বাংলা ফন্ট

মে দিবসের কবিতা

30-04-2017

মে দিবসের কবিতা

লাল আগুন ছড়িয়ে পড়েছে দিগন্ত থেকে দিগন্তে/কী হবে আর কুকুরের মতো বেঁচে থাকার?’—বাংলার প্রতিবাদী কণ্ঠ সুকান্ত ভট্টাচার্য’র এই দৃঢ়উচ্চারণ শ্রমজীবী মানুষদের জন্য। সভ্যতা নির্মাণে সদা নিয়োজিত কারিগরদের নিয়ে কালে কালে বিশ্বসাহিত্যে অসংখ্য কবিতা লেখা হয়েছে।  শ্রমজীবী মানুষদের শ্রদ্ধা জানিয়ে বর্তমান সময়ের কয়েকজন কবির কবিতা প্রকাশিত হল।

ভাস্কর চৌধুরী
রাজধানী এক্সপ্রেস

বেশ ভালো চলছে আমাদের
এই গণতন্ত্রায়ন
ইটফাটা দুপুরে রৌদ্রের ঘ্রাণ
মিনিম্যাক্সি রাস্তায়
বালকেরা ফটাফট ডাক দ্যায়
পাছার প্যান্টের শ্রী আর উপরে
দেশের ক্রিকেটের গেঞ্জি
ডাকে মিরপুর মিরপুর প্যাসেঞ্জার
তাদেরও ঘামের গন্ধ
ইটফাটা রোদে ভিজে চমৎকার
ফুটপাতমুক্ত স্বদেশে চার লক্ষ
বিক্রেতা বেকার
কালকের জোকারের হাতে আজ
সাফসুতরো ঢাকা
বাহ, বেশ
ইটফাটা রোদের পর বিকেলে
গরীবের হাট ফুটপাত ফাঁকা।

মাসুদুজ্জামান
মানববেদ

রাত্রি খসে পড়বার আগে এই যে পাললিক সমুদ্রস্নান, রৌদ্রকথন,
তার ভেতরে তোমার স্মৃতি-বিস্মৃতির লাবণ্যগুলি ঝলমল করে উঠছে।
পরিব্রাজকের মতো হালকা পোশাকে
হেঁটে যেতে যেতে তিমিরগহনে যে ক্রন্দনধ্বনি তুলেছিলে, তার মিহি সুর আমার
হৃৎপিণ্ড চিরে চিরে ঝরিয়ে দিচ্ছে সুপ্রভা, স্রোত, বৃষ্টিদাহ্য স্নিগ্ধ জাহাজের ডানায় চড়ে
উড়ে চলেছি নিজেরি সমাধিপ্রান্তরে।
সময়ের কাছে কিছু কথা মুঠো মুঠো রেখে গেছি। কাফকার হৃদয়লিখন নিয়ে
কতবার যে আমি তোমার জ্বলন্ত পিঠে চুমু খেয়েছি, কিন্তু সেই যে শীতার্ত শীর্ণ পাজরের খাঁচা,
হিমবাহ, প্রত্নলিপিগুলি শুধু তুষারের মতো সমাধির ’পরে ঝরে পড়ে।
সারি সারি নিথর সমাধি, আমাকে শতখণ্ড করে তুমি প্রতিটি কবরের ভেতর শুইয়ে রাখ।
বহুবর্ণ প্রজাপতির উড়ন্ত পালক বাতাসের ঢেউয়ে কাঁপছে
হিজাবের কালো কিংখাবের ভেতরে ভস্মীভূত শাড়ির আঁচল, রক্তবর্ণ টিপ,
তুর পাহাড়ের কাছেই দোজখের চুল্লি
তাতে রান্না হচ্ছে গরিব মানুষের অশ্রু, খিদে, শরীর,
তেল-মশলার ঘ্রাণে ভরে উঠছে বহুজাতিক রান্নাঘর
সূর্যভস্ম পাণ্ডুর প্রেতলোক
              শাদা রাক্ষস
                      কালো রাক্ষস
                                 বাদামী রাক্ষস
সূর্যের জন্যে আকাশটা খুলে রাখলেই সমস্ত ভূমণ্ডল জুড়ে আগুনবৃষ্টি
অস্ত্রের ঝনঝনানিতে গির্জার শাদা ঘড়িটা থমকে যায়
মসজিদের ভেতরে যে বোমাটা বিস্ফোরিত হলো তার গায়ে লেখা ছিল ‘ধর্মযুদ্ধ’
মন্দিরের ত্রিশূলে লেগে ছিল মানবের রক্তঅশ্রু
রক্তচুমুকেই ‘পবিত্র ধর্মগ্রন্থ’ থেকে রাক্ষসের মুখে শুষে নেয় সেমেটিক বর্ণলিখন
ব্রাহ্মিলিপি থেকে তরবারির আঘাতে ছিন্ন মানুষের মাথা মাটিতে লুটিয়ে
গড়াগড়ি খায়
সম্পূর্ণ মানবিক একটা ছক কালো আগুনের মধ্যেই কাঁপতে থাকে
শুভের পাশে এই যে বনের শ্বাপদ সামবেদ
তারই জন্যে
অগনন মৃত্যু
হিতপোদেশের গাথার পিঠে চড়ে এক-একটা শব এই সমাধিপ্রান্তরে এসে জড়ো হয়
আমাকে শতখণ্ড করে প্রতিটি সমাধির ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়
শ্বেতশহরের তলদেশ থেকে একটা চাঁদ, কিছু মেঘ অথবা প্রজাপতি উঠে এলে
আগুনশয্যায় শুয়ে শুয়ে আমি ঐন্দ্রজালিক একটা সমুদ্রের ফেনার ওপরে
ভাসতে থাকি।

