বাংলা ফন্ট

সড়ক খোঁড়াখুঁড়িতে বিষিয়ে উঠেছে ঢাকাবাসী

26-05-2018
নিজস্ব প্রতিবেদক ঢাকারিপোর্টটোয়েন্টিফোর.কম

 সড়ক খোঁড়াখুঁড়িতে বিষিয়ে উঠেছে ঢাকাবাসী

ঢাকা: ঢাকা শহরের প্রায় ৪০০ কিলোমিটার সড়কে খোঁড়াখুঁড়ি চলছে। এসব সড়ক সংস্কার, সড়ক খুঁড়ে গভীর ড্রেন নির্মাণ, মিডিয়ান সংস্কার ও ফুটপাতের উন্নয়ন কাজ করা হচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে খোঁড়াখুঁড়ি চলায় কর্মব্যস্ত নগরবাসীর জীবন বিষিয়ে উঠেছে।

বিশেষ করে স্কুলগামী ক্ষুদে শিক্ষার্থী, নারী, প্রতিবন্ধী ও অসুস্থ মানুষ ভোগান্তিতে পড়ছেন। বর্ষা মৌসুমে সড়ক খোঁড়াখুঁড়ি বন্ধ রাখার নীতিমালা থাকলেও সেসব মানছে না নগর সংস্থাগুলো।

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রকৌশল বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এ সংস্থার অধীনে ১ হাজার ৩৫০ কিলোমিটার সড়ক। বেশ কয়েকটি প্রকল্পের আওতায় ২০০ কিলোমিটারের বেশি সড়কে সংস্কার, পাইপ স্থাপন, মিডিয়ান সংস্কার ও ফুটপাতের উন্নয়ন কাজ চলছে।

আর ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ১ হাজার কিলোমিটার সড়কের প্রায় ২০০ কিলোমিটারে সংস্কার, পাইপলাইন স্থাপন, মিডিয়ান সংস্কার ও ফুটপাতের উন্নয়ন কাজ চলছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, নীতিমালা অনুযায়ী বর্ষা মৌসুমে সড়ক সংস্কার কাজ বন্ধ থাকার কথা। কিন্তু এবার চলছে কেন, এটা নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন করছেন। বাস্তবতা হচ্ছে, এবার বর্ষা অনেকটা আগেভাগে এসেছে। এ কারণে উন্নয়ন কাজে নগরবাসীর কিছুটা ভোগান্তি হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, জুনের মধ্যে বেশিরভাগ সড়কের উন্নয়ন কাজ শেষ হবে। কিছু সড়কের কাজ চলমান থাকবে। দরপত্রের কার্যাদেশ অনুযায়ী অনেক সড়কে কাজ চালানোর আইনগত সুযোগ থাকবে। তবে নতুন করে আর কোনো সড়ক কাটাকাটির অনুমোদন দেয়া হবে না।

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. শরীফ উদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, ডিএনসিসির ২০০ কিলোমিটার সড়কে এখন উন্নয়ন ও সংস্কার কাজ চলছে। এ কারণে এসব সড়কে খোঁড়াখুঁড়ি হচ্ছে। এতে করে নগরবাসীর দুর্ভোগ হচ্ছে, এটা সত্য। কিন্তু এরতো কোনো বিকল্প নেই। তবে চলমান কাজগুলো দ্রুততম সময়ের মধ্যে করতে জোর তৎপরতা চালান হচ্ছে।

সরেজমিন চিত্র : মহানগরীর সাতমসজিদ সড়কের শংকর থেকে মোহাম্মদপুর বাস স্ট্যান্ড পর্যন্ত ডিএনসিসির উন্নয়ন কাজ চলছে। সড়কের দু’পাশের ড্রেন সংস্কার চলছে। এজন্য সড়কে গভীর গর্ত করা হয়েছে। আর কর্দমাক্ত মাটি সড়কের একাংশে স্তূপ করে রাখা হয়েছে।

