বাংলা ফন্ট

প্রসঙ্গ: ‘হুমায়ুনকে কখনো কোনো জ্ঞানী মানুষ বলে মনে হয়নি

06-07-2017
তুহিন দাস

প্রসঙ্গ: ‘হুমায়ুনকে কখনো কোনো জ্ঞানী মানুষ বলে মনে হয়নি


কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক আর্টস বিডি নিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকমকে ৫ জুলাই একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন, সেখানে তিনি বহুমাত্রিক লেখক হুমায়ুন আজাদ সম্বন্ধে মন্তব্য করেছেন যে,‘‘হুমায়ুনকে কখনো কোনো জ্ঞানী মানুষ বলে মনে হয়নি, বিবেচ্য মানুষ বলে মনে হয়নি, দম্ভোক্তি করাটাই হল তার একমাত্র কাজ।…হুমায়ুন আজাদ বাদ দিয়ে আলাপ কর। হুমায়ুন আজাদ নিয়ে আমার কোনো মাথা ব্যাথা নেই।’’
তো, হুমায়ুন আজাদ কে ছিলেন একটু পেছন ফিরে দেখি নতুন করে। হুমায়ুন আজাদ নামের অজ্ঞানী ও অবিবেচ্য (হাসান

আজিজুল হকের মতে) সাহিত্যিককে বলা হয় কবি, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, সমালোচক, গবেষক, ভাষাবিজ্ঞানী, কিশোর সাহিত্যিক এবং রাজনীতিক ভাষ্যকার।

তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৭০টি। তার মাঝে ১০টি কাব্যগ্রন্থ, ১৩টি উপন্যাস, ২২টি সমালোচনা গ্রন্থ, ৮টি কিশোরসাহিত্য, ৭টি ভাষাবিজ্ঞান বিষয়ক গ্রন্থ। সে গ্রন্থগুলোতে তিনি লিখেছিলেন ধর্ম, সামরিক শাসনের বিরোধিতা, মৌলবাদ, প্রতিষ্ঠান ও সংস্কারবিরোধিতা, নিরাবরণ যৌনতা, নারীবাদ, রাজনৈতিক এবং নির্মম সমালোচনা নিয়ে। এসব কাজের জন্য হুমায়ুন আজাদ ১৯৮৬ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার এবং ২০১২ সালে সামগ্রিক সাহিত্যকর্ম ও ভাষাবিজ্ঞানে বিশেষ অবদানের জন্যে মরণোত্তর একুশে পদক প্রদান লাভ করেন। তবুও তিনি জ্ঞানী ছিলেন না?

১৯৬০-এর দশকে হুমায়ুন আজাদ যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের ছাত্র তখন পশ্চিমের ভাষাবিজ্ঞানী চম্‌স্কি-উদ্ভাবিত ‘Transformational Generative Grammar- TGG’ তত্ত্বটি বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করে। এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি ডিগ্রির জন্য হুমায়ুন আজাদ এই তত্ত্বের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে বাংলা ভাষার রূপমূলকতত্ত্ব তথা বাক্যতত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করেন। এর মাধ্যমে বাংলার ভাষাবিষয়ক গবেষণায় আধুনিক ভাষাবৈজ্ঞানিক পদ্ধতির সূত্রপাত করেন। তার সে পিএইচডি অভিসন্দর্ভের নাম ছিল ‘Pronominalization in Bengali’।

পরবর্তীতে ইংরেজি বই আকারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৮৩ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত হয়। ১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দে তিনি বাংলা ভাষার বাক্যতত্ত্বের ওপর ‘বাক্যতত্ত্ব’ নামে একটি বই প্রকাশ করেন। একই সালে তিনি ‘বাঙলা ভাষা’ শিরোনামে দুই খণ্ডের একটি দালিলিক সঙ্কলন প্রকাশ করেন, যাতে বাংলা ভাষার বিভিন্ন ক্ষেত্রের ওপর বিগত শতাধিক বছরের বিভিন্ন ভাষাবিদ ও সাহিত্যিকের লেখা গুরুত্বপূর্ণ ভাষাতাত্ত্বিক রচনা সংকলিত হয়। এই তিনটি গ্রন্থ বাংলা ভাষাবিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসাবে বিবেচিত হয় আজও। পরবর্তীতে তুলনামূলক-ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞান ও অর্থবিজ্ঞানের উপর দু’টি সংক্ষিপ্ত প্রাথমিক পাঠ্যপুস্তক লেখেন।

