বাংলা ফন্ট

পালাবদলের সময়ে দ্বিতীয় দশকের কবিতা

12-04-2017
কবির হুমায়ূন

 পালাবদলের সময়ে দ্বিতীয় দশকের কবিতা
ক্রমেই সব কিছু পাল্টে যাবে এমনটি বিশ্বাস না করলেও সময়কে তো আর অবিশ্বাস করার উপায় নেই। যদি বিশ্বাস করি তবে মানি আর না মানি, সময়ের ওপর চোখ রাখা যেকোনো সচেতন লেখকের প্রয়োজন। মিলেনিয়ামের ১৩তম বছরে এসে দেখি, এই শতকের প্রথম দশক পার হয়ে দ্বিতীয় দশকের কবিতা সৈনিকদের অন্তত তিনটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। কথাটা বললাম এ কারণে যে নতুন একটি দশক শুরু হওয়ার পর তার সৈনিকরা অন্তত পাঁচ বছরের একটি প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। এই প্রস্তুতি হলো দীর্ঘসময় কবিতাভুবনে আধিপত্য বিস্তার করতে নিজেকে তৈরি করার প্রস্তুতি। সতর্কভাবেই কবি বললাম না। দেখা যায়, প্রায় সব দশকেই দলবেঁধে লিখতে এসে দশক শেষ হওয়ার আগেই অধিকাংশের আর নামগন্ধ খুঁজে পাওয়া যায় না। লেখালেখি একটি নিরন্তর প্রক্রিয়া। এটি খণ্ডকালীন কাজ নয়। জীবন যেমন প্রবহমান, একইভাবে জীবনের চাহিদা এবং প্রয়োজনও প্রবহমান। এই বাস্তবতার সঙ্গে টিকে থাকতে প্রচুর এবং প্রচুর লেখক লিখতে শুরু করেও একসময় দম ফুরিয়ে আর লেখেন না। তাঁর কাছে বেঁচে থাকার বাস্তবতা, টিকে থাকার বাস্তবতা, ক্যারিয়ারের বাস্তবতা এতটাই নিষ্ঠুরভাবে ধরা দেয় কিংবা সংসারজীবন এতটাই দাবি জানিয়ে বসে, লেখার মতো কঠিন কাজে সময় দেওয়া আর সম্ভব হয় না। এ জন্য দ্বিতীয় দশকের কবিতা সৈনিকদের এখনই কবি অভিধায় আখ্যায়িত করে সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাওয়া ঠিক হবে বলে মনে করি না। অবশ্য আমার মনে করা না করা নিয়ে অন্যের কিছু যায় আসতে নাও পারে।
বাংলাদেশে করপোরেট সংস্কৃতি গড়ে উঠতে শুরু করলে সাহিত্যও এই বলয় সংস্কৃতির বাস্তবতা অস্বীকার করতে অনেকাংশে পারছে না। ফলে একসময় নতুন সময়ের নতুন লেখকরা লিখতে এসে নিজেদের মতো করে যে ভুবন গড়ে নিত, বর্তমানে করপোরেট হাতছানির কাছে তা বহুলাংশে ম্লান। লেখা ছাপানোর জন্য এখন আর কাউকে কোথাও ধরনা দিতে হয় না। উল্টো, করপোরেট এই লেখকদের টেনে নিয়ে লেখা ছাপিয়ে দিতে পারলে অন্তত প্রথম হওয়ার কৃতিত্ব দাবি করতে পারে। পত্রপত্রিকার বাইরে ওয়েব