বাংলা ফন্ট

অপৌরাণিক

14-06-2018
হামীম কামরুল হক

 অপৌরাণিক

করিমুদ্দিন অনেক দূরের গ্রামে যাত্রা দেখতে গিয়েছিল। সেখানের এক লম্বা চাওড়া ফর্সা যুবতী তার চোখে জড়িয়ে যায়। করিমুদ্দিন লম্বায় মাঝারি, কিন্তু ভীষণ চওড়া শরীর। বুকের ছাতিই ছেচল্লিশের বেশি। দৈত্যের মতো খাটার ক্ষমতা। তেমনি ফূর্তিবাজ। ওই নারীর সঙ্গে মেলামেশার শুরুতেই লোকে সাবধান করে। মাগীর আগে আরেকটা বিয়ে হয়েছিল। স্বভাব চরিত্র মোটেও ভালো না। পুরুষখেকো। আগের স্বামীটা রক্তবমি করে মারা গেছে। করিমুদ্দিনের এক কথা, আমার ওতে মন মজেছে। ওমন একটা মাইয়ামানুষ না পেলে জেবনই বৃথা। কারো কথায় কান না দিয়ে নিজের গ্রামে নিয়ে আসে। বউর রূপে সবাই ভুললেও কদিন যেতে না যেতে দেবর ময়েজুদ্দিনের সাথে তার একটা রহস্যময় সম্পর্কের জের ধরে সে শ্বশুরবাড়ির সবার লাথিগুতা খেতে শুরু করে। বাড়ির পেছনের বাঁশ বন। সন্ধ্যার অন্ধকার সবে ঘন হচ্ছিল। সে সময় তারা নাকি মাটিতে জড়াজড়ি করে গড়াগড়ি খাচ্ছিল। তাদের দিকে নজর ছিল নসিরনের। সেই সবাইকে ডেকে আনে। পুরো গেরস্থ বাড়ি তাদের ঘিরে দাঁড়িয়ে, কারো হাতে কূপি কারো হাতে হারিকেন। এই ঘটনার পর সে নজর বন্দি হয়ে যায়। আর ময়েজুদ্দিন অনেক দিনের জন্য নিখোঁজ। একটা লোককেও বোঝানো গেলো না কা-টা ঘটেছে সাপের হাত থেকে বাঁচাতে গিয়ে। তার সাথে ভাবীর এতটুকু পাপের কোনো ছোঁয়া ছিল না। মনের কথা মানেই কি কেবল পিরিতের কথাই? জগতে আলাপ করার আর কোনো বিষয় কি নেই? কত কিছু নিয়ে কথা বলত- ময়েজুদ্দিন শহরে যাবে, লেখাপড়া শিখবে, কীভাবে সেটা করা যায়, কাদের কাছে যাওয়া যায়Ñ কত কী, আর এরা? সেদিন হাঁটতে হাঁটতে বাঁশ বনের দিকে গিয়েছিল বাড়িতে সদ্য আসা তালাক পাওয়া ননদ নছিরনের একটা কথা বলতে বলতে। গতকাল অনেকরাতে, সবাই ঘুমিয়ে পড়লে, সে কোথায় জানি গিয়েছিল। কেউ টের পায়নি। করিমন তাকে যেতেও দেখেছে, ফেরার সময়ও দেখেছে। ভোরের দিকে করিমন যখন ওঠে, দেখে টলতে টলতে ফিরে এসে কোনোমতে ঘরে ঢুকছে নসিরন। হ, তার তো পুরানো ব্যারাম আছে, মুহুরিবাড়ির চেংড়া পোলা কানুর সাথে ভাবটা অনেক পুরানো। তারে এক সময়তো সারাদিন ঘরে আটকে রাখা লাগত। তারপর হঠাৎ হঠাৎ ওরে কাঁপা রোগে পেত। সবাই বলল বিয়ে দিলে ঠিক হয়ে যাবে। তার তো কানু ছাড়া গীত নাই। তারপর দশ মাইল দূরের এক বাড়ির সাথে বিয়ে দেয়া। তারপর? তারপর কি যৌতুকের কৌতুক। কদিন পর পর টাকা। মেয়েটাও এত বদরাগী! তখনই সাপটাকে আবছা অন্ধকারে জ্বলে