বাংলা ফন্ট

সৈয়দ শিশিরের প্রবচনগুচ্ছ নিয়ে তুচ্ছ কথা

21-08-2017
আনোয়ার কামাল

সৈয়দ শিশিরের প্রবচনগুচ্ছ নিয়ে তুচ্ছ কথা


প্রবচনগুচ্ছ ২০১৭ সালের অমর একুশে গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত কবি সৈয়দ শিশিরের অনবদ্য রচনা। মেলা থেকেই সংগ্রহ করেই পাঠ শেষ করেছি এবং কিছু লিখতে ইচ্ছে হলো। ৬৪ পৃষ্ঠার গ্রন্থটিতে ২২২টি প্রবচন লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। গ্রন্থটি উৎসর্গ করা হয়েছে ‘শত বছর পর যাঁরা আমাকে ভালোবাসবে’।
জীবনকে গভীর অন্তর্দৃষ্টিতে অবলোকন করার ক্ষমতা, পরিপার্শ্ব সম্বন্ধে দার্শনিক উপলব্ধি জন্ম দেয় প্রবচনের। সচরাচর প্রবচন আলাদাভাবে লেখা হয় না। খ্যাতিমান লেখকদের রচনার সম্মোহনী একটি পঙক্তিই কালক্রমে প্রবচনের মর্যাদা লাভ করে। গল্প, উপন্যাস, কবিতা এমনকি প্রবন্ধের একটি মাটিগন্ধী লাইনও প্রসাদগুণে ফিরতে পারে মানুষের মুখে মুখে। এ কথাগুলো গ্রন্থটির ভূমিকায় লিখেছেন প্রকাশক শফিক হাসান।
যত দূর মনে পড়ে, হুমায়ুন আজাদই বাংলাদেশে সচেতনভাবে প্রথম প্রবচন লিখেছেন। তারপর আরও কয়েকজন মনোযোগ দেন প্রবচন রচনায়। প্রবচনের বেশ কয়েকটি বই প্রকাশিত হলেও সেগুলো পাঠকমনে খুব একটা রেখাপাত করতে পারেনি। আর এ ‘বন্ধ্যাকালে’ প্রবচনগুচ্ছ হাতে আবির্ভাব ঘটল আরেক তরুণ-তুর্কি সৈয়দ শিশিরের। সাহিত্যাঙ্গনে তাঁর পদচারণ দীর্ঘদিনের। তাঁর কাজের পরিধি বয়সকেও ছাপিয়ে গিয়েছে বলেই ভ্রম হয়। নানামাত্রিক, রকমারি লেখনীর মাধ্যমে তিনি নিজের যোগ্যতার প্রমাণ রেখে চলেছেন দিনের পর দিন। গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, সাক্ষাৎকার গ্রহণ, ছোটকাগজ সম্পাদনা-কোথায় নেই সৈয়দ শিশির! সাংবাদিকতা পেশা তাঁর অভিজ্ঞতাকে করেছে যুগপৎ শাণিত ও ঋজু। এ শিশির রৌদ্রালোকে মিলিয়ে যায় না, বরং আরও দেদীপ্যমান হয়ে ওঠেন।
গ্রন্থটি পাঠ শেষে খুব বেশি ভালো লাগা প্রবচনগুলো পাঠকদের উদ্দেশ্য নিবেদন করলাম। ১. ঠকাতে চেয়েই কেউ কেউ ভালোবাসার নাটক সাজায়। ২. মদ, নারী আর সুদের ব্যবসায়ীরা বড় ভাইকে অনেক সম্মান করে। ৩. নাটক পরিচালনা আর নারী পরিচালনা ভিন্ন কিছু নয়! ৪. অনেকে কবিতা না বুঝলেও কবিকে ঠিকই বুঝতে পারেন। ৫. সুদকে এখন অনেকে লভ্যাংশ বলেন। মানে, মল ভালো নয়, মলের সন্দেশ ভালো। ৬. সুন্দর মনের তুলনায় সুন্দর দেহের বাজারদর বেশি। ৭. সবাই হোটেলে যান না, কেউ কেউ বাসায়। ৮. পেটের দায়ে বিছানায় গেলে জাত যায়, বিলাসী জীবনের মোহে গেলে নয়! ৯. প্রেম অথবা দাম্পত্য জীবনে পুরুষের অন্য নারীতে গমন ক্ষমার্হই থেকেছে। ১০. ওরা তিন বন্ধু-অর্থ, যৌবন আর ঘোলাজল। ১১. দৃশ্যমান অনেক কিছুই আজ দেখেও না দেখার ভণিতা করে চলেন বুদ্ধিমানেরা। ১২. অযোগ্যরা বরাবরই পাথর হয়ে বাঁচে। ১৩. ধর্ম জানা হয়নি তবু ধর্ম নিয়ে কথা, ধর্মটাকে বর্ম করে হাজার মনে ব্যথা। ১৪. মানুষের সাংকেতিক ভাষাশিল্পই কবিতা। ১৫. আগুন কখনো আত্মাকে পোড়াতে পারে না। ১৬. যুবতীর পাশে বসলে বাসের আসন ছোট হয়ে আসে। ১৭. দুধ পানে বমি তার, মদ পানে সুখ। ১৮. বেশ্যাপাড়ার বিছানায় কি শুধু বেশ্যারাই ঘুমায়? ১৯. প্রকৃত অর্থে মানুষ মাত্রই বুদ্ধিজীবী। ২০. কাজের বুয়ারা রাতের অন্ধকারে কখনো সুন্দরী হয়ে ওঠে!
তবে কিছু প্রবচন ভালো লাগেনি। যেমন, ১. সন্তান বড় হয়ে বাটপার হতে পারে ভেবে মা কখনো সন্তানের মুখে মধু দেন না। বরং মায়ের স্বপ্নকে সম্মান না করেই কেউ কেউ বাটপার হয়। ২. সত্য বড় মাপের বদমাশ হলেও সত্যই মুক্তি দেয়। ৩. সমাজে একাধিক স্ত্রী থাকে চরিত্রহীনের, আর গোপনে বেশ্যাপাড়া যায় চরিত্রবান! অবশ্য এ ক্ষেত্রে লেখকের সঙ্গে আমার উপলব্ধি কিংবা ভাবনার ভিন্নতা থাকতেই পারে।
বইটি পাঠে আমি সুখানুভূতি অনুভব করছি। আসলে সৈয়দ শিশির যে অনবদ্য রচনাগুলো তাঁর প্রবচনগুচ্ছ হিসেবে প্রকাশ করেছেন তা পাঠকমাত্রই লুফে নেবে, এ কথা আমি হলফ করে বলতে পারি। প্রবচনগুচ্ছ নামে ভিন্ন স্বাদের একটি গ্রন্থ উপহার দেওয়ার জন্য সৈয়দ শিশিরকে অভিনন্দন। গণপ্রকাশন থেকে পরিবেশন করা বইটি প্রকাশ করেছেন শফিক হাসান। বইটির দাম রাখা হয়েছে ৫০ টাকা। বইটির ব্যাপক প্রচার ও পাঠকপ্রিয়তা প্রত্যাশা করছি।

সর্বশেষ সংবাদ