বাংলা ফন্ট

উম্বের্তো একোর সাক্ষাৎকার: আমরাই একমাত্র জানি যে আমাদের মরতেই হবে

10-12-2016
রেশমী নন্দী

উম্বের্তো একোর সাক্ষাৎকার: আমরাই একমাত্র জানি যে আমাদের মরতেই হবে
নিজের সম্পর্কে এমন মন্তব্য করতেন ইতালীয় লেখক, দার্শনিক, চিহ্নবিজ্ঞানী উমবের্তো একো। ৪৩টিভাষায়অনুদিত তাঁর ” দি নেম অব দি রোজ” বইটির জন্য জগৎবিখ্যাত হলেও সবমিলিয়ে ৬টি উপন্যাস ছাড়াও লিখেছেন অসংখ্য উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধ, চিহ্নবিজ্ঞানের উপর গবেষনাগ্রন্থ। ইতালির বালোনে বিশ্ববিদ্যালয়ে চিহ্নবিজ্ঞানের এমিরাটাস অধ্যাপক এবং একই বিশ্ববিদ্যালয়ের মানববিদ্যার উচ্চতর বিভাগের চেয়ারম্যান হিসেবে নিযুক্তছিলেন একো। ২০১৬ সালের ২০ফেব্রুয়ারী ক্যান্সার আক্রান্ত এই শিক্ষাবিদ ইতালির মিলানে নিজ বাসায় মৃত্যুবরণ করেন। ১৯৯৬ সালের ১২ডিসেম্বর তাঁর এই সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন থিয়েডোর বেলে। সাক্ষাৎকারটি ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন রেশমী নন্দী। 

প্রশ্ন:আপনার উপন্যাসগুলো বেশ জনপ্রিয়। কিন্তু অনেকেই বলে যে বেশিরভাগ লোক সেগুলো পুরো পড়েনা। ভাবতে আপনার খারাপ লাগে ?

উত্তর:স্বীকার করতেই হবে যে, এমন অনেক বই আছে যেগুলো আমার খুবই প্রিয় কিন্তু সেগুলো পুরো পড়ে উঠতে পারি না। এমন হতেই পারে। আমার ল্যাটিন উদ্বৃতিতে ভরা জটিল লেখা ” দি নেইম অব দি রোজ” যখন জনপ্রিয় হয়, তখন থেকেই এটা প্রচলিত যে, লোকে বইটা পড়ে না। আমি সন্তুষ্ট।

প্রশ্ন:একেবারে কেটেছেটে সহজ করে বললে, আপনার ” দি নেইম অব দি রোজ” হলো খুনকে কেন্দ্র করে লেখা একটা রহস্য উপন্যাস আর ” ফুকো’স পেন্ডুলাম” হলো ষড়যন্ত্র নিয়ে উপন্যাস। তাহলে, ” দি আইল্যান্ড অব দি ডেবিফোর” কি?

উত্তর:প্রথমত:, যেভাবে বললেন, সেভাবেও গল্পগুলোকে ভাবা যায় । প্রথম দুটো উপন্যাসের ক্ষেত্রে, রহস্যগল্প হিসেবে এগুলোকে বিবেচনা করতে পারেন। তবে, রহস্য ছাড়াও আধ্যাত্নিক একটা ভাবনা রয়েছে এগুলোর মধ্যে- সত্য সম্পর্কে, পৃথিবীর ধারা সম্পর্কে কিছু অসাধারণ প্রশ্নের উল্লেখ আছে। সেই অর্থে, তৃতীয় উপন্যাসটিও এই ঘরানার।

তিনটিই আসলে দার্শনিক উপন্যাস। ” দি নিউ ইউর্ক টাইমস” সদয় হয়ে ভলতেয়ার ও সুইফটের কাতারে ফেলেছে এগুলোকে। তবে, একটা পার্থক্য হলো যে, প্রথম দুটো উপন্যাস মূলত: সংস্কৃতি সম্পর্কিত।
আমি ভাবছিলাম, একেবারে মুক্তভাবে প্রকৃতি সম্পর্কে কিছু বলাযায় কিনা। সেখান থেকেই আমার মাথায় দ্বীপের ভাবনাটা এলো। প্রশান্ত মহাসাগরের একটা দ্বীপ, মানুষের ছোঁয়ায় যেটা কলুষিত হয়নি। এটা বেশ কৌতুহল উদ্দীপক যে, উপন্যাসের চরিত্রটি পৃথিবীর প্রথম মানুষ যে সেই দ্বীপে পা ফেলেছে, এমন অনেককিছু দেখছে যেগুলো আর কোন মানুষের দৃষ্টিগোচর হয়নি, যেগুলোর কোন নাম তার জানা নেই।
নামের বদলে রূপক ব্যবহার করে গল্পটা বলতে আমার বেশ লেগেছে। আমার চিহ্নবিজ্ঞানের ধারণা থেকে উপন্যাস লেখার অভিজ্ঞতা বেশ মজার ছিল।
প্রশ্ন:আমি প্রায়ই ভাবি যে ঈশ্বর যখন আদমকে চারপাশের সবকিছুর নামকরণ করতে বলেছিল, কোত্থেকে শুরু করেছিল আদম?
উত্তর:আপনি নিশ্চয় জানেন যে আমার সর্বশেষ গবেষণাগ্রন্থে এই বিষয়টা নিয়েই আলোচনা করেছি। মানবসভ্যতার শেষ দু’হাজার বছর ধরে এআলোচনা চলছে যে আদমের সেই নিখুঁত ভাষা আসলে কি ছিল?? কারণ জনশ্রুতি বলে, খরগোসের যে নামকরণ আদম করেছিল, প্রাণীটির যথার্থ ভাব তাতে স্পষ্ট ছিল।
এটা একধরনের ভাবালুতা। আমরা ভাবতে ভালবাসি যে আমাদের ভাষা এমনই একটা শক্তি, যেটা যথার্থতার সাথে কোন বস্তুপ্রকৃতি নির্ধারণ করতে পারে।
প্রশ্ন:কিন্তু ” দি নেইম অব দি রোজ” বইটিতে অন্ধ লাইব্রিয়ানকে খলনায়ক বানিয়ে আপনি কি এটা দেখাতে চাননি যে মতামতে কিছু যায় আসেনা।
উত্তর:আপনার কি মনে হয়, উইলিয়ামের কোন বিশ্বাস ছিল না? জর্জ কিন্তু খলনায়ক নয়, সেও একজন নায়ক। সে কেবল তার সময়ের একটা নির্দিষ্ট ভাবনা প্রকাশ করেছে, কিন্তু তাকে আমি খলনায়ক বলতে নারাজ। এটা আসলে বৈশ্বিক দুটো ভাবনার দ্বন্ধ আর বৈশ্বিক ভাবনাতো নির্দিষ্ট ধারণার ফলাফল।