উঠতে দেখে ভাবীকে নিয়ে গড়িয়ে পড়ে। তাকে বাঁচানোর জন্যই গড়িয়ে ছিল ঠিকই, কিন্তু ওই সামান্য সময়ে বুঝেছিল সারা শরীরে তার কী মাদকতা রাখা আছে। সেই মাদকতার টান রক্তের ভেতরে কু-লীপাঁকানো সাপের মতো ঘাপটি মেরে থেকেছিল অনেক অনেক দিন। এমন বউ ফেলে ভাইজান বাইরে বাইরে ঘোরে। সারাদিন মাঠে ক্ষেতে কাজ করার পর করিমুদ্দিন কোথাও যাত্রা পালার নাম শুনলেই হাওয়া। সেদিনের ঘটনা দুই দিন পর এসব শুনে সে বউকে আগে মারে। পরে করিমনের কথা শুনে মাফ চাইতে চাইতে সারা। বিয়ের আগে যে লোকটাকে কোনোভাবেই তাড়ানো যেত না, সেই লোক খালি উধাও হয়ে যায়! নটীমাগীরা কি আমার চে সরেস। নটী দেখতে নারে বউ, আমি গান শুনতে যাই। আর সসপেন্স। কী পেন্স? ওই যে কয় না ডেরামা সসপেন্স।
এদিকে আমি যে সসপেন্স হইয়ে যাতিছি তার দিকে তোমার কোনো খেয়াল আছে। করিমনের পেটে তখন বাচ্চা। কও কি? তোমার কোলে আমি আণ্ডা দিয়েছি! এই কথা তুমি আমারে আগে বলবা না। তুমি ভালো কইরে তা দেও, আমি দেখি কী করা যায়। করিমনের মনে পড়ে সেই শুরুতে করিমুদ্দিন বলেছিল, তোমার নাম করিমন, আমার নাম করিমুদ্দিন কেমন মিলেসে বলদিনি। নামে যখন মিলেছে তখন কামেও আমাদের মিল না হয়ে যায় না। লোকে আমারে ভালো বলে না। না বলুক। লোকে আমারে রান্ডি বলে। বলুক। খানকি বলে। বলুক। তাও? তাও। পিরিতের গাঙে তোমার এত জোয়ার উইঠেছে! লোকের কথা শোনো, পরে পস্তাবা। করিমুদ্দিন বলে, যে শোনো লোকের কথা, তারেই কয় হাঁদার দাদা। আমি আমার দিলের কথা শুনি। মাইনসের কথা শুনে বোকা হওনের লোক আমি না। লোকের কথা শোনে যে, চোহের দৃষ্টি হারায় সে। ওমা তুমি দেখি ভালো ছড়াও কাটতে পারো। আরো কত কিছু পারি। কই দেখাও তাইলে। বিয়ে কর, দেহাচ্ছি। বিয়ে ছাড়াই দেখাও। ছিঃ, কী কথা কও। এই তো লাইনি আইছো, এতটুকুতেই ছিঃ- সারা জীবন কিন্তু ওই ছিঃ ছিঃ করতে করতে যাবি। যাক। মহামুসিবতে পড়া গেল, শোনো মিয়া যা রটে তা বটে- আমি তো ভালো না, আমার নিজের থেই ভালো না; পুরুষ মানুষ আমার ঝাল লাগে মিঠা লাগে, পাইলেই স্বাদ করইরে খাতি ইচ্ছে করে। আমি ওসব বুঝি না। আইচ্ছা আমারে তোমার খাতি ইচ্ছে করে না। তোমারে আমার কইলজার ভিতরে নিয়া রাখতি ইচ্ছা করে। তুমি আমার সাথে চল। আমার মা? সেও চলুক। কিন্তু করিমনের মা আসতে চায়নি। বলবান জামাই তার মেয়েকে অযতœ করবে না। করিমুদ্দিনের সঙ্গে একদিন কথা বলেই সে বুঝেছিল। শ্রীসামন্তপুর গ্রামে সেই যাত্রাপালা দেখতে গিয়ে তাদের দেখা। তারপর ঘনঘন যাওয়া আসা। তুমি খুব