পোর্টাল, ফেসবুক, ব্লগ, টুইটার- এসব তো রয়েছেই। ওয়েব পোর্টালগুলো তো আবার প্রতিদিনের সাহিত্যই শুরু করে দিয়েছে। সুতরাং কে কতটুকু লেখক, তার হিসাব বাদ দিয়ে কার কতটা লেখা ছাপানো যায়, এটিই এখন মুখ্য হয়ে উঠেছে। পত্রপত্রিকার কোথাও যদি লেখা ছাপানোর সুযোগ পাওয়া না যায়, তবে ফেসবুক-ব্লগ এসব তো রয়েছে। কারো তোয়াক্কা না করে সরাসরি সেখানে যত খুশি লেখা প্রকাশ করা সম্ভব। এই যে সুযোগ, এটিই প্রকৃত লেখকের সঙ্গে একজন শখের লেখকের প্রভেদ দূর করে দিচ্ছে। কম্পিউটারে কিছু একটা লেখার পর সেটিকে লেখার আদল দিয়ে যখন নেটে প্রকাশ করা যাচ্ছে, তখন তারও মনে হতে পারে সেও লেখক। প্রতিদিনের ফেসবুকে নজর রাখলে এ রকম হাজার হাজার লেখক দেখতে পাওয়া যায়। সুতরাং বলাই যায়, পাল্টাচ্ছে অনেক কিছু। পাল্টাচ্ছে রুচি। পাল্টাচ্ছে চিন্তা। যেমন, দ্বিতীয় দশকের কবিতা সৈনিকরা এরই মধ্যে বলতে শিখে গেছে- 'কোন পত্রিকায় আমাদের নিয়ে লেখা হবে?' এ প্রক্রিয়াটি মূলত শুরু হয় প্রথম দশকের কবিদের থেকে। ২০০১ সালে একটি জাতীয় দৈনিকের পক্ষে প্রথম দশকের কবিদের নিয়ে একটি গোলটেবিল করা হয়। পরে তা ফলাও করে প্রকাশও করা হয়। আশ্চর্যের বিষয়, সেই সময়টায় যাদের প্রবল উজ্জ্বল মনে হয়েছিল, ১৩ বছর পর তাদের সিংহভাগের নামগন্ধ আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আর দ্বিতীয় দশকের ক্ষেত্রে এ দায়িত্বটি পালন করে একটি লিটলম্যাগ। একেবারে দ্বিতীয় দশক শুরু হওয়ার বছরেই ২০১০ সালে 'উজানবাঁকের পায়রা : দ্বিতীয় দশকের কবিতা'- এই শিরোনামে ৩৯ জনের কবিতা প্রকাশ করা হয়। সঙ্গে প্রবন্ধও। সেই যে শুরু, এরপর আরো লিটলম্যাগ এবং দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য পাতায় বিশেষ আয়োজন হতে থাকে দ্বিতীয় দশক নিয়ে। অথচ সময় পার হলো মাত্র সাড়ে তিন বছর।
দুই.
দ্বিতীয় দশকের কবিতা নিয়ে আলোচনার আগে 'দশক' নিয়ে কিছু বলার প্রয়োজন বোধ করছি। প্রখ্যাত সাহিত্যিক বিমল কর লিখেছেন- "আজকাল তরুণ লেখকদের মধ্যে 'দশক' কথাটার চলন হয়েছে খুব। যারা কবিতা লেখে তারা যেমন দশকের ভক্ত, যারা গদ্য লেখে তারাও সে রকম 'দশক পাগল'। আমার মনে হয়, এখানে কথাটির অন্য কোনো গুরুত্ব তেমন নেই, যতটা রয়েছে একটি সময়সীমাকে বুঝিয়ে দেওয়ার চেষ্টায়। আমরা কবে লিখতে