বাংলা ফন্ট

সাহিত্যে ভাবনা চুরি

02-01-2018

 সাহিত্যে ভাবনা চুরি

নিজের নাম সবার কাছে ছড়িয়ে দেয়া অথবা বিখ্যাত হয়ে ওঠার চেষ্টা মানুষের নিরন্তর। কিন্তু চাইলেই তো আর বিখ্যাত হওয়া যায় না। লেখালেখি বা সাহিত্যে বিখ্যাত হওয়ার জন্য দরকার এমন কোনো বড় রকমের সাহিত্য বা শিল্পকর্ম, যা হতে হবে সর্বোচ্চ সৃজনশীল আর স্বতন্ত্র। অথচ পৃথিবীর অনেক বিখ্যাত কবি, গল্পকার, ঔপন্যাসিকের বিরুদ্ধে ভাবনার দীনতার অভিযোগ আছে, অনেক বিখ্যাত সাহিত্যকর্মের বিরুদ্ধে রয়েছে চৌর্যবৃত্তির অভিযোগ। তবে সাহিত্যে বা সাহিত্যিক লেখালেখিতে লেখকদের দ্বারা অপরের ভাব বা ভাবনা চুরি নতুন কোনো ব্যাপার নয়। লেখালেখিতে কবি-সাহিত্যিকদেরও মাঝে মধ্যে ভাবনার দীনতায় পেয়ে বসে অথবা এমন হয়, প্রভাবিত হয়ে বা অনিচ্ছাকৃতভাবে অন্য কবি, ঔপন্যাসিক অথবা নাট্যকারের সাহিত্য ভাবনা অনুকরণ এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে অনেকে পুরো ভাবনা, ভাষা বা ঘটনাপ্রবাহের হুবহু চুরি করে থাকেন।

লেখকদের মধ্যে ভাবনা চুরির শুরু হয় খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীতে।

রোমান কবি মার্শাল সে সময় অভিযোগ তুলেছিলেন যে, অন্য এক কবি তার একটি কবিতা চুরি করেছেন। আর সেই থেকেই সাহিত্যে অপর লেখকের ভাব বা রচনা চুরিকে ‘প্ল্যাজিয়ারিজম’ নামে আখ্যায়িত করা হয়। ল্যাটিন শব্দ ‘প্ল্যাজিয়ারিয়াস’র অর্থ হচ্ছে সাহিত্যভাবনা চুরি বা অপহরণ। ইংরেজ নাট্যকার বেন জনসন ১৬০১ সালে শব্দটিকে ইংরেজি সাহিত্যে পরিচয় করিয়ে দেন। তার মতে, অপর কবি-ঔপন্যাসিক বা নাট্যকারের সাহিত্যভাব বা রচনা অপহৃত হওয়ায়ই ‘প্ল্যাজিয়ারিজম’। তবে সাহিত্যে প্রায় অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত লেখকরা একে অপরের ভাব, ভাষা এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুরো সাহিত্য ধারণাটাই নকল করে নিয়েছেন একে অপরের কাছ থেকে এবং এতে নিন্দিত হওয়ার কোনো ভয় ছিল না। উনিশ শতক পর্যন্ত মানুষের ধারণা ছিল যে, সাহিত্য কোনো ব্যক্তিগত বিষয় নয়। ব্যক্তির দ্বারা সাহিত্য রচিত হলেও এটি সর্বজনীন এবং লেখকদের ভেতর একে অপরের ধারণা বা ভাষার অনুকরণ দূষণীয় কিছু ছিল না বরং পূর্বে রচিত সাহিত্যকর্মের প্রতি আনুগত্যকে শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকর্ম হিসেবে বিবেচনা করা হতো। এমনকি আমাদের বাংলাদেশেও মাইকেল মদুসূদন দত্ত ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ রচনা করার পর মূল ‘রামায়ণ’র প্রতি অনুগত না থেকে রাবণের প্রতি তার মমত্ববোধ নিয়ে পক্ষপাতের অভিযোগ তুলেছিলেন অনেক সমালোচক। বিংশ শতাব্দীতে আধুনিকতাবাদ বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে সাহিত্যে অপর লেখকের ভাবনা চুরি- অনৈতিক, লেখালেখির নীতিমালা ভঙ্গ ও লেখক অসততা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

