বাংলা ফন্ট

বিবর্তন: বাস্তব, নাকি শুধুই অনুমান নির্ভর?

15-03-2018
নিজস্ব প্রতিবেদক ঢাকারিপোর্টটোয়েন্টিফোর.কম

    বিবর্তন: বাস্তব, নাকি শুধুই অনুমান নির্ভর?
ঢাকা: ধরুন, আমি আর আপনি, আমরা দুইটা ঘাসফড়িঙ। আমার গায়ের রঙ খানিকটা সবুজাভ লাল, আর আপনার গায়ের রঙ একেবারে পাতার মতন সবুজ। আমরা একটা সবুজ মাঠে বসবাস করি, ঘুরেফিরে বেড়াই, খাই দাই, খেলাধুলা করি। ঐ সুন্দর সবুজ মাঠে কোন একদিন একটা হতচ্ছাড়া গিরগিটি চলে আসে। তার আমাদের মতন নির্দিষ্ট রঙ নাই, সে তো আমরা জানিই। সময় সময়ে সে রঙ বদলে ফেলে। সে এসে আনন্দে ঘুরছে ফিরছে। আর ঘুরাঘুরি করলে একটা সময় ক্ষিধে পাবেই এবং তার চোখ পড়ল আমাদের উপর! মানে আমার আর আপনার উপর, আমরা দুইটা ঘাসফড়িঙ।  ঘাসফড়িঙ নিঃসন্দেহে তার পটেনশিয়াল খাবার। আমরাও গিরগিটির নজরে পড়ে হুড়াহুড়ি করা শুরু করলাম। সবুজ ঘাসের মাঝে লুকিয়ে থাকার চেষ্টা করলাম।  এখন একটু চিন্তা করে বলেন তো দেখি, আমার কিংবা আপনার মধ্যে কার ঐ গিরগিটির পেটে যাবার সম্ভাবনা বেশি?

যদি সত্যিই আপনি চিন্তা করে থাকেন, তাহলে বলবেন যে, আমিই যাব গিরগিটির পেটে। কারণ, সবুজ ঘাসের মধ্য থেকে আমাকে খুব সুন্দর আলাদা করে বের করে ফেলা যাবে, আমার গায়ের রংয়ের জন্যেই।

আমরা এখন সত্যিই একটু বড় এবং বাস্তব পরিসরে চিন্তা করি। ধরা যাক একটা সবুজ মাঠে অনেক অনেক ঘাসফড়িঙ থাকে, মানুষের গায়ের রঙে যেমন অনেক পার্থক্য আছে, ঘাসফড়িঙ এর সবুজ রঙেও নিশ্চয়ই তেমন পার্থক্য আছে। সবাই নিশ্চয়ই একরকম সবুজ না! কেউ হয়তো হালকা সবুজ, কেউ গাঢ় সবুজ, কেউ কেউ নীলাভ সবুজ, কেউ হয়তো একেবারে সেই এলাকার ঘাসের মতন সবুজ। এখন সময়ের সাথে সাথে ঐ এলাকায় কী হতে পারে, তা নিশ্চয়ই অনুমান করা যাচ্ছে!

যেহেতু শিকারির হাত (কিংবা মুখ) থেকে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা একেবারে ঘাসের মতন সবুজ রঙের ফড়িঙ এর অপেক্ষাকৃত বেশি, তাতে যেটা হবে, সেই এলাকায় তাদের মতন ফড়িঙ এর সংখ্যা বাড়তে থাকবে। এবং সেইসব ফড়িঙ এর যে জিনের কারণে তাদের রঙ একেবারে ঘাসের মতন সবুজ, সেই জিন পরবর্তী প্রজন্মে যাবার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে। সবার ক্ষেত্রে হয়তো এমনটা হবে না। যাদের ক্ষেত্রে হবে না, তাদের পক্ষে বেঁচে থাকাটাও কঠিন হয়ে যাবে। এভাবে ঐ এলাকায় একটা সময় সকল ঘাসফড়িঙ একেবারে ঘাসের মতন সবুজ রঙের হয়ে যাবে। এভাবে অনেক দিন চলতে চলতে দেখা যেতে পারে যে, আগের প্রজন্মের সেই ভিন্ন রঙ এর ফড়িঙ এর চেয়ে এদের জিনের একটা সিগনিফিক্যান্ট পার্থক্য তৈরি হয়ে গেছে সময়ের সাথে সাথে। পার্থক্যটা এমনই যে, তাদের পক্ষে আর আগের ঐরকম কোন ঘাসফড়িঙ এর সাথে মেটিং সম্ভব হচ্ছে না। অর্থাৎ নতুন একরকমের ঘাসফড়িঙ এর স্পেসিস উদ্ভব হয়ে গেল।

