বাংলা ফন্ট

বিতর্ক, সমালোচনা অতঃপর ‍একটি ‍উৎসবমুখর বইমেলা

27-02-2017
নিজস্ব প্রতিবেদক

বিতর্ক, সমালোচনা অতঃপর ‍একটি ‍উৎসবমুখর বইমেলা মাসব্যাপী একুশে বইমেলা শেষ হতে যাচ্ছে। আর একদিন পরই থেমে যাবে বইমেলার বর্ণিল উৎসব। শুরু থেকেই নানা বিতর্কের জন্ম দিয়ে শুরু হওয়া বইমেলা জমে উঠেছিল শুরু থেকেই। প্রকাশনীর স্টল বন্ধ করে দেয়া, পুলিশের মাধ্যমে প্রকাশিত বই যাচাই করাসহ নানা ঘটনায় সমালোচনার সম্মুখীন হয় বাংলা একাডেমি।

এবারের মেলা গতবারের চেয়ে একটু সম্প্রসারিত হয়েছে, ফলে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পুরো অংশই বইমেলার আমেজে মেতে উঠেছে এবং এতে করে মেলায় আগতরা স্বাচ্ছন্দে মেলার ভেতরে চলা-ফেরা করতে পারছেন। একাডেমি চত্বরে ১শ’ ১৪টি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ৫শ’ ৪৯টি ইউনিটসহ মোট ৬ শ’ ৬৩টি ইউনিটের প্রত্যেকটি স্টলে লোকে লোকারণ্য। বাংলা একাডেমিসহ ১৬টি প্রকাশনা সংস্থার ১৫টি প্যাভিলিয়নেও রয়েছে প্রচুর ভিড়।

কিন্তু এত বড় বইমেলায় লেখকদের বসে আড্ডা দেয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই। এমনকি মেলার ভেতরে হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে গেলে লেখক বা পাঠকরা কোথাও যে একটু বসে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবে তার উপায় নেই। প্রচ্ছদ শিল্পী চারু পিন্টু অভিযোগ করে বাংলা একাডেমিকে দায়ী করলেন।

তিনি বলছিলেন, আসলে এটাকে বাংলা একাডেমির গাফিলতি বলা চলে। কারণ, যে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিগুলো কাজ নেয় তারা হয়তো লেখকদের মেজাজ ঠিকমত বোঝে না। তবে বাংলা একাডেমির উচিত ছিল এ বিষয়ে উদ্যোগ নেয়া। কিন্তু প্রতিবারই আশ্বাস দেয়া হয় অথচ বইমেলাতে লেখকদের আড্ডা কিংবা আগতদের জন্য একটু জিরিয়ে নেবার জন্য কোনো বসার জায়গার ব্যবস্থা করা হয় না। তবে এবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা খুবই কঠোর। মেলা শুরু হচ্ছে প্রতিদিন বেলা ৩ টা থেকে, এবং শেষ হচ্ছে রাত ৮ টা ৩০ মিনিটে। অর্থাৎ অন্যান্য বারের চেয়ে এবার ৩০ মিনিট সময় বাড়ানো হয়েছে। অবশ্য ছুটির দিনে মেলা সকাল থেকে শুরু হয়। রাত ৮ টার পর কোনো দর্শনার্থী বা পাঠক প্রবেশ করতে পারবেন না। প্রবেশদ্বারগুলোতে রয়েছে সতর্কতার সাথে তল্লাশি।

এবারের মেলাতে তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। মেলায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা তদারকি করতে বসানো হয়েছে পাঁচটি ওয়াচ টাওয়ার। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দুই হাজারেরও বেশি সদস্য সাদা পোশাকে কাজ করছে। দোয়েল চত্বর এলাকা থেকে শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন্নাহার হল পর্যন্ত থাকছে ২৫০টি ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা।

এ প্রসঙ্গে সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর বলেন, ‘মেলায় আগত প্রত্যেককে নিরাপত্তা তল্লাশি পেরিয়ে যেতে হবে, এমনকি আমাকেও এই তল্লাশির ভেতর দিয়ে যেতে হবে।’ এছাড়াও বাংলা একাডেমি, শাহবাগ থানা ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্থাপিত তিনটি কন্ট্রোল রুম থেকে এসব ক্যামেরা মনিটর করছে ১৭টি ইউনিট। ডিএমপি’র কন্ট্রোল রুম থেকে ২৪ ঘণ্টা মনিটর করা হচ্ছে মেলা প্রাঙ্গণ।

