বাংলা ফন্ট

ধারাকাব্য ম্যানগ্রোভ মন বাদাবনের মায়াবী আখ্যান

01-03-2017
হামিম কামাল

ধারাকাব্য ম্যানগ্রোভ মন বাদাবনের মায়াবী আখ্যান
ছবি: একুশে বইমেলায় কাগজ প্রকাশনের সামনে ম্যানগ্রোভ মন কাব্যগ্রন্থের পাঠ উন্মোচন করছেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব কবি কামাল চৌধুরী(সর্ববায়ে,বই হাতে) ,রাজু আহমেদ মামুন, পশ্চিম বঙ্গের কবি জহর সেনমজুমদার এবং কবি শামীম রেজা। ফটোগ্রাফার: স্বকৃত নোমান


।এক।

প্রথমেই একটি বিষয় জানিয়ে রাখা দরকার। তা হলো, এ লেখা যখন লিখছি তখনও আমার সুন্দরবন দেখার সৌভাগ্য হয়নি। কিন্তু এক কবির শব্দপ্রয়োগশক্তির ওপর ভর করে সেই বাদাবনে, যেন দীর্ঘ সব দিন যাপন করে এই মাত্র ফিরে এলাম। ধারাকাব্য ‘ম্যানগ্রোভ মন’ পড়ে আমার অনুভূতিটি এই। গুণী এ কবির নাম রাজু আহমেদ মামুন। কবির প্রকৃতি দেখার চোখদুটি এই ধারাকাব্যে তার দর্শনকৌশল প্রকাশ করেছে। বেশ অভিনব সেই দর্শনকৌশল। আমি ওই চোখজোড়ার প্রশংসা করছি সবার আগে। বিচিত্র এ বীক্ষার দৌলতে কবির দার্শনিক ভাবনাধারার সঙ্গে পরিচিত হতে পেরেছি। 
কেমন সে ভাবনাধারা? সুন্দরবনকে যে এমন রতিমুখর দৃশ্যকল্পে ফুটিয়ে তোলা যেতে পারে, এবং সৃজনমুখরতা থেকে শুরু করে মায়া ও মৃত্যুমুখিতা প্রকাশের এটিই যে আমোদপূর্ণ নৈর্ব্যক্তিক পথ, তা এর আগে বুঝতে পারিনি। অস্বীকার করব না, লেখাগুলো প্রথমে একটু ভাল্গার লেগেছিল। লাগলেও- পরে যখন কবির মেজাজ সয়ে গেল, তখন বেশ ভালো লেগেছে। 
কিন্তু কেন? নিজের মতো ব্যখ্যা করার আগে আরও দুটো কথা বলে নিই। আমার মতে, সাহিত্যস্রষ্টার গোপন কথাটি হলো, তিনি এক পরিচিত পৃথিবীকে অপরিচিত দৃষ্টিকোণ থেকে দেখাবেন বলে কথা দিয়েছেন। যার কাছেই এই কথা দিয়ে থাকুন, কথা যে দিয়েছেন স্বয়ং প্রকৃতি তা জানে। আমার ব্যক্তিগত মত— কবি তার দেয়া কথাটি রেখছেন। এটুকু নিজের মতো করে বুঝে নিয়ে সঙ্গে আরও একটি বিষয়ের অপ্রিয় সত্য আমাকে মেনে নিতে হচ্ছে। তা হলো, আমার মতো একজন তুচ্ছ পাঠক কাব্যরস নেয়ার জন্য রুচির সবচেয়ে স্থুল জিভটাই ব্যবহার করবে। আর কল্পনাতেও ব্যবহার করবে স্থুল মনশ্চোখ। তুচ্ছতা অতিক্রম করতে পারিনি, সুতরাং কী আর করার আছে? 
স্থুল জিভে কবিতা তো চাখলাম। এবার স্থুল সেই মনোশ্চোখে আমি কী দেখেছি তাও বলি। দেখেছি, কাব্যের অধিাষ্ঠাত্রী দেবী কবির মুখের ওপর তার সুবাসিত আঁচল বুলিয়ে গেছেন, তবে আঁচল পেতে বসতে এখনো দেননি। সে পরিকল্পনা তাঁর আছে, তবে তা ভক্তের ধ্যানসাপেক্ষ। এ বিষয়গুলো যেহেতু সাপেক্ষ বর্তমান, এসব ছেড়ে এবার ধ্রুব দিক নিয়ে ছুটি। এখানে কিন্তু একটি সম্পূর্ণ গল্প রয়েছে। বনের এ গল্পে কোনও মানব মানবী একচেটিয়া নায়ক নায়িকার স্থান নেয়নি। এখানে বস্তু ও প্রাণিজগতের সব সদস্য চরিত্র হিসেবে এসেছে। কবিতার সাধারণ জগৎ তো বহুকাল হলো ‘আমি-তুমিতে’ আটকে আছে। অর্বাচিনের হাতে আরও ক্লীশে হয়ে উঠছে এ জগতের হালচাল। ‘আমি-তুমি’ ভাব থেকে মুক্ত হয়েও একটি প্রচ্ছন্ন ‘আমি’ এখানে রয়েছে, তবে তা গুপ্ত পর্যবেক্ষকের স্থানে, তার এই ‘আমি’র ধড় এবং ভর দুটো আলাদা। ধারাকাব্যে ওই গুপ্ত পর্যবেক্ষকের বর্ণনায় একটি সম্পূর্ণ ও সম্পন্ন গল্পের আবেদন ছেড়ে আমি এক মুহূর্তের জন্যেও উঠতে পারিনি। কবিতাগুলো যখন পড়েছি, নিজের মতো করে বাক্যবন্ধ ভেঙে উচ্চারণ করেছি। এখানেও সেভাবেই লিখে দেখালাম। অনুরোধ করি, কবি ও পাঠকরা এজন্যে নিজগুণে আমাকে ক্ষমা করবেন। 
প্রথমে দেখিয়ে নিতে চাই কোন কোন বাক্যবন্ধ কখনও ছান্দসিকতায়, কখনও ভাষ্যে, কখনও দৃশ্যে আমাকে কাবু করেছে। যাত্রাটা একটু দীর্ঘ হবে বলে আমি বিব্রত, কিন্তু নিরুপায়।

