি অসিতবরণ সাহার বর্ণনায়-পাল শাসনামলে সামরাইল পরগনার রাজা ছিলেন রাম। এটা আনুমানিক ৯শ’ খ্রিস্টাব্দের কথা। বর্তমান হাজারাগাতি গ্রামটি ছিল রাজা রামের অধীন। প্রজারা কৃষি কাজ ও পশুপালন করতেন। এই এলাকার গৃহস্থরা গাভী পালন করলেও দুধ তেমন পেতেন না। সন্দেহ করা হতো রাখালদের। তিরস্কার করা হলে রাখালরা একদিন চুপিচুপি দেখতে পায় গাভীগুলো জঙ্গলের মধ্যে প্রবেশ করে উচুঁ ঢিবির মত স্থানে গিয়ে দাঁড়ায়, আর বাঁট দিয়ে দুধ পড়তে থাকে। এই কথা গৃহস্থ হয়ে রাজা রামের কানে পৌঁছায়। রাজার নির্দেশে জঙ্গল সাফ করতে গিয়ে কুলিয়ে ওঠেনি প্রজারা।
অবশেষে আগুন লাগানো হয় জঙ্গল পরিষ্কারে। ও সময় লাল পেড়ে সাদা কাপড় পরিহিত এক নারী নিজেকে রক্ষায় পাশের ডোবায় ঝাঁপিয়ে পড়তে দেখেন এলাকাবাসী। এরপর ঢিবি পরিষ্কার করতে গিয়ে দেখা মেলে কালো কষ্টি পাথরের এই শিবলিঙ্গ মূর্তির। রাজা রাম স্বপ্নে আদিষ্ট হলেন ‘ভৈবর ত্র্যম্বকেশ্বর’-এর পূজার জন্য নদীয়া শান্তিপুরে এক সাত্ত্বিক ব্রাহ্মণ আছেন তার কাছে যাও। রাজা লোক পাঠালে একই বংশের তিলক চক্রবর্তী রাজি হলে তাকে এনে পূজারি নিয়োগ করেন। সেই থেকে তার বংশধররা এখানে পূজারির দায়িত্ব পালন করছেন। ওই সময় ৭ দশমিক ৩৬ একর জমি বন্দোবস্ত দেওয়া হয়েছিল মন্দিরের নামে। দখলদারদের কবলে পড়ে যা এখন মাত্র ২ দশমিক ৩০ একরে ঠেকেছে।
এখানে সাধনা করলে সিদ্ধ হওয়া যায় বলে আন্তর্জাতিকভাবে সাধক পীঠ হিসেবে স্বীকৃত পোনাবালিয়ার শিববাড়ি। এজন্য কেবল শিব চতুর্দশীতেই নয়, বছর জুড়েই দেশ ও বিদেশ থেকে পূন্যার্থীরা এখানে আসেন বলে জানালেন মেলা কমিটির আরেক সহ-সভাপতি লক্ষণচন্দ্র কুণ্ডু।
তিনি আরও জানান, ১৯১৯ সালে শিববাড়িতে ভাড় নিয়ে আসার সময় বিরোধের জের ধরে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মিস্টার ব্লান্ডির নির্দেশে গুলি চালানো হয়েছিল। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারিয়েছিলেন ১৯ জন। ওসময় এই পীঠস্থানের মাহাত্ম্য অনুধাবনে শিবলিঙ্গ মূর্তি তুলতে জোড়াহাতি নিয়োগ করেও টেনে তুলতে পারেনি। এরপর মাটি খোড়া হলে এর উৎপত্তি নির্ণয়ে ব্যর্থ হন। ওই কারণে শিবলিঙ্গ জমি থেকে কিছুটা নিচে বলে প্রচলিত।
তিনি আরও বলেন, বারইকরণের জমিদার অনিল কুমার রায় চৌধুরীর কাকীমা এই মন্দির সংস্কার করেছিলেন। সর্বশেষ বছর দুয়েক আগে দর্শনার্থীদের সুবিধার্থে শিবমন্দিরের অধুনিকায়ন করা হয়।
এই পীঠেই সিদ্ধি লাভ করেন দয়ালানন্দ গুরু মহারাজ, অমলানন্দ গুরু মহারাজ ও দেবী লক্ষ্মী মাতা। এছাড়াও আরও অনেকে সিদ্ধি লাভ করেছেন বলে সংসার ত্যাগ করে এই ধামে সাধনা করছেন আশীষ কুমার গুপ্ত। ১৯৮২ সালে এসএসসি পরীক্ষা শেষে গুরু অমলানন্দ মহারাজের সাথে দেখা হলে তিনি আদেশ করেন শিববাড়ির এই পীঠে সাধনা করতে। সেই থেকে বিবাগী আশীষ সাধকের অবস্থান এখানে। এই সাধক বলেন, কেবল শিব চতুর্দশী নয়; বছরে এখন ৯টি অনুষ্ঠান হয়। এগুলোর মধ্যে প্রধান মেলা ফাল্গুন মাসের শিব চর্তুদশীতে মেলে ৩ দিনের জন্য, চৈত্রে অশোক অষ্টমীর অনুষ্ঠান, দোল পূর্ণিমা, গোসাই নবান্ন উৎসব ৩ দিনের, ১৪ আশ্বিন এবং ৯ই পৌষ গুরু মহারাজের অর্বিভাব ও তিরোধান উৎসব মেলে ৫ দিন করে, অক্ষয় তিথিতেও অনুষ্ঠানসহ আরও ২টি পার্বণ। এই সাধক আরও বলেন, অলৌকিক কিছু রয়েছে বলেইতো কেবল হিন্দুরা নয় অন্যান্য ধর্মালম্বীরাও মানত করেন। শিবের মাথায় দুধ, ডাবের জল ঢালেন, মানতের পাঁঠা বলি দেন। কামনা পূর্ণ হলে গাছের গোড়ায় সন্তানের চুল কামান।
শিব মন্দিরে গিয়ে দেখা যায় কামনা পূরণ হওয়াতে কাঁঠালিয়া উপজেলার আওড়াবুনিয়া থেকে এসেছেন রিপন খরাতী। প্রথমে কন্যা সন্তানের পর পুত্র সন্তানের কামনায় মানত করেছিলেন এখানে। মনোবাসনা পূর্ণ হওয়াতে ২ বছর ৪ মাস বয়সের পুত্র সন্তান রাজদ্বীপকে নিয়ে এসেছেন এবং যথারীতি সেজ গাছের গোড়াতে মাথার চুল ফেলেছেন। আর মানতের হিসেব অনুযায়ী রাজদ্বীপের শরীরের ভর ১২ কেজি সাতশ’ গ্রাম বাতাসা দিয়েছেন মন্দিরে। এ সময় আরও অনেককেই দেখা গেছে কন্যা বা পুত্র সন্তানদের নিয়ে এসেছেন, মাথার চুল ন্যাড়া করেছেন, মনোবাসনা পূর্ণ হওয়াতে।

ঢাকারিপোর্টটোয়েন্টিফোর.কম/এইচএমএল




সর্বশেষ সংবাদ