বাংলা ফন্ট

বাংলা সংস্কৃতি: চাই আর একটি ভাষা আন্দোলন

14-06-2018
যুবায়ের হাসান

 বাংলা সংস্কৃতি: চাই আর একটি ভাষা আন্দোলন

ইতিহাসের এক সূত্রহারা অজানা অধ্যায়ে, কোনো এক ধূসর সুদূর অতীতে- অনেক হাজার বছর আগে বিশাল সমতল প্রান্তরময় এই বাংলার কোনো এক নির্জন, প্রত্যন্ত স্থানে আজকের বাঙালি জাতির পূর্বপুরুষগণ দলবদ্ধভাবে বসবাস শুরু করেছিলেন। আজকের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি শিহরণমূলক ও রোমাঞ্চকর মনে হলেও, এই ছিল আদি সত্য। প্রকৃতির নিয়মে, প্রটো-অষ্ট্রোলয়েড মানব শাখার অন্তর্ভুক্ত ক্ষুদ্র এই গোষ্ঠীটি নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে নানা অর্থবোধক, সংকেতবাহী ধ্বনিপুঞ্জ সৃষ্টি করেছিল- যা আদতে ছিল আজকের বাংলা ভাষার ভিত্তি। পরবর্তীকালে, জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে জীবন ও জীবিকার তাগিদে উক্ত লোকালয়ের আধিবাসীগণ সন্নিহিত অঞ্চলসমূহে ছড়িয়ে যেতে থাকেন এবং নতুন নতুন জনপদ গড়ে উঠতে থাকে। এ প্রক্রিয়াটি হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসছে, কিন্তু সময়ের দীর্ঘ ব্যবধান, আন্ত:যোগাযোগে নানা প্রতিকূলতা ও স্থানিক প্রয়োজনে মূল ভিত্তি ভাষাটির কথ্যরীতিতে নানা আঞ্চলিক রূপ ও প্রকরণের সৃষ্টি হয়। তবু নির্দ্বিধায় বলা যায়, ইতিহাসের সেই সূত্রহারা অধ্যায়ের অনির্দিষ্ট কালেই বাংলা ভাষা ও এ ভাষাকে কেন্দ্র করে এক অভিন্ন সংস্কৃতির বীজ রোপিত হয়। এ সংস্কৃতির কেন্দ্রমূলে ছিল এর ভাষা, আর অন্যান্য উপাদান অনুঘটক হিসাবে যুক্ত হয়েছিল; যেমন এই জনগোষ্ঠীর লোকাচার, লোকধর্ম, খাদ্যাভ্যাস, সঙ্গীত, নদী-পাখি-জীবজন্তু-গাছগাছালি। নানা কালের ঝড়-ঝাপটা পেরিয়ে আজকের অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে বাংলা ভাষা ও বাঙালির সংস্কৃতি।
আবহমান কাল থেকেই বাঙালির পরিচয় পাওয়া যায় চর্যাপদে, নাথ সাহিত্যে, পদাবলী ও মরমী লোক সাহিত্যে, পুঁথি সাহিত্যে, গাঁথা ও কেচ্ছা-কাহিনীতে। বাঙালির পরিচয় আজ মসজিদে, মন্দিরে, বৌদ্ধ বিহারে। বাঙালির পরিচয় বঙ্গ-রাঢ়ভূমি-বরেন্দ্র-পুন্ড্রবর্ধন-সমতট।
বাঙালির সংস্কৃতির সাহিত্য-ভিত্তিটি রচনা করেছেন মীননাথ, ভুসুক, শাহ সগীর, বিদ্যাপতি, চন্ডীদাস, আলাওল, মধুসূদন, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, তারাশংকর, জসীম উদ্দিন, জীবনানন্দ দাশ, শামসুর রাহমান, সত্যজিৎ রায়, এস এম সুলতান সহ জানা অজানা কবি-সাহিত্যিক- শিল্পী। এঁরাই বাঙালির জীবন চলার পথে দিক-নির্দেশনা হতে পারেন।
বাংলার প্রাণধর্ম বাংলার মাটি হতেই উৎসারিত ও বিকশিত হয়েছে। বস্তুত: এ ধর্ম সকল সাম্প্রদায়িকতা ও সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে। লোকজতন্ত্রধর্ম, বৌদ্ধ সহজিয়া, বাউল ও হিন্দু বৈষ্ণব ধর্ম আর ইসলামের সূফীবাদ হতে জারিত হয়েছে এই মানবতাবাদ। লালন ফকির, হাছান রাজা-রা মূলত: এই মানব ধর্মেরই জয়গান গেয়েছেন। বাংলার কবির মুখেই শোনা যায়:-
‘নানান বরণ গাভীরে ভাই/একই বরণ দুধ/জগত ঘুরে দেখলাম/ সবই একই মায়ের পুত।’
অথবা
‘হিন্দু না ওরা মুসলিম? ওই জিজ্ঞাসে কোন জন?/ কা-ারি! বল ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মার।’
অথবা
‘সবার উপরে মানুষ সত্য/ তাহার উপরে নাই।’
গৌড়ীয় সেন রাজাপের আমলে বাংলায় হিন্দু ধর্ম-শাস্ত্র চর্চা নিষিদ্ধ করা হয় এবং সংস্কৃত ভাষা বাদে কেউ যদি অন্য ভাষায় এ চর্চা করে তবে তার শাস্তি হিসাবে পরজন্মে ‘কৌরব’ নামের নরকে যেতে হবে বলে রাজকীয় ফতোয়া জারী করা হয়। পরবর্তীতে তুর্কী-পাঠান-মোগল আমলে ফারসি ভাষাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেয়া হয় বটে, তবে আঞ্চলিক পর্যায়ে বাংলা ভাষা বিকাশের সুযোগ করে দেয়া হয়। বিশিষ্ট গবেষক ও লেখক শিব নারায়ণ রায়ের মতামত হল:
শশাঙ্ক থেকে পাল বা সেন রাজারা কেউই বাংলার বিভিন্ন জনপদকে কোনো ঐক্যে বাঁধতে পারেন নি। বাঙালি জনগোষ্ঠীর ঐক্য এবং স্বাতন্ত্রের মুখ্য অবলম্বন (আদর্শ) বাংলা ভাষা এবং বাংলা অক্ষরমালা এবং এ দুটিরই উদ্ভব ও বিকাশ ঘটে মুসলমান রাজত্বকালে। বাংলার সর্বদেশব্যাপী একটি সাহিত্যিক ভাষা রূপ নেয় পাঠান আমলে। পরে এই অঞ্চলকে অধীন করে তার সাধারণ নাম সুবা বাংলা নাম দেন মোগলরা। এক ভাষা এবং এক শাসন ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠার ফলে বাঙালি জনগোষ্ঠী ঐক্যবদ্ধ হন বটে, কিন্তু এই ঐক্যের চেতনা প্রথম পরিস্ফুট হয়ে ওঠে উনিশ শতকে ইংরেজের শাসনকালে।
(সূত্র: বাঙালিত্বের খোঁজে এবং অন্যান্য আলোচনা, পৃষ্ঠা-১১)
