বাংলা ফন্ট

ফারহান ইশরাকের কবিতা

14-06-2018

 ফারহান ইশরাকের কবিতা



জনপ্রিয়তা

পূর্বপুরুষ আমাকে একটি আয়না দিয়ে
বলেছিলেন, যা-ই বা ফুটিয়ে তুলতে চাও,
এ-ই হলো তোমার জন্য
একমাত্র আলোঘর
বহু শতকের ধূলি লাগা সেই জাদুক্ষেত্রটি
মুখের সামনে রেখে কাঁদলাম
এক শ’ বছর
একদিন দেখা গেল কাচের কোণায়
অর্থবহ আভার ইঙ্গিত
আঁকলাম প্রতিফলনের বিচিত্র মুখভঙ্গিমা
জন্ম মৃত্যু অতিক্রমী অগণিত রেখার বিস্ময়
লেপটে দিলাম কিছুটা রক্ত
উষ্ণতার কিছু ছাপ
হুবহু-ছবির বহু-বিস্ফোরণে যশ এলো
পারদের প্রান্ত ছাপিয়ে
কেটে গেল আরো এক দীর্ঘ হিমযুগ,
শোনা গেল বরফ ছাপিয়ে আসবে
পাথর সভ্যতা, লৌহযুগ, ইত্যাদি ইত্যাদি
কেটে গেল বহু যুগ, আলোকবর্ষ একাদিক্রম
সুনামের দীর্ঘ আবেশ ফিকে হয়ে এলো
অসহ্য মনে হলো দুর্বহ খ্যাতির তীব্রতা
জনপ্রিয়তার ভয়ে একদিন গায়ের চামড়া
উল্টে পড়লাম,
যাতে কেউ চিনতে না পারে
কেবল চোখ দুটি রইলো
যথারূপে অবিকল
উল্টে-পরানো চামড়ার রক্তিমতায়
ঘাবড়ালো চেনা দর্শক, পাঠক ও প্রশংসক
আয়না ভাঙার সাহস এলো হঠাৎ-চিৎকারে
বসলাম নুতন রেখার ধ্যানে, একান্ত সন্ধ্যায়।


বুক রিভিউ

বুক রিভিউ করতে গিয়ে দেখি প্রথম পৃষ্ঠায়
সিল্কের প্রজাপতি। দুই ডানা প্রাইভেট
কোম্পানি। সন্দেহজনক কোমলতা, খামারি
জ্যোস্না, বৃষ্টি ভেজা ফেব্রিক্স কারখানা।

দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় জলের কামিজ, লতাপাতা,
বাঙ্গিক্ষেত, পার্টিশন, দেহকে দুভাগ করা নদী।

বুক রিভিউ করে তৃতীয় পাতায় দেখি
পাহাড়ের ঢালে তৃতীয় বিশ্ব, মিল্কভিটা,
কর্পোরেট হাতের জরিপ বজ্রপাতে
ক্ষতিগ্রস্ত জাতিসংঘ সদর দপ্তর, যৌনপল্লী।
পরের পৃষ্ঠাগুলো লালাভেজা, বলতে গেলে
পাঠের যোগ্য নয়। চরমপন্থি পুলক এসে
পাতাগুলো অন্ধকার করে দেয়।

বুক রিভিউ করতে গিয়ে দেওয়ালে পিঠ
ঠেকে যায়। মর্মান্তিক ইঞ্জিনের দুধে
হাত ভিজে যায়, পেষণের রক্তে আমার
বুক ভিজে যায়, বুক রিভিউ আর করবো না
যাই, ঘুমের জন্য সারা দেশ চোখ বুজে আছে।



জামাজুতা

দশ মাসের ভ্রণ ফেরেশতারে ডেকে বললো, জুতা কিনে দাও
ভূমিষ্ট হবো। পৃথিবীর জলকাদায় খালি পায়ে হাঁটবো কী
করে! শুনেছি সেখানে মানুষেরা এতো বেশি কান্নাকাটি
করে, চোখের পানিতে পা-রাখার জায়গা পাওয়া ভার!
মাবুদরে বলো জীবের দুঃখ কমিয়ে দিতে, না হলে যাবো না!
ফেরেশতা বলেন দুনিয়া পবিত্রস্থান জুতা পরে কী করে প্রবেশ
করবে? ভ্রণের অনুযোগ, লজ্জা করছে পিরহান না পরালে
খালি গায়ে যেতেই পারবো না!
ফেরেশতার মেঘভেজা ডানা ভ্রƒণের আবদারে মুহূর্তে শুকাতে
চায়! বলেন তিনি, তোমার দেহপুঞ্জ আবৃত নরোম চামড়ায়
শরমের কিছু তো দেখছি না! পিতৃস্নেহ তোমারে ঢেকে রাখবে
মায়ের কোলের চেয়ে ভালো মখমল প্রভুমঞ্জিলে আছে কিনা জেনে
নিতে হবে। যতই জামা পরা হোক, মানুষ তো ন্যাংটাই থেকে যায়!
ভ্রƒণের মুখে নানা আবদার গুঞ্জরিত হতেই থাকলো। প্রসবের
লগন এসে যায়। চাহিদাক্ষুব্ধ শিশু প্রকট চিৎকারে ক্ষোভের
কথা জানিয়ে দিতে থাকে। সেই থেকে দুনিয়াও কেঁপে উঠছে
ক্রমবিপ্লবে!
আমলাতন্ত্র

রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিল
একটি রাজহাঁস
গাঙের ফেনায় ভেসে ভেবেছিল রাজপ্রাসাদ
নোনতা অথবা রক্তগন্ধা নয়
প্রটোকল না জানা সেই সামান্য পাখির পালক
এত দূর যেতে পারে এত সম্প্রসারে!
এবং তার পায়ে কোনো জুতাই ছিল না
দক্ষিণ বঙ্গের মতো দুটি চোখে জলাভূমি
জোছনা এবং দুধের মিশেল থেকে
নীল বর্ষায়
জন্মেছিল ভেজা রূপকথা অপরূপ
উড়াল ভঙ্গিতে বিস্তারিত ডানাযুগল
জেনেছিল না কি-
দস্তাবেজের মৃত মাছি নক্ষত্রগামী হবে
কালবেলা গলে পড়বে নীহারিকা
উল্কাপোড়ানো ইস্পাতের পেঁজা মেঘ
প্রতীক্ষার দীঘলতা ঘেষা অচেনা রেললাইন
শমুকের গুহাখোলে এক শ’ একটি নদী
ধরেই নিয়েছিল সমুদ্রসুখী শুভ কাল
আর আসবে না
রোস্টের টেবিলে উঠেও বুঝলো হাঁস
স্মৃতি ক্ষরণের ঘ্রাণ মশলার চেয়েও ঢেরতর
নাসারন্ধ্রগামী
এই হাঁস ভাসমান অন্ধকারে তারা
জলাভূমি তাকে বোঝে, না হলে তার
গোপনতার বুকে আর্তগভীর
ছবি ফুটতো না
সিংহদরোজা থেকে দূরের আকাশ নীল
উষা কালের নক্ষত্র রক্তিম
জানে না রাজহাঁস-
দেওয়াল ভাঙার রূপরেখা টানা নেই
প্রকল্প বা সময়সীমাও নেই
রাজহাঁস চেনে হাওর-প্লাবিত হাওয়া
অক্সিজেনঘন গ্রাম
কাঁশবন এবং মহাকাল, সেই সরাইখানা
যেখানে চুরুট টানে অন্ধ নীরবতা
ধরা যাক পেছনের কাচঘরে প্রদীপ জ্বলছে
সোনা রুপা ইস্পাতের ঘের ভেঙে
একবার আলো দেখা যায়
একবার হিমযুগ একবার পাথর সভ্যতা
বঙ্গভবন থেকে নয়, দূরতম সীমা থেকে
উড়ে যায় গর্ভবতী ভেজা রাজহাঁস
যার রঙ সবচেয়ে শাদা
যার কোনো টিকেট ছিল না অথবা থাকলেও
এক পাশে কেরানির মৃত মাছি আঁকাই ছিল না।
বীজের চিৎকার থেকে টুকে নিয়ে বলা

হত্যাকা- শেষ করে
ক্ষিপ্ত ক্লান্ত খুনি
অতর্কিত দৌড়ে এসে
সতর্ক শ্বাস টেনে
রুদ্ধ কণ্ঠে বলে
ছুরিটা কি রাখতে পারো
ব্যক্তিগত গোপনতার
বর্মকোষে ঢেকে?

কেন নয়, বলেই দ্রুত
লুফে নিই ইস্পাতের পাপ
যতœ করে রেখে দিই
যাতে সেই প্রত্ন সম্পদ
ধারমুখে ধরে রাখে
অজাচারী ব্যাপ্ত উল্লাস।

ক্ষুন্ন ব্যঞ্জনায় খুনি বলে
জলাধারে ছুটে যাবো
সেখানে আশ্রয়
উত্তীর্ণ-ভয় অঙ্গের প্রসাধন
অপেক্ষা করে আছে
উদার বুকে
বর্ণচোরা ডুবের আশ্বাস
এনে দেবে পেশাদার
পরের অধ্যায়
আরো এক যবনিকা টেনে
ঢেকে দেবো জীবলিপ্সা
বীজের চিৎকার
অন্ধকারে লাল চিহ্ন
মুছে দিলে
আরোপিত শাদা জামা
সারা দেহে
ভরসা এনে দেবে।

ঝাপটা হাওয়ার তোড়ে
চেতনা এলো ফিরে...
বুঝলাম
ভেতর-বাড়িতে
একটি অচেনা বিদ্যুৎ
চমকালো আকস্মিক
মুহূর্ত-মদিরা থেকে
ফিরে এসে দেখি
গাছের পেছনে পিতার
মৃতদেহ পড়ে আছে
রক্তমাখা উষ্ণ ভারী ছুরি
ব্যক্তিগত বর্মকোষ থেকে তুলে
কোথায় ফেলবো ছুড়ে!

রাত পেতে দিলো অক্লান্ত হাত
অন্ধকার রক্তিম হয়ে আসে
একান্ত আকাশে
গ্রহ পর্ষদে
তারায় তারায়।

সর্বশেষ সংবাদ