বাংলা ফন্ট

সোহেল হাসান গালিবের কবিতা

14-06-2018

 সোহেল হাসান গালিবের কবিতা


ঘুঘুদের ডাকবাক্স খুলে

কিভাবে পুলিশ গুম করা যায় ভেবে ভেবে, ধীরে
জঙ্গলে ডোবার মধ্যে নেমে গেল শান্ত গুইসাপ-
পিস্তল-সন্ধানী পাখিদের পাখসাটে এই পাতা-ঝরা
বহেরা গাছের নিচে
এখন ঘাপটি মেরে বসে থাকা যায়।

অথবা মাটিতে ছক কেটে, মাথা ঠান্ডা রেখে
ষোলগুটি খেলা যেতে পারে নিরিবিলি।

জলপাই ফাঁদ গ’লে নিঃশব্দে ঝিলিক মারে রৌদ্র
আততায়ী চশমার কাচে-

এমন দুপুরে পরকীয়া প্রেম সবচেয়ে ভালো।

ঘুঘুদের ষড়যন্ত্র থেকে দুপুরের জন্ম হলো
যদি নাই ভাবো একবারও
তাহলে পাতার বাঁশি এত যত্নে কেন
বাজাতে শিখেছ?
অথচ এখন বাঁশঝাড়ে কোনো সুর এতটুকু কাঁপছে না।
বাতাসে গাঁজার গন্ধ পায়চারি ভুলে থম ধরে আছে।
বলছে সে ফিসফিস করে, ‘থানা থেকে পালিয়ে এসেছি,
দরজাটা খোলো।’

দরজা-জানালা বন্ধ করে কেউ আর ঘরে বসে নেই।
সে সুযোগ তোমায় কে দেবে আজ?
সাপলুডু খেলবে তো মাচার ওপর উঠে গিয়ে
চাচাত বোনকে ডাকো। তবে জেনে রাখো,
বর্শি ফেলে পুঁটি মাছ ধরবার এখনইসময়
ধোপাদের পুকুড়ের পারে।
পাকুড় গাছের নিচে ভূতেরাও বসে গেছে
প্রেতিনীর ছবি-আঁকা তাস নিয়ে।

ঘাসবনে নূপুর হারাতে চাও যদি এসো বলে ডাকছে পুবেরহাওয়া...

ওই দূরে, নদীর ওপার
ওই কাশফুলের ছায়ায় শুয়ে হুঁকো টানবার কথা
একবারই ভেবেছিল শিয়ালেরা,
একবারই তারা কুকুরের বন্ধু হতে চেয়েছিল।

বন্ধুত্বের পথে কী কী বাধা দাঁড়কাক ভালো জানে;
সে জানে গরুর মাংস মন্দিরে ফেলার কূটনীতি।

আজ আর কূটনীতি শেখাবার কিছু নেই।
কোকিল পঞ্চম স্বরে শুধু লিখে যাচ্ছে একটিই নাম
আড়াই অক্ষরে, মুগ্ধ সেগুন পাতায়।
এখন খোলাশা হয়ে গেছে, এইসব লুকোচুরি
ধর্ম ও মর্মের টিটকারি খুব ভালোবাসে।
যেখানে কোকিল গায়, কবি কঙ্ক সেখানেই ফেরে;
তবুও জয়ানন্দের মতো নয়-
এ যদি জানত লীলা, আশ্রম-বালিকা,
খুনপলাশের নিচে আসতেই চিতা থেকে নেমে
গান গেয়ে উঠত না কি সেই?

জারুলের ফুলগুলি ভেবে ভেবে
ঠুমরির ঘায়েমূর্ছা যায়,
থেকে থেকে ঝরে পড়ে
জাতিবাদী শ্লোগানের নিচে।

আজ এই নির্জন দুপুরে
গত শতাব্দীর সবচে বাচাল
এক জননেতার কবরে আদিবাসী প্রস্রাবের ফেনা
মুছে না যেতেই, হেসে উঠেছে চামেলি, জুঁই।

শুধু ভুঁইফোঁড় বৃক্ষরাই আদিবাসী-
যদি মানো, তবে
গুচ্ছ গুচ্ছ অ-কোষ নিয়ে
ক্লান্ত ও ঝুলন্ত এই আঙুর-খামার,
আরও শ্রান্ত, স্নিগ্ধ এই করমচা বাগান ফেলে
কতদূর যাবে!

