বাংলা ফন্ট

ঈদানীন্তন

14-06-2018
পার্থ বসু, পশ্চিম বঙ্গ

 ঈদানীন্তন


ঠিকই পড়েছেন। বানান ইদৃশ। বা ঈদৃশ। বিষয় যেহেতু ঈদ। অথবা ইদ। তা বানান নিয়ে লিখতে বসি নি। আরও নানান দিক নিয়ে লেখার আছে। এই উৎসব নিয়ে। এর উদযাপন নিয়ে।
রমজান মাস শুরু হয়ে গেছে। হিজরী পাঁজির হিসেবমতো শাওয়াল মাসের ১ তারিখে ঈদ উল ফিতর। বাঙালীর রোজার ঈদ।
একদিনের উৎসব। তবে এখানেই শেষ নয়। কড় গুণে দু মাস দশ দিনের মাথায় কুরবানীর ঈদ। সে উৎসব তিনদিনের। ঈদ উল আযহা।
বর্ষে বর্ষে ঈদ আসে। ঈদ যায়। বাঙালী প্রতীক্ষায় থাকে। আসছে বছর আবার হবে।

আসছে বছর আবার হবে? কথাটি দুর্গাপুজার বিসর্জনের ঢাকের বাদ্যির সঙ্গে যে আওয়াজ ওঠে তেমন শোনাল না?
আহা, ঈদে তেমন বাদ্যি নেই। ঢাক পেটানো নেই। বারোয়ারী পরিসর নেই। না থাক। তবু মানতেই হবে ঈদ বাঙালীর বারো মাসের তেরো পাব্বনের উপরন্তু। এবং সার্বজনীন। খুশীর ঈদের হাপিত্যেশ প্রতীক্ষা সংখ্যায় মাপলে বাঙালীর সবচেয়ে বড় এবং প্রধান উৎসব। দূর্গাপুজোর মতো চোখ ধাঁধানো বহিরঙ্গ নেই।কিন্তু চোখ খুলে তাকান। কান পাতুন। আজান শুনছেন? একমাসের সিয়াম সাধনার পর আজ ভোর ভোর উঠেছে সবাই। ওজু করে, গোসল করে নামাজ আদায়ের আগে একটু মিস্টিমুখ। একটু পায়েস সেমাই খেজুর অথবা খোরমা। এরপর নতুন পোশাক পরে সবাই যাবে ঈদগাহের মাঠে। যাবে যে পথে, সে পথে ফিরবে না কিন্তু। তারপর?
সারাদিন এবাড়ি ওবাড়ি। প্রতিবেশীদের বাড়ি সব বাথানে অল্প হলেও লাচ্চা সিমাই। ঈদমুবারক। কোলাকুলি। বড়দের কদমবুচি।
ঈদও একপ্রকারের বিসর্জন। বিসর্জন শব্দটির উৎস সৃজ ধাতু। বি+সৃজ+ অনট। রোজায় পরিশীলিত মানুষটিও নতুন করে সৃজিত হচ্ছেন। তাই তিনি কল্যাণকামী। প্রতিবেশী ও পরিবেশের। মুবারক বার্তাটিও কল্যাণমুখর।
বাঙালীর পুজোর পরে বিজয়ার শুভেচ্ছা, রোজার শেষে ঈদমুবারক একটি প্রণাম আর আলিঙ্গনে একাকার।

তোমায় পূজার ছলে তোমায় ভুলে থাকি। বাঙালীর দুর্গাপূজার সমারোহ আর চাকচিক্যের কাছে ঈদ তুলনায় আসে? দুর্গাপূজা যখন থেকে বারোইয়ারী জৌলুষে বেড়েছে তার ভার নিয়েছে সংঘ আর সংগঠন। তাতে সামিল সব ধর্মের মানুষ। উৎসব সবার। ঈদ শুরু থেকেই আরও বেশী সার্বজনীন, তবে তার উদযাপনের কোন বারোয়ারী কাঠামো নেই বাস্তব কারণে। প্রশ্ন জাগে ঈদে মিলনের পরিসরটি আরও ব্যাপ্ত করার উপায়? ঈদ হল প্রাথমিকভাবে পরিবার ও তারপর একটি সামাজিক উদযাপন। এই সমাজটির একটি সীমানা আছে। কিন্তু উৎসবে সীমানা ডিঙনোর মানা আছে নাকি?

