বাংলা ফন্ট

অপমৃত্যুর অপেক্ষায় ময়ূর নদী

16-02-2017
নিজস্ব প্রতিনিধি ঢাকারিপোর্টটোয়েন্টিফোর.কম

অপমৃত্যুর অপেক্ষায় ময়ূর নদী খুলনা: অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভিশাপে খুলনা মহানগরীর হৃৎপিণ্ডখ্যাত ময়ূর নদীর পানিতে দূষণের মাত্রা চরমে পৌঁছেছে। বর্তমানে ওই নদীর পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়েও অনেক কম। যেখানে কোনো জলজ প্রাণীর বেঁচে থাকাও সম্ভব নয়। আর ময়ূর নদীর বিলুপ্তির সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা ও জনস্বাস্থ্যের হুমকি মহানগরীতে স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। নদী দূষণের ভয়াবহ এ প্রমাণ মিলেছে পরিবেশ অধিদপ্তরের নমুনা গবেষণায়।

মহানগরীর মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া ২২ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে ময়ূর নদী এক সময়ে খুলনার মানুষের সুপেয় পানি ও মাছের অন্যতম আধার ছিল। পাশাপাশি কৃষি ক্ষেত্রেও ব্যবহার হতো এই নদীর পানি। কিন্তু অপরিকল্পিত নগরায়ন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় দূষিত হয়ে পড়েছে এ নদীর পানি।

পরিবেশ অধিদপ্তর খুলনার ল্যাব সহকারী জানান, ২০১১ সাল থেকে তারা যখন ময়ূর নদীর পানির নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা শুরু করেন। তখন এই পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা প্রতি লিটারে ৪ মিলিগ্রাম পাওয়া যেত। কিন্তু বর্তমানে এই মাত্রা গড়ে প্রতি লিটারে ২ মিলিগ্রামেরও কম থাকছে।

পরিবেশ অধিদপ্তর খুলনার সিনিয়র কেমিস্ট কামরুজ্জামান সরকার জানান, পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা ১৯৯৭ অনুযায়ী জলজ প্রাণী বেঁচে থাকা ও কৃষি কাজে ব্যবহারের জন্য পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন (ডিও) সর্বনিম্ন প্রতি লিটারে ৫ মিলিগ্রাম থাকা প্রয়োজন। কিন্তু চলতি বছরের জানুয়ারিতে ময়ূর নদীর পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা ছিল ১.১; ফেব্রুয়ারিতে যা ছিল ১.৩। আবার তা মার্চ মাসে কমে আসে ০.৫ মিলিগ্রাম প্রতি লিটারে। মে, জুন ও জুলাই মাসের চিত্রও ভয়াবহ। এ সময় ডিওর মাত্রা ছিল যথাক্রমে ০.৭; ০.৮ ও ০.৮। জুলাই থেকে অক্টেবরে ডিওর মাত্রা কিছুটা বাড়লেও তা জলজ প্রাণী বেঁচে থাকার জন্য যথেষ্ট নয়। এই সময়ে নদীর পানিতে যথাক্রমে ২.১; ২.৫; ২.৮ ও ২.৯ মিলিগ্রাম পাওয়া যায়। এভাবে সারা বছরই ময়ূর নদীর পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা কম থাকায় নদীটি মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এখনই ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে বায়োলজিক্যালি অর্থাৎ বৈজ্ঞানিকভাবে এই নদী বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে।

খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর উন্নয়ন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তুষার কান্তি রায় ময়ূর নদী নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করছেন।

তিনি জানান, ময়ূর নদীর পানির স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বর্তমানে বাধাগ্রস্ত। এখন আর এই নদীতে কোনো পানিপ্রবাহ নেই। অপরদিকে রূপসা নদীর সঙ্গে সংযোগস্থলে সুইস গেট নির্মাণ করে তা রক্ষণাবেক্ষণ না করায় বর্তমানে নদীটি বদ্ধ জলাধারে পরিণত হয়েছে। এর ফলে এই পানিতে দূষণের মাত্রা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। পাশাপাশি দখলদারদের কারণে নদী প্রতিনিয়ত তার পরিবেশ হারাচ্ছে।