।দুই।

বনবিবি আহা বনদেবী/ তোমার পেটানো গড়ন/ শ্যামলকান্তি দেহ/ লাবণ্য লাবণ্য খেলা একা একা কাহারে দেখাও!/... কামার্ত চোখ মৌসুমী বেশ/ কামনা করে সামর্থ্যবান/ জঙ্গলা নিঃশ্বাস উত্তাল যোনীদেশ/ কামনা করে সামর্থবান (ম্যানগ্রোভ মন— ১)

রাত বা দিনের কোনো প্রহরে/ বাঘিনী মিলনকাতর হবে গহীন প্রান্তরে/ জ¦লে উঠবে বাঘার সুখজৌলুস/ রতিকাতর হরিণীর গন্ধে আস্ফালনে ছুটে আসবে প্রথম প্রণয়কামী তরুণ হরিণ/ জড়াজড়ি করে দু’টি সাপ ফুঁসতে থাবে সুখ যন্ত্রণায়/ ... কোনো মোয়ালের পো নতুন বউয়ের সাথে জাগবে সারারাত/ সুখ সুখ ছোঁয়ায় (ম্যানগ্রোভ মন— ২)

যৌনে অযৌনে বিপুল/ বিপুল দোলায় জাগে অর্থহীন চিত্রে বিচিত্র সুন্দর (ম্যানগ্রোভ মন— ৩)

বলগা বাতাসে কেওড়া পাতার শিস বানরের চিৎকার/ হঠাৎ নড়ে ওঠা গোলবন ছেড়ে ছুটন্ত ক্ষুধা/ ... গীলা লতার আড়ালে নড়ছে ঝরাপাতা/ প্রাচীন সরীসৃপ খুলে নিচ্ছে শরীরের প্যাঁচ/ প্যাঁচানো খালের শরীরে পোয়াতি শূকরীর মতো ফুলছে জল (ম্যানগ্রোভ মন— ৪)