এখন চলুন, স্পেসিস কিংবা প্রজাতি বিষয়টা নিয়ে আমরা একটু পরিষ্কার হই। দুটি প্রাণী কেবল একরকম দেখতে হলেই একই প্রজাতির না। কিংবা দুটি প্রাণীর মধ্যে বাহ্যিক কিংবা আচরণগত অনেক পার্থক্য থাকলেই তারা ভিন্ন প্রজাতির হয়ে যায় না। প্রজাতির সবচাইতে সহজ এবং প্রতিষ্ঠিত সংজ্ঞাটা হচ্ছে, যখন দুটি ইন্ডিভিজুয়াল (জীব বলা শ্রেয়) মেটিং এর মাধ্যমে ফারটাইল (প্রজননে সক্ষম) বাচ্চাকাচ্চা উৎপাদন করতে পারবে, তখনই তাদের একই প্রজাতির বলা যেতে পারে। মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, বাচ্চা হইলে সেইটা আবার প্রজননে অক্ষম কীভাবে হবে? উদাহরণ দেই একটা। লাইগার এর নাম শুনেছেন কখনো? পুরুষ সিংহ আর নারী বাঘের মিলনে উৎপন্ন অনেকটা বাঘ অনেকটা সিংহর মতন দেখতে বিরাট একটা প্রাণী। এখন, বাঘ আর সিংহকে কি একই প্রজাতি বলতে পারি আমরা? না, পারি না। কারণ, একটা পুরুষ আর একটা নারী লাইগার মিলে কখনোই নতুন লাইগার জন্ম দিতে পারবে না। যদিও নারী লাইগার আরেকটা সিংহের সাথে মেট করে নতুন আরেকটা লাইলাইগার (খরষরমবৎ) জন্ম  দিতে সক্ষম, কিন্তু পুরুষ লাইগারের কোন প্রজনন ক্ষমতা থাকে না।

আবার ধরা যাক, কুকুর আর নেকড়ে। যতই আচরণগত পার্থক্য থাকুক। এখনো যেকোনো প্রকারের কুকুর আর নেকড়ের মিলনে নতুন বাচ্চা হবে এবং সেইরকম দুটো বাচ্চাও নিজেদের ভেতর প্রজননে সক্ষম। অর্থাৎ, কুকুর আর নেকড়ে এখনো একই স্পেসিস। “এখনো” বলার কারণ হচ্ছে খুব বেশিদিন হয়নি এখন আমরা যে কুকুর দেখি, সেটার। মানুষের হাত ধরেই গত পনের বিশ হাজার বছরে নেকড়ে থেকে একটু একটু করে আজকের এই কুকুর। হয়তো আরও এমন অনেকদিন গেলে একটা সময় কুকুর নেকড়ে থেকে পুরোই আলাদা একটা প্রজাতি হয়ে যাবে। নেকড়ে থেকে কীভাবে কুকুর হলো- সেই মজার গল্পটা আরেকদিন করা যাবে, এইবারে আবার আগের কথায় ফিরে যাই।

প্রজাতি নিয়ে এত জ্ঞান দেয়ার কারণ অবশ্য ভিন্ন। একটা চমৎকার উদাহরণ দিই। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকেই লন্ডনের মাটির তলে খোঁড়াখুঁড়ি শুরু হয়ে যায়, পৃথিবীর প্রথম পাতালরেলের জন্যে, যার উদ্বোধন হয় ১৮৬৩ সালে। মাটির নিচ দিয়ে ট্রেন চলে, এমন একটা ঘটনার সাথে সাথে সেখানে আরেকটা আরও চমকপ্রদ ঘটনা ঘটতে থাকে। ঝাঁকে ঝাঁকে মশা সেই পাতালে বসবাস শুরু করে। মাটির উপরে এইসব মশা সাধারণত পাখির (বিশেষ করে কবুতর) রক্ত খেত, যেহেতু মাটির নিচে কবুতর থাকে না, সেহেতু তারা সেখানে তাদের নতুন শিকার খুঁজে বের করল। সেটা হচ্ছে ইঁদুরৃ চমকটা খুঁজে পাওয়া গেল এর প্রায় একশ বছর পরে!