তিনি আরো জানান, তাদের গবেষণা অনুযায়ী আরএস খতিয়ানে নদীর যে আয়তন ছিল সেখান থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত নদী দখল হয়েছে ৫ দশমিক ১২ শতাংশ, ২০০৪ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত নদীর আরও ৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ জমি দখলদারদের কবলে চলে গেছে। আর ২০১০ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত নদী তার সর্বশেষ আয়তনের ৪ দশমিক ১৭ শতাংশ হারিয়েছে। এসব কারণে ময়ূর নদী সংকুচিত হয়ে পড়ছে। আবার দূষণের মাত্রাও বাড়ছে।

পরিবেশ অধিদপ্তর খুলনার পরিচালক, মল্লিক আনোয়ার হোসেন জানান, বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, খুলনা সিটি করপোরেশনের ২৬টি ড্রেন থেকে বর্জ্যমিশ্রিত পানি প্রতিনিয়ত পড়ছে ময়ূর নদীতে, যার ফলে এই মারাত্মক দূষণের সৃষ্টি হয়েছে। অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ বিষয়ে অসচেতনতা, অপর্যাপ্ত পানিপ্রবাহসহ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে ঐতিহ্যবাহী নদীটি বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা ও তুরাগের মতো দূষণের পর্যায়ে উপনীত হয়েছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের খুলনার গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ রিপোর্ট পাওয়ার পর পরিবেশ মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। মন্ত্রণালয় চলতি বছরের ১৮ আগস্টে ময়ূর নদী দূষণ রোধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক ড. সুলতান আহমেদ স্বাক্ষরিত মন্ত্রণালয়ের ওই পত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘ভূ-পৃষ্ঠের পানির নমুনা বিশ্লেষিত ফলাফলে দেখা যায় যে, নগর বর্জ্য (কঠিন ও তরল) জমে ময়ূর নদীর পানি চরমভাবে দূষিত হচ্ছে। ময়ূর নদীর ডিওর মান নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে কম হওয়ায় বোঝা যাচ্ছে নদীর পানি খুবই দূষিত, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এবং জলজ প্রাণীর জীবন ধারণের অনুপযোগী।’

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য খুলনা সিটি করপোরেশন, বিভাগীয় ও জেলা প্রশাসন, খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠান, সুশীল সমাজ, এনজিও ও পরিবেশ অধিদপ্তর, খুলনাকে সম্মিলিতভাবে ময়ূর নদী দূষণ নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

অথচ ময়ূর নদী দূষণের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী প্রতিষ্ঠান খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বিকার। করপোরেশনের চিফ প্ল্যানিং অফিসার আবীর উল জব্বার বলেন, ময়ূর নদী বাঁচাতে আমরা যে পরিকল্পনা নিচ্ছি, তা কিছু স্বার্থান্বেষী মহলের কারণে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। ময়ূর নদীকে ঘিরে এখনো পর্যন্ত যে কটি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, তা মামলার কারণে আটকে রয়েছে।

এ ছাড়া মহানগরীতে সোয়ারেজ ব্যবস্থা নেই। ফলে সোয়ারেজের বর্জ্যও ড্রেনের মাধ্যমে ময়ূর নদীতে পড়ছে। কিন্তু এ ব্যাপারে ওয়াসা এখনো উদাসীন এবং কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন করেনি। তবে ময়ূর নদী দূষণ রোধ ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে ২০১৭ সাল থেকে ৮শ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫ বছর মেয়াদি একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে করপোরেশন। দাতা সংস্থার অর্থায়ন পেলে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। এই প্রকল্পে নদীর দুই পাড় রক্ষা, নদীর সঙ্গে সংযুক্ত ড্রেনগুলো সংস্কার ও বর্জ্য পরিশোধনের মতো বিষয়গুলো রয়েছে।

তবে ময়ূর নদীতে পানি প্রবাহ ফেরাতে আধুনিক সুইস গেট নির্মাণ পরিকল্পনা রয়েছে, যা বাস্তবায়ন হলে দূষণমুক্ত হবে ময়ূর নদী।

ঢাকারিপোর্টটোয়েন্টিফোর.কম/এইচএমএল

সর্বশেষ সংবাদ