গিরীশ গৈরিক
মা সিরিজ- ২০

কোনো বিষধর সাপ ফণা তুলে দাঁড়ালে
প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে যায়।
অথচ! সাপদের কোনো প্রশ্নের উত্তর আজও মানুষের অজানা
তাই মানুষের সাথে সাপদের এত আড়ি।
আমার মা বলেন-
কোনো কোনো মানুষ সাপেরও অধিক
তাদের এক ছোবলে হাজার শ্রমিক মরে।
বস্তুত সাপদের কাছে মানুষের শেখা উচিৎ
এই অভিশাপ থেকে মানুষ কবে মুক্তি পাবে।

পিয়াস মজিদ
মে দিনের অনুষঙ্গে সুভাষ

লেনিন
ধর্মতলা
মে দিনের গান
নাজিম হিকমত আর
সলোমনের মা
ফুল ও বসন্ত
সুভাষের বিরুদ্ধে সুভাষ।
আর তারপর
বেলভিউ নার্সিংহোম
এবং শেষশয্যা।
পদাতিকের পা থামে
কাদের যেন
পা চালানোর কথা থেকে যায়।

আমিনুল ইসলাম
সুদখোর চিত্রকল্প

অযুত স্কন্ধে পা-আরশে বাড়ানো হাত
দশমুখে দাঁড়িয়ে এক রাক্ষস- স্বভাবে সর্বভুক;
এ দৃশ্যে সফল ক’টি নোবেলবিজয়ী হাত
আর রাক্ষসের স্থূলতার মানচিত্রে-
বগলে ও বাহুতে- নাভিতে ও নিতম্বে
ক্রিয়াশীল-সুদকষা পাটিগণিত
অথচ চলিত নিয়মের চোখ তুলে কেউ বলে না
‘কোন্ দোকানের চাল খাও বাবা!’
এদিকে অনাহারে-অর্ধাহারে অচিকিৎসায়-অবিশ্রামে
এবং ফলে অপুষ্টিতে শীর্ণ ঘাড়ের নিচে অগুনিত পা।
মানুষ নয়, দেবতা নয়, ফেরেশতাও নয়
দুটি শকুন শকুনি, অভিজ্ঞ ও নিরীহ
টর্চের মতো চোখ, ক্রেইনের মতো ঠোঁট
দূরে বসে চেয়ে আছে-
ঘ্রাণ নাগালে হাওয়ায় দোলে-
রানা প্লাজার মতো মস্তবড় একটা যদি!


সর্বশেষ সংবাদ