বাংলা ফন্ট

সশস্ত্র সন্ত্রাসীর হাতে জিম্মি পাহাড়িরা

08-05-2018
নিজস্ব প্রতিবেদক ঢাকারিপোর্টটোয়েন্টিফোর.কম

 সশস্ত্র সন্ত্রাসীর হাতে জিম্মি পাহাড়িরা
ঢাকা: পার্বত্য অঞ্চলের ৪ গ্রুপের তিন সহস্রাধিক সশস্ত্র ক্যাডারের হাতে পাহাড়ের বাসিন্দারা জিম্মি হয়ে পড়েছে। এসব ক্যাডার প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি, অপহরণ ও খুন-খারাবির ঘটনা ঘটাচ্ছে। জানা গেছে, গত ৬ মাসে পাহাড়ে ৫২ সশস্ত্র হামলা ও অপহরণ হয়েছে। মিয়ানমারের এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সাথে পাহাড়ের সশস্ত্র গ্রুপের এক শীর্ষ নেতার ফোনালাপের ঘটনায় পার্বত্য অঞ্চলে তোলপাড়ের সৃষ্টি হয়েছে। মিয়ানমারের ওই শীর্ষ ব্যক্তি পাহাড়ের সশস্ত্র গ্রুপের ক্যাডারদের সহযোগিতা করার আশ্বাস দিয়েছেন। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নেটওয়ার্কে এমন তথ্য উঠে এসেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নই পারে পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি ফিরিয়ে আনতে।

বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়িদের আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠন রয়েছে ৪টি। এগুলো হলো- পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস), ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ), জনসংহতি সমিতি সংস্কারবাদী (এমএন লারমা) ও ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক)। এসব সংগঠনের কোন রেজিস্ট্রেশন নেই। এসব সংগঠনের নেতা নির্বাচিত করা হয় না। এক নেতা বংশ পরম্পরায় নেতৃত্ব দিয়ে আসছে। এ কারণে নেতৃত্ব নিয়ে সংগঠনের মধ্যে দ্বন্দ্ব বিরাজমান। মাঝে মাঝে সশস্ত্র ক্যাডাররা প্রতিপক্ষ থেকে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে নেতাদের হত্যা করতে সহযোগিতা করে থাকে। এমন তথ্য বেরিয়ে আসছে। এগুলো সশস্ত্র গ্রুপ। এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, খুন, ধর্ষণ, অপহরণ, গোলাগুলি, চাঁদাবাজি, মুক্তিপন আদায়সহ বিভিন্ন নাশকতামূলক সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে তারা। সংগঠনগুলোর সশস্ত্র হুমকির মুখে রয়েছে অসহায় সাধারণ পাহাড়ি-বাঙালিসহ সব পেশাজীবী। উক্ত সংগঠনগুলোর বছরে ৪শ’ কোটি টাকার চাঁদাবাজি করে। এই বিপুল পরিমাণ অর্থের ভাগাভাগি মূলত পারস্পরিক দ্বন্দ্বের অন্যতম প্রধান কারণ। চারটি গ্রুপের কার্যক্রমে খুবই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে তারা কোন নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের সাথে সংশ্লিষ্ট নয়। তারা পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে কোন ভূমিকাও পালন করছে না। তারা শুধুমাত্র ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য হানাহানিতে লিপ্ত রয়েছে এবং পাহাড়ের শান্তি বিনষ্ট করছে। দিন দিন তাদের সন্ত্রাসী কার্যকলাপে ভুলুণ্ঠিত হচ্ছে পাহাড়ের মানবতা, সুখ শান্তি। জিন্মি হয়ে পড়েছে পাহাড়ের নিরীহ জনগোষ্ঠী। সশস্ত্র চার গ্রুপের মধ্যে ইউপিডিএফ ও ইউপিডিএফ গণতন্ত্র খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। জেএসএস (সন্তু লারমা) রাঙামাটি এবং জেএসএস সংস্কার (এমএন লারমা) বান্দরবান ও রাঙ্গামাটির কিছু এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে। নিরীহ পাহাড়ি-বাঙালিরা তাদের কাছে জিম্মি। শান্তি চুক্তি বাস্তবায়ন হলে এসব সশস্ত্র গ্রুপের বিশাল চাঁদাবাজি বন্ধ হয়ে যাবে। এ কারণে তারা শান্তি চুক্তির বাস্তবায়ন চায় না।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, পাহাড়ের সশস্ত্র ক্যাডারদের হাতে রয়েছে আধুনিক অস্ত্র-গোলাবারুদ বিভিন্ন অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র। শুধু তাই নয়, অস্ত্র-গুলি আসছে পার্শ্ববতী দেশের সীমান্ত পথে। অহরহ ঢুকছে অস্ত্রের চালান। বাংলাদেশ-মিয়ানমার ও বাংলাদেশ-মিজোরাম সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র আসছে। বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটির দুর্গম পাহাড়ি এলাকা রুট হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে। গহীন অরণ্যে রয়েছে অস্ত্র ভান্ডার। দুর্গম হওয়ায় ওইসব এলাকায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী টহল দিতে পারে না। এই সুযোগটাই কাজে লাগাচ্ছে অস্ত্র পাচারকারীরা। আর এসব অস্ত্র ব্যবহার করে সম্প্রতি দুই গ্রুপের শীর্ষ নেতাকে হত্যা করা হয়েছে। নিহত ওই দুই জন সম্ভাব্য এমপি প্রার্থী ছিলেন। তারা হলেন তপন জ্যোতি চাকমা ও শক্তিমান চাকমা ওরফে বর্মা। তপন ইউপিডিএফ সংস্কারের আহ্বায়ক এবং শক্তিমান জেএসএস সংস্কার নেতা। তারা এমপি হয়ে গেলে ক্ষমতা বেড়ে যাবে-প্রতিপক্ষের এমন ধারনায় তারা টার্গেট কিলিংয়ে পড়েন।