বেহায়া। বেহায়া না হলি দুনিয়ায় কোনো কাজ উদ্ধার হয় শুনি? তাই নিকি? গরমে করিমুদ্দিন জামা খুলে রেখে তাল পাখার হাওয়া দিচ্ছিল। বুকের বিশাল পাটা আধভাঙা তরমুজের মতো ফুলে ফুলে উঠছিল। পেটে চাক্কা চাক্কা পেশি, নির্মেদ কোমর। তা আমার সামনে একটু বেহায়া হও দিনি। বসা থেকে উঠে করিমুদ্দিন একটানে লুঙ্গি খুলে সোজা উদোম হয়ে দাঁড়ায়। করিমন ওমা গো বলে দৌড়ে ঘর থেকে বের হতে গিয়ে উঠানেই মায়ের মুখোমুখি পড়ে। বুকে বুকে আরেকটু হলে ধাক্কা খেত। পরে বলেছিল, কী বেহায়া গো তুমি। এমন পুরুষ আমি জীবনে দেখি নি। কেমনে পারলা কও তো, মাগো মা। কী? কোন ঘোড়ার ডণ্ডা গো। আরবী ঘোড়ার। ছিঃ। এবার দেখি নিজেই ছিঃ। করিমুদ্দিন বলে, তোমার সামনে তো আমি গেদা পোলা। ওই গোরুডার মতো, গোরুর গায়ে কী কাপড় থাকে। ওই জানোয়ারের মতো সোজাসরল মানুষ আমি- আমারে তুমি ভরসা কর না? বেশরম মানুষেরে ভরসা করব? বেশরম না, সরল কও, সরল। সরল মানুষই ল্যাটাং হতি জানে। কও পাগল হতি জানে, ছিঃ-তাই বলে শরম থাকবে না- শরমই ধরম। তোমার শরম নাই? তোমার সামনে আমার কিসের শরম। শরম করলে মানুষের বংশ কবেই ধ্বংস হইয়ে যেত। করিমন থাকত তার মায়ের সাথে। মায়ের বয়স হয়েছিল। তার মা বাপের কত নম্বর বউ ছিল কেউ জানে না। তার মায়ের সাথে যখন বিয়ে হয় তখন তার বাপের বয়স পঞ্চাশের বেশি। মা তখনও যুবতী। এক জমিদারের বাঁদী ছিল মা। তার সমস্ত বাঁদীর ভেতরে এই ফর্সা সুন্দর বাঁদীটাকে তার ভীষণ পছন্দ।
জমিদার তাকে বলত, কবি কালীদাসের পাতা থেকে উঠে এসেছ তুমি আমার সামনে। জমিদার গানের আসর করত। কবিতা লিখত। তার নাম দিয়েছিল দিলশাদ। জমিদারের কোনো বিবির ছেলে হচ্ছিল না। কোনো বাঁদীরও না। সব মেয়ে। করিমনের মায়ের পেটে জমিদারের ছেলে হয়। প্রসবের পরদিনই বড়বিবি ছেলেটাকে হাত করে তাকে মেরে ফেলার সব আয়োজনই করেছিল কিন্তু যাকে দিয়ে মারতে পাঠানো হবে সে দিলশাদকে আগেই জানিয়ে দেয়। অসুস্থ শরীরে মাইলের পর মাইল হেঁটেছিল করিমনের মা, তারপর অন্ধকার বনের ভেতর চলতে গিয়ে যার বুকে সে জ্ঞান হারায় সেই হল মধু বাওয়ালী। সুন্দরবনে পর্তুগীজদের রেখে যাওয়া শেষ চিহ্নগুলির একটা। বাবড়িচুল, সবুজ চোখের গৌর চেহারা। বাঘের হাতে মরেছিল। বাঘটা অবশ্য মরেছিল সাথে সাথে। ধারালো লম্বা দায়ে বাঘের গলার নালী কেটে দিয়েছিল মধু। বাঘ ছিঁড়ে দিয়েছিল তার গলা আর ঘাড়ের অনেকটা জায়গা। সপ্তখানিক যুঝে সে যখন মারা যাচ্ছিল পেটে করিমনের মায়ের পেটে আরেকটা বাচ্চা। সে