বাংলা ফন্ট

সৌদি আরব থেকে নীরব যন্ত্রণা নিয়ে দেশে ফিরছেন নারী শ্রমিকরা

01-05-2018
নিজস্ব প্রতিবেদক ঢাকারিপোর্টটোয়েন্টিফোর.কম

 সৌদি আরব থেকে নীরব যন্ত্রণা নিয়ে দেশে ফিরছেন নারী শ্রমিকরা
ঢাকা: বছর দেড়েক আগে স্বামীর মৃত্যুতে সবকিছু বদলে যায় জামিলা বেগমের। তিন সন্তানের মধ্যে একজন নিরুদ্দেশ। সংসারের ভার নিতে হয় বাকি দুই সন্তানকে, রিকশা চালিয়ে। ঠিক সেই সময় দালালের খপ্পরে পড়েন সোনারগাঁর জামিলা বেগম। সচ্ছলতার স্বপ্নে পাড়ি জমান সৌদি আরবে। এ স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হতে সময় লাগেনি। সৌদি আরবে পা রাখার পাঁচ মাসের মাথায় স্বপ্নকে ফেলে নীরব যন্ত্রণা নিয়ে ফিরতে হয় তাকে।

মাসখানেক আগে শূন্যহাতে দেশে ফেরা জামিলা বেগম বলছিলেন, কাজ শুরু করার পর প্রথম মাসে বেতন পেয়েছিলাম ঠিকমতোই। পরের মাস থেকে বেতন বন্ধ হয়ে যায়। বেতনের কথা বললেই শুরু হতো নির্যাতন। এভাবে পাঁচ মাস চলার পর পালিয়ে আশ্রয় নিই দূতাবাসে। সেখানে দুই মাস থাকার পর দেশে ফিরেছি।

স্বাবলম্বী হওয়ার আশায় ১৮ মাসের শিশুকে বাড়িতে রেখে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন নরসিংদীর আফিয়া বেগম। তিন মাসের মাথায় ফিরতে হয় তাকেও। আফিয়া বেগমের ভাষায়, তিন মাসের মধ্যে পাঁচটি বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ পাই। নির্যাতন চলে সবখানেই। অসুস্থ হওয়ার পর চিকিৎসাটুকুও পাইনি। এ অবস্থায় দেশে ফেরা ছাড়া উপায় ছিল না।

পোশাককর্মী মোছা. রফিকা তার স্বপ্নপূরণের ঠিকানা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন জর্ডানকে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে পাড়ি জমান মধ্যপ্রাচ্যের দেশটিতে। পরের মাসেই কাজ পান সেখানকার একটি পোশাক কারখানায়। নভেম্বরে শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। অসুস্থ শরীর নিয়েই কাজ করতে হচ্ছিল রফিকাকে। শরীর আরো ভেঙে পড়লে দুই মাসের মজুরি ছাড়াই দেশে ফেরত পাঠানো হয় রফিকাকে। অসুস্থতা নিয়ে দেশে ফিরলেও আগের পোশাক কারখানায় আর ফেরা হয়নি তার।

এদের মতোই স্বপ্ন অপূর্ণ রেখে মধ্যপ্রাচ্য থেকে শূন্যহাতে ফিরতে হচ্ছে অনেককে। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরও শুধু সৌদি আরব ও ওমানের সেফ হোমে আশ্রয় শেষে ফিরতে হয়েছে ২ হাজার ৩০০ নারী শ্রমিককে। তার আগের বছর এ প্রক্রিয়ায় ফিরতে হয়েছিল ১ হাজার ৩৬২ জন নারী শ্রমিককে।

বাংলাদেশী নারী শ্রমিকদের বিদেশযাত্রা শুরু হয় ১৯৯১ সালে। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত বিভিন্ন দেশে পাড়ি দিয়েছেন মোট ৭ লাখ ২৪ হাজার ৬৩৬ জন নারী শ্রমিক। এর মধ্যে ৩১ দশমিক ২৩ শতাংশ গেছেন সৌদি আরবে। বাকিদের মধ্যে ১৭ দশমিক ৪৫ শতাংশ সংযুক্ত আরব আমিরাতে, ১৮ দশমিক ২৩ জর্ডান, ১৪ দশমিক ৪৪ লেবানন ও ৯ দশমিক ২৮ শতাংশ পাড়ি দিয়েছেন ওমানে।

