বাংলা ফন্ট

ভারতে অবিরাম উদ্ভাবনে মেতে আছেন যে ব্যক্তি

08-11-2017
নিজস্ব প্রতিবেদক ঢাকারিপোর্টটোয়েন্টিফোর.কম

 ভারতে অবিরাম উদ্ভাবনে মেতে আছেন যে ব্যক্তি
ঢাকা: "সমস্যার সমাধান করতে আমি ভালবাসি," বলছেন উদ্ধব ভারালি।

"মানুষের জীবনকে আরেকটু সহজ করতে আমার ভাল লাগে, যাতে করে তারা নিজেরা আরও একটু স্বাধীন হতে পারে।"

এই তাড়না থেকেই উদ্ধব ভারালি নতুন নতুন উদ্ভাবন করে চলেছেন। তিরিশ বছরেরও বেশি আগে পরিবারের বিশাল দেনা শোধ করার জন্য তিনি নানা জিনিস তৈরি শুরু করেন। এখন এটা তার জীবনের একটা নেশা।

১৪০টির বেশি নতুন জিনিস তিনি উদ্ভাবন করেছেন। এর বেশিরভাগ বাজারে বিক্রি হচ্ছে। কোনো কোনোটির জন্য তিনি আন্তর্জাতিক পুরস্কারও পেয়েছেন।

তিনি বলেন তার প্রেরণা একটাই- তিনি মানুষকে সাহায্য করতে চান। ভারতে কৃষিক্ষেত্রে নানা উদ্ভাবনের জন্য তিনি ইতিমধ্যেই সুপরিচিত একটি নাম। কিন্তু তার নতুন কাজ এখন প্রতিবন্ধীদেরও সহায়তা করছে।

ভিরালি বলছেন ভারতে শারীরিক প্রতিবন্ধীদের জন্য সরকারি সাহায্য খুবই সীমিত। কাজেই সমস্যার সমাধান খুঁজতে তার মত লোকেদেরই এগিয়ে আসতে হয়।

রাজ রেহমানের বয়স ১৫। জন্মগত ভাবে সে প্রত্যঙ্গ-বিহীন এবং মস্তিষ্কের কিছু অস্বাভাবিকতার ফলে সে জন্মেছে সেরিব্রাল পলসি রোগ নিয়ে।

তার জন্য মি: ভারালি খুব সাদাসিধে একটি যন্ত্র উদ্ভাবন করেছেন যা তার বাহুতে বাঁধা থাকে। দৈনন্দিন কাজে ব্যবহৃত ভেলক্রোর মত বিশেষ ফিতা এবং একটা চামচ এই যন্ত্রের উপকরণ। এই যন্ত্র রাজকে খেতে আর লিখতে সাহায্য করে।

ভারালি তার জন্য বিশেষ ধরনের জুতাও তৈরি করেছেন যার ফলে চলাফেরা করা রাজের জন্য আরও সহজ হয়েছে।

"আগে সবসময় নিজেকে নিয়ে আমি চিন্তায় থাকতাম, কিন্তু এখন আমি দুশ্চিন্তা-মুক্ত। স্কুলে যাবার জন্য রেললাইন কিভাবে পার হবো তা নিয়ে আগে দুশ্চিন্তা করতাম। এখন তা করতে হয় না কারণ এখন বিনা অসুবিধায় আমি হাঁটতে পারি," বলছেন রাজ।

"আমি খুব খুশি যে আমি নিজেই নিজের দেখাশোনা করতে পারি।"

মানুষের সৃজনশীলতা
ভারালির মনে আছে প্রথমদিকে লোকে মনে করত তিনি ''কোন কাজের নন'' কিন্তু তিনি যে একজন ''প্রথম সারির উদ্ভাবক'' তা প্রমাণ করতে তার ১৮ বছর লেগেছে।

তার বেশিরভাগ উদ্ভাবনের পেছনে খরচ হয় কম এবং তিনি কাঁচামাল হিসাবে ব্যবহার করেন স্থানীয়ভাবে প্রাপ্য জিনিসপত্র।


কম খরচে সহজলভ্য এধরনের উদ্ভাবনকে হিন্দিতে বলে "জুগাড়" যার অর্থ "বুদ্ধি খাটিয়ে সহজ সমাধান বের করা"

কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের জাজ বিজনেস স্কুলের জয়দীপ প্রভু জুগাড় নিয়ে একটি বই লিখেছেন।

তিনি মনে করেন মানুষকে নতুন সমাধান উদ্ভাবন করার ক্ষেত্রে এটার একটা বড় ভূমিকা আছে।

"কারণ এখানে মানুষের সহজাত সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা ছাড়া আর কিছুর প্রয়োজন হয়না।"