এসেছি, শুধু সেটা বোঝানোই যেন এই লেখকদের উদ্দেশ্য। আমাদের সময়ে দশক-টশক বলে কিছু ছিল না। তখন আমরা, উনি তিরিশের বা উনি চল্লিশের লেখক বলতাম না। সাধারণত 'কল্লোল' এবং তার পরবর্তী লেখকদের একই গোত্রে ফেলা হতো। পরে অবশ্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিদেশের দেখাদেখি আমরা মাঝেমধ্যে 'প্রি-ওয়ার' এবং 'পোস্ট-ওয়ার' শব্দ ব্যবহার করেছি। আবার বিদেশেরই দেখাদেখি বোধ হয় দশকের ভাবনাটা আমাদের সাহিত্যিক মহলে ঢুকে গিয়েছে। এতে অবশ্য কিছুই আসে যায় না। এক দশক থেকে অন্য দশকের তফাৎটাই বা এমন কী যে খুব বড় লাফ না মারলে এক থেকে অন্যতে যাওয়া যায় না।"- 'আমি ও আমার তরুণ লেখক বন্ধুরা'। বিমল কর। পৃষ্ঠা-১৪০-৪১।
এই প্রসঙ্গটা টানলাম এ কারণে যে গত শতাব্দীর আশির দশকে কবিতার বাঁক বদলে সে দশকের কবিরা যে উদ্যোগ নিয়েছিলেন, তাকে বরণ করে নেয় নব্বই দশকের কবিরা। আশির দশকের কবিদের প্রতি সম্মান জানিয়েই কবিতার প্রচল ব্যাকরণ অমান্য করে নব্বইয়ের কবিরা যে ধারা শুরু করেছিলেন, তা থেকে পৃথক কী লিখেছেন পরবর্তী দুই দশকের কবি এবং সৈনিকরা, তা পরখ করে দেখা প্রয়োজন। দশক বিভাজনের বাইরে পরবর্তী দুই দশকের কবিতায় কী কী পরিবর্তন এসেছে, এসে থাকলে তা কতটা মৌলিক, তা-ও খতিয়ে দেখা যেতে পারে। নব্বইয়ের দশকের কবিরা ছন্দ এবং ব্যাকরণ শিখে তবেই অমান্য করেছিলেন। কবিতার বহিরঙ্গের এই যে পরিবর্তন, তা থেকে পরবর্তী দুই দশকের কবিতার কোথায় পার্থক্য তা-ও দেখা প্রয়োজন। আর নব্বইয়ের দশকে বেশ কয়েকজন কবি যে স্বতন্ত্র স্বর ও সুর সৃষ্টি করেছিলেন চেতনার অতলে, তা থেকেই বা পার্থক্য কোথায় পরবর্তী দুই দশকে, সেদিকেও নজর দিতে হবে। সেটা করা না গেলে বিমল করের মতোই বলতে হবে- 'এক দশক থেকে অন্য দশকের তফাৎটাই বা এমন কী যে খুব বড় লাফ না মারলে এক থেকে অন্যতে যাওয়া যায় না।' এখানে দ্বিতীয় দশকের কথা বলতে গিয়ে বারবার প্রথম দশকের কথা চলে আসছে এ জন্য যে তাঁরা অন্তত একটি দশক পার করেছেন। আর দ্বিতীয় দশক পার করেছে মাত্র সাড়ে তিন বছর। এই সময় পর্বে এখনো স্পষ্ট নয়, কবিতার লম্বা দৌড়ে কারা টিকে থাকার মতো যোগ্য। দৌড়ে অংশ নেওয়ার জন্য শরীরের গঠন বুঝতে হলেও তো অন্তত দশ বছর প্রয়োজন। এখন তো সবেমাত্র শরীরচর্চার কাল শুরু হলো।
তিন.