বানডাকা অমাবস্যার জল যখন দাঁড়িয়ে পড়ে/ কুমির ভরা রাত বুক ঠেলে উঠে আসে বাদার ডাঙায়/... হ্রস্ব হ্রদের বাঁকে খেলা করে জীবনের নতুন সংরাগ/ জমে থাকে জমে ওঠে কুমির সঙ্গম (ম্যানগ্রোভ মন— ৫)

নুনপোড়া রোদের তাতানো দ্বিপ্রহর/ জিগির ওঠে সৈকতে/ কারবার কারবার/ মৌসুম দিয়েছে ডাক দুবলার চরে/ এসেছে দিনকামলা অভাবী আত্হার/ হোগলার পাটিতে পাটিতে শুঁটকির মাঠ শুকায় মাছ/ মানুষ/ শুকায় না অভাব (ম্যানগ্রোভ মন— ৬)

বনের পরে সমুদ্র কিনারে মন্দির/ আছে রাধাকৃষ্ণ/ বাঘের দেবতা গাজী বনদেবীর সাথে গঙ্গা/ ধন্য রাসমেলা উৎসবে/ বাঙালি যেন সমুদ্র চেতনা (ম্যানগ্রোভ মন— ৭)

বনবিবি বনদেবী মানে সর্বজন/ বাঘের দেবতা গঙ্গার বোনপো—/ শ্বশুর মুকুট রায় চম্পার বাজান/ মিলেমিশে একাকার হিন্দু মুসলমান (ম্যানগ্রোভ মন— ৮)

ডিমের গর্তে পৌঁছলে জোয়ারের জল/ বেরুবে খোলস খুলে কাছিমের ছানা/ হাজার মাইল দূরে চলে যাবে ওরা তবে/ জননে জলগানে ফিরবে আবার (ম্যানগ্রোভ মন— ৯)

বনমোরগের ঝুঁটির মতো লাল হলে সাগরের জল/ ঝিঁঝিঁদের ঘুমগানে নামে রাত/ জাগে বিচিত্র মৃত্যুর নাচ/ এখানে জীবন মৃত্যু করে প্রতিবাস (ম্যানগ্রোভ মন— ১১)

বাদারে আঁধারে নামে পৌরাণিক রাত/ মোয়ালের মনে জাগে চম্পাবতী চাঁদ/ চম্পাবতী রূপবতী রোদেলা শরীর/ ইলিশ আঁশের মতো রুপালি নখর (ম্যানগ্রোভ মন— ১২)

ছোট গর্ত, ছোট দৌড়, ছোট স্নেহ হাঁটে/ জ্যোৎস্নার রূপসী রাতে/ বিস্তীর্ণ সৈকতে বনদেবী খুলে দিলে চারুহাত—/ নামে স্নেহমাখা অগুনতি কাঁকড়ার ঝাঁক (ম্যানগ্রোভ মন— ১৪)

শুধু ভয় মৃত্যু দৌড় শেষ কথা নয়/ প্রজাতি জীবনে থাকে আয়েশি সময়/ কেওড়ার ছায়া প্রান্তর ধরে চন্দ্রমায়/ নেমে আসবে চিত্রল হরিণের পাল/ তটরেখা জুড়ে হবে শিংয়ের খুনসুটি/ প্রণয়ে প্রণয়ী হবে বেশ উন্মাতাল (ম্যানগ্রোভ মন— ১৫)

বহে গোসাপ শিশুর ফুটফুটে সকাল/ গোপন সুড়ঙ্গ ছেড়ে ফার্ন ঝোপে দেখে আলোর বিচ্ছুরণ/ মৃত্যু চেনে না তাই ভয়হীন জীবন চাখে বাস্তুর নন্দন (ম্যানগ্রোভ মন— ১৭)

কিশোরী স্তনের মতোন নতুন চর/ গড়ায় জড়ায়ে ধরে ঢেউভাঙা জল/ জলে আসে ওঁড়া কেওড়া, সুন্দরীর ফল/ বছর ঘুরলে হবে গোলের বাগান/ হরিণ পিঠে বানর, আসবে পেছনে রাজবাঘ... (ম্যানগ্রোভ মন— ১৮)

জেগেছে রুদ্র সুন্দরী বঙ্গোপসাগর/ ... আত্মসঙ্গমে ছটফট ষোড়শী বিছানা/ শ-শ-শ শীৎতকারে সদা ব্যাকুল মাতাল/ ফলাতে জীবন কী যে সঙ্গম মাতম! (ম্যানগ্রোভ মন— ১৯)