পাহাড়ের পাঁজরে লুকানো ছিল সেসব টোটেম
ধসে পড়ে ভেসে গিয়েছিল এক বৃষ্টি বুলেটের রাতে।
সোঁদা গন্ধে তারা সব ফিরে আসে বাংলার
বিষণœবাকলে আর গাছের চূড়ায়।

এর চেয়ে, যদি জন্ম হতো লখনৌর কোনো বাইজির ঘরে...
শিরীষের পাতাগুলি শিউরে ওঠে বারবার
কবেকার ভুল কল্পনায়।

কাঠবিড়ালি তো আজও হতভম্ব হয়ে যায়
হঠাৎ হঠাৎ, শুধু এই ভেবে,
‘ঐতরেয় আরণ্যক’ না পড়েই কী করে সে পেল
অরণ্যের অধিকার?

‘শোনো, এই ম্লেচ্ছদেশে মালাউনই রাজা’-
এমন একটা প্রবচন বলবার লোভ বানরেরও ছিল।
ছিল বনবেড়ালের দুতিনটা ইঁদুরের হিস্যা।

সে সব না হয় থাক। থাক আরও কিছু কথা, ক্ষুৎপিপাসা,
অমরতাশূন্য এই জগৎ-বাসনা। তারপরও, গ্যাংব্যাং
পশুদের মধ্যে নেই বলে এত মনস্তাপ
সত্যি নাকি পেঁচার সংসারে!

একবার এসে ছুঁয়ে যাও। ছুঁতে চাও যাকে।
লজ্জাবতী লতাটিরও এখন সম্মতি আছে
এই ভরদুপুরেই-
সমকামী হাওয়ায় ফুলতে থাকা ফুল আর
নাগলিঙ্গমের পাতা ছিঁড়ে আনুক না
লিঙ্গপূজারির দল।

জল ঢালো, দুধ ঢালো আর কলা খাও
কদলীবনের পাশে, কদলীনগরে। তারপর সেই
গোরক্ষনাথেরে করো আমন্ত্রণ।

কিন্তু এ দুপুর হলো বৈষ্ণবী, কেবলি নাম সংকীর্তনের...

একটি গাছের নাম কত না অদ্ভুত-
ইউক্যালিপ্টাস বলে ডাক দিলেই এন্টনি ফিরিঙ্গি ও কালিদাস
একযোগে সাড়া দেয়। মনে হয়
পদ্যলেখা পাতাগুলো কার
মুখস্থ বুলির মতো সারাদিন ছুড়ে ফেলে
জলের ওপর।

এখানে কালিন্দী নেই, তাই জেনো, কিংশুক ভাসে না জলে,
আমাদের দেশপ্রেম ভেসে যায় ত্রিপদী, পয়ারে...

এ দুপুর কি তবে রামপ্রসাদী? কিছুটা
কংগ্রেসি মনে হয়, হিন্দুমেলার মৃন্ময়ী উপহার।

রোয়েদাদ রদ হওয়া এই জঙ্গলের মধ্যে এসে দ্যাখো
বাউল ঘুমাচ্ছে, পরমের দরশনবিনা।
সব বুজরুকি ফাঁস হয়ে গেছে।
বুদ্ধের ছাতিম তলা ভিজে গেছে কার ঘামে?
সাইকেল থেকে নেমে ডাক-হরকরা পৌঁছে গেছে
ডাকবাক্স নিয়ে গ্রামবধূটির খুব কাছে।

প্রবাসী পাখিও জানে, পরকীয়া প্রেম নিয়ে
মহাপ্রস্থানের পথে, আজও নিপাতনে
এ-দেহচুল্লির সন্ধি ও সমাস।

এখনই সময় আত্মঘাতী হামলার নীল নকশা মেলে ধরবার।
ইহুদি-বিদ্বেষ নিয়ে তেঁতুল গাছের ছায়া
যত ঘন হয়ে নামে, তার চেয়ে বেশি ধর্মরাজ্য
পৃথিবীর কাম্য নয়, কেন ভাবো?