তবে লেখালেখিতে ভাবনা চুরি প্রতিরোধে আজও কোনো আইন তৈরি হয়নি, যদিও অনেকে কপিরাইট আইনকে সাহিত্যে ভাবনা চুরি প্রতিরোধক হিসেবে গুলিয়ে ফেলেন। কপিরাইট আইন হচ্ছে, কারও ভাবনার- হোক সে বই অথবা নিবন্ধের হুবহু নকল কিন্তু ‘প্ল্যাজিয়ারিজম’ হচ্ছে অন্যের সাহিত্যভাবনার অংশবিশেষের চুরি বা অংশবিশেষের প্রভাব, একেবারে হুবহু নকল নয়।

যাহোক, লেখকদের যেসব ভাবনা চুরির কথা জানা যায়, তার মধ্যে রয়েছে একাদশ শতকে ইরাকের বিখ্যাত লেখক আল খতিব আল বাগদাদির জীবজন্তুদের নিয়ে লেখা বই ‘আল জাহিদ’ (৮৬৯)-এর কথা। বইটি কম-বেশি অ্যারিস্টটলের লেখা ‘কিতাব আল হাইওয়ান’-এর অনুকরণ বলে অভিযোগ আছে। ১৮৭২ সালে আমেরিকার তরুণ লেখিকা হেলেন কেলারের লেখা গল্প ‘দ্য ফ্রস্ট কিং’র বিরুদ্ধে অভিযোগ আনেন গল্পকার মার্গারেট টি ক্যানবি। তিনি হেলেন কেলারের ‘দ্য ফ্রস্ট কিং’ গল্পটিকে তার ‘দ্য ফ্রস্ট ফেয়ারিজ’ গল্পের অনুকরণ বলে অভিযোগ আনেন। পারকিন্স ইনস্টিটিউট ফর দ্য ব্লাইন্ড আদালতে হেলেন কেলার স্বীকার করেন যে, তিনি মার্গারেটের গল্পটি পড়েছিলেন এবং তার গল্পে কিছুটা প্রভাব থাকতে পারে।

আলফ্রেড হিচককের ‘১৯৪০: রেবেকা’ উপন্যাসটিও চৌর্যবৃত্তির অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছিল। লেখক এডউইন ম্যাকডোনাল্ড আদালতে অভিযোগ করেছিলেন, হিচককের ‘রেবেকা: ১৯৪০’ তার ‘ব্লাইন্ড উইডো’ উপন্যাসের ধারণা থেকে নেয়া। শেষে বিচারকরা দুটি উপন্যাসের ভেতর কোনো মিল খুঁজে পাননি। লেখক ইয়ান ফ্লেমিং (১৯০৮-১৯৬৮)-এর ‘সেক্স, সেডিজম অ্যান্ড স্নোবারি’ বইটির বিরুদ্ধে ভাবনা চুরির অভিযোগ এনেছিলেন লেখক কেভিন ম্যাকগ্লোরি। ম্যাকগ্লোরি আদালতে জানান, ‘সেক্স, সেডিজম অ্যান্ড স্নোবারি’ বইটি লিখেছিলেন ইয়ান ফ্লেমিং, তিনি এবং অপর লেখক জ্যাক হুইটিংহাম মিলে কিন্তু ইয়ান ফ্লেমিং অন্যদের নাম বাদ দিয়ে নিজের নামেই বইটি প্রকাশ করেন। অভিযোগ সত্যি হওয়ায় আদালত ‘সেক্স, সেডিজম এবং স্নোবারি’ বইয়ের প্রকাশককে পঁয়ত্রিশ হাজার পাউন্ড ক্ষতিপূরণের নির্দেশ দেন।

বিখ্যাত লেখক ড্যান ব্রাউনের ‘দ্য ভিঞ্চি কোড’ বইটির বিরুদ্ধেও ভাবনা চুরির অভিযোগে দু’বার মামলা হয়েছে। ড্যান ব্রাউনের বিরুদ্ধে প্রথম অভিযোগ আনেন লেখক মিখাইল বাইগনেট। তিনি ‘দ্য ভিঞ্চি কোড’ বইটিকে তার ‘দ্য হলি ব্লাড অ্যান্ড দ্য হলি গ্রেইল’ বইয়ের অনুকরণ বলে অভিযোগ করেন। দ্বিতীয় অভিযোগটি আনেন লেখক লুইস পারডু। তিনি ‘দ্য ভিঞ্চি কোড’ বইটির ধারণা তার ‘দ্য ভিঞ্চি লিগাসি’ (১৯৮৩) থেকে নেয়া বলে অভিযোগ আনেন। দুটো মামলাই বিচারকরা খারিজ করে দেন অভিযোগ সঠিক নয় দাবি করে।