এ ব্যাপারে ডিএমপি কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া জানিয়েছেন, বইমেলার নিরাপত্তার জন্য সব ধরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। নিরাপত্তাজনিত বিষয়ে শঙ্কাবোধ করলে যে কোনো লেখক, প্রকাশক চাইলে নিরাপত্তা পাবেন।

লেখক স্বকৃত নোমান বলেন, গত বেশ ক’ বছরের তুলনায় এবারের বইমেলা বেশ ভালো হচ্ছে। অনেক শৃঙ্খলা এসেছে। পাঠক, লেখক, প্রকাশকদের তেমন কোনো অভিযোগ শোনা যাচ্ছে না। স্টলগুলোর পরিসর বেশ বড়। খোলামেলা জায়গা। ধুলোবালি নেই বললেই চলে। মেলার শুরুতে দুদিন ছুটির দিন পড়ায় শুরুতে দর্শকদের ভিড় চোখে পড়েছে। আশা করছি শেষ পর্যন্ত মেলা ভাল হবে।

তবে কেমন হল বই বেচা-কেনা? অনেকেই জানাচ্ছেন এবার শুরু থেকেই বই বিক্রির পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে, তবে এটা আশানুরূপ নয় বলেও অনেক প্রকাশক মন্তব্য করেছেন। আবার হতাশা আছে তরুণদের নিয়ে। কারণ মেলায় প্রকাশিত বইগুলোর মধ্যে অধিকাংশ লেখকেরই বয়স চল্লিশের কোটায়। মেলায় যারা আসেন তারাও বেশিরভাগ তরুণ। অথচ অনেকেই বলছেন, তরুণরা এখন আর আগের মতো বই কেনে না। অধিকাংশ তরুণেরই কবিতা লেখার প্রতি আগ্রহ, কিন্তু যে পরিমাণ বই বের হচ্ছে সেগুলো ঠিক সেভাবে বিক্রি হচ্ছে না।

প্রকাশকরা বলছেন, হাতে গোনা কয়েকজন কবির কবিতার বই বাদ দিলে ২০/৩০ কপি কবিতার বই বিক্রি হয় না অনেক লেখকের। লেখক হায়াৎ মাহমুদও একই কথা বললেন।

তিনি বললেন, তরুণরা বই পড়ার ব্যাপারে যতটা আগ্রহী থাকার কথা, এখন ঠিক ততটা নয়। এটা খুবই খারাপ লক্ষণ। কিন্তু এবার দেখা যাচ্ছে অনেক তরুণ কবির বই দেদারসে বিক্রি হচ্ছে। মূলত ফেসবুকসহ নানা সামাজিক মাধ্যমে এখন সবাই সক্রিয়। ফলে তরুণরা তাদের নিজেদের অবস্থান জানান দিতে পারছে। ফেসবুকের মাধ্যমে অনেক মানুষের সাথে পরিচয় ঘটছে। আর পরিচিতরা তো পরিচিত লেখকের বই কিনবেই।

এদিকে অনেক পাঠক প্রকাশকদেরও সমালোচনা করেছেন। তারা বলছেন, মান সম্পন্ন বই কমে যাচ্ছে। তাদের মতে, প্রকাশনায় পেশাদারিত্বের অভাব ঘটেছে।

কামাল লোহানী বললে, এখন প্রকাশক ও লেখকরা পরিশ্রমী নন। তবে লেখক স্বপন নাথ বলছেন, কেউ কেউ বলে থাকেন যে, মান সম্পন্ন বই বের হচ্ছে না। মানলাম, কিন্তু মান বিচারের সনদ কোথায়? অবশ্য তিনিও প্রকাশনায় যে পেশাদারিত্বের যে অভিযোগ রয়েছে সেটা স্বীকার করেন। আবার প্রকাশকদের বিরুদ্ধে উঠেছে নীতিমালা ভঙ্গের অভিযোগ। ড. তপন বাগচী বললেন, ‘ মেলার নীতিমালাতে বলা ছিল বিদেশি বই প্রকাশ করা যাবে না বা তাদের প্রমোট করা যাবে না। রবীন্দ্রনাথ বা তারাশঙ্কর বা ক্লাসিক্যাল বইগুলো প্রকাশ করা যেতে পারে। কিন্তু সমকালীন লেখকদের বই প্রমোট করার কথা ছিল না’।