বাচ্চাটা বাঁচেনি। করিমনের মনে পড়ে লোকটা মাঝে মাঝে আসত। তারপর আবার হাওয়া। তাকে কোলে চড়িয়ে বাঘ ভালুকের গল্প, শিকারের গল্প,বন থেকে মধু আনার সব গা শিরশিরানো গল্প বলত। অবস্থার শেষ দিকে একদিন ভোরে করিমন আবছা দেখে একটা ভারী পা ঘরের বেড়ার দুয়ার দিয়ে ভোরের আবছা অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে। তার বাবার পা। বাবার শেষ স্মৃতি। ভোরের অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া পা। বাপ মরে জঙ্গলে গিয়ে, তার দাদীর আর দাদীর মায়ের কবরের ওপরে। যার কোনো ধর্ম পরিচয় ছিল না। তার বাপকেও তার দাদীর পাশে মাটি চাপা দেয়া হয়েছিল। করিমন অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল সেই কবরের পাশে তার মা তাকে নিয়ে পরে শ্রীসামন্তপুর গ্রামে খন্দকার বাড়িতে কাজ পায়। প্রচুর পরিশ্রম করতে পারত দেখে তার স্থায়ী আবাস হয়। খন্দকার সাহেব তাকে একটা ঘর তুলে দেন বাড়ি থেকে গজ পঞ্চাশেক দূরে। সেখান থেকে করিমন তার উদগ্র যৌবনের অঙ্কুরোদ্গমের আগ পর্যন্ত তার বাপের কবরের কাছে অনেক সকালকে বিকাল করেছে। সবাই দেখত একটা মেয়ে হাঁটছে আর হাঁটছে। তারপর তার গন্তব্য শেষ হত জঙ্গলের ভেতর যেখানে তিনটি কবর পাশাপাশি। আশ্চর্যের ব্যাপার ছিল এত বোঝঝাড় ছিল সেখানে, কিন্তু কবরগুলির ওপর কোনো গাছপালা জন্মেনি। কেবল লতা গুল্মের জালিকা বুনন ছিল। পর্তুগীজদের জাহাজ থেকে নামিয়ে দেয়া এক অন্তঃসত্ত্বা তারও কত কতবছর আগে এইখানেই মরে ছিল কে জানতো। যার শিশুকন্যাকে নিয়ে গিয়েছিল নিঃসন্তান এক বাওয়ালী।
তারপরের ইতিহাস অন্য কোথাও থেকে দেখে নেয়া যেতে পারে। এখানে আমরা করিমনের কাছেই ফিরে আসি। করিমন দেখল আগে তবু আসতো, এরপর দিনের পরদিন তার কোনো খোঁজ নাই। মাঝে মঝে এসে গাদা খানিক টাকা আর শাড়ি চুড়ি। আমার এইসব চাইনা। তুমি আমার কাছে থাক। তোমার কাছে যাতে সব সময় থাকতি পারি এরজন্যই এসব করা। কদিন থেকে রওনা হলে বলত, টেক খালি হয়ে গেছে বউ, আবার যাতি হবে। নিজের খেতখামার ফেলে অন্য কোথাও কেউ যায়। নিজের খেতে পয়সা নগদে মেলে না গো, অনেক অপেক্ষা করতি হয়। আমি বউ নগদে নগদে বিশ্বাসী। তোমারে যেমন নগদে নগদে নিয়ে এলাম। অন্যের থে নিতি আমি দেরি করি না। দিতিও দেরি করি না। অন্যেরে ঠকাই না, নিজেও ঠকি না। করিমুদ্দিনরে খাটায়ে পয়সা ঠিক মতো দেবে না- এমনলোক আল্লার দুনিয়ায় পয়দা হয় নাই। নিজির জমি তো আর পইড়ে থাকতিছে না। কিন্তু কেউ তো তোমারে