ঢেউয়ে ঢেউয়ে মৃত্যু ছুটতে পারে ঝড়/ তবুও আগাও মাঝি খোঁজো জলের রং/ যে জলে রুপালি স্বপ্ন ইলিশের ঝাঁক/ জাল ফেলে তুলে নাও খুশির মোহর (ম্যানগ্রোভ মন— ২০)

পেরিয়ে দুর্গম বন সমুদ্র কিনারে/ শুঁটকি পল্লীতে আসে কর্মী যুবতীরা/ মহাজন চোখে খেলে ইলিশে ঝিলিক/ মেলাতেই হবে ঠিক লীলার রসদ (ম্যানগ্রোভ মন— ২২)

শরীরের কুণ্ডুলীতে স্নেহমাথা ডিম/ বীতনিদ্র সর্পমাতা প্রজাতি সংগ্রামে/ বেজিদের বাড়ি থেকে দূরে সে নিবাস/ ঈগল পায়নি খোঁজ অথবা গোসাপ (ম্যানগ্রোভ মন— ২৪)

বিকট গুলির শব্দ নিস্তব্ধ প্রান্তর/ রক্তবালুতে ছট্ফট— ব্যাঘ্র আর্তনাদ (ম্যানগ্রোভ মন— ২৫)

শুশুক বড় মিশুক প্রাণ/ মাঝির নায়ের সাথে তাই খেলে খেলে আসে বহুদূর/ মানুষের বন্ধু হাতে চায়/ মানুষ কী বন্ধু হতে পারে! (ম্যানগ্রোভ মন— ২৬)

বানর নেমেছে জলে/ মাছ যদি মেলে/ আমিষ উৎসব!/ ... শুধু কি আমিষ মেলে!/ যদি জলের তলে কুমিরের চোখ/ তক্কে তক্কে— কখন সুযোগ/ সুযোগ সবার কিছু মেলে/ যে প্রকারে গ্রহণে বিলীনে/ মিটে যায় প্রকৃতির ঋণ (ম্যানগ্রোভ মন— ২৭)

সারাদিন কেটে গেছে খুঁজে/ কোথাও মেলেনি তার লাশ/ বুনো খালে যেন ধ্যানী বক/ ঝিম মেরে শোকাতুর নাও (ম্যানগ্রোভ মন— ২৮)

এসেছে গীত সন্ধ্যায় বধূ— মোয়ালের/ দূর গ্রাম থেকে/ জেগেছে উৎসবে পরিজন/ বরণে পড়েছে বেশ ধুম/... খোলসী ফুলের মতো বউ/ সংসারে সে ফলাবে জীবন (ম্যানগ্রোভ মন— ৩০)

গল্পগুলো বলতে বলতে কাঁদে/ গল্পগুলো খিলখিলিয়ে হাসে/ গল্পগুলো রাঁধে বাড়ে খায়/ গল্পগুলো বৈঠা ঠ্যালে, গায় (ম্যানগ্রোভ মন— ৩১-খ)

মাটিতে চাপড় কাটা বুড়ো যোগীর শীর্ণ হাতে বাঘের হুঙ্কার/ শ্মশ্রুমুখে শ্লোকের স্রোত/ চোখের চাবুকে মন্ত্রের ঘোড়া দৌড়ায়/... মন্ত্রঘায়ে লাফিয়ে ওঠে গাজী কালু বনবিবি/ দাবড়ায় সারা বন (ম্যানগ্রোভ মন— ৩৩-গ)

নাড়া খেলে কুমিরের লেজে/ আন্ধারে আলো ঝলকায়/ গলুইয়ে মগ্ন বকের মতো নিকারী জোয়ান ভাসে/ বাসনার বিচিত্র ছবির মাঝে/ বনান্তে দূর গাঁয়ের কোনো নয়াল জোয়ানী/ কাঁকড়ার কৌণিক সোগাহী চলন যার/ সেই তো করেছে চুরি প্রাণের লাটাই/ যেতে হবে তার কাছে/... প্রাণ টানে প্রাণ, জাগে স্বপ্নের শ্বাসমূল (ম্যানগ্রোভ মন— ৩৫)