ব্রাহ্মণ্য ঘৃণায় কত রাত শেষ হলো,
দেখতে দেখতে, যেন কোন সমুদ্রের পার থেকে
তোমাদের হিংসা-সন উল্টে এল
উই-ঢিবি আর ঘুম-পাহাড়ের খাদে
বনি-ইজরাইলি সন্ধ্যা।

কৃষ্ণচূড়া খুব সন্তর্পণে, এইখানে,
দুপুরের প্রেসনোট লিখে গেল একান্ত নিষ্ঠায়।

যদি ভালোবেসে নিরক্ষর হতে, হয়তো বুঝতে,
মহুয়া গাছের পাশ দিয়ে যে রাস্তাটা চলে গেছে
দক্ষিণে শ্মশান আর উত্তরে উদাস বট, মঠ, দিঘি,
তার ধারে তোমাদের আতাফুল ফোটা
বিষণœ সে গোরস্থান ফেলে-

রাস্তাটা চিনতে কি পারছ?
এই হলো সেই গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড,
এই পথ ধরে আফগান চলে যাওয়া যায়।
এই পথ ধরে গোরা সৈন্য চিরদিন
ঘোড়া দৌড়ায়।

কখনোবা এত ধুলা ওড়ে, শূন্যে, মেঘের ওপারে
খুলে যায় গোধূলি-কপাট।
যদিও এখন, কাঁচুলি খোলার বুলি শুনেই বাতাস
আড়ি পাতে গোসলের ঘাটে।

এ দুপুর ফরায়েজি, এ দুপুর শরীয়তুল্লাহ...
সন্ন্যাসী গাছের কাছে এসে থেমে গেল বটে ফকির বিদ্রোহ।

উকুন কি স্বপ্ন কুড়ে খায়? রুক্ষচুল
ফুল্লরার আঙিনায় আজও সেই বাংলার দুপুর গড়িয়ে যায়।

কড়ই গাছের স্তব্ধতার নিচে বসে বহুদিন পর
পৃথিবীর জাঁহাবাজ স্বৈরাচারদের আত্মজীবনী পাঠের
সময় এসেছে- বাতাসের অনুবাদে নয়, সরাসরি
ডানাভাঙা পতঙ্গের নিঃশব্দ চিৎকারে।

সব লেখা, সকল বৃত্তান্ত পালতোলা জাহাজের থেকে নেমে
জনশূন্য পোতাশ্রয়ে একাকী দাঁড়িয়ে কারও জন্য
অপেক্ষার মধ্য দিয়ে শুরু,
বাষ্পীয় ইঞ্জিন ফুঁসে ওঠা ফিল্মি ইশরারায় শেষ।
খানিকটা ওয়েস্টার্ন, অসমাপ্ত, রোমান্টিক।
কোথাও একটি হ্রেষা, ঘোড়ার খুরের শব্দ থাক বা না থাক
নিশ্চিত শুনতে পাবে সবুজ বৃংহণ
এসব মেঘলা আত্মজীবনীর প্রতিটি পৃষ্ঠায়।

দুপাতা এগুলে দুকলম বেশি জানা যায়-
বিজলি-করাতকল নিয়ে তারা এসেছিল
এসেছিল শুধু এই অঙ্গহানি অঙ্গীকারে,
‘পৃথিবীর সব অরণ্যকে পশুদের বাসযোগ্য করে
গড়ে যাব মর্মরপ্রাসাদ।’

আজ যেন সেই ভগ্ন প্রাসাদের ক্ষুধিত পাষাণে
তপ্ত কাঞ্চনের ফুল চোখ উল্টে পড়ে গেল।

মনসামঙ্গল মুখে নিয়ে গর্ত থেকে বেরুবে কি সাপ?

আর কেউ নয়, দ্যাখো,
ঘসেটি বেগম এতদিন পর আবার এসেছে
ত্যাড়া লাঠি ভর দিয়ে ডুমুর কুড়াতে।

এই ছিন্ন ঘাসের আঁচল থেকে শুধু
ডুমুর কুড়াতে।

সর্বশেষ সংবাদ