বাংলা ফন্ট

চার বিচারকের প্রকাশ্য বিদ্রোহ: 'গণতন্ত্র হুমকির মুখে'

13-01-2018
নিজস্ব প্রতিবেদক ঢাকারিপোর্টটোয়েন্টিফোর.কম

 চার বিচারকের প্রকাশ্য বিদ্রোহ: 'গণতন্ত্র হুমকির মুখে'
ঢাকা: ভারতের সুপ্রিম কোর্টের চার জন বিচারক প্রকাশ্যে সংবাদ সম্মেলন করে প্রধান বিচারপতির কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করে বলেছেন, যেভাবে তিনি আদালত চালাচ্ছেন তা ভারতের গণতন্ত্রকেই হুমকির মুখে ফেলে দেবে।

সুপ্রিম কোর্টের বিচারকরা এভাবে প্রকাশ্যে সংবাদ সম্মেলন করে প্রধান বিচারপতির কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করা ভারতীয় বিচার বিভাগের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা।

সংবাদ সম্মেলনে এই বিচারকরা বলেছেন, ভারতের প্রধান বিচারপতি এখন তার ব্যক্তিগত মর্জিমাফিক বিভিন্ন বেঞ্চে মামলা পাঠাচ্ছেন। এটি আদালতের নিয়মকানুনের লংঘন।

তারা আরও বলেছেন, আদালতের নিয়ম-কানুন যদি মানা না হয় তাহলে ভারতে গণতন্ত্র টিকবে না।

যেভাবে সুপ্রিম কোর্টের মতো একটি প্রতিষ্ঠান চলা উচিত, তা হচ্ছে না বলে মন্তব্য করেছেন ওই চারজন বিচারপতি।

"আজ থেকে ২০ বছর পরে যেন কেউ না বলতে পারে যে আমরা আমাদের আত্মা বিক্রি করে দিয়েছিলাম," বলেছেন তারা।

বিচারপতি জে চেলামেশ্বর, বিচারপতি রঞ্জন গগই, বিচারপতি মদন বি লকুর এবং বিচারপতি কুরিয়ান যোশেফ সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, "গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলি যেভাবে বিভিন্ন বিচারপতিদের বেঞ্চে শুনানীর জন্য পাঠানো হচ্ছে, তা প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থা বা কনভেনশনের বিরোধী।"

হাইকোর্ট বা সুপ্রীম কোর্টের বিচারপতিরা কখনই সংবাদমাধ্যমের সামনে মুখ খোলেন না নিজেদের নিরপেক্ষতা বজায় রাখার জন্য।

কিন্তু এই চারজন বিচারপতির মতে, "গত কয়েকমাস ধরে যা হচ্ছে, তাতে একটা অভূতপূর্ব পরিস্থিতি তৈরী হয়েছে। যেভাবে সুপ্রীম কোর্ট চলা উচিত, তা হচ্ছে না। আমরা প্রধান বিচারপতির কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছিলাম, এমন কি আজ সকালেও তাঁর সঙ্গে দেখা করে তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করেছি। কিন্তু সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। সেজন্যই জাতির কাছে গোটা বিষয়টি তুলে ধরতে বাধ্য হচ্ছি আমরা।"

প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে কি তাহলে এবার 'ইম্পিচমেন্টের' প্রক্রিয়া শুরু হবে - এই প্রশ্নের জবাবে ভারতের দ্বিতীয় সব থেকে সিনিয়র বিচারক চেলামেশ্বর বলেন, "সেটা জাতিকেই ঠিক করতে হবে। আমরা কিছু বলছি না সেব্যাপারে।"

ওই সংবাদ সম্মেলনেই একটি সাত পাতার চিঠিও বিতরণ করেন বিচারপতিরা, যেটা মাস দুয়েক আগে এই চার বিচারপতি প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্রর কাছে পাঠিয়েছিলেন।

সেখানে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন ওই চার বিচারপতি, যে কীভাবে অতি গুরুত্বপূর্ণ কতগুলি মামলা - যেগুলি দেশের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সেগুলিকে কোনও সঙ্গত কারণ ছাড়াই নির্দিষ্ট কয়েকটি বেঞ্চের কাছে পাঠানো হচ্ছে।

"এটা শুধুমাত্র প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থা, যে প্রধান বিচারপতি কোনও মামলা কোন বিচারপতির কাছে বা কোন বেঞ্চে পাঠাবেন। এই ব্যবস্থা সুষ্ঠু বিচার ব্যবস্থার জন্য গড়ে উঠেছে। কিন্ত এর মাধ্যমে এটা প্রতিষ্ঠিত হয় না যে প্রধান বিচারপতি অন্য বিচারকদের থেকে উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত। প্রধান বিচারপতি হলেন ফার্স্ট এমং ইকুয়ালস্," লিখেছেন ওই চার বিচারপতি।

ওই চিঠিতে যদিও লেখা হয়েছে যে কোন কোন মামলার ক্ষেত্রে এরকম হয়েছে, সেটা তারা উল্লেখ করতে চান না, যাতে সুপ্রীম কোর্টের মতো একটা প্রতিষ্ঠান আরও বিড়ম্বনায় পড়ে।

কিন্তু সংবাদ সম্মেলনেই অন্যতম সিনিয়র বিচারপতি রঞ্জন গগইকে সাংবাদিকরা যখন প্রশ্ন করেন যে কোন মামলার প্রেক্ষিতে এই পরিস্থিতি তৈরী হল? সেটি কি বিচারপতি লয়া-র অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা সংক্রান্ত?

বিচারপতি গগই উত্তর দেন, "হ্যা"।

বিচারপতি লয়া নামে মহারাষ্ট্রের একটি বিশেষ আদালতে বিচারক ২০১৬ সালে অস্বাভাবিক ভাবে মারা যান। তাঁর আদালতেই চলছিল সোহরাবুদ্দিন ভুয়ো এনকাউন্টার মামলা।

গুজরাতে সোহরাবুদ্দিন নামে এক মুসলমনাকে গুলি করে হত্যা করে সেটিকে এনকাউন্টার বলে চালানো হয়েছিল।

বহুল আলোচিত ওই মামলাটিতে এর আগে একাধিক সিনিয়র পুলিশ আধিকারিকের এবং ভারতীয় জনতা পার্টির প্রেসিডেন্ট অমিত শাহ-র জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। ওই মামলায় অমিত শাহ-র ব্যক্তিগত হাজিরা দেওয়ার আগেই অস্বাভাবিক ভাবে মারা যান বিচারক।

সম্প্রতি একটি সংবাদ ম্যাগাজিন ওই ঘটনার বিস্তারিত তদন্তমূলক প্রতিবেদন বার করেছে। তা নিয়েই সুপ্রীম কোর্টেও মামলা হয়েছে।

সেই মামলাটি কোন বেঞ্চে পাঠানো হবে, তা নিয়েই প্রধান বিচারপতির সিদ্ধান্তের সঙ্গে এক মত হতে পারেন নি এই চার বিচারক।

কয়েক মাস আগে একটি হাইকোর্টের বিচারপতির বিরুদ্ধে দুর্নীতিতে জড়িত থাকার অভিযোগ সংক্রান্ত একটি মামলাকে ঘিরেও দ্বন্দ্ব বেঁধেছিল বিচারপতিদের সঙ্গে প্রধান বিচারপতির। কিন্তু তখন বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে নি, যদিও তা নিয়ে গণমাধ্যমে বিতর্ক হয়েছিল।

বিচারপতিদের প্রকাশ্যে মুখ খোলার পরেই প্রধানমন্ত্রী তার আইন মন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করেছেন। সূত্র উল্লেখ করে ভারতের জাতীয় সংবাদমাধ্যমগুলি বলছে, সরকারের এটাই মনোভাব যে, তারা বিচার ব্যবস্থার অভ্যন্তরীন বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে চায় না।

ভারতের প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্রর কাছ থেকে এখনও কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায় নি।

ঢাকারিপোর্টটোয়েন্টিফোর.কম/এইএমএল


সর্বশেষ সংবাদ