বাংলা ফন্ট

ডাক

06-07-2017
তানজুম তমা

ডাক

রাত ঠিক সাড়ে ৮টা । অটো ভাড়া মিটিয়ে শেখ হাসিনা হলের রাস্তা ধরলাম, বাইরে বেশ বৃষ্টি.... প্রচণ্ড বাতাস ছাতা উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে, পার্সটা কোনোমতে থুতনির নিচে গুঁজে ছাতায় মাথা মুড়িয়ে, বাতাসের অনুকূলে ধরে নিজের পায়ের দিকে তাঁকিয়ে একাই হেঁটে চলছি...... আশেপাশে কোথাও কেউ নেই, কামাল ভবন ছেড়ে সামনে আসতে তিনটা ছেলে হেঁটে আসলো,  আমিও ছাতার আড়াল থেকে মুখটা বের করে দেখার চেষ্টা করলাম পরিচিত কেউ কিনা? নাহ.... অচেনা একজোড়া কালো চোখের দিকে চোখ পড়াতেই চোখ সরিয়ে নিয়ে আমার গন্তব্য ধরলাম।
...... পল্লব চত্বরের মাঝখানে এবড়ো-থেবড়ো রাস্তায় পায়েলটা কীসে যেনো আটকে গেলো, উবু হয়ে বসে পায়েলটা ছাড়াচ্ছি তখনই মুক্তমঞ্চের দিকে চোখ গেলো, বুকের মধ্যে কেমন যেন একটা ভয়ার্ত বাতাস বয়ে গেলো......। কী থমথমে রাস্তা বাতাসে বৃষ্টি ঠিক ধোয়ার মত উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে, অনেক দূরে শুধু ডরমেটরির আলো কিছুটা আশার সঞ্চার করলো।তাড়তাড়ি পায়েলটা ছাড়িয়ে নিয়ে আবার হাটতে শুরু করলাম। দু পা চলতে না চলতেই, শুনতে পেলাম কারো হাঁটার আওয়াজ আসছে... চার রাস্তার মাঝামাঝি পয়েন্টে তখন আমি, বামে ঘুরলাম..... তালতলার দিকে, নাহ কেউ নেই তো? আবার পা বাড়ালাম আবারও। বুকের মধ্যে ধুপধুপ করছে, গলা শুকিয়ে আসছে, আবার সামনে তাকালাম -সারি সারি জারুলের গাছ ডরমেটরির উজ্জ্বল আলো আর মুক্তমঞ্চের লাল মঞ্চ ছাড়া কিচ্ছু চোখে পড়ছে না।
আবার পা বাড়ালাম, কিন্তু আবারও কারো রেইনকোটের কচকচানির শব্দ....! আর নিজেকে সামলাতে পারছিলাম না। গলা দিয়ে একটা শব্দও বের হচ্ছে না। মনে মনে শুধু পড়ছি "লা ইলাহা ইল্লা আন্তা....মিনাজ জলেমিন"।এবার ডান দিকে তাকালাম শহীদ মিনার আর ফাঁকা মাঠ ছাড়া কিছু নেই,একই সময়ে পিছনে ফিরলাম নিজের চোখকে বিশ্বাস হচ্ছে নাহ...লাম্পপোস্টের এত আলোতেও আমি স্পষ্ট কিছু দেখতে পাচ্ছি নাহ....! সব ধোয়াটে....! মুহূর্তে চোখ ঘুরিয়ে নেবো...... ভেবেও নিলাম না। শহীদ মিনারের মাঝের চূড়ার মতো মাঝখানটা উচু দুই পাশটা ঠিক একই সাইজের হাঁটছে আমার দিকেই মনে হলো হাঁটছে,কালো রঙে আবৃত সবটা..... এত চেষ্টা করেও কিছুই দেখলাম না, হলের ঢোকার মুখের বিদ্যুতের খুটিতে এমন সময় স্পার্কিং হচ্ছে সেই শব্দে নজর ঘুরালাম খুটির উপরের আলো জ্বলছে আর নিভছে, সাথে আগুনে স্পর্কিং তো চলছেই। এক মিনিটও দেরি না করে হল গেটে জোরে হেটে আসলাম। পাঁচতলা ভবনের পুরোটা জুড়ে আলো দেখে অনেকটা সাহস পেলাম। স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে গেটে ঢুকবো, ঠিক তখনি মুক্তমঞ্চের সামনের রাস্তা ধরে কেউ আমার নাম ধরে ডাকছে.....
মনে হলো একবারই ডাকটা শুনতে পেলাম, গলাটাও বেশ পরিচিত। ডাইনিং-এ যে ছেলেটা কাজ করে এটা তো তারই গলা, কিন্তু সে তো কারো নাম ধরে ডাকে না, আজ  আমার নাম ধরে পেছন থেকে ডাকবার সাহস সে কই পেলো?এটা ভেবে যতটা অবাক হয়েছিলাম তার চাইতে বেশি ভয় পেয়েছিলাম, কারণ ছেলেবেলায় দাদীর কাছে শুনেছিলাম কেউ নাম ধরে পেছন থেকে একবার ডাকলে ফিরে তাকাতে নেই, অন্তত তিনবার একই কণ্ঠের ডাক শোনার জন্য অপেক্ষা করতে হয়।
