বাংলা ফন্ট

একশত টাকার ফুল ও একটি ভুল

14-02-2017
শেখ রাসেল ফখরুদ্দীন

একশত টাকার ফুল ও একটি ভুল

বিক্রমপুরের ছোট্ট সুন্দর একটি গ্রাম বিদগাঁও। সকাল ৯ টার মত বাজে। বসন্ত এসে গেছে কিন্তু শীত তেমন কমেনি। এখনো কম্বল গায়ে দিয়ে নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে অনন্ত। মায়ের ডাকে ঘুম ভাঙে অনন্ত'র। এই অনন্ত ওঠ বাবা, আজ মঙ্গলবার তোর না ঢাকায় যাওয়ার কথা। তোরা বলে আজ সবাই পিকনিকে যাবি? অনেক বেলা হয়েছে ওঠ বাবা ওঠ। এক লাফ দিয়ে চৌকি থেকে নিচে নামলো অনন্ত। গোসল সেরে নাস্তা করে বিশ মিনিটের মধ্যেই তৈরি হয়ে গেল সে। অনন্ত' র মা ছাড়া পৃথিবীতে আপন আর কেউ নেই। অনন্ত'র বয়স যখন ছয় তখন ওর  বাবা পরপারে পাড়ি জমান। অনন্ত এখন গ্রামের পাশে একটি  কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। সারা রাত ভরে অনন্ত শুধু জবার কথা ভেবেছে। জবা ঢাকায় থাকে। ঢাকার একটি নামকরা কলেজে প্রথম বর্ষের ছাত্রী। গ্রীষ্মের ছুটিতে গত বছর জবা বেড়াতে  গ্রামে এসেছিলো। এই গ্রামের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব ভোদাই হালদারের ভাগ্নি সে। চেয়ারম্যান এর বাড়ির পাশেই অনন্তদের বাড়ি। অনন্তদের বাড়ির পাশেই বিশাল একটি পুকুর। ওই পুকুর পাড়ে বসে রোজ সকালে একটি হোগলা পাটিতে বসে অনন্ত পড়তে বসতো। জবা প্রায়শই ওই পুকুর পাড়ে আসতো। এভাবেই দুজনার দেখা, পরিচয় বন্ধুত্ব, ভালোলাগা থেকেই ভালবাসা হয়ে যায়। দুটি অবুঝ মন এক হয়ে যায়। জবাকে না দেখে অনন্ত একটুও থাকতে পারেনা আবার অনন্তকে না দেখে জবাও থাকতে পারেনা। গভীর রাতে বাড়ির পাশে আম বাগানে দুজনে দেখা করতো। জবার মামা ভোদাই হালদার বিরাট পাজি লোক। যদি দেখে ফেলে বা ওদের দুজনার সম্পর্কের কথা জেনে যায় তাহলে হয়তো অনন্তকে মেরেই ফেলবে। দুজনার মনে আতঙ্ক উৎকণ্ঠা কাজ করতো। গ্রীষ্মের ছুটি শেষ হয়ে যায়। জবা ঢাকা চলে যায়। গত একবছরে দুজনার এক বারেও দেখা হয়নি। তবে ফোনে কথা হতো প্রতিনিয়ত। এক বছর পরে আজ বিশ্ব ভালবাসা দিবসের দিন জবার সাথে দেখা হবে ভাবতেই পুলকিত হচ্ছে অনন্ত। মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে হাটা ধরলো অনন্ত। তবে ওর মনটা খুব খারাপ। আজ একটি মিথ্যা কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়েছে। মাকে বলেছিলো বন্ধুদের সাথে পিকনিকে যাবে। কিন্তু পিকনিকের নাম করে জবার সাথে দেখা করতে যাবে ঢাকায়।  বাসে চড়তে পারে না অনন্ত। মা তা জানে। তাই দুইটা পলিথিন ব্যাগ দিয়েছিলো অনন্ত'র পকেটে গুঁজে। নৌকা দিয়ে পদ্মা নদী পাড় হয়ে বাসস্ট্যান্ড এ আসলো অনন্ত। বাসে ওঠে কিছুই ভালো লাগছেনা। বার বার মায়ের কথা মনে পড়ছে। নিমতলা নামক এলাকায় এসেই ঢালে বমি শুরু হল। বমি করে অনন্ত দুর্বল হয়ে গেল। কোনো রকমে পৌঁছল ঢাকার গুলিস্তানে। প্রচণ্ড ক্ষুধার্ত ছিলো অনন্ত। পকেটে দেখে মাত্র আড়াই শো টাকা আছে। না বেশী কিছু খাওয়া যাবেনা সিদ্ধান্ত নিলো সে  ফুটপাত থেকে পাঁচটাকা দিয়ে এক গ্লাস লেবুর জল পান করে ক্লান্তি কিছুটা দূর করলো। দুটি রজনীগন্ধা ও একটি গোলাপ ফুল একশ টাকা দিয়ে কিনে রিকসা নিয়ে টিএসসি চলে গেল। বাসে থাকা অবস্থায় একাধিক বার জবার সাথে মোবাইলে কথা হয়েছে অনন্ত'র। সকাল থেকেই তাঁর জন্য অপেক্ষায় আছে জবা। রিকসা থেকে রাজু ভাস্করের সামনে নামলো অনন্ত। জবাকে এতদিন পরে দেখে খুশিতে আত্মহারা। অনন্তকে জড়িয়ে ধরলো জবা। কিন্তু শত শত লোকের সামনে একটু শরম ও ভয় কাজ করছিলো অনন্তর। শরীরটা কাঁপছিল। সে এক অন্য রকম অনুভূতি। দুজন দুজনার হাত ধরে অনেকক্ষণ হাঁটাহাঁটি করলো ও অনেক কথা বললো তাঁরা। জবা হুট করে একটি বায়না করে বসলো অনন্ত আমাদের বাসায় তোমাকে যেতে হবে। কিন্তু অনন্তর যেতে ইচ্ছে করছিলো না। কারণ পকেটের অবস্থা তেমন ভালো নয়। জবার অনুরোধে বাধ্য হয়েই যেতে হলো। জবাকে আজ অনেক সুন্দর লাগছে। হলুদ রঙ্গের একটি শাড়ি পড়েছে। ঠোটে হালকা লাল লিপস্টিক, হাতে লাল চুড়ি। মাথায় ফুলের তৈরি একটি মুকুট। যেন বিক্রমপুরের রাণী। গাড়ির পিছনে জবা ও অনন্ত বসেছে। সামনে ড্রাইভার। আস্তে আস্তে চলছে গাড়ি। জবাদের সাদা রঙ্গের গাড়ি। পথিমধ্যে জবা গলা থেকে তাঁর স্বর্ণের চেইনটি অনন্তর গলায় পড়িয়ে দেয়। অনন্তর বুকে মাথা রেখে জবা বলে ওঠলো আমার ভালবাসার উপহার। রাস্তায় জবা আর কিছু বললো না। ধানমন্ডি ৭ এ জবাদের আলিসান বাড়ি। বাড়ির ভিতরে ঢুকে অনন্তর মন খারাপ হয়ে গেল। অনন্তকে নিচ তলায় রেখে দ্বিতীয় তলায় জবা চলে যায়।  জবার মামা গ্রামের চেয়ারম্যান ভোদাই হালদার তাঁর লোকজন নিয়ে এই বাড়িতে। চেয়ারম্যানকে দেখে অনন্ত ভয় পেয়ে যায়।