প্রশ্ন:আমাদের বৈশ্বিক ধারণায় এমন কোন বিপজ্জনক দৃষ্টিভঙ্গী কি আছে, যে মনটা হাসির উপর অ্যারিস্টোটলের ভাবনা ১৩২৭ সালেও বলবৎ ছিলো?
উত্তর:এই সময়েও এমন সব স্বৈরাচারী ভাবনা রয়েছে যার জেরে বই পুড়ছে। সালমান রুশদির উপর যে নিগ্রহ চলে, সেটাকে বই ধ্বংসের পায়তারা ছাড়া আর কি বলা যায়? আমরা সবসময় কিছু না কিছু ধ্বংস করে চলেছি।
এখন পর্যন্ত কিছু মানুষের সাথে আমাদের ক্রমাগত দ্বন্ধ চলছে যারা বিশ্বাস করে নির্দিষ্ট কিছু লেখা ভয়ঙ্কর এবং সেগুলো নিশ্চিহ্ন করে দিতে হবে। কাজেই মধ্যযুগের পরিপ্রেক্ষিতে লিখিত হলেও আমার লেখা এখনো পুরোনো হয়ে যায়নি। আমরা উন্নত হইনি।
এমনকি এখানেও, অনেকে আলোচনা করে যে নির্দিষ্ট কিছু তথ্য ইন্টারেনেটে থাকা ঠিক না। সত্যিই কি এটা অনুমোদনযোগ্য যে, কেউ ইন্টারেনেটের মাধ্যমে অন্যকে শেখাবে যে কিভাবে নিজের মাকে বিষ খাওয়াতে হয় কিংবা বোম বানাতে হয়? আমরা সবসময় ভীতিকর লেখা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকি।
প্রশ্ন:১৯৯৫ সালে আপনি বলেছিলেন যে আপনি ইন্টারনেট ব্যবহার করেন না। এখন করেন কি?
উত্তর:আমি খুব মেপে ইন্টারেনেট ব্যবহার করি। কিছু খোঁজার প্রয়োজন হলে নেটের সাহায্য নেই। কৌতূহল মেটাতে খুব বেশি হলে ১০ থেকে ১৫ মিনিট। নেশাখোরের মতো সারারাত এর পেছনে নষ্ট করি না। আমার মনে হয় অন্তত এব্যাপারে যদি সবাই আমার মতো হতো।

প্রশ্ন:গবেষণাগ্রন্থ, উপন্যাস নাকি ভালো কোন সংবাদপত্রের কলাম- কোনটা আপনার বেশি সন্তোষজনক মনে হয়?

উত্তর:কোন পার্থক্য নেই। কোন কাজে যুক্ত হলে আপনি সেই দায়িত্ব প্রচন্ড ইচ্ছা দিয়ে তা সম্পন্ন করতে পারেন। এই মুহূর্তে আমি খুব প্রায়োগিক একটা বিষয় নিয়ে লিখছি। দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো যে, এক্ষেত্রে আমি কিছু উদ্ভাবন করতে পারবোনা। পুরোপুরি সত্যি না লিখলেও গ্রহণযোগ্য কিছু একটাই আমাকে লিখতে হবে। (হাসি)
প্রশ্ন: দি নেইম অব দি রোজ বইটাতে যিশু হেসেছিল কিনা সে বিষয়ে বেশ গুরুগম্ভীর আলোচনা আছে। আপনি কি মনে করেন, ঈশ্বরের রসবোধ আছে?

উত্তর:মানুষের সবচেয়ে অদ্ভুত আর অসাধারণ সম্পদ কি? যদিও হয়তো খুব একটা মজার জ্ঞান নয়, কিন্তু অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এক জ্ঞান যে আমরা একদিন মরবো। এবং আমার ধারণা যেহেতু আমরাই একমাত্র জানি যে আমাদের মরতেই হবে, সেহেতু হাসি দিয়ে প্রতিক্রিয়াও কেবল আমরাই দেখাই। সেই অর্থে, ঈশ্বর যদি থেকেও থাকে, তাঁর হাসির প্রয়োজন হবে না। কিংবা হয়তো তিনি মুচকি হাসবেন।

সৌজন্যে: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম