বাংলা ফন্ট

ইংল্যাণ্ডে বাংলাদেশি খাবার জনপ্রিয় করেছিলেন নুর

08-01-2018
নিজস্ব প্রতিবেদক ঢাকারিপোর্টটোয়েন্টিফোর.কম

 ইংল্যাণ্ডে বাংলাদেশি খাবার জনপ্রিয় করেছিলেন নুর
ঢাকা: ইংল্যাণ্ডে ভারতীয় উপমহাদেশের খাবার এখন খুবই জনপ্রিয়। কিন্তু একটা সময় ছিল যখন ব্রিটেনের মানুষের কাছ কারি বা মসলাযুক্ত খাবার ছিল সম্পূর্ণ অপরিচিত।

১৯৫০এর দশকে ইংরেজদের রসনায় কারিকে জনপ্রিয় করতে রীতিমত বেগ পেতে হয়েছিল সেসময় যারা দক্ষিণ এশীয় রেস্তোঁরা ব্যবসা চালু করেছিলেন।

বাংলাদেশি নুর জামান খান তার রেস্তোঁরা ব্যবসা শুরু করেছিলেন মধ্য ইংল্যাণ্ডে বা মিডল্যাণ্ডসে।

ইংল্যাণ্ডের মিডল্যাণ্ডস এলাকায় প্রচুর ব্রিটিশ বাংলাদেশি এখন কারি রেস্তাঁরার রমরমা ব্যবসা করছেন। এসব কারি রেস্তোঁরা ইংল্যাণ্ডে পরিচিত ভারতীয় রেস্তোঁরা নামে।

১৯৫০এর দশকের গোড়ায় শুরু হয়েছিল এই কারি ব্যবসা।

যুদ্ধোত্তর ব্রিটেনে মসলাযুক্ত খাবারের কোন চল না থাকলেও দক্ষিণ এশিয়া থেকে সেসময় অভিবাসীদের আগমন সেই চালচিত্র বদলে দেয়।

নুর জামান খান এসেছিলেন বাংলাদশ থেকে ১৯৫৭ সালের গ্রীষ্মে। তার বয়স তখন তার হিসাবে বোধহয় ১৮ কি ১৯। হিথরো বিমানবন্দরে নেমে তিনি পাড়ি জমান ইংল্যাণ্ডের দ্বিতীয় সবচেয়ে বড় শহর মিডল্যাণ্ডসের বার্মিংহাম শহরে।

সেখানে তার গ্রামের একজন পরিচিত থাকতেন। তাছাড়া তার একজন আত্মীয়ও ছিলেন ওই শহরে। কিন্তু প্রথম যাত্রাটাও ছিল তার জন্য কঠিন। প্রথম ধাক্কা এসেছিল ভাষা নিয়ে।

"আমি যখন দেশে ছিলাম, আমি ভালই ইংরেজি বলতাম। আমার নিজের মত করে। কিন্তু ইংল্যাণ্ডে আসার পর দেখলাম আমার কথা কারোকে বোঝাতে পারছি না। আমি কলেজে পড়েছি,ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে গেছি। কিন্তু আমরা যে অ্যাকসেন্টে ইংরেজি বলতাম তার সঙ্গে ইংল্যাণ্ডের অ্যাকসেন্টের অনেক তফাৎ। ফলে আমার কথা কেউ বুঝছিল না। যেটা বিরাট একটা সমস্যা হয়ে দাঁড়াল।"

কাজেই তিনি বামিংহাম যেতে চান একথাটা কাগজে লিখে মানুষকে বোঝাতে হয়েছিল।

বার্মিংহাম ছিল ১৯৫০এর দশকে ব্রিটেনে ব্যবসা-বাণিজ্যের একটা প্রাণকেন্দ্র। শহরে তখন একের পর এক গড়ে উঠছে নানা ধরনের শিল্প কলকারখানা, সেইসঙ্গে মোটরগাড়ি তৈরির কারখানাও।

খান কাজ পান এরকম এক কারখানায় এবং এক বছরের মধ্যে পুঁজি জোগাড় করে ফেলেন নতুন এক উদ্যোগে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য।

ভারতীয় রেস্তোঁরা ব্যবসা তখন বার্মিংহাম ও তার পাশের উলভারহ্যাম্পটন শহরের জন্য ছিল আনকোরা নতুন এক শিল্প।

"আমার একজন বন্ধুর আত্মীয় সেখানে নতুন একটা রেস্তোঁরা খোলার জন্য উদ্যোগ নিচ্ছিলেন। উনি আমাকে ডাকলেন। সেটা ছিল মধ্য ইংল্যাণ্ডের উলভারহ্যাম্পটন শহরের প্রথম ভারতীয় রেস্তোঁরা - কোহিনূর।"