ইংরেজ শাসনকালের শুরু থেকেই, বাঙালি হিন্দু সমাজ ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে পাশ্চাত্যের শিল্প-বিজ্ঞান-সাহিত্য ভাবনার সঙ্গে পরিচিত হতে শুরু করেন এবং পাশাপাশি ব্রিটিশ ভারতের রাজকার্যে ভূমিকা রাখার সুযোগ পান। কোলকাতা-ভিত্তিক এক বিশাল মধ্যবিত্ত শ্রেণী গড়ে উঠে। অচিরেই এখানে ঘটে এক অভূতপূর্ব রেনেসাঁস। বঙ্গীয় রেনেসাঁসের সবচাইতে উল্লেখযোগ্য ও স্থায়ী কৃতি হল মাত্র একশো বছরের মধ্যে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের যুগান্তকারী বিকাশ। মহা প্রতিভাধর রবীন্দ্রনাথ ছিলেন এই অধ্যায়ের মহানায়ক।
অগ্রসরমান, সংঘবদ্ধ বাঙালি জাতির শিক্ষিত একটি অংশের মধ্যে স্বদেশী-চেতনার স্ফুরণ দেখা যায় এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রতিরোধের আগুন জ্বলে উঠে। সংহত বাঙালি জাতিসত্তা ক্রমেই বিদেশী প্রভুদের জন্য হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, আর ঠিক তথনই, শাসন কর্যের সুবিধার্থে বৃহত্তর বাঙালি সমাজে ‘ডিভাইড এন্ড রুল পলিসি’ প্রয়োগ করা হয়। ১৯০৫ সালের ১৬ই অক্টোবর বাংলাকে দু’ভাগে ভাগ করে ফেলা হয়। এর বিরুদ্ধে সারা বাংলার নগরে বন্ধরে কোলকাতা কেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবী রাজনীতিবিদদের নেতৃত্বে (ব্যতিক্রম বাদ দিয়ে) এক স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধ আন্দোলনের সূচনা হয়। বাঙালি জাতীয়তাবাদের চাপে পড়ে, শেষ পর্যন্ত ইংরেজ সরকার ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গা আদেশ প্রত্যাহার করে, কিন্তু একই সঙ্গে ভারতবর্ষের রাজধানী কোলকাতা থেকে দিল্লীতে সরিয়ে নিয়ে যেয়ে বাংলার রাজনৈতিক মেরুদন্ডটি ভেঙে দেয়।
পরিহাসের বিষয় এই যে, সাম্প্রদায়িকতার বিষয়টি কখনো, কোনো কালেই বাংলার সাধারণ হিন্দু মুসলমানের সমস্যা ছিল না। এটি ছিল দু দিকের দুই ব্রাহ্মণের সামাজিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রতিক্রিয়া। এর ফলে, ১৯০৫ সালে প্রকাশিত বাঙালি জাতীয়তাবাদের আবেগের উলটোটা প্রকাশ পেল ১৯৪৬ সালের পারস্পরিক বিবাদ ও হানাহানিতে। ভারতের পূর্ব, পশ্চিম ও মধ্যভাগকে পৃথক করে ব্রিটিশ কেবিনেট মিসন উত্থাপিত তিনটি স্বাধীন রাষ্ট্রগঠনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হল- অংকুরেই মৃত্যু ঘটল শরৎবসু-আব্দুল হালিমদের বৃহত্তর বাংলা রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্নেরও। বাংলার বিকাশমান হিন্দু ব্রাহ্মণ আর মুসলমান ব্রাহ্মণ নিজেদের স্বার্থে বাংলাকে শেষ পর্যন্ত ভাগ করেই ছাড়ল।
পূর্ব বাংলা বা পূর্ব পাকিস্তানে, বাঙালি মুসলমানদের আশা পূরণ হয় না। শুরুতেই বিপত্তির সৃষ্টি হয় রাষ্ট্র ভাষা নিয়ে। উর্দু-কে সারা পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করা হলে, পূর্ব বাংলায় ব্যাপক আন্দোলন শুরু হয়। বাংলা প্রতিষ্ঠার দাবীতে এক অভূতপূর্ব গণজোয়ার সৃষ্টি হয়। ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারিতে ঢাকার রাজপথ রক্তাক্ত হয়- বেশ কয়েকজন তরুণ পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারায়। এর পরিণতিতে বাংলাকে প্রাদেশিক ভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয় পাকিস্তানী সরকার, কিন্তু বাঙালির পূর্ণ আত্মবিকাশের সংগ্রাম বন্ধ করা সম্ভব হয় না। শেষ পর্যন্ত ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থান দেখা দেয় এবং ১৯৭১ সালে পূর্ণ স্বাধিকার আদায়ের লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধে পাকিস্তানী দখলদার বাহিনীর হাতে প্রাণ হারায় লাখ লাখ নিরীহ নিরপরাধ মানুষ। অশ্রুতপূর্ব এক গণযুদ্ধের শেষে, ১৯৭১ এর ১৬ই ডিসেম্বর পৃথিবীর বুকে ‘বাংলাদেশ’ নামের এক স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্ম হয়। বাঙালির হাজার বছর ধরে লালিত স্বপ্নের একাংশের বাস্তবায়ন ঘটে।
আজকের বাস্তবতার নিরিখে বাংলাদেশ ও পশ্চিম বাংলা দু’টি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচিতির ধারক হলেও আবহমান বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির সম্মিলিত উত্তরাধিকার এদের উভয়েরই উপর এসে বর্তায়। এই ভাষা ও সংস্কৃতির সংরক্ষণ ও বিকাশে এক ঐতিহাসিক ভূমিকা পালনের দায় উভয়ের কেউ-ই এড়াতে পারে না। কিন্তু এক্ষেত্রে আমরা কতোটুকু সফল? এই অঞ্চলের গণমানুষের জীবনে অর্থনৈতিক মুক্তির পাশাপাশি আমরা কি পেরেছি নিজ সংস্কৃতির উজ্জীবন ঘটাতে? স্বাধীনতার এতো বছর পরও আমাদের গৌরব মাতৃভাষা বাংলা-কে কি আমরা প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছি জীবন ও জীবিকার সকল স্তরে? আমাদের মহান ভাষা ও সংস্কৃতি কি আজ নানামুখী চাপে বিপন্ন নয়? কোনো জাতির ভাষার বিপর্যয় কি সেই জাতির সার্বিক সামাজিক সংকটকে সূচিত করে না? শিকড় না থাকলে, গাছে কি লাভ?
