বাংলা ফন্ট

নাভেদ, এক ভালোবাসার মুখ

02-12-2018
রাজু আহমেদ মামুন

 নাভেদ, এক ভালোবাসার মুখ

নাভেদ আফ্রিদী, নাভেদ আমার বন্ধু। ওর সাথে প্রথম পরিচয় বোধ করি ১৯৯৮ সালে। তখন লাইব্রেরি যাতায়াত ক্রমশ বাড়ছে। আমার সময় কাটতো লাইব্রেরির ভেতরে। নাভেদের সময় কাটতো লাইব্রেরির বাইরে, আড্ডা মেরে, গাঁজা টেনে। আমি বই পড়তাম। নাভেদ মানুষ আর গাছ পড়তো। নাভেদ কবিতা লেখে। তাকে অনেকেই কবি মনে করে না, (আমাকেও হয়তো কেউ কেউ কবি মনে করে না) তাতে কী! তবুও নাভেদ কবি।

তখন সে কেমন এক দরবেশ দরবেশ কবি। সব সহজ সরল সামান্য কথাকেও অধিবিদ্যার কুয়াশায় টেনে নিয়ে যেতো। তার কথায় একটা চটকদারী ভাব আছে। বাক্যগুলো ভালোবাসায় জরিয়ে ধরতে চাইতো। সদা শান্ত কিন্তু উত্তাল। নেত্রকোনার এক গ্রাম থেকে এসেছে সে। তার ঝাঁকড়া চুল। আমি তখন মাইলেটাস ফিলোসফি থেকে ফিকটে শেলিঙ পর্যন্ত বকতাম, তখন সে নেত্রকোনার কোন বাউল সাধকের আখড়ার গল্প বলতো। তার সাথে ঘুরে বেড়াতো আমাদের আরেক ভবঘুরে বন্ধু মোহন্ত কাবেরী, সে কোথায় এখন জানিনা।

নাভেদ আমার বন্ধু। পরিচিতরা জানে সবাইকে আমি খুব সহজে বন্ধু মনে করি না। হয়তো পরিচিত বা শুভাকাঙ্খী মনে করি। আমার কাছে অনেক পথ হাঁটার পরে কেউ বন্ধু হয়। নাভেদ আমার সাথে অনেক দূর হাঁটেনি। তার একটি মহৎ সহজিয়া মন আছে, সোমেশ্বরী নদীর মতো একটি স্নেহতাপ্তি নদী, আমি সেই নদীটির সাথে অনেকদিন হেঁটেছি। তাই সে আমার বন্ধু।

নাভেদ একবার তার এক বন্ধুর সাথে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল, তার নাম আলতাফুর। সেও নেত্রকোনার কোন এক গ্রাম থেকে এসেছিল। আলতাফুর ছিল নাভেদের চেয়েও কয়েক ডিগ্রি বেশি পাগল। সে সর্বভুক। তার কখনও খাবারের অভাব হতো না। কাদা, কেঁচো থেকে মরা প্রাণী পর্যন্ত ভক্ষণ করার অভ্যাস ছিলো। এখন নাকি তার একটা খানকা হয়েছে, মুরিদেরা সেবায় নিবেদিত। কোন একদিন সময় পেলে নেত্রকোনায় আলতাফুরকে দেখতে যাবো।
 
সম্প্রতি নাভেদ তার সর্বশেষ এবং ৬ষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ 'সকল মুখ ভালোবাসার জন্য' উপহার দিয়েছে, একটি অনুরোধ সমেত। পড়ার অনুরোধ। আমি সেই ছোট্ট বইটির চব্বিশটা কবিতাই পড়েছি। নির্মাণকলা নিয়ে নাভেদ খেলাধুলা না করলেও সে তার বক্তব্য নিয়ে খেলতে নামে। তার আধ্যাত্মিক ভাবনার বয়ানে। সেই প্রাচীন আত্মা ভাবনা আর তাকে কেন্দ্র করে নানাবিধ রহস্য আর বিষয়ের বয়ান। এ বিষয়টি তার আগের লেখাগুলোতেও ছিলো। কিছু কিছু বৈষয়িক বিষয়ও থাকে, যেমন সে দেশপ্রেমিক। এ গ্রন্থেই মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে তার 'রক্তবৃক্ষ' কবিতা। আধ্যাত্মিকতার রহস্য হয়তো ক্রমশই সংকোচিত হয়ে আসছে মানুষের সভ্যতায়। তাতে কী! নাভেদ সে মাঠেই খেলতে নামবে। ওর সিনট্যাক্সগুলোর মধ্যে একটা অসংগতি এবং অসমাপ্ততা দেখা যায়, দৃশ্যতো কারো কাছে ভুল মনে হতে পারে কিন্তু ওর ভাবনা ওর ব্যাখ্যায় এটি ওর আধ্যাত্মিকতারই বয়ান কৌশল। সে তার ভেতরে প্রবহমান নদীর কুলকুল ধ্বনি লেখে।

নাভেদ আমার বন্ধু, সে মানুষ পড়ে, পড়তে চেষ্টা করে। মাঝে মাঝে আমাকেও পড়তে চায় যখন তার সামনে আমি দুই নক্ষত্রের মধ্যবর্তী অন্ধকার হয়ে বসে থাকি। সে কিছু দূর আগায়, তার পর ফিরে যায়। টেবিলে আঙ্গুল বাজায়, মাথা নাড়ে। চশমার ফাঁক গলে মিটমিট করে তাকায়, যেন সে পড়ে ফেলেছে। আমি দেখি তার চালাকি সরল এক কিশোরের মতো।

নাভেদ হয়তো বিখ্যাত কেউ নয়, কোন বড় চাকুরে নয়, বিত্তবান নয়। কিন্তু তার সরল মহৎ হৃদয় অনেক বড়। তার ভেতরের একস্টেসি বা ভাবউন্মাদনা তাকে নিয়ে উড়াল দিতে চায়। আমি কেঁপে উঠি। এই ভালোবাসার মুখ হারানোর ভয়ে।

শেষে নাভেদের ৬ষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ থেকে দুটি কবিতা তুলে দিচ্ছি-

ঝিনুক
.
তোমার ভেতর নীল রকমের জল
এবং রহস্যময় অগ্নি।
ধ্বংস আর সৃষ্টির প্রস্তুতি

তোমার ভেতর বিস্ময়কর বহির্জগত

তোমার খুব জরুরি-
নিজের সাথে নিজে কথা বলা

দু'টি ভেতর থাকা জরুরি।
একটি উন্মাদ লুকিয়ে রাখার জন্য
একটি সকল মুখ ভালোবাসার জন্য
.

দুখের নিসর্গ
.
চোখের ভেতর কারো সাগর থাকে না
থাকে অবহেলার লাশ

দুখের নিসর্গ
আত্মার ওপর ডেকে আনে ঈশ্বরের ছায়া

অতপর, জল আর মাটি
সমঝোতা করে, নাম দেয় নতুন নদীর
.

সর্বশেষ সংবাদ