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধজুড়ে যখন লন্ডনবাসী জার্মান বিমানবাহিনীর হামলার ভয়ে অস্থির হয়ে থাকত, তখন তারা সময়ে সময়ে আশ্রয় নিত সেই সাবওয়েতে। তারা আবিষ্কার করল, নিচে একটা বিরাট মশার রাজত্ব। যারা একশ বছর ধরে নিচে একটা সা¤্রাজ্য গড়ে তুলছে। এর আরও পরে বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করলেন যে, নিচের মশাগুলা আর উপরের মশাগুলার সাথে মেট করতে পারে না, অর্থাৎ তারা নিজেরাই একে অপরের সাথে প্রজননে সক্ষম।

অর্থাৎ এই একশ বছরের মধ্যেই দুটো ভিন্ন প্রজাতির উদ্ভব হয়ে গেল। অথচ তারা এই একশ বছর আগেই এক প্রজাতির ছিল। ভিন্ন পরিবেশে দীর্ঘদিন থাকার ফলে তাদের জেনেটিক্সে বেশ কিছু পরিবর্তন আসে এবং পরিবর্তনগুলা একটা পর্যায়ে তাদেরকে আলাদা প্রজাতিতে পরিণত করে দেয়। প্রশ্ন আসতে পারে, তবে আলাদা আমাদের চারপাশের সব প্রাণীর মধ্যে কেন এমনটা হয় না। উত্তরটা বেশ সহজ। আমাদের এক জীবনে একটা মশার হাজার হাজার প্রজন্ম হয়ে যায়! একশ বছরে একটা মশার যতগুলা প্রজন্ম পৃথিবীতে আসে, মানুষ কিংবা কুকুর বা নেকড়ের বেলায় এমনটা ঘটতে কয়েক লক্ষ বছর লেগে যায়। এবং এইসব বড় বড় প্রাণীরা কয়েক বছরে হয়তো একটি দুটি বাচ্চার জন্ম দেয়। অন্যদিকে মশার মতন প্রাণীরা কতটা প্রজননে দক্ষ সেটা নিশ্চয়ই আমাদের অজানা না! আবার ব্যাক্টেরিয়া ভাইরাস যারা কিনা মিনিটেই নতুন ব্যাক্টেরিয়া উৎপাদন করতে পারে, তাদের বেলায় এমনটা আরও দ্রুত ঘটতে পারে, এবং ঘটেও!

আরেকটা কথা, দুটো আলাদা প্রজাতি হতে হলে, জেনেটিক্সে খুব বেশি পরিবর্তন আসতে হয় না। মানুষ আর শিম্পাঞ্জির জেনেটিক সিমিলারিটি মোটামুটি ৯৬% এর কিছুটা বেশি এবং আমরা অতি অবশ্যই দুটো আলাদা প্রজাতি। এসবই ছিল ন্যাচারাল সিলেকশন বা প্রাকৃতিক নির্বাচনের কয়টা উদাহাণ। বিবর্তনের তিনটা উপায়ের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

আমরা সবসময়ই বলতে শুনি, বিবর্তনের কোন প্রমাণ নেই, এটা চোখের সামনে কখনো ঘটতে দেখি না আমরা। বিবর্তন নাকি ভাইরাস ব্যাক্টেরিয়া পর্যায়েই ঘটে। এটা নাকি অনেকটাই অনুমান নির্ভর বিজ্ঞান এবং আরও যা তা কথাবার্তা। এসব কুযুক্তির কোন ভিত্তি এই একবিংশ শতাব্দীতে নেই। বিবর্তন তত্ত্ব আবিষ্কারের দেড়শ বছর পরে এসে, জেনেটিক সায়েন্সের এমন অগ্রগতির সময়ে দাঁড়িয়ে এসব কুযুক্তিতে বিশ্বাস করতে দেখাটা সত্যিই কষ্টদায়ক।

ঢাকারিপোর্টটোয়েন্টিফোর.কম/এইএমএল



সর্বশেষ সংবাদ