কোহিনূর নুর জামানের জন্য নিয়ে এসেছিল ভাল ব্যবসা। তার প্রথম বিনিয়োগ থেকে তিনি ভাল অঙ্কের লাভের মুখ দেখেছিলেন। কিন্তু কাজটা মোটেই সহজ ছিল না।

"খদ্দেরদের জোর করে রেস্তোঁরায় আনতে হতো, প্রথম দিকে খাবারের মেন্যুতে ইংরেজদের পছন্দের খাবার রাখতে হতো।"

"আমাদের মেন্যুতে থাকত ডিমের ওমলেট, রোস্ট চিকেন, মুরগী বা ভেড়ার লিভার বা কলিজা এসব। আলু ভাজা বা চিপস্ও রাখতাম মেন্যুতে। আলুভাজা খুব জনপ্রিয় ছিল। বেশিরভাগ লোক খেত আলুভাজা আর কারি। ভাত বিক্রি করা কঠিন ছিল। লোকে ভাত খেতে চাইত না।"

খান চেষ্টা করতেন কীভাবে খদ্দেরদের নতুন নতুন খাবারের স্বাদ নিতে শেখাবেন।

"প্রথম প্রথম আমরা তাদের জন্য হালকা মসলাযুক্ত খাবার দিয়ে শুরু করতাম। তারপর ধীরে ধীরে মসলার পরিমাণ বাড়াতাম এবং নতুন ও ভিন্ন স্বাদের মসলা দিয়ে রান্না খাবার তাদের চেষ্টা করতে বলতাম। তারা জানতে কৌতূহলী ছিল আমরা কী খাই। আমরা বলতাম এগুলোই আমাদের খাদ্য। তবে তাদের বলতাম বাংলাদেশিরা খুব মাছ ভালবাসে। কিন্তু আমাদের মেন্যুতে মাছ বলতে ছিল শুধু চিংড়িমাছ।"

খান বলছিলেন তখন বাংলাদেশি মাছ ইংল্যাণ্ডে পাওয়া যেত না। এখন তো বাজারে বাংলাদেশের অনেকধরনের মাছ পাওয়া যায়। তখন যেত না। তখন দেশীয় কোন সব্জিও পাওয়া যেত না- যেমন ঢ্যাঁড়শ, বেগুন, এমনকী ধনেপাতাও পাওয়া যেত না। তবে বাংলাদেশি মসলাপাতি পাওয়া যেত।

আসলে ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন মসলা অনেক আগে থেকেই - অষ্টাদশ শতাব্দী থেকেই ব্রিটিশদের রান্নায় ব্যবহৃত হয়ে এসেছে।

১৭৪৭ সালে হ্যানা গ্লাস ও আরো পরে মিসেস বিথাম নামে দুই রান্না বিশারদের লেখা রান্নার বইয়ে বিভিন্ন রন্ধনপ্রণালীতে এইসব মসলা ব্যবহারের উল্লেখ পাওয়া যায়।

নথিপত্র অনুযায়ী ইংল্যাণ্ডে প্রথম ভারতীয় রেস্তোঁরা খুলেছিলেন দীন মহম্মদ - লন্ডনে - যার নাম ছিল হিন্দুস্তানী কফি হাউস। ১৮১০ সালে ওই রেস্তোঁরার প্রথম বিজ্ঞাপন বের হয়। কিন্তু দুবছর পরই ওই রেস্তোঁরা দেউলিয়া হয়ে যায়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দক্ষিণ এশিয়া থেকে যেসব অভিবাসী ব্রিটেনে বসতি গাড়তে এসেছিলেন, তাদের কারণে সেসময় কারি রেস্তাঁরার জনপ্রিয়তা বাড়ছিল।

নুর জামান খান সেসময় উলভারহ্যাম্পটনের রেস্তাঁরায় তার শেয়ার বেচে দিয়ে চলে যান বার্মিংহামে। সেখানে তখন কয়েকটি ভারতীয় রেস্তোঁরা খুলেছে।

"আমি বম্বে রেস্টুরেন্টের কথা জানতাম- মালিক ছিলেন আবদুল সামাদ। আমার ভাল বন্ধু ছিলেন। কিন্তু তার ব্যবসা তখন তেমন জমে ওঠেনি।"

তারই রেস্টুরেন্টে ম্যানেজার হিসাবে যোগ দিয়েছিলেন খান।

সামাদের ছেলে অ্যান্টনি উদ্দিন বলছেন, বার্মিংহামে বম্বে রেস্টুরেন্টের মালিক ছিলেন তার আব্বাও এসেছিলেন বাংলাদেশ থেকে।

