বাংলা ফন্ট

ঢাকার আদলে কোলকাতাতেও হবে মঙ্গল শোভাযাত্রা

15-04-2017
নিজস্ব প্রতিবেদক ঢাকারিপোর্টটোয়েন্টিফোর.কম

 ঢাকার আদলে কোলকাতাতেও হবে মঙ্গল শোভাযাত্রা

ঢাকা: পয়লা বৈশাখে বর্ষবরণের দিন যে মঙ্গল শোভাযাত্রা বাংলাদেশে হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে, এবার কলকাতাতেও তা শুরু হচ্ছে। শনিবার ভোরবেলায় দক্ষিণ কলকাতায় হবে এই মঙ্গল শোভাযাত্রা। গ্রাম বাংলার লোকজ সংস্কৃতিকে তুলে ধরতে মুখোশ, ঘোড়া, কুলোয় আঁকা আল্পনা তৈরিতে সাহায্য করতে ঢাকার বেশ কয়েকজন শিল্পী এখন কলকাতায়। সঙ্গে আছেন স্থানীয় ছাত্রছাত্রীরাও।

যদিও কলকাতায় বর্ষবরণের অন্য একটি শোভাযাত্রা দীর্ঘ দিন ধরেই হয়ে আসছে, কিন্তু বাংলাদেশের আদলে মঙ্গল শোভাযাত্রা কলকাতায় এই প্রথম।

দক্ষিণ কলকাতার একটি পরিত্যক্ত কারখানায় শনিবার দুপুরে চলছিল তারই চূড়ান্ত প্রস্তুতি। কোথাও প্রকাণ্ড এক ঘোড়ার গায়ে রঙ দেওয়া চলছে, কোথাও বিরাট বড় এক প্যাঁচার মুখ রাখা, কোথাও আবার বাঘের মুখের ভেতরে হাত দিয়ে দিয়েছেন একজন।

ওই কারখানাটির কাছ থেকেই প্রথমবারের মতো কলকাতায় মঙ্গল শোভাযাত্রা বেরবে, যেভাবে ঢাকা সহ বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় বাঘ, প্যাঁচার মুখোশ, কুলোয় দেওয়া আল্পনা নিয়ে মিছিল হয়, এবার কলকাতাতেও সেরকমই হবে।

যদিও বর্ষবরণের অন্য একটি শোভাযাত্রা দীর্ঘদিন ধরেই হয়ে আসছে মধ্য কলকাতায় শহরের সাংস্কৃতিক প্রাণকেন্দ্রে।

কেন ঢাকার আদলে কলকাতাতে এই মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন? জানতে চেয়েছিলাম শোভাযাত্রার অন্যতম মূল সংগঠক শিবাশিস দত্তের কাছে।

"পশ্চিমবঙ্গের বাঙালীদের একটা রাজনৈতিক সমাজ আছে, কিন্তু সাংস্কৃতিক সমাজ সেই অর্থে নেই। সাংস্কৃতিক ভাবে বেশ কিছু বছর ধরেই আমরা যেন কিছুটা উদাস। এই যে নববর্ষ হয়, সালটা কত, সেটাও অনেকে বলতে পারে না। এটা অন্যমনস্কতা তো বটেই, কিছুটা লজ্জাজনকও। আমরা চাইছি যা কিছু অশুভ, তার বিরুদ্ধে শুভকে নিয়ে আসা, দেখানো লোকসংস্কৃতিকে তুলে ধরা," বলছিলেন মি. দত্ত।

মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজনে সাহায্য করতে কলকাতায় এসেছেন ঢাকার শিল্পী শহির আহমেদ মিঠু। তাঁর কথায়, "এখানে যেহেতু প্রথম আয়োজন হচ্ছে, এঁরা চেয়েছিলেন আমরা যারা ঢাকায় প্রথম শুরু করেছিলাম মঙ্গল শোভাযাত্রা, তাদের মধ্যে কয়েকজন এসে এঁদের অনুপ্রেরণা দিই, কারিগরি সহায়তা দিই। সেজন্যই আসা। এছাড়াও কি উদ্দেশ্য নিয়ে আমরা মঙ্গল শোভাযাত্রা শুরু করেছিলাম, সেটা কলকাতার মানুষদের সঙ্গে শেয়ার করার জন্যও আসা।"