সড়কের মিডিয়ান ভেঙে নতুন করে তৈরির কাজ চলছে। এ সড়কের মিডিয়ান বরাবর ব্লক, ইট, সুরকি রাখা হয়েছে। একটু পরপর সড়কে ছোট-বড় গর্ত করা হয়েছে। এ অবস্থায় প্রায় প্রতিদিনই থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। সামান্য বৃষ্টিতেই সড়কে হাঁটুপানি জমে যাচ্ছে।

খানাখন্দে ভরা জলাবদ্ধ সড়কে মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়েই চলাচল করছেন নগরবাসী। একই চিত্র মোহাম্মদপুর বাঁশবাড়ী সড়ক ও আশপাশের অলিগলিতে।

সাতমসজিদ রোডের গ্রাফিক আর্টস ইন্সটিটিউটের কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী মাহমুদুল হাসান বলেন, প্রায় ২ মাস ধরে ক্যাম্পাসের সামনের সড়কে খোঁড়াখুঁড়ি চলছে, যাতায়াতে খুব কষ্ট হচ্ছে। ঢিমেতালের এ উন্নয়ন কাজ কবে শেষ হবে আল্লাহ জানে।

এ শিক্ষার্থী আরও জানান, বৃষ্টি হলেই সড়কে পানি জমে যায়। সে সময় খানাখন্দে ভরা সড়কে চলাচল করা আরও কষ্টকর হয়ে যায়।

কুড়িল প্রগতি সরণির বসুন্ধরা গেট থেকে কুড়িল ফ্লাইওভার পর্যন্ত সড়কের দু’পাশে গভীর ড্রেন তৈরির কাজ চলছে। আর মিডিয়ান ভেঙে নতুন করে তৈরি করা হচ্ছে। এতে ব্যস্ততম এ সড়কটি অত্যন্ত সরু হয়ে গেছে। গণপরিবহন ও প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস চলাচলে তীব্র যানজট সৃষ্টি হচ্ছে।

সামান্য বৃষ্টি হলেই সড়কে হাঁটুপানি জমছে। এ সময় খানাখন্দে ভরা এ সড়কে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। নিত্যদিনই এ সড়কে দুর্ঘটনা ঘটছে।

যমুনা ফিউচার পার্কের ফুডকোর্টের ব্যবসায়ী ইনামুল হক বলেন, খিলক্ষেত থেকে যমুনা ফিউচার পার্কে অফিস করি। কুড়িল প্রগতি সরণি সড়কে খোঁড়াখুঁড়ির কারণে ৫ মিনিটের দূরত্ব পাড়ি দিতে প্রায় ১ ঘণ্টা লেগে যায়। বাস ছেড়ে হেঁটে আসব, তাও সম্ভব হয় না। কেননা, সড়ক খুঁড়ে এত বেহাল করে রাখা হয়েছে যে, হেঁটে চলাচল করতে গেলে খানাখন্দে পড়ে যাওয়ার আতঙ্ক তাড়া করে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের টিএসসি থেকে দোয়েল চত্বর পর্যন্ত সড়ক মেট্রোরেলের নির্মাণকাজে খুঁড়ে ফেলে রাখা হয়েছে। সড়কের অংশবিশেষ খুঁড়ে ফেলে রাখার কারণে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। প্রায় সময়ই এ সড়কে যানজট লেগে থাকে।

সড়কের একাংশে অনিরাপদ গর্ত থাকার কারণে প্রায় রিকশা, মোটরসাইকেল বা গাড়িকে সাইড দিতে গিয়ে অসতর্ক পথচারীরা গর্তে পড়ছেন। আর বৃষ্টির সময় সড়কের গর্তে পানি জমে একাকার হয়ে থাকছে। জলাবদ্ধ এ সড়কে চলাচল করা দুরূহ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী সাদ্দাম হোসেন যুগান্তরকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ভেতর সড়ক খুঁড়ে যেভাবে ফেলে রাখা হয়েছে, এতে মনে হয় নাগরিকদের জীবনের কোনো মূল্য নেই। অনিরাপদভাবে সড়কে গর্ত করে ফেলে রাখা হয়েছে, যে কোনো সময় একজন শিক্ষার্থী সড়কের গর্তে পড়ে আহত হতে পারে।

জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনের সড়কের একাংশও খুঁড়ে ফেলে রাখা হয়েছে প্রায় ১ মাস। পাইপলাইন স্থাপনের জন্য খুঁড়ে ফেলে রাখা এ সড়ক এখন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সচিবালয়, জাতীয় প্রেস ক্লাব, বিএমএ ও সিরডাপে নানা প্রয়োজনে আসা মানুষ যানজটে পড়ে নাকাল হচ্ছেন।

একই চিত্র মতিঝিল, শাপলা চত্বর ও আরামবাগ এলাকায়। বাণিজ্যিক এলাকার প্রধান সড়কগুলো দীর্ঘদিন ধরে খুঁড়ে ফেলে রেখেছে। রমজানে ভোর থেকে রাত পর্যন্ত এসব সড়কে সীমাহীন যানজট লেগে থাকে। আর সামান্য বৃষ্টিতে হাঁটুপানির নিচে তলিয়ে যায় পুরো সড়ক। এ সময় এসব সড়কে দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়েই মানুষকে চলাচল করতে হয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বরাবরের মতো এবারও বর্ষার মৌসুমে রাজধানীর সড়কগুলোতে শুরু হয়েছে খোঁড়াখুঁড়ি। বেশিরভাগ এলাকায় রাস্তার অর্ধেকটা গর্ত করে চলছে বিভিন্ন সংস্থার অপরিকল্পিত ‘উন্নয়নযজ্ঞ’। এক্ষেত্রে মানা হচ্ছে না কোনো নিয়মনীতি। উপেক্ষিত হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সিদ্ধান্তও।

ঢাকা ওয়াসা, সিটি কর্পোরেশন, ডেসা, ডেসকো, বিটিসিএলসহ সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সড়কে খোঁড়াখুঁড়ি চালায়। গত বর্ষায় ছিল মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভার নির্মাণে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি। ফ্লাইওভার চালু হওয়ার পর এ বছর সেই ভোগান্তি নেই। বেশ কিছু এলাকায় চলছে ইউলুপ নির্মাণ।

গত বছরের মাঝামাঝি শুরু হওয়া মেট্রোরেলের নির্মাণ কাজ এখনও চলমান। অনেক এলাকায় বসানো হচ্ছে ড্রেনের পাইপ ও সেবা-সংযোগ। ফলে ঢাকার প্রধান প্রধান সড়ক কাটাকাটি হচ্ছে। এতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে নগরবাসীকে। সৃষ্টি হচ্ছে যানজট। এমনকি পথচারী চলাচলও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। নষ্ট হচ্ছে মানুষের কর্মঘণ্টা। বাড়ছে অর্থের অপচয়।

বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব প্লানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ঢাকা শহরের উন্নয়নকাজগুলো সুষ্ঠু পরিকল্পনার আলোকে করা হচ্ছে না। এ কারণে অর্থবছরের শুরুতে তেমন কোনো কাজ থাকে না।

কিন্তু অর্থবছরের শেষে একত্রে নগরজুড়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু হয়। আর বাংলাদেশে এ সময়টা বর্ষার মৌসুম। এতে করে মারাÍক জনদুর্ভোগ হয়। দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলো এ ব্যাপারে সচেতন হলে ভোগান্তি অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

প্রকৌশল বিশেষজ্ঞ ম. ইনামুল হক বলেন, ঢাকার জনদুর্ভোগের অন্যতম প্রধান কারণ সেবা সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতা এবং অপরিকল্পিত কার্যক্রম। দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলো এ অবস্থা থেকে সরে এলে ভোগান্তি অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

ঢাকারিপোর্টটোয়েন্টিফোর.কম/এইএমএল


সর্বশেষ সংবাদ