বাড়ির ভিতরে ঢোকার সাথেই দরজা বন্ধ করে অনন্তকে ব্যাপক মারধর করলো তাঁরা। শাসিয়ে চিৎকার করে  আলহাজ্ব ভোদাই হালদার বললো বান্দির পুত তরে গ্রামেই খেয়ে ফেলতে পারতাম। কিন্তু খুন খারাবি অনেক আগেই ছেড়ে দিছি। মানুষে আমারে অহন ভালো জানে তাই তরে শহরে আইন্না একটু জামাই আদর করে দিলাম। যেন গ্রামের মানুষ কেউ কিছু না জানে। আমার ভাগ্নির সাথে...। অনন্ত মার খেয়ে বাড়ি থেকে বের হয় যায়। রাস্তা দিয়ে হাঁটছে অনন্ত। ঠোটের কোনা দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে। গায়ের শার্টটি ছেড়া। মাথার চুল গুলো এলোমেলো। আশেপাশের লোক গুলো যেন কেমন কেমন করে তাকাচ্ছে অনন্তর দিকে। গুলিস্তান এসে অনন্ত বাসে ওঠলো। দুচোখ দিয়ে পানি পড়ছে অঝোর ধারায়। মনে মনে বলতে লাগলো জবা কেন আমার সাথে এমন করলে। কি দোষ ছিলো আমার?  কি ভুল ছিলো আমার ?

বাস চলছে বাস  শো শো করে বিক্রমপুরের দিকে।

সর্বশেষ সংবাদ