বাংলাদেশ থেকে আসা আরেক শিল্পী তরুণ ঘোষের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, তাঁর দেশে যেভাবে লোকজ শিল্প দিয়ে বর্ষবরণের উৎসব পালন করা হয়, কলকাতায় সেটার অভাব ছিল বলেই কি তাঁদের বাংলাদেশ থেকে আসতে হল? মি. ঘোষের জবাব ছিল, "হয়তো বা। তবে আরেকটি কারণও আছে। সবকিছুরই তো একটা অভিজ্ঞতার ব্যাপার থাকে। এত বড় একটা অনুষ্ঠান আমরা যারা ওখানে ম্যানেজ করেছি, কীভাবে করেছি আর কেন করেছি, সেটা জানানোও আমাদের আসার বড় কারণ। কেন মঙ্গল শোভাযাত্রা, সেটাই জানাতে এসেছি - যে লোক-ঐতিহ্যর সঙ্গে আমরা আর্থিকভাবে সম্পৃক্ত। ওই সম্পৃক্ততা শহরে কিছুটা অনুপস্থিত।"

ঢাকার শিল্পী এবং কলকাতার কারিগরদের সঙ্গে মঙ্গল শোভাযাত্রার জন্য প্রচুর মুখোশ বানাতে হাত লাগিয়েছিলেন কলকাতায় পাঠরত বাংলাদেশের ছাত্রছাত্রী কথা বলেছিলাম তাঁদের কয়েকজনের সঙ্গে।তাঁদের একজন বলছিলেন, বেশ কয়েকবছর ধরে কলকাতায় পড়াশোনা করছেন, কিন্তু পয়লা বৈশাখটা সেভাবে অনুভব করতে পারেন নি। অনেকদিন পরে দেশের আমেজটা ফিরে পাওয়া যাচ্ছে আজ।

আরেক বাংলাদেশী ছাত্রের কথায়, "কিছু কিছু উৎসব আছে, যেগুলো বাঙালী সংস্কৃতিকে ধরে রাখে সব জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে। এটা সেরকমই একটা দিন। অনেক আগে থেকেই এখানে এটা হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু এখন তো অন্তত শুরু হয়েছে, সেটাই ভাল লাগছে।"

কলকাতার এক ছাত্রীও কাজ করছিলেন মুখোশ বানানোর। তিনি বলছিলেন, "গত বছর পর্যন্তও তো পয়লা বৈশাখের দিন ঘুরতাম, খেতাম এসবই করতাম। জানতামই না যে এভাবেও পয়লা বৈশাখ পালন করা যায়।"

বাংলাদেশ থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশ নিতে এসেছেন শিল্পী আমিনুল ইসলাম আশিক। তিনি বলছিলেন, "ধর্মীয় উৎসব দুই বাংলায় অনেক আছে, কিন্তু বর্ষবরণটা হল ধর্ম নিরপেক্ষ একটা উৎসব। এটা এতদিন এখানে হয় নি, এবার শুরু হল। এটাই খুব ভাল উদ্যোগ।"

মঙ্গল শোভাযাত্রা নাম দিয়ে কলকাতায় এই প্রথম মিছিল হবে ঠিকই, কিন্তু শহরে অন্য যে মিছিলটি দীর্ঘদিন ধরে হয়ে আসছে, সেখানেও বাংলাদেশের কিছু শিল্পী এসে কর্মশালা করে গেছেন আগে। এবছরও স্থানীয় সংগঠকদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে মুখোশ তৈরি করতে এসেছিলেন কয়েকজন।

দুটি মিছিলের সংগঠকরাই সন্ধ্যে থেকে ঢাকার আদলে রাস্তায় আল্পনা দিতে শুরু করেছেন।

দেখা যাচ্ছে, কলকাতার বর্ষবরণ উৎসবে বাংলাদেশের শিল্পীদের অংশগ্রহণ আর বাংলাদেশের মতো করে দিনটি উদযাপন করার প্রচেষ্টা ক্রমশ বাড়ছে।

ঢাকারিপোর্টটোয়েন্টিফোর.কম/এইচএমএল

সর্বশেষ সংবাদ