ফুটাটাও দেয় না। করিমুদ্দিনকে সব ভাই একরকম আলাদা করে দিয়েছিল। তাকে তারা কিছু দিত না। তুমি খেতে খাটবা না, মাসে তিরিশ দিনের বিশ দিন টৈ টৈ করবা, তুমি তোমারটা বোঝ , আমরা আর তোমারে কিছু দিতে পারব না। ভাইদের সাথে ঝগড়ার শুরুটা করিমনকে নিয়ে, আমাদের কাছে খবর আছে, তুই ওই রা-িরে খেদা। একজন বলে, ওর জইন্যে নিজের ভাইডারে হারালাম। কেউ বলে, ওরে যদি রাখবাই, তালি নিজের বুঝ বুঝো, আলাদা থাক। এই জন্যিই তোমারে নিয়ে আমি এখান থেকে চইলে যাবো। কই যাবা? গঞ্জে। বলে, সেখানে সে এক রত্তি জমি কিনতে যাচ্ছে। আমাদের ঘর হবে। সেই ঘরে আমার ছেলে হাঁটবে উঠানে খেলবে। ছেলে হলে কিন্তু আমি নাম রাখব আব্দুল করিম। মেয়ে হলে আমি। কী নাম ? ডোনা। এটা আবার কেমন নাম। আমার দাদীর মায়ের নাম। বাবার কাছ থেকে গল্পে তার নাম শুনেছি। সুন্দর না নামটা? লোকে বনেররাণী বলে তারে ডাকত। আগে বাড়িঘর হোক তাহলে সব দেখা যাবে। করিমুদ্দিন কথা রেখেছিল দেখতে না দেখতে একদিন তারা মহেন্দ্রগঞ্জ বাজারের পেছন দিকে খালের পাড়ে এটা ছাপড়া ঘরে ওঠে। ছোট্ট একটু উঠান। চারপাশে কঞ্চির বেড়া।
করিমনের মনে হয়েছিল এই বেড়া তাকে সুখ দিয়ে ঘিরে ধরেছে। তাদের ভিটার পেছনে খাল, খালের পারে বেশ্যাপট্টি। করিমুদ্দিন অন্যের রিক্সা চালাত, দিনমজুরি করত। তারপর নিজেই রিক্সা করে। তার আগেই করিমের জন্ম। এত সুখে আমার ভয় করছে গো। কী বাজে বক। ঘুমাও করিমন। যে দিন এই কথা বলে সেদিন রাতে আর ঘুমাতে পারেনি। সেদিন বাজারে কী নিয়ে মারামারি হয়। একটা লোক এসে সন্ধ্যাবেলা তাদের ঘরে ওঠে। খদ্দরের পাঞ্জাবি পরা কাঁধে থলি। লোকটা যে তাদের ঘরে লুকাতে এসেছিল, করিমুদ্দিন এই কথা করিমনকে বলেনি। ভদ্রলোক করিমুদ্দিনের গায়ে হাত দিয়ে ভাই ভাই বলছিল, ডাকছিল করিমদা বলে। এই রকম আন্তরিকভাবে কোনো ভদ্রলোকের সাথে তার স্বামীকে দেখে আজব আজব লাগছিল। লোকটা সারারাত কূপির আলোয় কী যেন পড়ে, আর ছোট্ট একটা খাতায় লেখে। কী লেখেন এত। বইটা খুলে লোকটা বলে একে চেন, করিমন দেখে বাঘের মতো দেখতে দাড়ি গোফেঁ ভরা দুটো লোকের ছবি। কী যেন নাম বলে, করিমন বুঝতে পারেনা। এরা কী দুইভাই ? না, বন্ধু। আমাদের সবার বন্ধু।