ফেসবুক বা মুখবহির অনেক বন্ধুর সাথে মতবিনিময় হলো। রেহান আমিন থেকে দিয়ানাথ আলি। শামীম মাহবুব থেকে আজিজুর রহমান। সে সব বলার আগে দুটো গল্প।

সত্তর দশকে পুজোর মাসে এক পক্ষকাল কাটিয়েছিলাম গঙ্গাটিকুরিতে। জিলা বর্ধমান। ব্লক অফিসে পশুচিকিৎসক ছিলেন মাসতুতো দাদা। পুজোয় প্রতিমা দেখতে যেতে হলো জমিদারবাড়িতে। বাংলা সাহিত্যের খ্যাতনামা কথাকার ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্মভিটা।
পুষ্পাঞ্জলি দেওয়া হলো না। নিয়ম নেই। ব্যানার্জীবাড়ির পুজোয় অব্রাহ্মণের অঞ্জলি দেওয়ার বিধান নেই।
২০০০ সালে শিলচর থেকে করিমগঞ্জ হয়ে নদীপথে গেছিলাম কবি বন্ধু দিলীপকান্তির ভালোমায়ের বাড়ি। সেখানে পুজায় ঢাক ছিল। ছিল কাঁসর ঘন্টা। কিন্তু চোখ ধাঁধানো জৌলুষ ছিল না। পুজাটি ছিল গণমানুষের। উপচার সর্বস্য ছিল না।

এবারের গল্প একটি ভ্রমণকাহিনীর কিয়দংশ। মাস কয়েক আগে মুম্বাই থেকে সপরিবারে ফিরছি। ট্রেণে। কোচটি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত। তিন থাকের কামরা।মুম্বাই ছাড়ার পর ইগতপুরী পার হয়েছি, কামরায় আমার পাশের খোপে একদল যাত্রী উঠলেন। জানলার ধারের আসন দখল করে বসেছিলেন এক বয়স্ক দম্পতি। নতুন যারা উঠলেন তারা জানলার ধারের আসন দুটিই দাবী করলেন। টিকিটে রিজার্ভেশন তাদের নামে।
এনারা দলে ভারী। দু তিন জন যুবক। একজন মধ্যবয়সী পুরুষ। আর তিনজন মহিলা। মাঝবয়সী পুরুষটি পেল্লাই চেহারার। মাথায় ফেজ। পরণে নিভাঁজ পায়জামা। জামা। মেহেন্দীচর্চিত দাড়ি। বাঁজখাই কণ্ঠ। আসন দখল করে বসে থাকা বুড়োবুড়ির মিনমিনে আওয়াজ ফুৎকারে উড়ে যাবে। ঝগড়া বাধল না তো! এনারা মহত্ব দেখিয়ে বুড়োবুড়িকে উৎখাত করলেন না। করিডরের পাশের আসনে আর ওপরের বাঙ্কে ছেলেরা শুয়ে পড়লেন। মেয়েরা ভিতরখোপে।
ভোর হলো। ওই বাঁজখাই গলার পেল্লাই পুরুষটি দেখে পাশের জনকে জিগাচ্ছেনÑ পশ্চিম কি করে চিনব? কোন মুখে নামাজ পড়ব?
পাশ থেকে উত্তর গেলÑ ট্রেণে অত দিগনির্ণয়ের ব্যাপার নেই। তবে পশ্চিম থেকে পুবে যাত্রা শুরু হয়েছিল। তো পিছনপানে মুখ করে নামাজ পড়ুন। দশাশই চেহারা। খোপের পরিসরে আঁটবে না। তো জায়নামাজ পাতলেন করিডরে। নামাজ আদায় করলেন। ততক্ষণ দুপারে আটকে সকালে মুখ ধোওয়া আর টয়লেটের লাইন। যে যার পিছনে হেঁটে দূরের বেসিনে যাচ্ছে। আমি মনে মনে প্রমাদ গণছি। ভারতের পরিস্থিতি ভালো নয়। যে কোন ছুতোয় গোল বাঁধলে!
না। কিছুই হলো না। নামাজী মানুষটি সহযাত্রীদের সহযোগিতায় বঞ্চিত হন নি। ওহো, বলতে ভুলে গেছি এনারাও বাঙালী। জানালার পাশের বুড়োবুড়িও তাই। ধম্মে যা আলাদা।
আলাদা? উঁহু, এভাবে বললে ধম্মে সইবে না। কান পেতে দেখি ওই বুড়োবুড়ি, দৃশ্যত সনাতনধর্মী আর এ পক্ষের গিন্নীবান্নী মহিলারা কখন দিব্যি ভাব জমিয়ে ফেলেছেন।
আপনারা ইলিশেও পিঁয়াজ খান। তাই না? রসুন বেশী খান? এইসব কৌতুহল ডিঙিয়ে এমনকি আমিষ নিরামিষ, ডাল, পোস্ত, ডাঁটাশাক, কচুর লতি, চচ্চড়ি, সীদল থেকে সিমাই রান্নার নানা রেসিপির আদান-প্রদান শুরু হলো। কে বলবে দুপক্ষের এই হৃদ্যতায় একটি চলমান প্রেক্ষিত রয়েছে। স্থিতাবস্থায় তারা যে যার বৃত্তে দূরে থাকেন।