বাঙালির আগামী প্রজন্ম আজ সত্যি-ই বিপদাপন্ন। সামনে অভাবিত সামাজিক বিপদের আশংকা। বাংলাদেশের অন্যতম কবি আল মাহমুদ -এর ‘সোনালি কাবিন’ কবিতায় তাই দেখি বাঙালির অতীত, বর্তমান আর সংকটময় ভবিষ্যতের ভাষিক চালচিত্র:
‘যে বংশের ধারা বেয়ে শ্যাম শোভা ধরেছো, মানিনী
একদা তারাই জেনো গড়েছিল পুন্ডের নগর
মাটির আহার হয়ে গেছে সব, অথচ জানিনি
কাজল প্রাতির রক্ত পান করে বটের শিকড়।
আমারও নিবাস জেনো লোহিতাভ মৃত্তিকার দেশে
পূর্ব পুরুষেরা ছিলো পাট্টিকেরা পুরীর গৌরব,
রাক্ষসী গুল্মের ঢেউ সবকিছু গ্রাস করে এসে
ঝিঁঝিঁর চিৎকারে বাজে অমিতাভ গৌতমের স্তব।
অতীতে যাদের ভয়ে বিভেদের বৈদিক আগুন
করতোয়া পার হয়ে এক কঞ্চি এগোতো না আর
তাদের ঘরের ভিতে ধরেছে কি কৌটিল্যের ঘুণ?
লালিত সাম্যের ধ্বনি ব্যর্থ হয়ে যায় বার বার;
বর্গীরা লুটেছে ধান নিম খুনে ভরে জনপদ
তোমার চেয়েও বড়ো হে শ্যামাঙ্গী, শস্যের বিপদ।’

তথাকথিত বিশ্বায়নের নামে পৃথিবী জোড়া আজ আর্থ-রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী দেশ বা জাতির আগ্রাসন প্রকট হয়ে উঠেছে। বড় সংস্কৃতি গ্রাস করছে ছোট সংস্কৃতিকে আর এভাবে পৃথিবী থেকে চিরদিনের জন্য হারিয়ে যাচ্ছে ছোট ছোট জাতিসত্তার আত্মপরিচয়, বিশেষত: তাদের মাতৃভাষা যা অনেক হাজার বছরের চেষ্টা ও সাধনায় তারা অর্জন করেছিল। নিউইয়র্ক ভিত্তিক ভাষা বিষয়ক বিশ্বকোষ ‘এটলাম অব দি ওয়ার্ল্ড ল্যাঙ্গুয়েজেস ইন ডেঞ্জার অব ডিসএপিয়ারিং’ এ এই মর্মে আশংকা ব্যক্ত করা হয়েছে যে, বড় সংস্কৃতির চাপে ও তাপে আগামী পঞ্চাশ বছরের মধ্যে পৃথিবীতে এ মুহূর্তে সচল ছয় হাজার আটশো নয়টি ভাষার প্রায় অর্ধেকই মরে যাবে আর এ প্রক্রিয়ার শিকার হয়ে আগামী একশো বছরে প্রায় নব্বই শতাংশ ভাষাই মৃত্যুর মুখে এসে দাঁড়াবে।
ভূ-মন্ডল বিরাজমান জীব-বৈচিত্র্য, পরিবেশ-বৈচিত্র্য, জ্ঞান-বৈচিত্র্যের মতো ভাষা-বৈচিত্র্যও একটি প্রাকৃতিক সত্য। এক একটা ভাষা এক-একটা জাতির অভিজ্ঞতার আকর-বিপুল জ্ঞান ভান্ডার। পৃথিবীর প্রতিটি ভাষাই প্রকৃতির অমূল্য সম্পদ। প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখার স্বার্থেই তাই প্রতিটি জাতি-উপজাতির মাতৃ ভাষা বেঁচে থাকার প্রয়োজন আছে।
মাতৃভাষা বলেই যে কোনো মানুষ যে ভাষায় কথা বলে, তা নয়। ভাষার যদি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ওজন না থাকে, তবে মাতৃভাষা হলেও কিন্তু এর আবেদন বা প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে আসে। ভালো চাকরি লাভের আশায়, ব্যবসা-বাণিজ্যে উন্নতি করতে মানুষ নিজ ভাষা ত্যাগ করে প্রয়োজন মাফিক শক্তিশালী ভাষা ব্যবহারে মনোনিবেশ করে।
পৃথিবী জুড়ে বিরাজমান এই বাস্তবতার মুখে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির বিষয়ে আশংকিত ও উদ্বিগ্ন না হয়ে পারা যায় না। এ কথা সত্যি, বাংলাকে হারানো বা হারিয়ে দেওয়া সহজ হবে না, কেন না, কোটি কোটি সাধারণ মানুষ এ ভাষায় কথা বলে এবং হয়তো আগামীতেও বলে যাবে কিন্তু দেশি-বিদেশি শক্তির চাপ, সূক্ষ্ম কৌশল প্রয়োগ, দূরদর্শী নেতৃত্বের অভাব প্রভৃতির কারণে ভবিষ্যতে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির আরো বেহাল দশা দাঁড়াবে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।
এক সময় বাংলা সংস্কৃতির আয়তন ও পরিধি পূর্ব-ভারতের এক বিশাল অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত ছিল। ইংরেজ শাসনামলের প্রথম ভাগে, আসাম, উড়িষ্যা, ঝাড়খ- (বিহার সহ) ছিল বৃহত্তর বাংলারই অংশ। নৃতাত্ত্বিক বিচারে বাঙালি, অসমিয়া, উড়িয়া জাতিগোষ্ঠীসমহ মূলত: একই জাতির বিভিন্ন স্থানিক রূপ মাত্র আর ভাষা-বিজ্ঞানের দৃষ্টি কোন থেকে এই তিনটি জাতির উৎস ভাষাও অভিন্ন। অনেক হাজার বছর আগে এরা একই জনপদের বাসিন্দা ছিল।