জেগে ওঠে ভোরে ভোঁদড়ের গ্রাম/ গর্তমুখে দলপতি দেখে চারপাশ/ প্রতিবেশী খুব বেশি নেই/ আর কমে গেছে শত্রু, মিত্র/ শুধু খালের পারে দূরে— বাইনের সুউচ্চ শাখায়/ ক’টা দিন বসে আছে ঠায়/ এক রুগ্ন বাঙাল শকুন (ম্যানগ্রোভ মন— ৩৭)

বয়সী মোয়াল জানে/ গরানের ক’টি পাতার আড়াল থেকে মাটি ফুঁড়ে যেন/ উঠে আসে বাঘ/ মেধাবী শিকারি বটে!/ তবু মানুষের কাছে সে দণ্ড পাওয়া পশু/ বনান্তে নেমেছে তাই দণ্ডধারী মানুষের দল (ম্যানগ্রোভ মন— ৩৮)

পচাব্দি গাজী/ গাজীর বেটা/ সাহস যার নাম/ মেরেছে যে নরখেকো আশি নব্বই/ সে কিনা শিশুর মতো ঘুম জেগে কাঁদে!/... শপথ নিয়েছে গাজী, ফিরে যাবে বাড়ি/ বনের বাঘেরা তবে বনেই বেঁচে থাক (ম্যানগ্রোভ মন— ৩৯)

আকাশের বুকে ঘনিয়েছে পাগলা বয়াল মেঘ/ বাইনের বিশ্বস্ত শাখা ছেড়ে/ অরণ্য গহীনে উড়ে গেছে তিলা ঈগল , বাঁশিচোরা, ভীমরাজ পাখিদের ঝাঁক (ম্যানগ্রোভ মন— ৪০-১)

ছুটছে দাঁতাল শূকর শিঙ্গাল হরিণ বানর মোষ বাঘ/ একই পালে বাঘের পায়ে পায়ে হরিণ শাবক/ ঘন বন আরো ঘন বন ঠিকানা সবার/... আজ ছোঁবে না কাউকে কেউ/... শিকার ভুলেছে বাঘ/ আজ সকলেই বায়ু আর জলের শিকার (ম্যানগ্রোভ মন— ৪০-১)

সমুদ্র ছুটেছে ডাঙায় বৃক্ষেরা প্রহরী দেয়াল/ বাতাস দিয়েছে জলের ক্ষিপ্র গতি জলের গর্জন/ এ প্রলয় বাতাস আর জলের যৌথ আয়োজন (ম্যানগ্রোভ মন— ৪০-২)

সিবসা, রায়মঙ্গল, মালঞ্চ, বলেশ্বর যতসব বুনো নদী/ হারিয়েছে জলের তলায়/ জল সে আজ তীব্র ত্রাসের ছুরি/... পাগলা বয়াল বাতাস জাগিয়েছে শিঙের তা-ব/ ছিঁড়েখুঁড়ে টুকরো টুকরো উড়ছে চরাচর (ম্যানগ্রোভ মন— ৪০-২)

বায়ু আর জল জীবনের নিয়ামক/ জীবন সংহারে হলো তাদের উৎসব (ম্যানগ্রোভ মন— ৪০-২)

কেটেছে গতির ঘোর ক্লান্ত বাতাস/ সাগরের জল ফিরেছে সাগরে নদীরা দৃশ্যমান/...নদীর শরীরে ভাসছে গানহীন পাখি/... ডাকহীন পশু (ম্যানগ্রোভ মন— ৪০-৩)

আহত কুকপক্ষীর ভাঙা গলায়/ বেজে ওঠে বিকৃত আওয়াজ/ নড়ে ওঠে বনতল/ মগডালে পাখা ঝাড়ে শিকারী ঈগল (ম্যানগ্রোভ মন— ৪০-৪)