এবার আসা যাক লিটলম্যাগ চত্বর প্রসঙ্গে। অনেকেই বলে থাকেন লিটলম্যাগ চত্বর হল বইমেলার প্রাণ। এখানেই দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা লেখককের আড্ডা বসে। নানাবিধ আলোচনা, সমালোচনা, বিতর্ক ও আড্ডায় মেতে থাকে বাংলা একাডেমির এই অংশটি। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা লিটলম্যাগগুলোর স্টলগুলো এখানে বসে। কিন্তু এবার লিটলম্যাগকে নিষ্প্রাণ মনে হচ্ছে।

প্রতিদিনই মেলায় প্রবেশ করছে নতুন নতুন বই। এ পর্যন্ত প্রায় তিন হাজারের মত নতুন বই মেলায় এসেছে। এর মধ্যে কবিতার বই সবচেয়ে বেশি। প্রায় ৭০০ কবিতার বই এসেছে এবার।

তবে মেলায় ঢুকে খটকা লাগার ব্যাপার আছে। সেটি হল একুশে গ্রন্থমেলায় ভুল বানান দেখে। তাও আবার শিশুচত্বরে। অথচ আমাদের শিশুরা এই ভুল বানান দেখে দেখে ভুলটাই শিখবে। ছোটদের গুরুত্ব দিয়ে মেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে ‘শিশুচত্বর’ তৈরি করেছে বাংলা একাডেমি। কিন্তু ‘শিশুচত্বর’ এর প্রবেশপথেই করা হয়েছে বানান ভুল, ‘শিশুচত্বর’ শব্দটির পরিবর্তে লেখা হয়েছে ‘শিশু চত্তর’। তাও আবার ‘শিশু’ ও ‘চত্তর’-এ দুটি শব্দকে লেখা হয়েছে আলাদাভাবে। অথচ শুদ্ধ রূপটি হবার কথা ‘শিশুচত্বর’। বাংলা একাডেমি’র ব্যবহারিক বাংলা অভিধানে ‘চত্তর’ বলে কোনো শব্দ নেই। আর বাংলা একাডেমির অভিধান অনুযায়ী শব্দটি হবে ‘চত্বর; যার অর্থ চাতাল, চবুতর, প্রাঙ্গণ, উঠান, আঙিনা, রঙ্গভূমি, যজ্ঞভূমি।

বলা বাহুল্য, শ্রাবণ প্রকাশনীকে বইমেলায় নিষিদ্ধ করার পর ২০১৬ সালের ২৮ ডিসেম্বর ফেসবুকে বাংলা একাডেমি’র মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান যে ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন, তাতেও ছিল বানান ভুলের ছড়াছড়ি। এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি। এরপরও তিনি আবার নিজের ভুলের পক্ষে সাফাই গেয়ে গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, ‘ভুল হতেই পারে’। কিন্তু এবার কী বলবেন তিনি?

তবে যাইহোক এখনও পর্যন্ত কোনো প্রকার বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। শেষ হতে চলেছে এবারের বইমেলা। বলা যেতেই পারে গতবারের তুলনায় এবারের মেলাটা ভাল হয়েছে। এখন প্রকাশকরা কতটা লাভবান হলেন আর লেখকরা কতটা তৃপ্ত হলেন সেটাই বিবেচ্য। তবে পাঠক যে সন্তুষ্ট তা বোঝা গেল অনেকের সাথেই কথা বলে।

শ্রাবণ প্রকাশনীকে বইমেলায় নিষিদ্ধ করার পর ২০১৬ সালের ২৮ ডিসেম্বর ফেসবুকে বাংলা একাডেমি’র মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান যে ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন, তাতেও ছিল বানান ভুলের ছড়াছড়ি। এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি। এরপরও তিনি আবার নিজের ভুলের পক্ষে সাফাই গেয়ে গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, ‘ভুল হতেই পারে।’

সর্বশেষ সংবাদ