বৃহত্তর বাঙালি জাতির সংহতি ও ঐক্য বিদেশি উপনিবেশবাদের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে মনে করে ইংরেজ শাসকরা বাংলা ও বাঙালির বিভাজনে খড়গহস্ত হয়। মিশনারিদের মাধ্যমে, কৌশলে ইংরেজ প্রশাসন আসাম ও উড়িষ্যার কথ্য ভাষাগুলিকে সমন্বয় করে অসমিয়া ও উড়িয়া নামে দু’টি পৃথক আঞ্চলিক ভাষা প্রতিষ্ঠা করে এবং প্রশাসনের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় এগুলি প্রাদেশিক ভাষা হিসাবে স্বীকৃতিও পায়। এ দু’টি অঞ্চলে শিক্ষার মাধ্যম হিসাবে স্কুল ও কলেজে প্রতিষ্ঠিত বাংলা ভাষাকে ক্রমে ক্রমে তুলে দেও হয়। হিন্দির ক্ষেত্রে ঘটেছিল এর ঠিক উলটোটি। হিন্দিকে সর্বভারতীয় ভাষা হিসাবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে উত্তর ভারতের লোক-ভাষা হিসাবে ব্যবহৃত মৈথিলি, ভোজপুরি, গাড়োয়ালি প্রভৃতি আঞ্চলিক ভাষাকে আত্মীয়করণের নামে এদের পরিচয় হরণ করে নেয়া হয়।
একদা সৈয়দ মুজতবা আলী লিখেছিলেন:
‘বাংলাদেশের পরিমাণের চেয়েও আমি বহু গুণে বেশি মূল্য দেই বাঙালি সংস্কৃতির পরিব্যাপ্তিকে। আমার ধ্যানের বাংলা বাংলাদেশে সীমাবদ্ধ নয়- পশ্চিম বাংলার গুটি কয়েক জেলাই তার বিহারভূমি নয়- আমার ধ্যানের বাংলা আসাম, বিহার, উড়িষ্যার সুদৃরতম প্রান্ত অবধি- না কম বলা হল, এলাহাবাদ, জব্বলপুর, দিল্লী, জয়পুর যেখানেই বাঙালি সংস্কৃতির ছাপ পড়েছে, ছায়া পড়েছে সেখানেই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বাংলা। পূর্ব বাংলাও তাই এ ধ্যানের বাংলার মূল-বাংলার প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে বাংলার বাইরে এই যে ছোট ছোট বাংলা- এদের দিকে তাকানো যাক।
আসাম ছিল জঙ্গলময় নদী-বিধৌত এক উর্বর ভূ-খন্ড। নিম্ন- আসাম বা লোয়ার আসামের বিস্তীর্ণ অঞ্চলই ছিল প্রায় জনবসতিশূন্য। একশো থেকে দেড়শো বছর আগে, পূর্ব বাংলা থেকে বিপুল সংখ্যক লোক এ অঞ্চলে জনবসতি গড়ে তোলে এবং প্রশাসনের চাহিদামাফিক ধান-পাট প্রভৃতির চাষাবাদ শুরু করে। এই অভিবাসনের পিছনে ঔপনিবেশিক প্রশাসনের প্রচ্ছন্ন সহযোগিতা থাকা স্বত্বেও নীতির প্রশ্নে এদের মধ্যে দ্বিচারিতা লক্ষ্য করা যায়। তাই তৎকালীন ইংরেজ প্রশাসক হান্টার সাহেবই আবার বলেন:
‘পূর্ব বাংলার বাঙালি মুসলমানরা যেখানেই একখন্ড জমি দেখতে পায়, সেখানেই ক্ষুধার্ত শকুনির মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে। এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করে লাখ লাখ গরিব, ছিন্নমূল বাঙালি চাষি লোয়ার আসাম দখল করে নিচ্ছে।’
(সূত্র: দি ইম্পেরিয়াল গেজেটিয়ার অব ইন্ডিয়া, ২য় খন্ড)
অনুন্নত আসামের উন্নয়নের লক্ষ্যেই হোক বা অন্য কোনো দুরভিসন্ধি হাসিল করার লক্ষ্যেই হোক, ১৮৭৪ সালে বাংলা থেকে বৃহত্তর সিলেট ও গোয়ালপাড়া জেলা দুটিকে বিচ্ছিন্ন করে নবগঠিত আসাম প্রদেশের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়। খুব স্বাভাবিক কারণেই এ প্রদেশে বাঙালির সংখ্যা রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছে যায়। ১৯৩১ সালের সরকারী জনগণনা অনুসারে আসামে অসমিয়ার সংখ্যা ছিল প্রায় ২০ লাখ আর বাঙালির সংখ্যা ৪০ লাখ।
এ সময় ইংরেজ শাসকদের নিজস্ব স্বার্থোদ্ধারের লক্ষ্যে এবং ওই অঞ্চলে ক্ষমতা নিরঙ্কুশ করতে অসমিয়া জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটানো হয়। কুখ্যাত ‘ডিভাইড এন্ড রুল পলিসি’ তত্ত্বের অনুসরণে দু’সম্প্রদায়ের মধ্যে দ্বন্দ্ব সংঘাত সৃষ্টি করা হয়। অসমিয়াদের মনে বাঙালি-বিদ্বেষ চরমে পৌঁছায়। অসমিয়ারা বাঙালিদের উদ্দেশ্যে গালি দিয়ে বলত:
আলি-কুলি বঙালি
কুকুরর পোয়ালি
কোর পরা আহিলি?
