বাংলা ফন্ট

সুস্থ্য হও, শিক্ষা ব্যবস্থা!

01-08-2017
প্রদ্যোত

সুস্থ্য হও, শিক্ষা ব্যবস্থা!

প্রতি বছর পাবলিক পরীক্ষাগুলোর ফলাফল প্রকাশ হবার সাথে সাথেই পত্রিকার পাতা ভরে একের পর এক আত্মহত্যার খবর প্রকাশ হতে থাকে। আমরা কষ্ট পাই। আত্মহত্যাকারী ছাত্র বা ছাত্রীটিকে নির্বোধ বা কাপুরুষ আখ্যা দিয়ে ক্ষণিক বাদেই ভুলে যাই আবার। আমরা এমনই, খুব অল্প স্মৃতিশক্তি সম্পন্ন আত্মকেন্দ্রিক জাতি। কোনো ঘটনা নিজেদের ব্যক্তিজীবনে না ঘটা পর্যন্ত আমাদের হুঁশ হয়না।

পত্রিকার পাতায় যে কয়টি পরীক্ষার ফল জনিত আত্মহত্যার খবর প্রকাশিত হয়, মোট এমন ঘটনার তা সামান্য একটা অংশ মাত্র। আর আত্মহত্যার চেষ্টার ঘটনা তার থেকে বেশ কয়েক গুন বেশি। কেন এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে, তা নিয়ে কিছু মনোস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ আর টকশো'তে মহাপন্ডিতদের বকবকানি পর্যন্তই আমাদের কর্মকান্ড থেমে থাকে। অভিভাবক দোষারোপ করে শিক্ষক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কে। শিক্ষক দোষারোপ করে অভিভাবকের তত্ত্বাবধান ও শিক্ষার্থীর মেধাকে। এদিকে শিক্ষক, অভিভাবক, আত্মীয়স্বজন ও সমাজকে সচেতন হতে বলে নীতিনির্ধারকরা নিজেদের দায় এড়ায়। আর সবার প্রতি একরাশ অভিমান নিয়ে, ছোট্ট বুকটায় পাহাড় সমান কষ্টের বোঝা নিয়ে, সব ব্যবস্থাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে অনেক স্বপ্নদেখা মানুষটি সব স্বপ্নের জলাঞ্জলি দিয়ে পাড়ি দেয় না ফেরার দেশে।

আমরা যারা ওই বয়সটি পেড়িয়ে এসেছি, তারা কেন ভেবে দেখিনা শিশু, কিশোর বা যুবক বয়সের অনুভূতিগুলো? কেন চাপিয়ে দেই নিজেদের অপূর্ণ স্বপ্নগুলো ওদের উপরে? চাপ প্রয়োগ করে কোনো কিছু হয়েছে কোনোদিন, কোনো ইতিবাচক কিছু? "3 Idiots" বা "Taare Zameen Par"-এর মতো সিনেমাগুলো দেখে আমরা বাহবা দেই, "চমৎকার মুভি!" বলে। কিন্তু কোনো শিক্ষা নেই না, বা বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করি না, বা করার সাহস দেখাই না। পৃথিবীর সেরা মানুষগুলোর আত্মজীবনী পড়ে বা তাদের বক্তব্য শুনে শ্রদ্ধায় মাথা অবনত করি, করি না তাঁদের পথ অনুসরণ।

আমাদের দেশের মতো হাস্যকর শিক্ষা ব্যবস্থা উন্নত বিশ্বের কোথাও নেই। এমনকি উন্নয়নশীল দেশগুলোও সার্টিফিকেট সর্বস্ব পরীক্ষানির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে অনেক আগেই বেড়িয়ে এসেছে। যখন উন্নত বিশ্ব পরীক্ষাপদ্ধতি প্রায় বিলুপ্ত বা শিক্ষার্থীবান্ধব করে কার্যকর করছে, তখন আমরা পরীক্ষা পরীক্ষা করে শিশুদেরও মাথা খাচ্ছি। আধুনিক দেশগুলো যেখানে শিশুর ১৮ বছর বয়সের আগে কোনো পাবলিক পরীক্ষা না নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, সেখানে আমরা পি.এস.সি ও জে.এস.সি পরীক্ষার প্রবর্তন করে কী প্রমাণ করতে চাই?

মহাবোদ্ধা নীতিনির্ধারক ইন্টেলেকচুয়ালদের (যাদের ইন্টেলেক্ট চোয়ালে এসে ঠেকেছে!), যারা বহু উচ্চতর ডিগ্রীর ভারে চলার ক্ষমতাই হারিয়েছেন প্রায়, পঞ্চম বা অষ্টম শ্রেণির সব প্রশ্নে উনাদের পরীক্ষা নিলে হয়তো উনারা পরীক্ষা পদ্ধতির প্রয়োজনীয়তা ও শিক্ষা ব্যবস্থার ত্রুটিগুলো ধরতে পারবেন।
এতো এতো বিষয়, এতো এতো পরীক্ষা, এতো এতো পড়ার চাপ স্বাভাবিক মানবতা বিকাশের পথেই বিশাল অন্তরায় হয়ে দাড়িয়েছে।

আমরা ক'জন প্রাথমিক, মাধ্যমিক বা উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের কয়টি বিষয়ের কতটুকু মনে রাখতে পেরেছি? যদি মনেই না থাকলো তাহলে অতোগুলো বিষয় অধ্যয়ন করে অতোটা সময় (জ্ঞানার্জনের শ্রেষ্ঠ সময়) নষ্ট করা কেন? যে পুরানো পরীক্ষাগুলোর ফলাফল নিয়ে এতো গর্ব আমাদের সেই একই পরীক্ষায় যদি ফেল করে বসি, তাহলে কী মানে হয় ফালতু পরীক্ষা ব্যবস্থার! প্রতিবেশি দেশগুলোতেও সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিক্ষাচিন্তার ছিটেফোঁটাও যদি ধারণ করতে পারতাম, ব্যাপকতায় আমাদের জ্ঞান বিশ্বসীমা ছাড়াতো।

উন্নত দেশগুলোতে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীরাও জানে না পরীক্ষা কী জিনিস! আর আমাদের শিশুরা প্রাক-প্রাথমিক স্কুলে ভর্তি হবার সময়েই জেনে যায়, পরীক্ষা কতো ভয়ানক এক ভিলেইন, এক আতংকের নাম!

বোধোদয় হোক আমাদের। পরিবর্তন হোক সার্বিক শিক্ষা ব্যবস্থা। শিশুরা বেড়ে উঠুক হেসে খেলে স্বাভাবিক জীবন ধারায়। ওদের সহজাত শৈশব, কৈশোর কেড়ে নেবার অধিকার কে দিয়েছে আমাদের? আমাদের রুঢ় আচরণ আর বৈমাত্রেয় শিক্ষা পরিবেশের কারনে যদি একটি কোমল প্রানেরও বিনাশ ঘটে, তার দায় আমাদের সবার।

সুস্থ্য হও শিক্ষা ব্যবস্থা! সুস্থ্য হও বাংলাদেশ!


প্রদ্যোত
(শিক্ষা ও সংস্কৃতি কর্মী)

সর্বশেষ সংবাদ