১৯৯৯ সালে ঔপন্যাসিক জে কে রোলিংসের ‘হ্যারি পটার’ উপন্যাসের বিরুদ্ধে তথ্য চুরির অভিযোগ আনেন ন্যান্সি স্টোগার নামের এক লেখিকা। শেষে অভিযোগ যথার্থ নয় বলে মামলা খারিজ করে দেয়া হয়।

ভারতের কাব্য বিশ্বনাথনের লেখা প্রথম উপন্যাস ‘হাউ অপাল মেহতা গট কিসড’ উপন্যাসটির বিরুদ্ধে একাধারে অন্য পাঁচটি উপন্যাসের বিভিন্ন অনুচ্ছেদ সরাসরি চুরির অভিযোগ তোলা হয়। অভিযোগ সত্যি হওয়ায় শেষ পর্যন্ত ওই লেখিকা বাজার থেকে সব বই প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হন। আমেরিকান ঔপন্যাসিক আলেক্স হালে ১৯৭৭ সালে আরেক আমেরিকান ঔপন্যাসিক হ্যারল্ড কোয়োরল্যান্ডারের বিরুদ্ধে চৌর্যবৃত্তির অভিযোগ করেন। আদালতে দায়ের করা মামলায় তিনি উল্লেখ করেন, হ্যারল্ড কোয়োরল্যান্ডারের ‘দ্য আফ্রিকান’ উপন্যাসটির প্রায় ৮০ পৃষ্ঠা আলেক্স হালের উপন্যাস ‘রুটস’ থেকে নেয়া। নিউইয়র্কের আদালতে মামলা বিচারাধীন অবস্থায় কোয়োরল্যান্ড সাড়ে ছয় লাখ ডলারের বিনিময়ে আপস করেছিলেন আলেক্স হালের সঙ্গে। ২০১১ সালে আমেরিকার লেখক কোয়েন্টিন রায়ানের প্রথম উপন্যাস ‘অ্যাসাসিন অব সিক্রেটস’ প্রকাশিত হলে একই সঙ্গে ১১ জন লেখক তার বিরুদ্ধে চৌর্যবৃত্তির অভিযোগ আনেন। ঘটনা সত্যি হওয়ায় দুঃখ প্রকাশ করে তিনি সঙ্গে সঙ্গে সব বই বাজার থেকে প্রত্যাহার করে নেন। ১৯৯৭ সালে আমেরিকার বেস্ট সেলার লেখিকা জ্যানেট ডাইলে স্বীকার করে নেন যে, তার ‘নাইনটি থ্রি বডিস রিপার’ উপন্যাসটি, যেটি বিক্রি হয়েছিল দুইশ’ মিলিয়ন কপি, সে উপন্যাসটির অনেক অংশ আরেক ঔপন্যাসিক নোরা রবার্টসের উপন্যাস থেকে চুরি করা। অপরাধ স্বীকার করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘লেখালেখিতে ক্রমাগত অপরের ভাবনা নকল বা অনুসরণ করা আমার জন্য মনস্তাত্ত্বিক এক বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে। আমার বইয়ে নোরা রবার্টসের যেসব ধারণা বা অংশের নকল আমি করেছি, তা নকল করার ইচ্ছে আমার কোনো সময়ই ছিল না। এ সমস্যা নিয়ে আমি বর্তমানে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হয়েছি। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা আর ঘটবে না-এ আশ্বাস দিতে পারি আমার পাঠকদের।’

যাহোক, লেখকদের ভেতর ভাবনা চুরি নিয়ে অনেক ঘটনা ঘটে গেলেও বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে, এ বিষয়ের প্রতিরোধে আজও কোনো আইন নেই বিশ্বের কোথাও। তাই বিভিন্ন সময়ে লেখকদের মধ্যে ভাবনা চুরি নিয়ে অভিযোগ এবং এ বিষয়ে মামলা-মোকদ্দমা হয়ে থাকলেও সেসবের বেশিরভাগই অমীমাংসিত থেকে গেছে শেষ পর্যন্ত।

এ প্রসঙ্গে বিখ্যাত আমেরিকান নাট্যকার উইলসন মিজনার বলেন, ‘একজনের লেখা বা ভাবনা অনুকরণ যদি দূষণীয় হয়, তবে দু’জন বা ততোধিক লেখকের ধারণা বা ভাবনার অনুসরণ কী করে গবেষণার স্বীকৃতি পেতে পারে?’ সূত্র: ব্লগ

সর্বশেষ সংবাদ