"এখানে বিষয়টা হল আপনার সম্প্রদায়ের মধ্যে সমস্যার বিষয়গুলো চিহ্নিত করা, যে সমস্যা আপনার এবং আপনার মত আর পাঁচটা মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলছে। এবং তারপর হাতের কাছে যা আছে তাই দিয়ে সেই সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা," বলছেন মি: প্রভু।

ভারালি তার উদ্ভাবিত জিনিস বেচে অর্থ উপার্জন করেন। তিনি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এবং সরকারের কাছেও তার কারিগরি দক্ষতা বিক্রি করে অর্থ রোজগার করেন।

তবে অন্যদের অর্থ উপার্জনে সাহায্য করতেও তিনি আগ্রহী, যাতে অন্যরা তাদের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি ঘটাতে পারে। তার যন্ত্রপাতি অন্যরা যাতে ব্যবহার করতে পারে তার জন্য তিনি দুটো কেন্দ্র তৈরি করেছেন।

স্থানীয় গ্রামগুলো থেকে মেয়েরা এরকম একটি কেন্দ্রে এসে তার ডিজাইন করা চাল গুঁড়ানোর যন্ত্র ব্যবহার করতে পারেন। এই চালের গুঁড়া দিয়ে পিঠা বা অন্যান্য খাবার বানিয়ে তারা বাজারে সেগুলো বিক্রি করেন।

সহজ কোন পথ নেই

বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী ভারতে ১৫র বেশি বয়সী মেয়েদের মাত্র শতকরা ২৭ ভাগ অর্থনৈতিকভাবে সক্রিয়।

"গ্রামে আমাদের জন্য চাকরি বাকরি জীবিকা নির্বাহের কোন উপায় নেই," বলছিলেন ওই কেন্দ্রে আসা একজন মহিলা পরবিত্তা ধুত্তা।

"এখানে আমরা উদ্ভাবিত যন্ত্রের সাহায্য নিয়ে নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে পারছি এবং নিজেদের ও পরিবারের জন্য মোটামুটি ভালই রোজগার করতে পারছি।"

মি: ভারালির উদ্ভাবিত প্রযুক্তি থেকে লাভবান হচ্ছেন গ্রামের পুরুষরাও।

সিমেন্ট দিয়ে ইঁট বানানোর যে যন্ত্র তিনি উদ্ভাবন করেছেন মি: ভারালি ২০০র বেশি সেই যন্ত্র বিক্রি করেছেন।

এরকম একেকটি যন্ত্র চালাতে লাগে ৫জন করে লোক। এবং তার হিসাব অনুযায়ী এক হাজারের বেশি লোক এখন এই সুবাদে কাজ করে খাচ্ছেন।

ভারালি বলেন কিছু না করে সফল হওয়া যায় না। তিনি খুবই পরিশ্রমী। তার পরিশ্রমের ফলে তিনি এখন স্বচ্ছন্দ জীবন যাপন করছেন। এবং তার ব্যবসা থেকে আয় করে আরও ২৫টি পরিবার এখন জীবন চালাচ্ছে।

ভারালি প্রকৌশলী। তার সেই শিক্ষা তাকে অবশ্যই সাহায্য করেছে। তবে তিনি মনে করেন উদ্ভাবন বা সৃজনশীলতার মৌলিক ভাবনাটা কাউকে শেখানো যায় না।

"যে মানুষটা সবসময় কিছু ভাবছে, সুস্থির হতে পারছে না, বিশ্বে যা আছে তা নিয়ে সে সন্তুষ্ট নয়, সেই উদ্ভাবক।"

"কোন কিছু উদ্ভাবন করার বিষয়টা ভেতর থেকে আসে। কেউ আপনাকে উদ্ভাবক বানাতে পারবে না এটা আপনাকে ভেতরে অনুভব করতে হবে।"

তিনি নিজের যন্ত্র প্রথমে ডিজাইন করেন, বানান এবং তারপর আশা করেন তার উদ্ভাবন বাণিজ্যিকভাবে সফল হবে। তবে এখন তার নামডাক এতই ছড়িয়ে পড়েছে যে মানুষ তার কাছে সমস্যা নিয়ে যায় এবং তার সহজ সমাধান বানিয়ে দিতে বলে। কাজেই সুনির্দিষ্ট সমস্যা মোকাবেলার জন্য উদ্ভাবনের কাজও তিনি করছেন। ব্যস্ত জীবনে তার অবসর নেই।

হাতের কাছে পাওয়া জিনিসপত্র দিয়ে সমস্যার সমাধান করে তিনি দারুণ আনন্দ পান।

"এই চ্যালেঞ্জ আমি দারুণ উপভোগ করি। সবসময় নতুন কিছু করছি। নতুন সমস্যার সমাধান বের করছি আমিই প্রথম- এর আনন্দই আলাদা।"

ঢাকারিপোর্টটোয়েন্টিফোর.কম/এইএমএল



সর্বশেষ সংবাদ