শিল্পের ধর্মই হলো প্রথমে নিজেকে অস্বীকার করা। পরে অন্যদের। এই অস্বীকারের মধ্য দিয়েই প্রতিটি দশকের লেখকরা যাত্রা শুরু করেন। যে কারণে দেখা যায়, প্রথমেই তাঁরা আক্রমণ চালান মা-বাপের দেওয়া প্রিয় নামের ওপর। নাম পরিবর্তন করে নিজেকে বিশিষ্ট করে তোলার এই যে চেষ্টা তা কবিতাতেও প্রভাব ফেলে। চেষ্টা চলে পূর্ববর্তীরা যেভাবে বলে গেছেন, যেভাবে ভেবে গেছেন তেমন করে না ভেবে, তেমন করে না বলে নিজের সৃষ্টস্বরে বলা। এটা যাঁরা পারেন, নিঃসন্দেহে তাঁরা ইতিহাসের খাতায় নাম লিখিয়ে ফেলেন। দ্বিতীয় দশকের কবিতা সৈনিকদের মধ্যেও এই প্রচেষ্টা লক্ষণীয়। এই দশকের কবিতা পড়ে এবং এরই মধ্যে প্রকাশিত তিনটি কবিতাগ্রন্থ যথাক্রমে- অরবিন্দ চক্রবর্তীর 'ছায়া কর্মশালা', গ্যাব্রিয়েল সুমনের 'হাওয়াকাঠের ঘোড়া', সাইয়েদ জামিলের রাষ্ট্রবিরোধী গিটার' পাঠ করে অন্তত তেমন প্রচেষ্টাই লক্ষ করা গেছে। এদিকে এ পর্যন্ত দ্বিতীয় দশকের কবিতা সৈনিকরা অনেকেই নিয়মিত কবিতা লিখছেন। সামনে আরো অসংখ্য কবিতা সৈনিক এই দশককে যে আরো প্রলম্বিত করবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। শিল্প-সাহিত্যের নিষ্ঠুরতা হলো, অসংখ্য মানুষের অংশগ্রহণ একেকটি দশককে সমৃদ্ধি দান করলেও ইতিহাস মনে রাখে দু-একজনকে। অসংখ্য মানুষের রক্ত-ঘাম-শ্রমের ওপর এই দু-একজন দাঁড়িয়ে যান।
দ্বিতীয় দশকের কবিতা সৈনিকদের মধ্যে রয়েছেন- অজিত দাশ, অনায়ত, অনুপম মণ্ডল, অমিত আশরাফ, অমিত চক্রবর্তী, অরবিন্দ চক্রবর্তী, অসীম ইশতিয়াক, আজিম হিয়া, আফসানা জাকিয়া, আবু নাসিব, আবদুল্লাহ আল মুক্তাদির, আল-ইমরান সিদ্দিকী, আসমা অধরা, আহমাদ শামীম, ইলিয়াস কমল, কামাল আজাদ, কিশোর মাহমুদ, খালেদ চৌধুরী, গ্যাব্রিয়েল সুমন, চঞ্চল মাহমুদ, জিয়াবুল ইবন, জেমস আনজুম, জোনাফ আহমেদ, তানজিম আতিক, তানজীর মেহেদী, তারেক আহসান, তানিম কবির, তাহিতি ফারজানা, তুষার প্রসূন, দেব জ্যোতি ভক্ত, নাজমুল হাসান, নিজাম বিশ্বাস, নিলয় রফিক, ডাল্টন সৌভাত হীরা, ফয়সাল আদনান, বিধান সাহা, বিভা বৃষ্টি, মহিম সন্ন্যাসী, মেহেরুবা নিশা, মেঘ অদিতি, মৃন্ময় মিজান, রইস মুকুল, রজত সিকস্তি, রঞ্জন শুভ্র, রওশন আরা মুক্তা, রাশেদ শাহরিয়ার, রাসেল আহমেদ, রুদ্র হক, রুদ্র রাজীব, শহিদুল্লাহ পিয়াস, শ্যামল শিশির, শামীম মেহেদী, শিমন গুপ্ত, শুভ্র নীল সাগর,  শোয়েব সর্বনাম, সঞ্জীব সাহা, সফি রিয়াদ কামাল, সঞ্জয় কান্ত, সাইয়েদ জামিল, সাজ্জাদ সাইফ, সানাউল্লাহ সাগর, সাম্য রাইয়ান, সারাজাত সৌম্য, সালমান তারেক, সালেহীন শিপ্রা, সুজন আহমেদ, সুদীপ্ত সাইদ, সুদেব চক্রবর্তী, হাসানুজ্জামান, হিজল জোবায়ের, সুমন শামস, সূর্য্যমুখী, শ্যামল চন্দ্র নাথ, সিলভিয়া নাজনীন, হাসান রোবায়েত, সাইইদ উজ্জ্বল, সোহরাব ইফ্রান, সরকার মুহাম্মদ জারিফ প্রমুখ।
