বাংলা ফন্ট

শামীম রেজার কবিতা

14-06-2018

 শামীম রেজার কবিতা




দেশহীন মানুষের গান

গোপনতা ওগো গোপনতা

আলিঙ্গনে ছুরি বসিয়েছো, গোপনতা ওগো
গোপনতা, বলতে পারিনি কোনোদিন
ক্ষত সাইরা গেছে বটে, ইনবক্সে হীমবাহ দাগ
আবরণহীন; এই ফতেপুর, এই সিক্রি
আকবর-অনুরাগ-বীরবল-তানসেন-আবুল ফজল
অমৃতসর, মরিচঝাপি, যশোর রোড, শাহপরী দ্বীপ
সব যেন চিরচেনা বন্ধুরপথ, বিশ্বাস যদি ঠেলে
দেয় ভুল পথে, রাজনীতি বোঝাইবে কে আমাকে?

গোপনতা ওগো গোপনতা বলতে পারিনি
কোনোদিন। কারো নাম লেখা থাকে স্কুল গেটে
কারো নাম লেখা থাকে খুনির পকেটে
কারো বা খোদাই করা থাকে সেমেট্রি বা কবরে
কারো নাম মুছে যায় পদ্মার জলে
কারো নাম লেখা হয় স্যেন নদীর তলে
এই রোজার দিন, এই শবে কদরের রাইত শোনো,
আকবর বাদশার স্যেকুলার নাম লেখা ইলাহী দলিলে
আমার নাম লেখা আছে প্রেমের সলিলে
গোপনতা ওগো গোপনতা সে কথা বলতে পারিনি কোনোদিন।

স্ক্যান্ডাল
 
কত কত গুজব তোমায় নিয়ে, কত শত স্ক্যান্ডাল
তোমার চাঁদ দুটো নিয়ে অনেক গল্প ছড়ালো
পাড়ায় পাড়ায়, মাঠে চাঁদ কেমন কেমন
জোছনা ছড়ালো একা একা; সবুজ মায়া...
তোমায় নিয়ে পুরাকালে মূর্তি বানানো ছিলো
সে সব মূর্তি দেখে কেউ কেউ বললো,
এ-তো রাধার গোপন শৃঙ্গারমূর্তি
কেউ বললো অষ্টাদশী নয়, এ তো কিশোরীলো
পহেলা শ্রাবণী, কেউ বললো মা-কুমারেশ্বরী
এসো তোমায় প্রণাম করি, কেউ বললো
ওকে তো চন্দ্রিমা উদ্যানের মূল ফটকে
দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি...
আরে ওতো আমার সাধিকা
কেউ কেউ বললো, ওতো পদ্মাপাড়ের মেয়ে
জেলেদের ঘরেই বেড়েছে, দেখছো না? নাকছাবি
প্রবাস থেকে কে একজন চিনে ফেলেছে তোমাকে!
সে নাকি দেখেছে লেক অন্টারিয়র পাড়ে একা...
শরণার্থীর বিষণ্ন চোখ, শূন্যতায় আঁকা।
একজন এসে দাবী করে বসলো, সে তোমার
আপন মানুষ; তোমাকে নিয়ে অনেক কথাই হলো
অনেক ভালোবাসাবাসী হলো; পাহেলগাঁও থেকে
অচেনা এক পাখি এসে জানিয়ে গেল
তুমি কে আমার।
 
তুমি একটুতে ভেঙে পড়, একটুতে জল
কলঙ্ক গাছের দিকে তাকাতে ভয়
চেয়ে দেখো কলঙ্ক গাছেতে ওই
ঝুলে আছে, বেহেস্তি-ফল।
তোমাকে নিয়ে অনেক কথাইতো হবে
অনেক কথাই হয়, অনেক অনেক কথা...
তাকিয়ে দেখো তোমার এক বুকে মধুমতি
অন্য বুকে জ্বলে সন্ধ্যাতারা।

আমি এক সাগরে ভাসা ক্রীতদাস

এই সমুদ্র মায়ার, এই সমুদ্র ধাঁধার
ক্রীতদাসÑ ক্রীতদাসী হয়ে এই সমুদ্রে ভাসছে
আমারই মা-ভাই-বোন
অভিবাসী দু:স্বপ্নে বিভোর, সাঁতার না জানা এ-সব স্বজন।
 
