বাংলা ফন্ট

কুমার চক্রবর্তীর কবিতা

14-06-2018

 কুমার চক্রবর্তীর কবিতা


ইউলিসিস আর আমি

ইউলিসিস যে জাহাজের নাবিক
সেই জাহাজে চড়ে আমি বেড়াতে চাই দশটি বছর,
ইলিয়াম থেকে ইথাকা?
আমার ভ্রমণের দৈর্ঘ্য পরিমাপ করে আমার স্মৃতি,
আমারই স্বপ্নের দর্পণ।
আমার ভেতরে সমুদ্র বাইরেও সমুদ্র
ধমনিগুলোতে প্রবহমান বেদনার লিথি,
উড়ন্ত চুলগুলো মেঘে-ছাওয়া,
বৃষ্টি এলে ভেঙে পড়ে সমুদ্রে
চিহ্নহীন, পরিবর্তনীয়তায়।

জানি আমি, অমরতা হলো ট্রয়ের ঘোড়া
যে অনেককে নিয়ে হয়ে যায় একা,
প্রতীক্ষার প্রহরগুলো ইউলিসিসের অশ্রুরাশি
যে ঝরে একা, জলহীন,
আর সমুদ্রের তলদেশ হলো তার বুক
যা সে বিছিয়ে দেয় অজানা সংকেতের দুরাশায়।

ইউলিসিস জানত প্রতিটি সমুদ্রের সীমা এবং সীমাহীনতা,
জানত তার সীমান্তগুলোর রহস্য
যেখানে মেঘেদের পাহারা বস্তুত জাহাজডুবির কথা মনে করিয়ে দেয়,
জানত? জীবন হলো অলীক উপস্থিতি,
এক অসম্ভব প্রত্যাবর্তন, যা সমুদ্রের আলগুলো ধরে
অনন্তের দিকে পথ করে নেয়

নিজেকে পুনর্বার একা করে তোলে।



আমাকে বলেছো তুমি

আমাকে বলেছো তুমি, এই জল অপসৃত
গভীরে রয়েছে ছায়া তার, অশ্রুপতনের দাগ
আমি ভেবে উদাসীন, তোমারই দিকে আজ
ঘুরিয়ে নিয়েছি ডানা, এইদিকে দীর্ঘ রেলপথ
অতীত মুগ্ধতা নিয়ে সরে যায়, যায় সে তো যায়
অন্তহীন বাদুড়ের গান, চলে যায় জীবনের দল
স্তরভেদে এখানে এসেছে গুল্ম, কালস্রোতে
আমি তার ক্লোরোফিলে ধুয়ে নিই দেহ
নার্সিসাস বৃক্ষগুলো ঢুকে যায় মাথার কোটরে

আমাকে বলেছো তুমি? এইদিকে যাও কোনো
অনন্ততৃষ্ণায়... তোমার ঋতুর কাছে
...স্মৃতিহীনতায়, মৃত্যুফাঁদ রয়েছে বিছায়ে
ঝরে যাব বলে

তোমার কাছেই আছি চুপচুাপ
বলিনি তো কিছু এতকাল, বলেছি কি?
গোপনে গোপন ঝড় আসে, ঝড় চলে যায়
কে যেন একাকী এসে বলে যায়:
থেকে যাও, থেকে যাও, থেকে যাও আরও কিছু কাল,
আমি বলি, নশ্বরতা এখন তো রয়েছি
ঝরে যাব বলে? আসছে কাল



অধিবিদ্যা

অস্তিত্বহীন এমন কিছু রয়েছে যা অধিকার করে রাখে আমাদের। গত রাতে নদীদের গতিপথ খুঁজতে গিয়ে দেখা পেলাম সেই গাছপালাদের যারা সময়ের বাইরে অনন্তের অধিবিদ্যার কথা বলে গেল আমাদের।
অজানার উদ্দেশে এখানে রয়েছে এক মন্দির যেখানে প্রার্থনা করে পাখিরা। ছায়ার পৃথিবী এ কথাই প্রমাণ করে যে মানুষ আর প্রকৃতির মাঝে বিরাজ করছে এক টলোমলো ঐক্য, সুতরাং প্রথম কাজ হলো যা কিছু অস্তিত্বময়, তার ভঙ্গুরত্বকে প্রতিষ্ঠা করা।
বৃক্ষদের অধিবিদ্যা হলো নিজ জন্মমৃত্যুর ক্ষণকে অনিশ্চিত করা, পাখিদের অধিবিদ্যা হলো নিজেদেরকে প্রকৃতির প্রতীক করে রাখা। আর মানুষের অধিবিদ্যা হলো মৃত্যুর পর জীবনের কথা বলা।
মনে রেখো, অস্তিত্বহীন আমি এখনও চর্চা করি অস্তিত্ববিদ্যার, যা তোমাদের অসোয়াস্তিতে ফেলে। আমার ভুলগুলো হলো আমার বিম্ব ও প্রতিস্ব, আর শুদ্ধগুলো হলো তোমার নিজস্ব স্নায়ুসন্ধির সৌন্দর্য।
আরও মনে রেখো, যা অসীম তার কোনো অস্তিত্ব থাকে না।



নিজের পথ

জীবন ফুরিয়ে যাচ্ছে বলে তাড়াহুড়া বাঁধিয়ে দিয়েছিলে তোমরা। বোঝোনি, তাড়াহুড়ায় জীবন আরও দ্রুত ফুরিয়ে যায়।
বস্তুর রহস্য আর রূপকার্থ নিয়ে তোমরা উদ্বেল হয়ে উঠেছিলে, আর নিজেকে বানিয়ে ফেলেছিলে এক একজন আসঙ্গলিপ্সু রহস্যবাদী। কেউবা জ্ঞেয় আর অজ্ঞেয়বাদের পর্বতারোহণে গিয়ে বরফ হয়ে ফিরে এলে। বোঝোনি, শীত আর গ্রীষ্ম তোমার ভেতরেই রয়েছে যা সময়-সুযোগমতো একে অন্যকে সুবিধা দেয়, আর তোমাকে দেয় ঋতুচক্রের নিশ্চয়তা।
সুতরাং হয়ো না নস্টিক, মিস্টিক, স্টোয়িক বা কাবালিস্ট। হয়ো না সোফিস্ট, নিয়োপ্লেটোনিস্ট। তুমি হও যা হয়নি অন্যরা।
মনো রেখো, বাঁচার জন্য উত্তম হলো নিজের পথ, যেভাবে বাঁচে ফুল, পাখি, মেঘ আর মেরুতুষার। যখনই অন্যের পথে যাবে, তখনই মৃত্যুর দিকে চলে যাবে তুমি, যেমন যায় তোমার আর বন্ধুসকল।

সর্বশেষ সংবাদ