বাংলা ফন্ট

ফেসবুক একাউন্ট নিরাপদ রাখার যত উপায়

06-11-2018
নিজস্ব প্রতিবেদক ঢাকারিপোর্টটোয়েন্টিফোর.কম

 ফেসবুক একাউন্ট নিরাপদ রাখার যত উপায়


ঢাকা: কখনো কি আপনার ফেসবুক একাউন্ট হ্যাকিংয়ের চেষ্টা হয়েছে? অথবা অপরিচিত কোন এলাকা বা কম্পিউটার থেকে লগইন হয়েছে, যা আপনি মনে করতে পারছেন না? আপনার একাউন্ট থেকে আপনার অজান্তেই কারো কাছে বার্তা চলে যাচ্ছে?

এরকম হলে আপনার একাউন্টে হয়তো অযাচিত প্রবেশের ঘটনা ঘটেছে।

সাইবার হামলা, একাউন্ট হ্যাকিংয়ের চেষ্টা নতুন নয়। ইন্টারনেটের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে এই প্রবণতা অনেক বেড়েছে। কিছুদিন আগে এরকম একটি হামলায় পাঁচ কোটি ফেসবুক ব্যবহারকারীর তথ্য চুরি হয়েছে।

ফেসবুকের জনপ্রিয়তা যেমন বাড়ছে, সেই সঙ্গে বাড়ছে বিভিন্ন একাউন্টে ব্যক্তিগত তথ্য থাকা এবং সামাজিক বা ব্যবসায়িক যোগাযোগ থাকার কারণে একাউন্টগুলো অনেক ক্ষেত্রেই হ্যাকারদের লক্ষ্যে পরিণত হচ্ছে।

সরকারি হিসাবে বাংলাদেশে প্রায় তিন কোটি ফেসবুক ব্যবহারকারী রয়েছেন।

বিটিআরসি জানিয়েছে, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত তারা সামাজিক মাধ্যম সম্পর্কিত ১২১টি অভিযোগ পেয়েছে। মূলত ফেসবুক ব্যবহার করে গুরুতর অপরাধ বা সমস্যা তৈরি করার অভিযোগ বিটিআরসি পর্যন্ত গড়ায়।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সাইবার ক্রাইম বিভাগের অতিরিক্ত উপ পুলিশ কমিশনার নাজমুল ইসলাম বলছেন, "প্রতিদিন ফেসবুক সম্পর্কিত গড়ে প্রায় পাঁচশো অভিযোগ আমরা পাই। এর বেশিরভাগই একাউন্ট হ্যাক হয়ে গেছে, প্রবেশ করা যাচ্ছে না এ ধরণের।"

তবে হ্যাকিং বা সমস্যার শিকার হলেও অনেক অভিযোগই কর্তৃপক্ষ পর্যন্ত যায়না।

ফেসবুকের নিরাপত্তা পাতা Security and Login একাউন্ট নিরাপদ রাখার বিষয়ে পরামর্শ দেয়া হয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে:

পাসওয়ার্ড: ফেসবুকের পাসওয়ার্ড অন্য কোন ক্ষেত্রে ব্যবহার করা উচিত নয় বা এটি কারো সঙ্গে শেয়ার করা ঠিক না। পাসওয়ার্ড হতে হবে ছোটবড় অক্ষর ও নম্বর মিলিয়ে, অন্ততপক্ষে আট সংখ্যার, যা সহজে কেউ ধারণা করতে না পারে। যেমন নিজের বা ঘনিষ্ঠ কারো নাম, জন্মতারিখ, বিয়ে বার্ষিকী, পরীক্ষার বছর ইত্যাদি পাসওয়ার্ড হিসাবে সবসময়েই ঝুঁকিপূর্ণ।