শ্বেতপদ্ম হাতে জন্মেছিলে, মুক্ত-স্বাধীন দেশে, তাহাদের মতন।
গভর্মেন্ট ফেরারী এখানে, বুদ্ধিজীবীরা বাকুড়ার পুতুল সকল
ক্যাফে জ্বলছে, চলছে সংসদ; বারে নাচছে বয়সী বেশ্যা
মুদ্রা জমছে কতিপয়ের হাতে, যারা মানুষ নামে নকল।
স্বপ্ন কেড়ে নিয়েছে নীলজল, সাক্ষী টুনা-ফিস, হার্পুন মাছ
শ্রম লুট হবার আগেই শরীর হারিয়ে
বসে আছে যেন মৃত অক্টোপাস।
চোখ টিপে হাসছে আন্দামান, আচেহ প্রদেশ;
হাসছে রেঙ্গুন আলওয়ালের স্বদেশ
রক্তের ঢেউগুনে দুঃস্বপ্নের দিন; থ্যাতলানো সময়
রক্তপায়ী দালাল ঘুরছে যেন মৃত দূত করছে প্রণয়।
ও ফুল গ্লাডিওলাস, তুমি কি গ্লাডিয়েটরদের চেনো?
যারা ভাসছে বঙ্গপসাগর আর আন্দামানে
আমিও যেন ভাসছি তাদের সাথে, তারা কি বেঁচে আছে এখনও?
 
মৃত্যু, জাদুকরের মুখের ভিতর লুকানো এক শকুন
ঘুমের ঘোরে পরজন্মের কাফনের পাখি ওড়ে মনে আমার
শোনো প্রণয়িনী পাখি ওগো বুবুন
ওড়ার ঠিকানা জানা নেই যে পাখির ডানার
সেই পাখি আমি; ওদিকে দেখো ওরা ভাসছে অথৈ নোনাজলে
আয়ুরেখা মুছে গেছে যার,
সে যে মৃত্যুর আগেই স্বপ্নবেচা এক নিহত শিকার।

প্রতিটি গার্লস স্কুল পাশে
 
প্রতিটি গার্লস স্কুল পাশে একটি সবুজ ছায়াপথ আছে
কিশোরেরা স্কুল ফাঁকি দিয়া ছায়াপথ ধইরা হাইটা যায়;
কাছে হাতছানি, স্বর্ণকুমারী নদীর ধার...
যেই নদীতে কেবলি উষ্ণ ঢেউ, কেবলি উথলি হাওয়া
কেউ কেউ কড়ি ফাঁকি দিয়া শুধু ঢেউ গোনে;
কেউ কেউ ঘুমায়া পড়ে দিন-জোছনার অন্ধকারে
কেউ কেউ সন্ধ্যা হবার ছলে বাড়ি ফেরে নদী পাড় ধরে
কেউ কেউ লেক অন্টারিয়র খোঁজে
ছায়াপথ ধইরা হাইটা যায় উদ্বাস্তুনগরে
নাগরিক কোলাহলে; বাঁচে, মরে, কেউ কেউ নিজেকে বাঁচায়
আমি কারো কারো মত, ছায়াপথ ধরে হাইটাছি একদিন
সেই স্মৃতি হারায়েছে কবে, তবু বুকে ধরা আছে, এখনও
মাঝে মাঝে বুক থেকে নেমে, বর্ণিল ঝর্ণা বয়ে যায় মনে।

এক পাগলিকে দেখে

অবাধ্য কিশোর আমি, যার ডাক নাম জানে শুধুÑ
এই রতিঝর্ণা পথ।
কৈশোরের কোন এক সকালবেলায়
এক পাগলীকে দেখে মা ডাকতে মন কেঁদেছিলো বেশ।
বাবা শব্দটি আপন মনে হয়নি কোনদিন,
রূপকথার মতন ভাইবোন ঝুলে আছে ছাতিমতলায়
বন্ধুরা পথের ধূলো, যদিও শিকারীর পাঠ নেয়নি তারা
দেখেছি নয়াল রমণীরা চেরাজিভে কাছে ডাকে

আমাকে মানুষ করবে দায়িত্ব নিয়েছিল যে নগর
তার হৃদয় ছিলো না কোনো;
সে ছিলো গুপ্ত নিশ্চিন্ত- ঘাতকের ঘর।
নগরের পূর্ণ শবাধারে আমি মৃত সহদর
আর সব জীবিত শবেরা ঘাতক চোখে
আধখানা অন্ধরাত লাশের খাটের মত কাঁধে নিয়ে
ঘুরে বেড়ায় এপাড়া থেকে ওপাড়ায়
এসব দেখে আমার সেই পাগলীকে মনে পরে যায়
যে তার শিশুকে শুকনো স্তনের বাট মুখে দিতে দিতে বলেছিল
ওআল্লাহ এই খান্কি পট্টীতে কানু তোরে ক্যামনে বাঁচামু ক’দেহি।