মিজোরাম সীমান্ত ঘেঁষেই রয়েছে একটি পাহাড়ি সন্ত্রাসী দলের প্রধান কার্যালয়। অনায়াসেই তারা বাংলাদেশ-ভারতে যাতায়াত করছে। অন্যদিকে মিয়ানমার থেকেও অস্ত্র আসছে। সন্ত্রাসীরা পার্বত্য অঞ্চলের ভাবনা কেন্দ্রের ভান্তে পরিচয় দিয়ে ছোট অস্ত্র আনছে। গোয়েন্দারা খোঁজ নিয়ে জেনেছে, তারা বাংলাদেশি নয়। বাংলাদেশের পরিচয়পত্র তাদের হাতে নেই। এসব অস্ত্র পাহাড়ের তিনটি সন্ত্রাসী সংগঠন, জঙ্গি ও পেশাদার সন্ত্রাসীদের হাতে যাচ্ছে। গহীন অরণ্যে রয়েছে জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। গোয়েন্দা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ভান্তে পরিচয় দানকারী কয়েকজনকে অস্ত্রসহ গ্রেফতার করেছে। তারা স্বীকার করেছে, মিজোরাম সীমান্ত এলাকা দিয়ে পাহাড়ি চারটি সশস্ত্র গ্রুপ অস্ত্র, গোলাবারুদ ও গ্রেনেড এনে মজুদ করছে। জানা গেছে, পার্বত্য অঞ্চলের চার গ্রুপের ক্যাডারদের হাতে এখন প্রচুর অস্ত্র ও গোলাবারুদ। পার্বত্য শান্তি চুক্তির পর তাদের কাছে থাকা অস্ত্রের ৩ ভাগের এক ভাগ জমা দেয়। অত্যাধুনিক অস্ত্রগুলো তারা তাদের কাছে রেখে দেয়। নিজেদের কাছে অনেক অস্ত্র থাকায় এখন কেউ কারোর নেতৃত্বে মানে না। আর এতে টার্গেট কিলিংয়ের মাধ্যমে হত্যাকান্ড বাড়ছে।

জানা গেছে, পার্বত্য অঞ্চলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ৫৫২টি ক্যাম্প ছিল। শান্তি চুক্তি বাস্তবায়ন অনুযায়ী ৩৩৪টি ক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়। এখন আছে ২১৮টি ক্যাম্প। যেসব এলাকায় ক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়েছে সেখানেই সশস্ত্র গ্রুপের ক্যাডাররা দখল করে ফেলেছে। ওই সব ক্যাম্পে সশস্ত্র ক্যাডাররা ঘাটি গেড়েছে। চলছে, খুন, অপহরণ, ধর্ষণ ও চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধ। পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি ফিরিয়ে আনতে প্রত্যাহার হওয়া ক্যাম্পগুলো পুনরায় চালু করার দাবি জানিয়েছেন নিরীহ পাহাড়ি-বাঙালি।

ঢাকারিপোর্টটোয়েন্টিফোর.কম/এইএমএল



সর্বশেষ সংবাদ