লগইন: কখনোই ফেসবুকের লগইন তথ্য ফেসবুক ছাড়া আর কোথাও প্রবেশ করানো যাবে না। অনেক সময় স্ক্যামাররা ভুয়া ওয়েবসাইট তৈরি করে ফেসবুকের আইডির লগইন ইমেইল বা পাসওয়ার্ড চাইতে পারে। এরকম ক্ষেত্রে আগে সেই ওয়েবসাইটের ইউআরএল দেখে নিন। ফেসবুকের বাইরে আরো কোন শব্দ সেখানে থাকলে বা কোন সন্দেহ হলেই www.facebook.com টাইপ করে একাউন্ট খুলুন।

যেখানে অনেক ব্যক্তি একই কম্পিউটার ব্যবহার করেন, সেখানে অবশ্যই ফেসবুক ব্যবহার শেষে লগআউট করুন। যদি ভুলে যান, তাহলে ফোন বা অন্য কোন কম্পিউটারে ফেসবুকে লগইন করে সিকিউরিটি এন্ড লগইন সেটিংয়ে গিয়ে দেখতে পাবেন, সর্বশেষ কোথায় আপনি লগইন করেছিলেন। সেখানে ডিভাইস সনাক্ত করে লগআউট করে দিতে পারেন।

বন্ধু গ্রহণে সতর্কতা: ফেসবুকের পরামর্শ, কখনোই এমন কাউকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ না করা, যাকে আপনি চেনেন না। এক্ষেত্রে হ্যাকাররা হয়তো মিথ্যা পরিচয়ে আপনার বন্ধু হয়ে আপনার টাইমলাইনে স্প্যাম ছড়াতে পারে, আপনাকে বিব্রতকর পোস্টে ট্যাগ করতে পারে বা হ্যাকিংয়ের মেসেজ পাঠাতে পারে।

দূষিত সফটওয়্যার বা কম্পিউটার: অনেক সময় আপনার ফোন, ট্যাব, কম্পিউটার, এমনকি ক্রোম বা ফায়ারফক্সের মতো ব্রাউজিং সফটওয়্যার বিশেষ কোড দ্বারা আক্রমণের শিকার হতে পারে। যদি আপনার একাউন্ট থেকে নিজে নিজেই অন্যদের কাছে বার্তা যেতে থাকে, বা একাউন্ট ব্যবহারের ভুল ইতিহাস দেখায় অথবা অ্যাকটিভিটি লগে এমন সব পোস্ট দেখতে পান, যা আপনি মনে করতে পারছেন না, তখন আপনার সতর্ক হওয়া উচিত।

কম্পিউটার বা মোবাইল খুব আস্তে কাজ করছে, এমন সফটওয়্যার দেখতে পাচ্ছেন যা আপনি ইন্সটল করেননি, আপনার সার্চ ইঞ্জিন পাল্টে গেছে কিন্তু আপনি তা করেননি,তখনো বুঝতে হবে হয়তো আপনি আক্রান্ত হয়েছেন।

এ ধরণের ক্ষেত্রে ESET বা TrendMicro সফটওয়্যার ব্যবহার করে কম্পিউটার বা মোবাইল পরিষ্কার করার পরামর্শ দিয়েছে ফেসবুক। ক্রোম ক্লিন আপ টুল ব্যবহার করে ব্রাউজার দূষণ মুক্ত করা যেতে পারে। এছাড়া ওয়েব ব্রাউজার নিয়মিত আপডেট করা উচিত।

মত সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত যে কোন কনটেন্ট যদি বাংলাদেশ সরকারের কাছে দেশের জন্য ক্ষতিকর বলে মনে হয়, তাহলে সরকার চাইলেই সেগুলো প্রতিরোধ করতে বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে।