লোকটা আবার কী একটা কথা বলে, কমরেড। করিমন বোকা বোকা মুখ করে সামনে থেকে সরে আসার আগে বলে, সেই কখন ভাত দিয়া গেছি,আপনে এখনও দেখি খান নাই। খেয়ে নেন। অনেক রাত হইছে। একটাই তো রাত- ভোর পর্যন্ত আমাকে জেগে থাকতে হবে। কিন্তু ভোরের ঠিক আগে চারপাঁচটা লোক এসে তাদের বাড়ি ঘিরে ফেলে। লোটাকে টেনে হিচড়ে নিতে যায়। খবরদার, বাঘের মতো হুঙ্কার দেয় করিমুদ্দিন। করিমন বহুদিন মনে করতে চেয়েছে তার বাপের সঙ্গে করিমুদ্দিনের কোথায় জানি মেলে, কিন্তু বের করতে পারেনি। আজ দেখে মধু বাওয়ালীর ছায়া করিমুদ্দিনের শরীর থেকে বেরিয়ে এসে এতগুলি লোকের সামনে রুখে দাঁড়ায়, বুদ্ধদা আপনে পালান। বলতে বলতে ওদের বাধা দিয়ে মারামারি বাঁধিয়ে দেয়। এতগুলি লোকের সাথে করিমুদ্দিন একা লড়ে। বুদ্ধদা বলছিল, তুমি থামো করিম ভাই, আমি ওদের সাথে যাচ্ছি। কিন্তু করিমুদ্দিন বারবার বলে, আপনি পালান বুদ্ধদা। ধরা দিতে হলে মানুষের কাছে দেবেন, শয়তানের কাছে না। যান,পালান, দৌঁড়ান। বুদ্ধদা শেষ পর্যন্ত পালিয়েছিল। আর এতগুলি লোক করিমুদ্দিনকে পিটিয়ে লাশ করে চলে ঘর বাড়ি ভেঙে রিক্সাটা গুড়িয়ে দিয়ে চলে গিয়েছিল। সেই মারে মাথায় প্রচ- আঘাত পেয়ে করিমুদ্দিন অথর্ব হয়ে যায়। আর সেরে ওঠেনি। তার মারা যাবার অনেকদিন পর করিমন খালের পাশ বদলায়। করিমুদ্দিনের দোস্ত বদু অনেকদিন তক্কে তক্কে ছিল। করিমুদ্দিনের অসুস্থ হবার সময়ও সে তাদের টাকা পয়সা দিত। করিমুদ্দিন মারা যাবার পর সেই গনি ব্যাপারিকে নিয়ে আসে। গনি ব্যাপারি তারপর কয়েকদিন যাওয়া আসা করে। করিমনের মন ভোলায়। আহা আহা করে করিমনের হাতে পয়সা দেয়। তারপর একদিন বিয়ের প্রস্তাব। বছর খানেক সম্পর্কটা থাকে। ভুয়া বিয়েটা অনেকদিন পরে টের পেয়েছিল করিমন। তার আগে বসতভিটা গনির দখলে চলে গেছে। তখন সে গনির রাখা-মেয়েছেলে ছাড়া আর কিছু না। এবার সে আরেকটি মেয়েকে রক্ষিতা হিসেবে আনে। করিমনকে বলে, চাইলে তুমিও থাকতে পারো, হাজার হোক কাঞ্চনের তো কাজের লোক লাগবে। করিমন গনির মুখে একদলা থুতু ছিটিয়ে চলে আসে। তারপর দুইবছরের করিমকে নিয়ে সোজা বেশ্যাপট্টিতে চলে যায়। প্রথমদিন থেকেই তাকে নিয়ে লোকে লোকে কাড়াকাড়ি। এতদিনে পুরোপাড়ার নাম রাখার মতো কেউ তাদের এখানে এল। দুনিয়ার নাগরদের সে মাত করেদিয়েছিল। জাতবেশ্যা গো। এ রকম সুন্দরী আর বেশরম বেশ্যা আগে তারা কেউ দেখেনি। পারো কেমনে গো।
করিমন বলত, শরম করলে বেশ্যার চলে না, বেশরম হলি ঘরের বউর চলে না। লাজুক বেশ্যা, বেশরম বউ/ নাশ হলে দেখে না কেউ। বেশ্যাপট্টিতে থাকার দুই বছর পর একভোরে, করিমন সেদিন আরো পরের দিকে ঘুমাতে গিয়েছিল, অনেক ডাকাডাকি হাকাহাকির পর দেখে দাড়িয়ালা একটা লোক কাজলা মাসীর সাথে ধুমছে তর্ক করছে। তাকে ঢুকতে দিচ্ছিল না আরো অনেকে মিলে। করিমন