১৯৮০-র দশকের শেষভাগ থেকে হুমায়ুন আজাদ সমসাময়িক রাজনীতি নিয়ে গণমাধ্যমে বক্তব্য রাখতে শুরু করেন। এ সময় তিনি ‘খবরের কাগজ‘ সাপ্তাহিক পত্রিকায় সম্পাদকীয় নিবন্ধ লিখতে শুরু করেন। সামরিক শাসনের বিরোধিতা দিয়ে তার রাজনৈতিক লেখালেখির সূত্রপাত। ২০০৩ সালে প্রকাশিত তার ‘আমরা কি এই বাঙলাদেশ চেয়েছিলাম’ গ্রন্থটি প্রধানত রাষ্ট্রযন্ত্রের ধারাবাহিক সমালোচনা; ১৯৭১-এ প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশে রাষ্ট্রযন্ত্রের ব্যভিচারের প্রামাণিক দলিল এই গ্রন্থটি। তার ‘নারী’ (১৯৯২), ‘দ্বিতীয় লিঙ্গ’ (২০০১), ‘পাক সার জমিন সাদ বাদ’ (২০০৪) গ্রন্থ তিনটি বিতর্কের ঝড় তোলে এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করা হয়।

শুধু রাজনৈতিক সমালোচনা নয়। হুমায়ুন আজাদ জন্ম দিয়েছিলেন নতুন একটি যুক্তিবাদী আন্দোলনের, তিনি এক অর্থে বাংলাদেশের যুক্তিবাদী মুক্তচিন্তা আন্দোলনের পুরোধা। তিনি ছিলেন স্বঘোষিত নাস্তিক। তার অন্যতম প্রণোদনা ছিল প্রথা-বিরোধিতা। কবিতা, উপন্যাস ও রচনা সর্বত্রই তিনি প্রথাবিরোধী ও সমালোচনামুখর। সর্বপ্রথম গুস্তাভ ফ্লবেয়ারের আদলে ১৯৯১ প্রকাশিত প্রবচনগুচ্ছ এদেশের শিক্ষিত পাঠক সমাজকে আলোড়িত করতে সক্ষম হয়।

হুমায়ুন আজাদের লেখালেখিতে বিজ্ঞানমনস্কতার ছাপ স্পষ্ট। তবে তিনি নিজেই ছিলেন তার চিন্তা-চেতনা ও বিশ্বাসের প্রধান মুখপাত্র। একটি বৈষম্যহীন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা তার স্বপ্ন ছিল। সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতিকেই তিনি মুক্ত মানবের মুক্ত সমাজ গড়ার পক্ষে অনুকূল বলে মনে করতেন।

এসবের বিপরীতে কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হকের ঠিক কি দলিল-দস্তাবেজ আছে? তাকে ‘বাংলা ছোটগল্পের রাজপুত্র’ বলা হয়। অবশ্য কথাটি ঠিক যে তিনি রাজপুত্র হতে পেরেছেন, রাজা হতে পারেননি। আর তার উপন্যাস ‘আগুনপাখি’ ছাড়া আর কিছু উল্লেখযোগ্য আছে কি? হুমায়ুন আজাদকে নিয়ে বাংলাদেশের অনেক সাহিত্যিক কথা বলতে বিব্রত বোধ করেন। এ কথা ঠিক। এবং এ কারণে অনেকে তার ওপর মৌলবাদীদের চাপাতি আক্রমণের পরও নিরবতা পালন করেছিলেন। কেননা তিনি সবসময় সত্য বলতেন, সত্য বলতে কখনো কুণ্ঠিত হননি। সে কারণে আজকের বাংলাদেশেও তাকে নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত সাহিত্যিকদের কুণ্ঠা বোধ করতে হয়।

উক্ত সাক্ষাৎকারে গল্পকার হাসান আজিজুল হক আর কি বলছেন হুমায়ুন আজাদ সম্পর্কে?