।তিন।

দুঃসাহসী। খোদ বনের দেবীকে কি এ ধারায় প্রশ্ন করা যায়? হয়ত কবি তার চেয়ে শক্তিমান, তাই এমন দুঃসাহস দেখালেন। বনদেবীর প্রতি এমন ভাষণ গোটা কাব্যধারার গমনপথটি দেখিয়ে দিয়েছে। 
একদিকে রতিমুখর বন, অন্যদিকে প্রকৃতির সমতাবিধান-রীতি। সৃজন যেখানে স্বতঃস্ফূর্ত, মৃত্যুর ফাঁদও সেখানে পদে পদে পাতা। সৃজনদুয়ার খোলা রাখবে বলে প্রকৃতি কিছু বিভ্রান্তির আয়োজন করেছে। কাম, কামজ প্রেম এই আয়োজনের মূল অনুষঙ্গ। আর মৃত্যুমুখিতা বজায় রাখবে বলে প্রকৃতি কিছু দাসত্বে বাধ্য করেছে। খাদ্যচক্র এই দাসত্বশৃঙ্খল, না চাইলেও পায়ে জোটে, ঝনঝনাৎ শব্দ করে। আর প্রাকৃত-গণেশ উল্টে যেতেও প্রস্তুত। সারাটিক্ষণ প্রাণ বাঁচায় যে জল, যে হাওয়া— কাব্যোপাখ্যানের শেষে দেখেছি কী করে সেই জল ও হাওয়া প্রাণ কেড়ে নিয়ে সমতাবিধানে প্রকৃতির অন্ধ নীতিকে প্রতিষ্ঠা করে। 
গতিময় এ আখ্যানে পাশবপ্রেম পাশব-রমনের পাশাপাশি এসেছে মানবপ্রেম, মানব-রমনের বেগ। এখানে হরিণীর ঘ্রাণে হরিণ ছুটে আসে, বাঘিনীর আহ্বানে বাঘা। পাশবরমনের সাধারণ ছবি এসব, বহুবার এমন ছবি আঁকা হয়েছে। আবার জলের নীচে ভেটকি কোরালের কেলি আর বিষাক্ত গোখরা মায়ের ডিম আগলে রাখার মমতার মধ্যে মেলে প্রাকৃত সুন্দরের ছবি। এ ছবিও বহুবার আঁকা হয়েছে। যা আঁকা হয়নি তা হলো, এ দুয়ের সম্মিলিত রূপ। এখানে মোয়ালের ঘরে জীবন ফলাতে মোয়ালবধূ আসে, নয়াল জোয়ানীর বিরহে কাতর হয় নিকারী জোয়ান। জীবন এখানে প্রথার অনুবর্তী এবং প্রাকৃত ধারায় সুন্দর। ওদিকে শুঁটকিপল্লীতে মৌসুমী বারবণিতা আসে, চোখের পাতায় নিষিদ্ধ আহ্বান। তখন মহাজনের উচাটন মন স্থিত প্রথাকে না মেনে ও প্রাকৃত সুন্দরকে না যেচে পাশবিক অনিবার্যতার পেছনে ছোটে। মানুষ তো আদতে পশুই। এই বিষয়টি যখন প্রতিষ্ঠিত হয় তখনই শিল্প একটি সম্পন্ন মেজাজ পায়। কল্পনার সুরলোক থেকে বাস্তবের নরলোকে নেমে আসে। এবং প্রাকৃতিক বাস্তবতার, চারিত্রিক সাম্যনীতির প্রতিনিধিত্ব করতে শুরু করে। এই প্রতিনিধিত্বের অভাবের কারণে বস্তুবাদী শিল্পীরা অনেক হা-হুতাশ করে গেছেন। সে অভাব এখানে মিটেছে। 

ম্যানগ্রোভ মন ৪-এ কোনো ফাঁকে এক শিকারী এই মায়া উপাখ্যানে ঢুকে পড়ে। এই শিকারী খলনায়ক, ২৫-এ এসে সে তার মাহাত্ম্য দেখায়। বনের প্রতীকের মৃত্যুর কারণ হয়। রক্তবালুতে নিথর পড়ে থাকে বাঘ। প্রতীকের মৃত্যুর পর বনের এই আখ্যানের গমনপথ ক্রমে বিয়োগান্তিকতার দিকে যেতে থাকে। ভোঁদড়ের গ্রামে দলনেতা স্মৃতিতে কাতর হয়। ডালের ওপর অপেক্ষায় থাকে মৃত্যুর দূত— বাংলা শকুন। ঋতু বদলাতে শুরু করে। অভাবি মোয়াল-বাওয়ালি-জাল্লাদের ঘরদোর ক্ষুধার কাঁপনে ভেঙে পড়ে, মরিয়া হয়ে ওঠে ওরা। বাঘচালানের মন্ত্র শোনা যায়, বনময় দৌড়োতে থাকে কল্পনার বাঘ। গীলা লতায় দোলে কুহকী ভবিষ্যত। প্রতীকই চলক। চলকের মৃত্যুতে প্রকৃতি বোঝে, ঢেলে সাজাতে হবে বন। শেষটায় কী হয়? 