চিনতে পারে। লোকটা ময়েজুদ্দিন। বড্ড দেরি করে ফেলেছ- বড্ড দেরি হয়ে গেছে- কেউ কাউকে বলতে পারেনি। ময়েজুদ্দিন কোথায় কোথায় গিয়েছিল কী কী করেছে জীবনে, সব বলে। কীভাবে তার খোঁজ পায়- সব। ময়েজুদ্দিন তাকে নিয়ে যশোর শহরে যেতে চায়, পারলে আজকেই। করিমন রাজি হয় না। নসিবের মুখ আমার খুব ভালো করে চেনা হয়ে গেছে গো। আমি আর কোনো সুখের আশা করি না, কোনো স্বপ্নও দেখি না। ছেলেটারে মানুষ করতে হবে না। ময়েজুদ্দিন আগে একটা বিয়ে করেছিল। সে বউটা মরা বাচ্চা দিয়ে নিজেও মরে যায়। কয়েক বছর হল আরেকটা বিয়ে করেছে এই মহিলার সঙ্গে সে সুখি নয়। হোমিওপ্যাথি শিখেছিল। মফস্বলে তার একটা দাওয়াখানা আছে। আয় রোজগার মোটামুটি। করিমন যদি বলে আগের বউটাকে সে ছেড়ে দেবে। আমারে তুমি এইখান থেকে বাইর করতে চাও। এখানে আর সব পাপের মতো ঢোকার রাস্তা আছে, বাইরনের রাস্তা নাই। দোজখের সমুদ্র। তীর আছে, পার নাই। মরণ ছাড়া। অনেকেই গেছিল, বিয়াও হইছিল,সব ফেরত আইছে। এখানের নিয়তিই এই। চাইলে তুমি এখানে আমারে বিয়া কর। মাঝে মাঝে আস, সমস্যা নাই কিন্তু আমি আর বাইরাইতেছিনা। ময়েজুদ্দিন রাজি হয়। করিমনের তখন শরীর ভাঙছে। চোখের নীচে বয়সের ছাপ। কিন্তু রূপ অটুট। ময়েজুদ্দিন আগে দেখেছিল বলে বুঝতে পারে। যৌবনের গাঙে তখন জোয়ার না থাকলেও বাঁকগুলি ভরা। যারা এখনও দেখবে, দেখবে এতটুকু শুকায়নি কোথাও। যতক্ষণ ছিল তার খদ্দেরের লাইন পড়ে গিয়েছিল বাইরে। ময়েজুদ্দিন সেই দিনই বিয়ের আয়োজন করে। রাতে বেলা তার স্বপ্নের সেই মাদকতা ভরা শরীরে প্রবেশ করার আগেই ধরতে পারে করিমনের সিফিলিস হয়েছে। শুধু বিয়েটাই হয়। আর কিছু কোনো দিন হয় না। ময়েজুদ্দিন তাকে চিকিৎসার জন্য শহরে নিতে চায়, করিমন বলে, সারা শহর সে সিফিলিসে ভরে দিয়ে তবে মরবে। তারপর একেবারে হঠাৎ করিমন অসুস্থ হয়ে পড়ে। শেষ অবস্থায় পৌঁছনোর আগে বেশ মোটা অংকের টাকা আর গাদাখানিক গয়না দিয়ে বলে, ওরে দেইখো। মানুষ কইরো। গয়না কিছু তোমার বউরে দিও, মেয়ের বিয়েতে দিও আর ছেলেদের মানুষ কইরো। তারপর কাউকে কিছু না বলে বেশ্যাপট্টি থেকে হারিয়ে যায় করিমন। করিমন ফিরে এসেছিল তার সেই শ্রীসামন্তপুর গ্রামে, শোনে মা তার মাত্র কদিন আগে দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছে। তারপর তাকে সেখানেও পাওয়া যায় না। মধু বাওয়ালীর কবরের ওপর সাদা কাপড় জাড়ানো তার লাশটা যখন পাওয়া যায় তখন আর তাকে চেনা যাচ্ছিল না।

সর্বশেষ সংবাদ