মূলত: ১৯৩৫, ১৯৬১ ও ১৯৮১ সালে সারা আসাম জুড়ে বড় বড় বাঙালি-নিধন অভিযান সংঘটিত হয়। স্বাধীনতা-উত্তর প্রশাসকরাও বিদেশী প্রভুদের নীতি অনুসরণ করে। এ সব দাঙায় কমপক্ষে দশ হাজার বাঙালি বিশেষত: বাঙালি মুসলমান প্রাণ হারায়, লাখ লাখ মানুষ বাড়ি ঘর হারিয়ে ছিন্নমূল হয় অথবা নাগরিকত্ব সহ ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ায় প্রায় উদ্বাস্তু জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়।
১৯৬১ সালে ভারতের প্রথম সরকারী জনগণনায় দেখা গেল, অথবা বলা যায়, দেখানো হল যে, আসমিয়াদের সংখ্যা বাঙালিদের তিনগুণ। তৎকালীন সেনসাস- কমিশনের প্রধান তাই বিস্ময়ের সঙ্গে তার রিপোর্টে মন্তব্য করেছিলেন, ‘ইট ইজ আ বায়োলজিক্যাল মিরাকল।’ কিন্তু এর নেপথ্যে মূল সত্যটি হল এই যে, উগ্র প্রাণসংহারী অসমিয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মুখে, প্রাণ রক্ষার তাগিদে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার লাখ লাখ বাংলাভাষী নিজেদের অসমিয়া হিসাবে পরিচয় দিতে এবং ১৯৬১ সালের এক সরকারী কালাকানুনে এরা মাতৃভাষা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়ে, আসামের একমাত্র প্রশাসনিক ভাষা অসমিয়া গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। শুধু ব্যতিক্রম হয়ে দেখা দেয় দক্ষিণ-পূর্ব আসামের পাহাড়-ঘেরা বরাক উপত্যকা। প্রায় সম্পূর্ণভাবে বাঙালি অধ্যুষিত বৃহত্তর কাছাড় জেলাবাসীর মনে উক্ত ভাষা-আগ্রাসী কালাকানুনের বিরুদ্ধে আগুন জ্বলে ওঠে। আন্দোলনের এক পর্যায়ে, ১৯৬১ সালেরই ১৯শে মে শিলচরে এগারো জন বাঙালি পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারায়। এর পর, এই ভাষা আন্দোলন শতগুণে স্ফূরিত হয়। উপায়ন্তর না দেখে, আসাম সরকার শুধুমাত্র বরাক উপত্যকার মানুষের জন্য বাংলা ভাষার স্বীকৃতি দেয়। কিন্তু এতেও আছে শুভঙ্করের ফাঁকি। বাংলায় শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ থাকলেও চাকরি লাভের ক্ষেত্রে কোনো ফল ঘটে না- ‘অসমিয়াকরণ’ চলছে নীরবে ও সরবে, সামাজিক জীবনের সর্বস্তরে। নিরুপায় হয়ে কাছাড়বাসী বাঙালি আজ আলাদা রাজ্যের দাবি তুলেছে।
বিহার-উড়িষ্যার বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীর অবস্থাও প্রায় আসামের মতো করুণ। সরকারীভাবে রাজ্য পর্যায়ে মূল ও স্থানীয় ভাষাটি প্রতিষ্ঠিত থাকায় সেখানে বাংলা ভাষার কোনো বিকাশ হয়নি। ভাগলপুর, কাটিহার বা কটক এলাকার লাখ লাখ বাঙালির জীবনে দুর্যোগ নেমে এসেছে। এদের বর্তমান প্রজন্ম হয় হিন্দি, নতুবা উড়িয়া ভাষায় লেখাপড়া করতে বাধ্য হচ্ছে।
অধুনা উপজাতি অধ্যুষিত নতুন রাজ্য ঝাড়খন্ড-এও বাঙালিকে একই পরিণতি ভোগ করতে হচ্ছে। সে রাজ্যে, বাঙালি জাতিগতভাবে দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও বাংলা ভাষাকে এ পর্যন্ত দ্বিতীয় প্রশাসনিক ভাষার মর্যাদা দেয়া হয়নি। রাজ্য সরকারের সহযোগিতার অভাবে বাংলা মাধ্যমের স্কুলগুলো ক্রমেই হিন্দি মাধ্যমের স্কুলে রূপান্তরিত হয়ে যাচ্ছে।
ছত্রিশগড় রাজ্যের ‘দ-কারণ্য’ নামের অরণ্যে বা এক সময়ের কালা-পানির দেশ ‘আন্দামান-নিকোবর’ এর দুর্গম দ্বীপমালায় কিংবা গুজরাটের প্রায় মরুভূমির মতো অনুর্বর অঞ্চলে ভারতের স্বাধীনতার পর বহু লাখ বাঙালি শরণার্থীকে পুনর্বাসনের নামে যে অমানবিক দ- দেওয়া হয়েছিল- তা সব বিচারেই নজিরবিহীন। এই দেশত্যাগী লাঞ্ছিত, নিপীড়িত জনগোষ্ঠীটি শেষ পর্যন্ত, একান্ত নিজের করে কোনো দেশের ঠিকানা খুঁজে পায়নি।
বাংলাদেশের সীমানার পূর্বদিকে, তৃতীয় বাংলা, অর্থাৎ, পাহাড়ি বাংলার শুরু। ত্রিপুরা এই পাহাড়ি বাংলার কেন্দ্রভূমি। ১৯৭১ সালে ত্রিপুরাকে স্বতন্ত্র রাজ্যের মর্যাদা দেয়া হয় বটে, কিন্তু বাংলা ভাষা এখনো পূর্ণ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি এবং রাজভাষা হিন্দির সমাদর উল্লেখ করার মতো।
বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণে, মিয়ানমার- এর আরাকান রাজ্য। বর্মী শাসকরা এখন এর নাম রেখেছে ‘রাখাইন’ ফ্রি স্টেট। দুর্গম পাহাড়-পর্বত, নদী-জঙ্গলময় এ অঞ্চলটি বঙ্গোপসাগরের পূর্ব উপকূল জুড়ে প্রায় সাতশো মাইল প্রলম্বিত। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ চট্টগ্রামের উপ-আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে এবং এরা রোহিঙ্গা মুসলমান হিসাবে পরিচিত। সতেরো শতকে আরাকান রাজসভায় বাংলা সাহিত্যের ব্যাপক চর্চা হয়েছে। আলাওল ও দৌলত কাজী সে সময়কার বিখ্যাত রাজকবি হিসাবে সমাদৃত হয়েছিলেন।
বহু শতাব্দী বসবাসের পরও এই অঞ্চলের রোহিঙ্গা বাঙালিরা নাগরিক অধিকার অর্জনে সক্ষম হয়নি। এদের অধিকাংশেরই ভোটাধিকার পর্যন্ত নেই। বর্মী শাসকদের নির্মম অত্যাচার সহ্য করে আজো এরা টিকে আছে তবে ১৯৪৮, ১৯৬৫, ১৯৭৮ সালে এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এদের ওপরে সবচেয়ে বড় বড় পীড়ন অভিযান চলে। শত শত গ্রাম নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়, হাজার হাজার নিরীহ মানুষকে হত্যা করা হয়, প্রায় ১২/১৩ লাখ মানুষ দক্ষিণ চট্টগ্রামে আশ্রয় নিয়েছে।
এই হল বহি: বাংলায় বাঙালি হিন্দু মুসলমানদের বর্তমান অবস্থা। গত পঞ্চাশ বছরের বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে, সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিপর্যয়ের দিক থেকে, বাংলাভাষীরা অন্য সকলের চেয়ে এগিয়ে। অবিশ্বাস্য হলেও রূঢ় সত্য এই যে, এই সময়কালে প্রায় এক কোটির উপর বাংলাভাষী বা বাঙালিকে তাদের মাতৃভাষা ত্যাগ করতে হয়েছে এবং বর্তমানে আরো প্রায় পঞ্চাশ লাখ বাংলাভাষী এই সাংস্কৃতিক রূপান্তর প্রক্রিয়ার কালো ছায়ার নীচে বসবাস করছে। বলাই বাহুল্য, আসাম, বিহার, ঝড়খন্ড, উত্তর প্রদেশ, ছত্রিশগড়, আন্দামান-দ্বীপমালা, আরাকান রাজ্য সহ পৃথিবীর নানা প্রান্তের অনাবাসী বা অভিবাসী বাঙালিরা এই রূপান্তর প্রক্রিয়ার শিকার। এমনকি, খোদ বাংলা হিসাবে পরিচিত ভূখ- পর্যন্ত এই বিপদের বাইরে নয় বলে দেখা যাচ্ছে। ইতিমধ্যে বাংলা সংস্কৃতি-বিনাশী অনেক আলামত আমাদের চারপাশে দৃশ্যমান হচ্ছে।
পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের বাঙালিরা আজ বাংলাদেশকে বাংলা সংস্কৃতির আগামী পীঠস্থান বা ভরকেন্দ্র হিসাবে ভাবতে ভালবাসে। এ ভাবনার মধ্যে হয় তো কিছু বাস্তবতা আছে, কিন্তু সামগ্রিক বিচারে এর যথার্থতা এখনো প্রমাণিত হয়নি; অথচ একথাও সত্যি যে, বাংলা সংস্কৃতির ধারক ও বাহক হিসাবে সার্বভৌম দেশ বাংলাদেশকেই আজ দিকনির্দেশনা দিতে হবে।
বাংলা ভাষা আন্দোলনের সূত্র ধরে, রক্তাক্ত যুদ্ধের মাধ্যমে, শেষ পর্যন্ত ওই ভাষার নামেই স্বাধীন দেশের নামকরণ ও আর্বিভাব ঘটেছে। বাংলা শিক্ষা ও প্রশাসনের ক্ষেত্রে সরকারী ভাষার মর্যাদাও পেয়েছে, কিন্তু জীবনের সর্বক্ষেত্রে কি মহান মাতৃভাষার প্রয়োগ ও ব্যবহার নিশ্চিত করা গেছে? এর উত্তর না-ই হবে। অর্থ-বিত্তে প্রতিষ্ঠিত সামাজিক পরিম-লে সাংস্কৃতিক চেতনার দৈন্য প্রকট। আকাশ-নির্ভর সম্প্রচার-সংস্কৃতির কুপ্রভাবে, অবাধ তথ্য সংস্কৃতি বিকাশের অজুহাতে মূল সংস্কৃতির কাঠামোতে আঘাত হানা হচ্ছে বার বার। আঘাতটা হানছি আমরাইÑ বাইরের কেউ নয়। উচ্চ শিক্ষার মাধ্যম হিসাবে প্রকৌশল ও চিকিৎসা বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে আজো ইংরেজি ভাষা ব্যবহৃত হচ্ছে অবলীলায়। সবচেয়ে বিপদের বিষয় এই যে, ঢাকা সহ বড় বড় শহরগুলোতে ব্যাঙের ছাতার মতো ‘কিন্ডারগার্টেন’ নামের ইংরাজি মাধ্যম স্কুলের পাশাপাশি ভুঁইফোড় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গজিয়ে উঠছে। হাই টেক প্রযুক্তি শিক্ষা গ্রহণের নামে সৃষ্টি হচ্ছে মাটি ও জনসংস্কৃতি বিচ্ছিন্ন এক নতুন সংকর প্রজন্ম।
গ্রামীণ বাংলার চিত্রটিও খুব আশাব্যঞ্জক নয়। যেখানে, মাদ্রাসা শিক্ষার নামে বাংলার চেয়ে আরবি ভাষাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বেশি এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বিরাট একটা অংশ, উপায়ান্তর না দেখে এ ধরণের শিক্ষাব্যবস্থার সাথে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েছে।