সাগরের জল ফেঁপে নদী হারিয়ে যায়। পাগলা বয়াল মেঘের যে নীরব বার্তা, প্রাণী তাতে অস্তিত্বের ঘণ্টাধ্বনি শোনে। বাইনের বিশ্বস্ত শাখা প্রবোধ দিতে পারে না, দিতে চায়ও কি? সেও প্রকৃতির রুদ্রমূর্তির শিকার হয়। জয় বাবা কালারুদ্দুর! শৈব প্রকৃতি কী প্রাণঘাতী তা-বেই না মাতে। প্রাণের ক্রোড়ে প্রাণহারি, প্রাণহারির ক্রোড়ে প্রাণ। আর গন্তব্য? সে আরও গহীন বাদাবন। প্রকৃতির যে সৃজনমুখরতা, মৃত্যুমুখিতার সঙ্গে যুগপৎ পরিচয় প্রথম থেকেই কবি করিয়ে দিতে দিতে এগোচ্ছিলেন, এখানে এসে তার দার্শনিকতা পূর্ণতা নিয়ে উপস্থিত হয়। কী করে? প্রকৃতি জানে, কেওড়া সুন্দরীর যে জলভাসী ফল বনকে বাড়ায়, তারা আবার ছড়িয়ে পড়তে লেগে যাবে। হরিণের পিঠে চড়ে আসবে বানর, তাদের পেছনে বাঘ। আর আগেই তো পৌঁছে গেছে মৌয়ের মাছি। বন বাড়লে আসবে বাওয়াল, মোয়াল বাড়াবে মৌ, আর জাল্লারা ‘রুদ্রসুন্দরীর’ সঙ্গরত জঙ্গরত তো আছেই। এই তো চলে এসেছি এক বাঁকে। আমার স্থুল চোখ কিন্তু রুদ্রসুন্দরীকে কল্পনা করতে গিয়ে বারবার ঠেকে গেছে। রুদ্রের মতো অতিপুরুষে আমি কোনো সুন্দরীকে দেখতে পারিনি। আমি ক্ষমা চাই। উপমান ও উপমিত এখানে একটা বচসায় লেগেছে। সে বচসা শুনতে আমার ভালো লাগেনি। কারণ বাদাবনের অদূরবর্তী লোকালয়ে ব্রাত্য হিন্দু- মুসলমানের সহাবস্থান চলছে, এ দৃশ্য যখন দেখতে পেলাম, আমার শান্তির অনুবর্তী হৃদয় কৃষ্ণের রাসলীলায় গাজী পীরের শিরনির বিতরণ করতে শুরু করল। আর গাজী পীরের আস্তানায় বাজতে লাগল রাশলীলার ঢাক। 

ধারাকাব্যের আনন্দপাঠ শেষে মনে একটি উভদিকগামী ভাষ্য আমার মনে জেগেছে। ম্যানগ্রোভ বন টিকে থাকলে টিকে থাকবে ম্যানগ্রোভ মন এবং ম্যানগ্রোভ মন টিকে থাকলে টিকবে ম্যানগ্রোভ বন। এ সত্য কিন্তু পরস্পরনির্ভরশীল। ক্ষেত্রবিশেষে যা পরস্পরনির্ভরশীল তা চক্রেও আবদ্ধ। আর যেখানে চক্র সেখানেই গতি। আর এতো সবাই জানে, যে গতি ইতিবাচক তা-ই প্রগতি। ধারাকাব্য গ্রন্থ ‘ম্যানগ্রোভ মন’ প্রগতির স্মারকগুলোর মধ্যে নতুন সংযোজন বলে গণ্য হতে পারে।