কখনোই সন্দেহজনক কোন লিংকে ক্লিক করবেন না: যদি ঘনিষ্ঠ কোন বন্ধু বা ফেসবুক বন্ধুর কাছ থেকে কোন ইমেইল, মেসেঞ্জারে বার্তা, বা পোস্ট পান, যা হয়তো তার স্বাভাবিক আচরণের সঙ্গে মেলে না, সবচেয়ে ভালো হবে সেটায় ক্লিক না করা বা সাড়া না দেয়া। যেমন কেউ হয়তো লিখতে পারে যে, সে কোথাও বেড়াতে গিয়ে বিপদে পড়েছে অথবা আপনার মেসেঞ্জারে এমন একটি লিংক পাঠিয়েছে, যার কোন কারণ নেই। এক্ষেত্রে তাকে আলাদাভাবে একাউন্টে নক করে বা বার্তা পাঠিয়ে জিজ্ঞেস করতে পারেন। এ ধরণের সন্দেহজনক কিছু দেখলে রিপোর্ট করার পরামর্শ দিয়েছে ফেসবুক।

তবে আইটি বিশেষজ্ঞ জাকারিয়া স্বপন বলছেন, বাংলাদেশে কোন ফেসবুক একাউন্ট পুরোপুরি নিরাপদ নয়। কারণ যখন একাউন্ট করার সময় একটি ফোন নম্বর দেয়া হয়, সেসব ফোনের ওপর যে কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণ বা নজরদারি থাকে, তারা চাইলে সেসব বার্তা দেখতে পারে। তখন এর মাধ্যমে তাদের পক্ষে ফেসবুকের প্রবেশ বা নিয়ন্ত্রণ নেয়া সম্ভব।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিভিন্ন আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার কাছে এমন কিছু প্রযুক্তি রয়েছে, যা দিয়ে বিভিন্ন বাহিনী বা সংস্থার সদস্যরা যেকোন ফেসবুক একাউন্ট সনাক্ত বা অনেক সময় নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেন।

কিভাবে অতিরিক্ত সতর্ক ব্যবস্থা নেয়া যায়?

এডিসি নাজমুল ইসলাম বলছেন, "নিরাপদ রাখার ব্যাপারে ফেসবুকে যেসব পরামর্শ দেয়া হয়েছে, আমিও সেগুলোই সবাইকে অনুসরণ করতে বলবো।"

"তবে সমস্যা হলো, যখন কাউকে টার্গেট করা হয়,তখন হ্যাকাররা নানা পদ্ধতি অনুসরণ করে তাদের বিপদে ফেলে। আমরা বিষয়টি ফেসবুককে জানিয়েছে। তবে নিজে সতর্ক থাকলে বা প্রতিটি মন্তব্য বা লিংকে ক্লিক করার আগে সতর্ক হলে অনেকাংশে নিরাপদ থাকা সম্ভব।"

একাউন্টের নিরাপত্তার জন্য বাড়তি কিছু ব্যবস্থা নেয়ার পরামর্শ দিয়েছে ফেসবুক। এর সবগুলোই রয়েছে আপনার একাউন্টের সিকিউরিটি এন্ড লগনই পাতায়। ফেসবুকের একবারে ডানদিকে যে চিহ্নটি রয়েছে, সেখানে ক্লিক করে সিকিউরিটি এন্ড লগইনে প্রবেশ করুন।

অপরিচিত লগইনের বিষয়ে তথ্য: একটু নীচের দিকে দেখতে পাবেন, যেখানে বলা হয়েছে, অপরিচিত লগইনের বিষয়ে সতর্ক বার্তা গ্রহণের ব্যাপারে নির্দেশনা রয়েছে। ডানদিকে এডিট বাটনে ক্লিক করে একাউন্ট এবং মেসেঞ্জারের লগইনের বিষয়ে সতর্ক বার্তা পাবার বিষয়টি চালু করে দিন। এরপর সেভ বাটনে ক্লিক করলে আপনার পাসওয়ার্ড চাইবে। এরপর থেকে কোথাও আপনার একাউন্ট লগইন হবে,তখন আপনাকে একটি বার্তা বা মেসেজ দিয়ে জানাবে ফেসবুক।

