বাংলা ফন্ট

ম্যানগ্রোভ চালিশা

28-01-2017
পার্থ বসু, কলকাতা,পশ্চিম বঙ্গ,ভারত

ম্যানগ্রোভ চালিশা
একুশে বইমেলা ২০১৭ তে কাগজ প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হতে যাচ্ছে রাজু আহমেদ মামুনের কাব্যগ্রন্থ  ‘ম্যানগ্রোভ মন’। গ্রন্থটির পাণ্ডলিপি পাঠ শেষে কলকাতা থেকে পার্থ বসু -এর প্রতিক্রিয়া...    

চল্লিশটি শ্লোকে কোনো বিষয় বিবৃত হলে তার নাম চালিশা। ম্যানগ্রোভ অরণ্য নিয়ে রাজু আহমেদ মামুন বদনবহিতে লিখছিলেন। চোখ টেনেছিল। রাজু অবশ্য শ্লোকের পরিমিতি অতিক্রম করে কবিতায়। শ্লোকের জননী শোক। রাজুও তাই শোকাকূল। বিপন্ন সুন্দরবন। চল্লিশটি কবিতায় রাজু ম্যানগ্রোভ অরণ্যের দিন রাত্রি, জীবনযাপন, জন্ম মৃত্যু, উল্লাস বিষাদ সবকিছুই ছেনে তুলেছেন পরম মমতায়। সুন্দরবনের নামাঙ্কন সুন্দরী গাছ থেকে। এই গাছের শিকড় মাটির গভীরে যায়। তারপর আবার মাথা তোলে আলো বাতাসে। অদম্য জীবনতৃষ্ণা।

জলে জঙ্গলে একাকার এই অরণ্য আজ পাকে-চক্রে দ্বিখণ্ডিত। তার বিস্তার দুটি রাষ্ট্রের সীমানায়। যদিও বাস্তব সত্যটি হল-এই বন আবহমান বাংলার। দুই বাংলার যৌথ সম্পদ। সেখানে লোভের থাবা। সংকট। প্রস্তাবিত রামপাল তাপবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে আশঙ্কার কালো মেঘ। দিল্লির সাথে চুক্তিও সম্পন্ন হয়েছে। সুন্দরবন গেল কি থাকলো তাতে দিল্লি কিংবা আদানির কোনো মাথাব্যথা নেই। কিন্তু দুই বাংলার সমূহ বিপদ। প্রতিবাদে সোচ্চার নদীর দুই কূল। সীমান্তের দুই পাড়।দুই পার। প্রতিবাদ দানা বাঁধছে।

এই প্রেক্ষিতে ম্যানগ্রোভ সিরিজ আমাদের সামনে কোন বার্তা নিয়ে আসে? রাজু কোনো স্লোগান লেখেননি। শ্লোক লিখেছেন। ভালবাসায়। কাঁদালে তুমি মোরে। সেই ভালবাসা। তার নিরীক্ষায় বাদাবন, বনবিবি, নিশিবক, শূকর শূকরী, হেতালের বন, বলগা বাতাসে কেওড়া পাতার শিস, বানরের চিৎকার, বাঘ যখন শিকারি অথবা নিজেই শিকার, হাঙ্গর কিংবা কুমির কিংবা কাছিম কিছুই বাদ যায়নি। রতিকাতর হরিণী কিংবা শঙ্খলাগা সাপ, মৌয়ালের বাসর রজনী, গেওয়া ফুল, গিলা পুষ্প, গন্ধমাতাল মধুপোকা, কুকপাখির ডাক এমনকি রুগ্ন শকুনের বিপন্ন প্রহর গুনছে যে ভোঁদড়ের গ্রাম-নজর এড়ায়নি কবির।

তাই ম্যানগ্রোভ কবিতাগুচ্ছ নিছক কবিতার শিল্প নয়। শব্দের সুরম্য মিনার নয়। আসমুদ্র খাঁড়ি ও মোহনা জুড়ে যত মোহ, মোহন প্রকৃতি, পরিবেশ,যা কিছু লবন, ক্লেশ, সবকিছুর আশ্চর্য দলিলও। অবন ঠাকুর কথায় ছবি লিখতেন। রাজুও কবিতায় ছবি এঁকেছেন। সযত্নে, পূঙ্খানুপূঙ্খভাবে। সুখবর, কবিতাগুলো গ্রন্থিত হচ্ছে, বই হচ্ছে। কবিকে আগাম অভিনন্দন।
ম্যানগ্রোভ চালিশা অবশ্য বইটির নাম নয়। রাজুর দেয়ালে গিয়ে টুকটাক মন্তব্য করেছি। বিষয় নিয়ে নয়। যা কিছু বলেছি তা শৈলিগত। নির্মাণ প্রকরণগত। কিন্তু বই হচ্ছে। রাজু আমার সামুহিক পাঠ প্রতিক্রিয়া চেয়ে বসলেন। রাজু আমার প্রিয় মানুষ। তার অনুরোধ ফেলা বা ঠেলা কঠিন। আমিও গোড়া থেকে পুনরায় পড়তে বসলাম।

প্রথম প্রতিক্রিয়া- আমি খুলে বলি, অকপটে বলি, আমি ক্লান্ত হইনি রাজু। ভয় ছিল একঘেঁয়ে লাগবে নাতো? রাজুৃ সতর্ক ছিলেন। কবিতা থেকে কবিতায় তার বাচনভঙ্গির বাঁক বদল আমায় আবিষ্ট রেখেছে। বাজী রাখতে রাজি আছি, কেবল দীক্ষিত কেন, যেকোনো পাঠক উৎকর্ণ থাকবে শেষ অবধি।
কারণ মামুন আঙ্গিক নিয়ে ভেবেছেন। নানা ছন্দে, অন্ত্যমিল রেখে বা না রেখে, প্রয়োজনে টানা গীতল গদ্যে, পংক্তি আর স্তবক বিন্যাসে পাঠকের আগ্রহ অটুট রাখেন।
মামুনের একটি কবিতা প্রসঙ্গত বিষয় গৌরব আর বাক প্রকরণে স্বতন্ত্র আলোচনার দাবী রাখে। এতে করে আমরা তার বাকি কবিতাগুলোর আবহে পৌঁছে যাব।

আমার বেছে নেওয়া কবিতাটি ম্যানগ্রোভ-৩০

এসেছে গীত সন্ধ্যায় বধূ-
মোয়ালের, দূর গ্রাম থেকে।
জেগেছে উৎসবে পরিজন,
বরণে পড়েছে বেশ ধুম।

ধানদূর্বা পড়েছে কুলায়
সাথে আছে ফুলপটি, মধু।
মোয়ালের বধূ বলে কথা,
মধূ ছাড়া হয় কি বরণ।

খোলসী ফুলের মত বউ
সংসারে সে ছড়াবে জীবন।

একটিও অপ্রয়োজনীয় শব্দ নেই। অলঙ্কার নেই। তবু নিপুন নিখুঁত রেখাচিত্র। লেখাচিত্র। শব্দগুলি কখন যেন অতিরিক্ত ব্যঞ্জনামুখর। সামান্য ক’লাইনে, শব্দের আঁচড়ে বাংলার লৌকিক অলৌকিক সংস্কার, সংস্কৃতি, লোকাচার, পরম্পরা কেমন বাঙ্ময়।

এবার কবিতার কাঠামোটি নিয়ে দু চারখানা কথা। না, আমি ছান্দসিকের মত কোনো পরিভাষাকণ্টকিত কাটা ছেঁড়ায় যাব না। কবিতা তো গদ্যের মত শব্দের মত পায়ে পায়ে পড়ার মত নয়। কবিতা পর্বে, না পর্ব কথাটাও পাশ কাটাই, কবিতা কীভাবে বাজবে নিয়ামক উঠন্তি মুলোর মত পত্তনেই কবিতার প্রথম লাইন। এই কবিতার প্রথম লাইন অনায়াসেই তার পরের লাইনগুলির সাথে তাল মিলিয়ে পড়া যায় না। প্রথম পাঠের পর পুণঃপাঠে শুরুর লাইনে ‘এসেছি’ পড়ার পর একটু থেমে মানিয়ে নিতে হয়। আপাতভাবে এটি গঠনগত দুর্বলতা। তাই?

একটা গল্প বলি।

ভ্যান গগ বিশপের চাকরি খুইয়ে চলেছেন গুরুর সকাশে। তার শিল্পের শিক্ষক। যে স্কুলে তিনি যাজক হবার পাঠ নিতেন সেখানে যাকে ঘিরে আগ্রহ ছিল তিনি আঁকার ক্লাসের মাস্টারমশাই। পায়ে হেঁটে চলেছেন। ভাড়ার সঙ্গতি নেই। পয়সা নেই। বহু ক্রোশ ভেঙ্গে পৌঁছলেন। মাস্টারমশাই দয়ালু আর স্নেহপ্রবণ। এই ছাত্রটি বাধ্য ছিল না। আঁকায় মন ছিল। কিন্তু আঁকতো নিয়ম না মেনে। মর্জিমত।

আজকেও সাথে এনেছে একতাড়া কাগজ, স্কেচ। কয়লাখনির মেয়েমদ্দ কাজে যাচ্ছে। তাদের দিনযাপন। এই সবের। ছাত্রকে আহার দিলেন। কিন্তু বিশ্রাম নয়। নিজেও বসলেন। ছবিগুলি বলিষ্ঠ। কিন্তু ব্যাকরণ? তিনি মেরামতি করতে বসলেন। এবং গলদঘর্ম। সবিস্ময়ে বললেন- তোমার রেখার চালচলন সিলেবাসে নেই, ব্যাকরণে তো নয়ই। তবু শোধরাতে গেলেই তোমার ছবির মেয়েমদ্দের চরিত্র থাকছে না।

মামুনের এই কবিতায় নববধূ মোয়ালির ঘরে আসছে। প্রথম চরণপাতে কিছু দ্বিধা লজ্জা থরো থরো, কিছু কুণ্ঠা। অতঃপর প্রত্যায়িত। পাঠে প্রথম লাইনে যদি পাঠকও ঐ নববধূটির সাথে টলে যান- অসংগত নয়।

অসাধারণ কাজ করেছেন রাজু।কুর্ণিশ!