আগেই বলেছি সময়টা পরিবর্তনের। এই পরিবর্তিত সময়ে এখনো অবস্থান করছেন চল্লিশের আবুল হোসেন, পঞ্চাশের আল মাহমুদ, সৈয়দ শামসুল হকের মতো প্রতাপশালী লেখকরা। আছেন ষাট, সত্তর, আশি, নব্বই, শূন্য কিংবা একের দশকের লেখকরাও। আর এই পরিবর্তিত সময়ে লিখতে শুরু করেছেন দুইয়ের দশকের কবিতা সৈনিকরাও। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাংলা কবিতা কোন দিকে যাচ্ছে কিংবা যাবে, সেটি সময়ে সময়ে গবেষকরা খুঁজে বের করবেন।
চার.
এখানে আরো একটি প্রসঙ্গের অবতারণা করে এই লেখা শেষ করতে চাই। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের ইংরেজিভাষী লেখকরাও নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছেন প্রবলভাবে। এরই অংশ হিসেবে ২০১২ সালে ঢাকায় বেশ ঘটা করেই হয়ে গেল হে ফেস্টিভ্যাল। এখন প্রায় প্রত্যেকেই জানেন ইংরেজিভাষী লেখক তাহমিমা আনাম, কে. আনিস আহমেদ, ফারাহ গজনভি কিংবা মাহমুদ রহমানের নাম। আর এই তালিকায় সর্বশেষ সংযুক্তি নিয়ামত ইমাম। এই লেখক তাঁর 'ব্ল্যাক কোর্ট' উপন্যাস নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বর্তমানে বেশ আলোচনায় আছেন। এই প্রসঙ্গ অবতারণার পেছনে কারণ হলো, ইংরেজিভাষী এই লেখকরা বাংলাভাষী লেখকদের আর একা মাঠ ছেড়ে দিতে রাজি নন। সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের সরব উপস্থিতি এই কথাকে উসকে দেয় যেনতেন করে সাহিত্যচর্চার দিনও ফুরিয়ে গেছে। যেমন একদা শিল্প-সাহিত্যের আড্ডার প্রাণকেন্দ্রগুলো সংকুচিত কিংবা হারিয়ে যেতে যেতে বর্তমানে সামনে চলে আসছে কফি শপ রেড শিফটের নাম। আবার বিখ্যাত ওয়ার্ল্ড লিটারেচার টুডের মে/জুন ২০১৩ সংখ্যার প্রচ্ছদ দখল করে 'বাংলাদেশ অন দ্য ওয়ার্ল্ড স্টেজ' শিরোনাম। সেখানে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মাহমুদ রহমান এবং কে. আনিস আহমেদ যে কথাগুলো বলেছেন, এর প্রাসঙ্গিক অংশ এখানে তুলে ধরছি।
মাহমুদ রহমান : বাংলা লেখা সম্পর্কে আমি কয়েকটি কথা বলতে চাই। বাংলাদেশি লেখকদের লেখালেখি সর্বোচ্চ বিন্দুতে অবস্থান করে ষাট ও সত্তরের দশকে। সমসাময়িক সাহিত্য কিছুটা একটা স্থিতিশীল প্যাটার্নের মধ্যে এসে গেছে। আর এর পেছনে একটা কারণ হলো, মুসলমান মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উত্থানের বিবর্তন। লেখকদের অনেকেই, বিশেষ করে ভালো লেখকদের অনেকেই ছিলেন হিন্দু এবং তাঁরা এক সময় পূর্ব বাংলা ছেড়ে ভারতে চলে যান। তার পর থেকে মুসলমান লেখকদের আধুনিক বাংলা গদ্য তৈরি হতে থাকে। মাহমুদুল হক আমাকে বলেছিলেন, তাঁরা বাংলা বলা ও লেখা শিখেছেন খবরের কাগজ থেকে। ফলে আমরা পিছিয়ে রইলাম। কাজেই পঞ্চাশ ও ষাটের দশক আমাদের নবিশিকাল হয়ে এলো। আর ভাষাগত জাতীয়তাবাদ এ ক্ষেত্রে আমাদের এগিয়ে দিল; কারণ আমাদের এ রকম কণ্ঠই ছিল এবং সে সময়টাজুড়ে ছিল একটা উঠতি সাহিত্যিক সময়। এমনকি পুলিশের হাতেও 'ডিটেকটিভ' নামের একটা ম্যাগাজিন থাকত, সেখানে গল্প ও কবিতা ছাপা হতো।
কে. আনিস আহমেদ : ঠিক তা-ই। মাহমুদ যা বললেন, সেটা আসলে একটি অপ্রিয় সত্য- লেখালেখি ষাট ও সত্তর দশকে পোক্ত ছিল এবং বিগত কয়েক দশকে লেখালেখির মন্দা চলছে। এই অপ্রিয় সত্যটা খোলাখুলি বলতে পারাটা সাহসের কাজ বলে মনে করি। বাংলাদেশি প্রেক্ষাপটে ইংরেজি ভাষার লেখক হিসেবে আমি মনে করি, এ রকম বলার কারণে অনেক সমালোচনার মুখে পড়তে হবে। তবে আমার মনে হয়, স্পষ্টবাদিতা ও সততার সঙ্গে বলার এখনই উপযুক্ত সময়। বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে আমি জানি, বর্তমানে পুরস্কারজয়ী অনেক বাংলা লেখক আছেন, যাঁরা ইংরেজি পড়ার ক্ষেত্রে সাবলীল নন এবং তাঁরা বিশ্বসাহিত্যও খুব একটা পড়েন না। এ রকম ব্যাপার অনেকেরই হয়েছে বাংলা মাধ্যমের কারণে। সেখানে বেশ বুদ্ধিজীবী পর্যায়ের লেখকও ইংরেজিতে তেমন চলার মতো পর্যায়ের স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না। সুতরাং আজকের দিনে লেখকের জন্য সংস্কৃতির যে ব্যাপক পরিসরে প্রবেশের দরকার এবং যেখান থেকে উৎসাহ-উদ্দীপনা আসতে পারে, তেমন ব্যাপক পরিসরে প্রবেশের ক্ষেত্রে তাঁরা অনেকটা অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। আপনি যখন এসব দেখবেন, তাঁদের সম্পর্কে বিপর্যস্ত বোধ না করে পারবেন না।
শেষ কথা : এ বিষয়গুলোর ওপর দ্বিতীয় দশকের কবিতা সৈনিকদের পর্যবেক্ষণ আছে তো? একই সঙ্গে সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, নৈতিক, মনস্তাত্তি্বক, পারিবারিক যে পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে, তার ওপরই বা দ্বিতীয় দশকের পর্যবেক্ষণ কী সেটাও দেখার অপেক্ষায় আছি। উল্লিখিত তালিকায় যে কয়জনের নাম উজ্জ্বলতর হয়ে উঠছে, কবিতায় তারা কতটা উজ্জ্বল হয়ে ওঠেন, সে অপেক্ষা আমাদের করতেই হবে। গুটিকয় কবিতা ছেপে কিংবা ছাপার সুযোগ পেয়ে কবি হওয়ার দিন শেষ। এ কথাটি মনে রাখলে ভবিষ্যতের জন্য ভালো হয়।




সর্বশেষ সংবাদ