দ্বি-স্তর যাচাই: এই পাতার একটু নীচের দিকে টু-ফ্যাক্টর ভেরিফিকেশন বা দ্বি-স্তর যাচাই ব্যবস্থা প্রথমে আপনাকে চালু করে নিতে হবে। এক্ষেত্রে কেউ আপনার পাসওয়ার্ড পেলেও এই কোড না থাকার কারণে লগইন করতে পারবে না। এজন্য মোবাইল নম্বর বা ফোনে একটি অ্যাপলিকেশন ব্যবহার করতে পারেন। সিকিউরিটি এন্ড লগইন পাতায় গিয়ে আপনার মোবাইল ফোনের নম্বরটি যোগ করে দিকে পারেন। এরপর থেকে প্রতিবার ফেসবুকে প্রবেশের সময় বিনামূল্যে একটি এসএমএস আসবে এবং সেটি প্রবেশ করিয়ে লগইন করতে হবে।

অথবা আপনি গুগল থেকে অথেনটিকেটর অ্যাপ মোবাইলে ডাউন লোড করে নিতে পারেন। এরপর ফেসবুকে এই পাতায় নতুন অ্যাপ সংযুক্ত করার বাটনে ক্লিক করলে যে কিউআর কোড আসবে, সেটা স্ক্যান করে নিলেই অ্যাপটি ফেসবুকের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে যাবে। এরপর প্রত্যেকবার ফেসবুকে প্রবেশ করতে হলে এই অ্যাপ থেকে পাওয়া কোডটি আপনার পাসওয়ার্ডের সঙ্গে সঙ্গে ফেসবুকে দিতে হবে।

এই দুইটি পদ্ধতি বেশিরভাগ মানুষ ব্যবহার করেন। এছাড়া পেন ড্রাইভের মাধ্যমে ইউনিভার্সাল সেকেন্ড ফ্যাক্টর বা রিকভারি কোড ব্যবহারেরও সুযোগ আছে।

একজন বন্ধুকে নির্বাচন: আপনার ফেসবুক একাউন্ট যদি কখনো আটকে যায়, তখন একজন নির্বাচিত বিশ্বস্ত বন্ধুর সহায়তা সেটি পুনরুদ্ধার করতে পারেন। নিরাপত্তার এই পাতাতেই নীচের দিকে তিন থেকে পাঁচজন বন্ধুকে নির্বাচন করার কথা বলা হয়েছে, যারা একাউন্ট লক হয়ে গেলে বা হ্যাকিংয়ের শিকার হলে আপনাকে ফিরে পেতে সহায়তা করবে। সেখানে এডিট বাটনে ক্লিক করে তিন থেকে পাঁচজন বন্ধুকে সিলেক্ট করে দিন।

তবে কম্পিউটারটি যদি আপনি নিয়মিত ব্যবহার করেন, তাহলে ব্রাউজারটি সেভ করে রাখলে পরবর্তীতে আর এই ব্যবস্থা অনুসরণ করতে হবে না।

নিরাপদ থাকতে ফেসবুকে আরো কিছু ব্যবস্থা

ফেসবুকে কারো অনধিকার প্রবেশে হয়েছে মনে হলেই আইডি ও পাসওয়ার্ড পরিবর্তনের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এছাড়া প্রতি দুই মাসে পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করা উচিত বলে তারা মনে করেন।

কখনো যদি মনে করেন কারো পোস্ট বা বক্তব্য আপনার জন্য ক্ষতিকর বা হুমকি, তখন আপনি রিপোর্ট বাটনে ক্লিক করে ফেসবুকের কাছে অভিযোগ জানাতে পারেন।

ফেসবুকে আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহার, শিশুদের জন্য নির্যাতনমূলক ভাষা বা পোস্ট ঠেকাতে বিভিন্ন দেশের সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করছে ফেসবুক। এই পাতায় এ সংক্রান্ত বিস্তারিত রয়েছে, যেখানে অভিযোগ জানালে ফেসবুক ব্যবস্থা নেবে।

ঢাকারিপোর্টটোয়েন্টিফোর.কম/এইএমএল



সর্বশেষ সংবাদ