গল্প দুটির প্রাসঙ্গিকতা কোথায়? প্রথমটিতে মাৎসন্যায় ছায়া ফেলেছে। উৎসব লোকায়ত চরিত্র হারিয়েছে। দ্বিতীয়টি আমবাঙালীর পারস্পরিক মিলন পরিসরের তালাশ সংক্রান্ত। আজকের ভারতে যা অতীব জরুরী। এমনকি ভারতগ্রস্ত পশ্চিমের অবশিষ্ট বাংলার আকাশেও অশনিসংকেত। প্রীতির চর্চায় মেয়েরা এগিয়ে এসে সই পাতান। হেঁসেল শেখাক লাচ্চাসিমাই। নিদেনপক্ষে দাওয়াত দিন। গন্ধ যতদূর গেছে, যারাই পেয়েছে ঘ্রাণ সবাই হকদার। গ্রামে গ্রামে এই বার্তা রটি যাক। গল্পটি শুনে মাকিম বলল ভাব জমল বাঙালীর হেঁসেলে আর ভাষায়।
বাঙালী হেঁসেল একান্তই একটি মেয়েলী প্রযোজনা। সেখানে ডালভাতের পথ্য বনাম মুর্গীমটনের কুস্তি নেই। চৈতন চুটকির ঠাকুর বনাম দাড়ি নাড়ি কলিমুদ্দি মিঁয়ার কোন মোগলাই কসরৎ নেই। এই মেয়েরা মায়ের জাত। স্নেহময়ী। বাংলার বধূ। মা বলিতে প্রাণ করে আনচান। বাঙালী তার মেয়েদের উপর, মায়েদের উপর আস্থা রাখতে পারে। মেয়েরা নির্মান করে। সৃষ্টি করে। নষ্ট করে না। সম্প্রীতির চর্চা তো হেঁসেল থেকে শুরু হোক। মাছেভাতে, দুধেভাতে, ডালেভাতে, গেরস্থের পান্তাপিঁয়াজে। হেঁসেল চিনিয়ে দেয় আমরা সবাই রুচিতে ও রসনায় বাঙালী। বাংলার আকাশ যতটা আযানের, ততটাই শঙ্খধ্বণির। এই সহাবস্থানই আমাদের পরম্পরা। আমাদের ঐতিহ্য। এই সম্প্রীতির দিগন্ত আলোয় আলো হয়ে উঠুক ঈদে।

সত্তর দশকে বাগনানে পিঠে উৎসব হয়েছিল কয়েক বছর। পিঠে তামাম বাঙালীর শিল্প। রেহান জানাল লাচ্চা আর সিমাইও নানা ঘরাণার হয়। খাদ্য উৎসবের অনুষঙ্গে ঈদ উদযাপন হলে কেমন হয়? হবে?
হোক। তারপর কোলাকুলি হোক। অপেক্ষায় আছি।

সর্বশেষ সংবাদ