যে পর্যায় থেকে আধুনিক ও বিজ্ঞানমনস্ক শিক্ষা প্রচার ও পরগাছা শিক্ষাপদ্ধতি নিয়ন্ত্রণ ও সংস্কার করা দরকার যা আদও হচ্ছে না কিংবা বিশেষ কোনো অভিপ্রায়ে পুরো বিষয়টি দেখেও না দেখার ভান করছেন। আধুনিক একটা রাষ্ট্রের আন্ত:সংগঠন ও বিকাশে এই নির্লিপ্ততা সুদূরপ্রসারী ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
আজ যেমন ইংরেজি নিয়ে সমাজের একটা সুবিধাভোগী শ্রেণী বাড়াবাড়ি করছে, মধ্যযুগে এবং মধ্যযুগের পরে, এই সুবিধাবাদী শ্রেণীই ‘সংস্কৃত’ ও ‘ফারসি’ ভাষাকে রাষ্ট্রীয় জীবনে প্রতিষ্ঠিত করতে অপচেষ্টা চালিয়েছিল। এদের তঞ্চকতা, ভ্রষ্টাচার ও অপক্রিয়াতে ত্যক্ত বিরক্ত হয়ে, সেই আলো আঁধারির যুগে, কবি আব্দুল হাকিম লিখেছিলেন:
’যে সবে বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী।
সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।
দেশী ভাষা বিদ্যা যার মনে ন জুয়ায়।
নিজদেশ তেয়াগী কেন বিদেশ ন যায়।’
উনবিংশ শতাব্দীতে কোলকাতা কেন্দ্রিক রেনেসাঁস বাংলা সংস্কৃতির প্রতিটি শাখাকে করেছে অভাবিত সমৃদ্ধ, আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের জোয়ারে পুষ্ট। সাহিত্য, সঙ্গীত, নাটক, বিজ্ঞান সাধনা, ব্যবসা-বাণিজ্য সহ জীবনের সকল ক্ষেত্রে ঈর্ষণীয় উন্নতি ঘটেছে। স্বদেশ চেতনায় উদ্বুদ্ধ মানুষ স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। স্বাধীন স্বদেশের আশায় বাঙালি অনেক ত্যাগও করেছে কিন্তু ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগ বাঙালির স্থায়ী বিপর্যয়ের কারণ হয়ে ওঠে। বাস্তবে, বাঙালির স্বদেশ-চেতনা ছিল গোঁজামিল দিয়ে ভরা- বাঙালিত্বের চেয়ে অন্যতর পরিচয় মুখ্য হয়ে উঠেছে । এর খেসারত পূর্ব বাংলার চেয়ে পশ্চিম বাংলার মানুষকে দিতে হয়েছে অনেক বেশি। সর্বভারতীয় জাতীয়তাবাদের যাঁতাকলে পড়ে বাংলা হারিয়েছে তার আপন স্বকীয়তা আর স্বাতন্ত্রবোধ। এ ক্ষতি অপূরণীয়, অমোচনীয় অবস্থানে এসে আজ দাঁড়িয়েছে। এমনকি, এককালে বাংলার সাংস্কৃতিক রাজধানী কোলকাতা-তে এর মূল বাশিন্দারাই সর্বতোভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। স্বদেশ চেতনা আর আত্মত্যাগের উল্টো পিঠে বাস্তবতার কী নির্মম পরিহাস!
কোলকাতা তথা পশ্চিম বাংলার বাঙালির এই অধ:পতন আর অবক্ষয়ের চিত্রটি প্রখ্যাত সাহিত্যিক বুদ্ধদেব গুহ’র আত্মজীবনী থেকে তুলে ধরছি:
‘কলকাতা তখনও পুরোপুরি বাঙালিদেরই শহর ছিল। হয় তো গরিব ছিল, হয় তো এত চাকচিক্য ছিল না; কিন্তু তাঁর বাঙালিয়ানাতে কোনও ফাঁকি ছিল না। ...বাঙালি তখন বাঙালি পোশাক পরত, বাঙালি খাবার খেত; নিজেদের বাঙালি বলে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করত। ...উনিশ শো বাহান্নতেও, কলকাতার মালিক বাঙালিরাই ছিলেন। ব্যবসা, বাণিজ্যে, চাকরি; বেসরকারি ও সরকারি, দোকানদারি-এ সব অধিকাংশই তখনও বাঙালিদের হাতেই ছিল। এখন বিরানব্বুইতে এসে বাঙালিদের খুঁজে বার করতে হয়।
(সূত্র: ঋভু, হয় পর্ব, পৃষ্ঠা ১০৩, ১৮৪)
পশ্চিম বাংলায় বাংলা সংস্কৃতির বিপদ এক নজিরবিহীন পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। সংস্কৃতির এই সংকটের গভীরতা তুলে ধরতে আরো কয়েকটি উদ্ধৃতির আশ্রয় নিচ্ছি:
১/ বড়ই উদার এ শহর, কিন্তু মনের অতলে কাজ করে অন্তর্লীন প্রাদেশিক সংকীর্ণতা। কোলকাতা প্রাদেশিক সংকীর্ণতা পোষণ করে বলেই বোধহয় মহানগরীর লিঙ্গুয়া ফ্রাংকা আজ হিন্দিতে পর্যবসিত হয়েছে। পেটে ক্ষুধার উদ্রেক হলেই ভূ-ভারতের বুভুক্ষ জনগণ এ শহরে ছুটে এসে অনায়াসে ফুটপাথ দখল করে নিতে পারে, একবর্ণ বাংলা না শিখেও দিব্যি মাধ্যমিক স্তর উত্তীর্ণ হওয়া যায়, এমনকী রাজ্য সরকারি চাকরিতেও প্রবেশ করা যায়। মুষ্টিমেয় আত্মসম্মান সম্পন্ন বুদ্ধিজীবী যখন কলকাতায় বাংলাকে সম্মানজনক স্থানে উন্নীত করতে চায়, তখন এ শহরের জনগণ ও যাবতীয় সংবাদপত্র সেই ‘প্রাদেশিক’ উদ্যোগের বিরুদ্ধে একত্রে গর্জে ওঠে, অথচ হাওড়া, শিয়ালদাহ স্টেশনে হিন্দির দাপটে বাংলা নির্দেশিকা নিশ্চিহ্ন হলে, এই উদার বিগ্রেড সম্পূর্ণ নীরবতা অবলম্বন করে। ধন্য কলকাতার উদারতা! নিজ বাসভূমির রাজধানী শহরকে ঠিক কী প্রকারে বহিরাগতদের হাতে তুলে দিতে হয়, কীভাবে নিজ ভূমেই পরবাস জীবন যাপন করতে হয়, সে বিষয়ে গবেষণা করতে হলে বিশ্ববাসীকে বারে বারে এই কলকাতাতেই ছুটে আসতে হবে। (সূত্র: পাক্ষিক ‘দেশ’, ২ ডিসেম্বর ২০০৪, কাজল চট্টোপাধ্যায়)