যাই হোক মেইন গেটে কতক্ষণে ঢুকে গেছি পাঁচতলা বিল্ডিংয়ে ঝলমলে আলোয় অনেকটা ভয় পালিয়েছে।পথের পাশধরে জোড়াপুকুরের বুকচিরে আমি কিছুটা সাহস সঞ্চয় করে হেঁটে চলেছি। বাম পাশের বিদ্যুতে খুঁটিটাতে আজও প্রতিদিনকার মতো স্পার্কিং হচ্ছে....ফিরে তাকালাম, স্বল্পগভীর চৌকোনা পুকুরটার দিকে। নাহ ভয়ের কিছু নেই, সব ঠিকঠাক।এটা ভেবেই মনযোগ রাস্তার দিকে দিতেই লোডশোডিং সমস্ত পরিবেশটা পাল্টে দিলো, আলোকসজ্জিত আবাসিক হলটা ভুতুড়ে মনে হতে থাকলো.... হাতব্যাগ থেকে ফোনটা বের করলাম। কতক্ষণে মেয়েরা ২/১টা মোমবাতি আর চার্জার লাইট যে জ্বালিয়েছে তা দূরের এই টিমটিমে আলোয় বেশ বুঝতে পারছি। অন্ধকারে আস্তে আস্তে অভ্যাসের চিরপরিচিত ইটবাঁধানো রাস্তাটাতে হেঁটে চলছি।ফোনের টর্চ অন করার বৃথা চেষ্টা করলাম কয়েকবার। কাজ হচ্ছে না... আমি তো টর্চের অপশনটাই অডিও প্রোফাইলে খুঁজে পাচ্ছি নাহ।অবশ্য আমার মোবাইলে এমন সমস্যা মাঝে-মধ্যে হয়।টাইমটা দেখার চেষ্টা করলাম, ৯টা বাজতে পাঁচ মিনিটে বাকি এখনও। আমি বিচলিত না হয়ে স্ক্রিনের ব্রাইটনেস বাড়িয়ে হাঁটছি।
ঠিক যখন আমি জোড়া পুকুরের বাঁকটা ঘুরে পুবদিকে হাঁটছি তখন এক আজব জিনিস চোখে পড়লো। সামজিদা, আমার শয়নসঙ্গীকে ফোন করার জন্য ফোনের দিকে তাকিয়ে দেখি কোনো নেটওয়ার্ক পাচ্ছে না, আবার কী হলো এই ফোনটার! অসহ্য লাগছে সবকিছু। এই তিন মিনিটের পথটা আমার কাছে তিন যুগ মনে হচ্ছে, এই সময়ের ব্যাপ্তির যন্ত্রনা হয়তো  বোঝানো  অসম্ভব।তবুও প্রাণপণ চেষ্টা করছি এই পুবের বাঁকটা ফেলে পশ্চিমের মোড়টা ধরার, তাহলে নাইট গার্ড মামাদের দেখা মিলবে। অবশেষে আমার অপেক্ষা আর উত্তেজনা দুটোই শেষ হলো, দুজনের মধ্যে একজন গেটম্যান উঠে দাঁড়ালো। হলে এসে আর কিছু না পাই এই মানুষগুলোর অসীম স্নেহ পেয়েছি।একজন বললো- মামা এই ঝড়বৃষ্টির মধ্যে কী করে আসলেন? তিনি টর্চ নিয়ে গেট খুলতে উদ্যত হলেন। আমি বললাম -"মামা লেট ফরম কি দেখাতে হবে?" অন্যজন বললো-"না মামা, আমাদের না দেখান ভিতরে একজন আছে তাকে দেখানো লাগবে," বুঝলাম রুকাইয়ার কথা হচ্ছে, রুকাইয়া হলের অফিস স্টাফ শুধু স্টাফই না, জাদরেল স্টাফ, যার যন্ত্রনার স্বীকার ছাত্রী, নাইট গার্ড, গেটম্যান, রেজিস্টার আপা থেকে সবাই।কড়া ডিউটি পালন করে পিচ্চি মেয়েটা। সবার সাথেই খারাপ ব্যাবহারে অভিযোগ ত তার আছেই। যাই হোক, বিল্ডিং এর গেটে ঢুকে ডাইনিং এর দিকে গেলাম, মানিকের সাথে দেখা -"মামা এত ঘামাইতেছেন ক্যান?বাইরে তো বৃষ্টি হয়’। আমি তার প্রশ্নের কোনো উত্তর না দিয়ে বললাম -"আপনি কি ৮.৩০ এর দিকে হলের বাইরে ছিলেন?" মানিক বলল-"মামা কহন?" আমি বললাম -এইতো ২০ মিনিট আগে? মানিক বলল "নাহ আমি তো এ কূলেই রইছি'

আমি ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বসে পড়লাম। একটা কোল্ড ড্রিংকস শেষ করে পা বাড়ালাম রুমের দিকে। ভাবছি তাহলে কে ডেকেছিল আমায়? উফ! আবার ঘামছি...

সর্বশেষ সংবাদ