জর্ডান ও লেবাননে পোশাক কারখানায় কাজ করলেও বাকি দেশগুলোয় এখনো গৃহকর্মী হিসেবেই পাড়ি দিচ্ছেন বাংলাদেশী নারীরা। এর বড় অংশকে আবার অল্প দিনের মধ্যেই খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে। নির্যাতনের কারণে গত মার্চে সৌদি আরব থেকে ফিরে আসেন বরিশালের আমেনা বেগম। তিনি বলেন, যাওয়ার আগে আমাকে বলা হয়েছিল, গৃহকর্মী হিসেবে অল্প কিছু কাজ করতে হবে। এজন্য ভালো বেতনও মিলবে। কিন্তু বিদেশে যাওয়ার পর গৃহকর্তার বাড়িতে নির্যাতিত হয়েছি। ভাগ্য ভালো যে, দূতাবাসের মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত দেশে ফিরতে পেরেছি।

নির্যাতনের কারণে ফিরতে চাইলেও অনেকের ক্ষেত্রেই সুযোগটি জোটে না। নিয়োগকর্তা অপারগতা প্রকাশ করে। আবার দেশে ফেরার মতো অর্থও তাদের কাছে থাকে না। দেশে ফেরত আনার খরচ বহন করে কল্যাণ বোর্ড। প্রতি অর্থবছরে নারী কর্মী দেশে ফেরত আনার জন্য বিদেশের বাংলাদেশ মিশনে বোর্ড থেকে অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয়।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব (ভারপ্রাপ্ত) ড. নমিতা হালদার এনডিসি বণিক বার্তাকে বলেন, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের যেসব দেশে আমাদের নারী কর্মীরা রয়েছেন, তাদের সুরক্ষার জন্য মন্ত্রণালয় কাজ করছে। নারী কর্মীদের বিভিন্ন সমস্যার কথা জানিয়ে তাদের স্বজনরা মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ জমা দিলে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়। দূতাবাসগুলোর লেবার উইংয়ে মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি দেয়া হয়। তারা সমস্যার সমাধানে কাজ করে।

সৌদি আরবের দূতাবাসের শেল্টার হোমে পালিয়ে এসে আশ্রয় গ্রহণকারীর অধিকাংশের কাছেই পাসপোর্টসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র থাকে না জানিয়ে তিনি বলেন, এ কারণে তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া একটু জটিল। আইনি জটিলতা মোকাবেলার পর এক্সিট পাস সংগ্রহ করেই তাদের দেশে নিয়ে আসতে হয়। লেবার উইংগুলো এ নিয়ে প্রতিনিয়ত কাজ করছে।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদেশে অবস্থানরত নারী কর্মীদের বড় অংশকেই নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হচ্ছে। শারীরিক নির্যাতন, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পারা, কর্মঘণ্টা বেশি, ফোন ব্যবহারের সুযোগ না থাকা এর মধ্যে অন্যতম। তবে লেবার অ্যাটাশেসহ বিভিন্ন দূতাবাসের কর্মকর্তারা নারী অভিবাসীদের বিষয়ে আরো বেশি সংবেদনশীল হলে নিরাপত্তা ও কাজের সুরক্ষা বাড়বে।

তার পরও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নারী শ্রমিক বিভিন্ন দেশে পাড়ি দিচ্ছেন। বিএমইটির হিসাবে, চলতি বছর প্রথম তিন মাসেও সৌদি আরবে পাড়ি দিয়েছেন ২১ হাজার ৬১০ জন নারী শ্রমিক। এছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাতে গেছেন ৪৭৭, ওমানে ২ হাজার ৬৭৯, কাতারে ৮৭২, জর্ডানে ২ হাজার ২৬১ ও লেবাননে ৪৩৭ জন। ২০১৭ সালে এ সংখ্যা ছিল সৌদি আরবে ৮৩ হাজার ৩৫৪, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৩ হাজার ২৭২, ওমানে ৯ হাজার ১৯৯, কাতারে ৩ হাজার ২০৯, জর্ডানে ১৯ হাজার ৮৭২ ও লেবাননে ১ হাজার ৬৪২।

ঢাকারিপোর্টটোয়েন্টিফোর.কম/এইএমএল

সর্বশেষ সংবাদ