বাংলা ফন্ট

পশু না মেরেই খাওয়া যায় মাংস!

26-09-2018

পশু না মেরেই খাওয়া যায় মাংস!

ধাবমান ডেস্ক: গরুর মাংস দিয়ে তৈরি বার্গার, কিন্তু সেই গরু দিব্যি জীবিত রয়েছে৷ এদিকে বার্গারের মাংসের টুকরো ভাজার শব্দ হচ্ছে৷ সেটা কী করে সম্ভব?

নেদারল্যান্ডসের মাসত্রিখট বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্ক পস্ট সেই অসাধ্য সাধন করেছেন৷ অনেক বছর ধরে তিনি প্রাণীহীন মাংস নিয়ে কাজ করছেন৷ গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশক থেকেই নেদারল্যান্ডসে গবেষকরা স্টেম সেল থেকে মাংস তৈরির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন৷ সেল কালচার আধারেই পেশির মাংস সৃষ্টি তাঁদের লক্ষ্য৷ মার্ক পস্ট এ ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন৷

 ২০১৩ সালে তিনি প্রথম ‘নিষ্পাপ' হ্যামবার্গার পরিবেশন করেন৷ কোনো কৃত্রিম পদার্থ নয়, আসল মাংস দিয়ে তৈরি৷ গরুর স্টেম সেল থেকে ল্যাবে সেই মাংস সৃষ্টি করা হয়েছে৷ মূল্য তিন লক্ষ ডলার৷ হাতে গোনা যে কয়েকজন তা চেখে দেখার সুযোগ পেয়েছেন, তাঁদের মতে স্বাদ একেবারে আসল হ্যামবার্গারের মতো৷

মার্ক পস্টের প্রাথমিক হ্যামবার্গারে মাংসের কোষ এসেছিল জবাই করা প্রাণী থেকে৷ ছোট এক টুকরো পেশির মাংস দিয়ে তিনি কাগজে-কলমে ১০,০০০ কিলোগ্রাম গরুর মাংস সৃষ্টি করতে পারেন৷ সেই প্রক্রিয়া মোটেই গোপন নয়৷

 টিস্যু থেকে স্টেম সেল নিষ্কাশন করা হয়৷ তারপর তা পুষ্টিকর দ্রব্যের মধ্যে বেড়ে উঠে বংশবৃদ্ধি করে৷ গরুর শরীরের মধ্যে ঠিক যেমনটা ঘটে৷ পেশির আসল তন্তুও সৃষ্টি হয়৷ আসল মাংসের মতো বৈশিষ্ট্য আনতে সেই তন্তুকে যান্ত্রিক ও ইলেকট্রিক স্পন্দন দিয়ে মূল পেশির মতো পরিশ্রম করানো হয়৷ মার্ক পস্ট বলেন, ‘‘গরু আল্পস পর্বত বা অন্য কোথাও মাঠে চড়ে বেড়ায়৷ তাই তার পেশি সজাগ রাখতে হয়৷ স্নায়ুর কোষের মাধ্যমে ইলেকট্রিক উত্তেজনাই আসলে পেশিকে সজাগ রাখে৷ আমরা এখানে সেই স্টিমুলেশন নকল করছি৷''

 ল্যাবে তৈরি মাংসে মসলাপাতি ও রং যোগ করা হয়৷ মাংসের মৌলিক স্বাদ আনতে চর্বির কোষও যোগ করা হয়৷ সেই কোষও ল্যাবেই তৈরি৷ ল্যাবে তৈরি সেই মাংসের অবশ্য কোনো কাঠামো নেই৷ তবে এখনো পর্যন্ত সেটি দিয়ে শুধু কিমা বানানো যায়৷

  মার্ক পস্ট এর মধ্যে স্টেম সেলের বংশবৃদ্ধির জন্য জীবন্ত প্রাণীর শরীর থেকে পেশির তন্তু সংগ্রহ করছেন৷ ল্যাবে সেই মাংস তৈরির প্রক্রিয়ায় প্রাণীদের কষ্ট পুরোপুরি দূর করা এখনো সম্ভব হয়নি৷

 যে পুষ্টিকর দ্রব্যের মধ্যে কোষ গড়ে ওঠে, তার উপকরণ হলো বাছুরের সিরাম, যা গরুর ভ্রুণের হ্রদযন্ত্রের রক্ত থেকে পাওয়া যায়৷ সেই প্রক্রিয়ায় জন্মের আগেই বাছুরের মৃত্যু হয়, গর্ভবতী গরুকেও জবাই করতে হয়৷

এমন কষ্ট এড়াতে মার্ক পস্ট তাই বাছুরের সিরামের বিকল্প খুঁজছেন৷ অ্যালজি বা সামুদ্রিক উদ্ভিদের মধ্যে কিছু পদার্থ এ ক্ষেত্রে সম্ভাবনাময় হতে পারে৷

উৎপাদনের ব্যয়ও এর মধ্যে অনেকটা কমে গেছে৷ আজ ল্যাবে তৈরি বার্গারের মূল্য ১০ ইউরোর মতো৷ তবে একমাত্র বিশাল মাত্রায় উৎপাদন করলেই সেটা সম্ভব৷ কিমার ক্ষেত্রে বর্তমানে সেটাই ঘটছে৷ কিন্তু গবেষকরা এখনো সেই লক্ষ্য পূরণ থেকে অনেক দূরে রয়েছেন৷

তাছাড়া শুধু পস্ট ও তাঁর টিম নয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গবেষকরাও ল্যাবে মাংস তৈরির লক্ষ্যে কাজ করছেন৷ ‘মেম্ফিস মিটস' নামের এক স্টার্টআপ কোম্পানির এরিক শুলৎসে পস্টের আইডিয়া বড় আকারে কার্যকর করতে চান৷ তিনি বিশাল আকারের সুপারট্যাংক তৈরি করে সেখানে সেল কালচার করতে চান৷ বিয়ার তৈরির প্রক্রিয়ার মতোই মাংস উৎপাদন করতে চান শুলৎসে৷ এরিক বলেন, ‘‘শুনতে অদ্ভুত মনে হলেও এটা পুরোপুরি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া৷ তাতে শুধু গরুর প্রয়োজন পড়ে না৷''

একটি ট্যাংকে উৎপাদিত মাংস খেয়ে প্রায় ৪০,০০০ মানুষের পেট ভরবে বলে দাবি করা হচ্ছে৷ তবে এখনো পর্যন্ত সেই মাংসের মান মোটেই সন্তোষজনক নয়৷ তাছাড়া কিমার ছোট গোলকগুলির মূল্য এখনো ৬,০০০ ডলার৷

শিল্পক্ষেত্রে এখনো ল্যাবে তৈরি মাংসের বিষয়ে যথেষ্ট উৎসাহ রয়েছে৷ জার্মানিতে মুরগির মাংস কোম্পানি ভিসেনহোফ চলতি বছর থেকে ল্যাবে মুরগির মাংস উৎপাদন সংক্রান্ত গবেষণায় বিনিয়োগ করছে৷

আমরা কি অদূর ভবিষ্যতে ল্যাবে তৈরি চিকেন নাগেটস খেতে চলেছি? গবেষকদের ধারণা, ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে এ ক্ষেত্রে সাফল্য আসবে৷ কিন্তু এই মুরগিছানাগুলি সে দিন দেখে যেতে পারবে না৷

সর্বশেষ সংবাদ