তিনি বলছেন: ‘‘ওই লোকটা অত্যন্ত অপ্রিয় কথা বলত, কিন্তু সব সময় অপ্রিয় সত্য কথা বলত না….অপ্রিয় কথা শুধু অপ্রিয়, এতে সত্য-মিথ্যার কোনো ব্যাপার নাই, একটা মন্তব্য আর কি।’’

এখানে প্রথমে লক্ষ্যণীয় যে হাসান আজিজুল হক হুমায়ুন আজাদকে বলছেন ‘লোকটা’! চূড়ান্ত রকমের অভদ্রতা আরকি! বাংলাদেশের একজন প্রতিষ্ঠিত লেখক আরেকজন প্রথিতযশা প্রয়াত লেখককে নিয়ে এমন মনভাবপ্রকাশ কি মানসিক দৈন্যতা নয়? অন্তত যে মানুষটি নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছিলেন বাংলাদেশের জনমানসকে ক্রমাগত শিক্ষিত ও যুক্তিবাদী জ্ঞানের আলোয় নিজেদের দীক্ষিত করতে।

উল্লেখ্য সাক্ষাৎকারে তিনি আরো বলেছেন হুমায়ুন আজাদ সম্পর্কে, ‘‘অত্যন্ত অপ্রিয় কথা বলত, কিন্তু সব সময় অপ্রিয় সত্য কথা বলত না।”

হাসান আজিজুল হক কোন উদাহরণ দেননি। ঠিক কোন্ কথাটি হুমায়ুন আজাদ মিথ্যে বলেছিলেন? যিনি ছিলেন একজন রাষ্ট্রস্বীকৃত ভাষাবিজ্ঞানী তিনি নাকি জ্ঞানী নন? তাকে নিয়ে নাকি তার কোন মাথা ব্যথা নেই। যদি মাথাব্যথা না থাকে তাহলে তাকে নিয়ে মন্তব্য করা কেন? মৌলবাদের বিপক্ষে সবসময় হুমায়ুন আজাদ কথা বলেছিলেন বলে তাকে বাংলাদেশের সাহিত্যিকরা-বুদ্ধিজীবীরা বারবার এড়িয়ে গিয়েছেন। এটিই বাংলাদেশের মুসলিম সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীদের প্রচলিত চরিত্র।

মূল ঘটনা কি তা বোঝার চেষ্টা করলাম। হাসান আজিজুল হকের জীবনীগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে সম্প্রতি চারটি খণ্ডে। সাক্ষাৎকারের শুরুতে তা নিয়ে প্রশ্ন করতে গিয়ে সাক্ষাৎকারগ্রহীতা অলাত এহসান তাকে প্রশ্ন করেছেন, ‘‘আত্মজীবনী নিয়ে আমাদের দেশে যে রকম অনেস্টি, তা নিয়ে হুমায়ূন আজাদ একটা কথা বলেছিল, যেন ফেরেশতা হয়তো শয়তানের আত্মজীবনী লিখছে।…’’

প্রসঙ্গ: ‘হুমায়ুনকে কখনো কোনো জ্ঞানী মানুষ বলে মনে হয়নি'

হাসান আজিজুল হক: ‘‘হুমায়ূন আজাদ কি বলেছেন?’’
সাক্ষাৎকারগ্রহিতা: ‘‘একজ্যাক্ট কোডটা আমার মনে নেই। সেটা এমন ছিল যে, বাঙ্গালির আত্মজীবনী পড়লে মনে হয় যে, এটা হচ্ছে শয়তানের জীবন কিন্তু ফেরেশতার মত লেখা।’’
আর এতেই মূলত কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক তেলে-বেগুনে-জ্বলে উঠেছেন।

ভাবি, প্রয়াত হুমায়ুন আজাদের বাক্যগুলো এখনও কতো শক্তিশালী। এক যুগ আগে হুমায়ুন আজাদের কণ্ঠরোধ করা হয়েছে, কিন্তু এখনও সেসব লেখা মৌলবাদীদের তো বটেই বাংলাদেশের সাহিত্যিকদেরও বিব্রত করছে! জয়তু হুমায়ুন আজাদ, বিপ্লবী হুমায়ুন আজাদ দীর্ঘজীবী হোক!

তথ্যসূত্র:
(১) হাসান আজিজুল হক: হুমায়ুনকে কখনো কোন জ্ঞানী মানুষ মনে হয়নি, সাক্ষাৎকার গ্রহণ-অলাত এহসান, arts.bdnews24.com, ০৫ জুলাই ২০১৭।
(২) হুমায়ুন আজাদ, উইকিপিডিয়া।


সর্বশেষ সংবাদ