২/ বহুভাষিতা, বহু সংস্কৃতি অবশ্যই কলকাতার অহংকার হওয়া উচিত, কিন্তু তা আঞ্চলিক স্বাতন্ত্রকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার মূল্যে নয়। পশ্চিমবঙ্গে বাংলাকে অপসারিত করে ‘রাজভাষা’র গাজোয়ারি সহ্য করার নাম ‘দেশাত্মবোধ’ আর অবলুপ্তির দিকে ধাবমান বাংলার অস্তিত্বকে রক্ষা করার উদ্যোগ ‘রাষ্ট্রদ্রোহিতার নামান্তর হতে পারে না।
নিজ মাতৃভাষার প্রতি দরদ-ভালবাসার অধিকার সকল বিশ্ববাসীর থাকতে পারে। মগজ ধোলাই প্রাপ্ত বাঙালি জনগণ ও রাজ্য সরকারের কল্যাণে পশ্চিমবঙ্গের যাবতীয় ক্ষেত্র থেকেই বাংলা ভাষা নিশ্চিহ্ন হতে চলেছে। যে জাতি নিজ সংস্কৃতি, ভাষা ও ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধাহীন হয়ে পড়ে, তার পতন অনিবার্য। তাই বাঙালি আজ সর্বক্ষেত্রে অবনমিত হয়ে পড়েছে।
(সূত্র: পাক্ষিক ‘দেশ’, ২ সেপ্টেম্বর ২০০৪, কাজল চট্টোপাধ্যায়)
৩/ শিক্ষিত বাঙালি বাবা-মা-ছেলে-মেয়ের আলোচনায় ইংরেজি, হিন্দি ভাষার ফুলঝুরি। ভাবখানা এমন যেন বাঙালিত্ব ছাড়লেই পরম প্রাপ্তি। মাতৃভাষার জন্য মন-প্রাণ নিবেদিত, অথচ সন্তানকে ইংরেজি স্কুলে ভর্তির জন্য অহেতুক টাকা ঢালতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা নেই। সাধারণ শিক্ষিত বাঙালি হয়েও পুরোপুরি বাংলা ভাষায় কথা বলতে বা লিখতে গেলে আমরা পদে পদে হোঁচট খাই।
ঐতিহাসিক কারণে, সভ্যতার অগ্রগতিতে দেশি-বিদেশি নানান ভাষার মাধ্যমে বাংলা-শব্দ ভান্ডার নি:সন্দেহে সমৃদ্ধ হয়েছে। তেমনই বাংলা ভাষা বা শব্দের ক্রমসংকোচনও অনবরত ঘটে চলেছে। কথ্য ও লিখিত দুই ভাষাতেই বাংলা শব্দকে পাত্তা না দিয়ে অন্য ভাষার শব্দ জায়গা করে নিচ্ছে; যে কোনও ভাব এবং মেধা-মননজাত কোনও বক্তব্য যথাযথ প্রকাশ করার জন্য বাংলায় উপযুক্ত শব্দ থাকা স্বত্বেও ইংরেজি ও হিন্দির আকছার প্রয়োগ হচ্ছে। এ জন্য বাঙালি প-িত, শিক্ষক, লেখক, সাহিত্যিক চলচ্চিত্র-সংগীত-নাট্য জগতের কলাকুশলী কিংবা গণমাধ্যমের কর্তাব্যক্তি-কেউই দায় এড়াতে পারে না।
প্রগতির খর-ধারায়, বাঙালির সংস্কৃতির আপন সত্তা হাবুডুবু খাচ্ছে; হয়তোবা আগামিতে কোনও সংকর সভ্যতার কোলে তা মুখ লুকাবে। পঞ্চাশ বা একশো বছর বাদে বাংলা ভাষায় লেখা গল্প উপন্যাস-কবিতা-প্রবন্ধে, বাংলা নাটক-চলচ্চিত্র-যাত্রা বা টিভি অনুষ্ঠানের সংলাপে দেখা যাবে অর্ধেকটাই ইংরেজি বা হিন্দি শব্দ, বাঙালির জীবনযাপনে মিশ্র ভাষা-সংস্কৃতির এক উদ্ভট শৈলী। তখন সেটা কি আর বাংলা ভাষা, বাঙালির সংস্কৃতি থাকবে?
(সূত্র: পাক্ষিক ‘দেশ’, ২ সেপ্টেম্বর ২০০৪, অরুণাভ দাস)    
৪/ বাংলা ভাষার পক্ষে কিছু বললেই, তাকে ইংরেজি-বিদ্বেষী বলে প্রচার করা হচ্ছে। এটা কেন?
একটি নিবন্ধে সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছিলেন, ‘কে বলল আমরা ইংরেজি শেখার বিরোধী? আমরা চাই সবাই ইংরেজি শিখুক-ভাল মতোই শিখুক; কিন্তু ইংরেজি শিখতে গেলে বাংলা ভুলে যেতে হবে কেন?’ বাংলা ভাষা প্রেমিকরাও কেউ ইংরেজি বিরোধী নয় বরং তারা বিরোধী ভাষাগত আগ্রাসনের। এই রাজ্যে সে আগ্রাসনের চরমতম শিকার বাংলা ভাষা। মনে রাখা উচিত সর্বোচ্চ ন্যায়ালয়ের একটি আদেশের কথা। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্ট একটি মামলার রায় দিতে গিয়ে বলেছে, মহারাষ্ট্র সরকারের সেই রাজ্যে অ-মারাঠিদের মারাঠি ভাষা শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা সম্পূর্ণভাবে আইনসংগত ও সংবিধান সম্মত। এই যুক্তরাষ্ট্রীয় দেশে প্রতিটি রাজ্যেরই সেই অধিকার আছে। ভাবতে আশ্চর্য লাগে, আমাদের বাংলায় সেই রকম ন্যায়সঙ্গত কোনও কাজ করতে গেলেই অদ্ভুত বিতর্কের সৃষ্টি হয়। হয় তো এই বিতর্কের ভয়েই রাজ্য সরকার আমাদের এই মহান বাংলায় এখনও শিক্ষা ও চাকরির ক্ষেত্রে ইংরেজির পাশাপাশি বাংলা ভাষা শিক্ষা বাধ্যতামূলক করতে পারেনি। ফলে এই সব ক্ষেত্রে একদিকে ইংরেজির গুরুত্ব যেমন বেড়ে গেছে, তেমনই অন্যদিকে বাংলার তাৎপর্য অস্বাভাবিক রকম কমে যাচ্ছে। আর বাংলা গুরুত্ব কমায় সেই শূন্যস্থানে ভারসাম্য বজায় রাখতে হিন্দি প্রবল বিক্রমে ঢুকে পড়তে চাইছে।

সর্বশেষ সংবাদ