"মার্চেন্ট নেভিতে কাজ করতেন তিনি, তার শখ ছিল একটা রেস্টুরেন্ট খুলবেন। কীভাবে ওই রেস্টুরেন্ট সাজাবেন, সে ব্যাপারে তার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছিল। ছাদ থেকে তিনি ঝাড়বাতি ঝুলিয়েছিলেন। খুবই জমকালো আর অভিজাত একটা চেহারা দিয়েছিলেন তার রেস্টুরেন্টের।"

নুর জামান খান বম্বে রেস্তোঁরা পরিচালনায় একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন।

"বম্বে রেস্টুরেন্টে দেখতাম যারা খেতে আসছে তারা আসছে পরিবার নিয়ে। তারা বলতো আমরা ভারতে গেছি। এদের অনেকেই ভারতে কাজের সূত্রে থেকেছেন। ভারতীয় খাবার আগে খেয়েছেন। আমাদের বেশিরভাগ বড় খদ্দের ছিল এই শ্রেণির। এছাড়া খদ্দের আসত পানশালা থেকে। তরুণ-যারা পাবে মদ খেয়ে রেস্টুরেন্টে আসত কারি আর চিপস খেতে।"

নুর জামান খান আর আবদুল সামাদ দুজনের যৌথ উদ্যোগে খুবই সফল হয়ে ওঠে বম্বে রেস্তোঁরা।

"সামাদের নজর সবসময় ছিল নতুনত্বের দিকে," বলছিলেন অ্যান্টনি।

"রেস্তোঁরায় খাবার জন্য অপেক্ষা করার সময় বারে পানের জন্য আলাদা জায়গা তৈরি করেছিলেন তিনি। এমনকী রেস্তোঁরায় সামনাসামনি গানবাজনা শোনার ব্যবস্থাও তিনি চালু করেছিলেন। তবে যে ব্যাপারে তারা ছিলেন পথিকৃৎ - সেটা ছিল তন্দুর উনুন বসানো। তাদের রেস্তোঁরাই মধ্য ইংল্যাণ্ডের প্রথম তন্দুর উনুন নিয়ে আসেন।"

এরপর তন্দুরি রান্নার কায়দা শেখার জন্য তারা রীতিমত শুরু করেন ওই শিল্পে গোয়েন্দাগিরি।

অ্যান্টনি বলছেন তারা কীভাবে লন্ডন থেকে একজন বিশেষ শেফকে নিয়ে আসেন যে জানত কীভাবে তন্দুর উনানে রান্নার জন্য মাংসে মাখানোর মসলা তৈরি করতে হয়।

"ওই মসলার সসটাই ছিল আসল। ওই সসে কী দেয়া হবে তার ওপরই নির্ভর করত এই ডিসের সাফল্য। ওই শেফ কিচেনের ভাঁড়ারে ঢুকত গোপনে- তারপর দরোজা বন্ধ করে দিয়ে মসলার সসটা বানাত। যেদিন ওই বিশেষ শেফ আসত, আমরা কৌশলে সেখানে গোপনে আরেকজনকে ঢুকিয়ে লুকিয়ে রাখতাম। ওই শেফ যখন সস বানাত তখন আমাদের লোক দেখে নিত কীভাবে সস বানানো হচ্ছে। ঐ শেফ জানতে পারতো না আমাদের লোক কোথায় আছে। এভাবেই তন্দুরি বানানোর মসলা আমরা শিখে নিয়েছিলাম।"

নুর জামান খানের উদ্যোগে গুড ফুড গাইড নামে ব্রিটেনের ভাল রেস্তোঁরার নির্দেশিকায় বম্বে রেস্টুরেন্টের নাম ওঠে।

"আমার মনে আছে বম্বে রেস্টুরেন্টের সুদিনগুলোর কথা, যখন রেস্টুরেন্টের বাইরে বিশ তিরিশজন লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত।"

অ্যান্টনি উদ্দিনের বাবা আবদুল সামাদ বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার আগে পর্যন্ত তার বম্বে রেস্টুরেন্ট চালু রেখেছিলেন।

১৯৯০ সালের পয়লা জানুয়ারি তিনি বাংলাদেশে মারা যান।

নুর জামান খান আগামী বছর আশিতে পা দেবেন। এখনও তিনি থাকেন মধ্য ইংল্যাণ্ডে।

সম্প্রতি বার্মিংহামে চিত্রশিল্পী মোহম্মদ আলির উদ্যোগে আয়োজিত 'নাইটস অফ দ্য রাজ' প্রদর্শনীতে কারি শিল্পের পথিকৃৎদের নানা কাহিনি তুলে ধরা হয়।

ঢাকারিপোর্টটোয়েন্টিফোর.কম/এইএমএল


সর্বশেষ সংবাদ