বাংলা ফন্ট

ডিমেনশিয়া

14-06-2018
খোকন কায়সার

 ডিমেনশিয়া

কেমন করে সে স্মৃতিভ্রষ্ট হল তা জানা যায় না। কেউ তার মাথায় তক্তা ফাটিয়ে দিয়েছে-এমন নয়। অথবা বাংলা সিনেমার নায়কদের-নায়িকাদের মত রোড এক্সিডেন্টে মাথার ভিতরটা ফাঁকা হয়ে যাওয়ার মত কোন ঘটনাও ঘটে নাই। একে বলা যায়, এমনি এমনি মাথা নষ্ট হয়ে যাওয়া। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় ডিমেনশিয়া।
এই অবস্থায় কোন ভদ্রমহিলা ক্যাতেবগলে দুইচাইরটা বালবাচ্চা নিয়া আইসা যদি দুম করে বলে বসে- এগুলি আপনের!
সে তাৎক্ষণিকভাবে অস্বীকার করতে পারবে না। তাকে অনেকক্ষণ ধরে মাথা চুলকাতে হবে। তারপর আমতা আমতা করে বলবে-এ কি করে হয়! এ কি করে হয়! সে হয়ত দু’দিকে মাথা দোলাতে থাকবে আর ভদ্রমহিলা বান্দরের মত দাঁতমুখ খিঁচিয়ে খিস্তি করেই যাবে-
-গোলামের পুত গোলাম। সাউয়ামারানিরপো। কাম করনের সময় তো মজা নিছিলা। অহন ভঙ ধরছো?
তার বগলের তলায়, আঁচলের খুটে আটকে থাকা ছাওপোনাগুলা তার দিকে জুলজুল চোখে তাকিয়ে থাকবে। তার কিছুই মনে পড়বে না।যতই মনে করার চেষ্টা করবে ততই সে বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যেতে থাকবে। আবছাবছা কিছু একটা মনের কোণে উঁকি দিয়ে স্যাৎ করে মুছে যাবে।
এদিকে ভদ্রমহিলা আর তাকে ঘিরে উৎসাহীজনতার হইচই-ফিস্ফাস-হট্টগোল ক্রমশ বাড়তে থাকবে। আর সে নীল আকাশের গায়ে আটকে থাকা একখ- ঘোলা মেঘের দলার দিকে তাকিয়ে কিছু একটা খুঁজবে। এসব সময়ে প্রায়শই মেঘের দলার ভিতর কার্ল মার্ক্স সাহেবের চাপদাড়িঅলা মুখবায়ব তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। কার্ল মার্ক্স সাহেবের ক্লিনসেভড একটা মুখচ্ছবি মনের পর্দায় ফুটিয়ে তোলার প্রাণপণ চেষ্টা করে সে যখন ব্যর্থ হবে-ততক্ষণে মেঘখ- হয়ে যাবে একটা ডানাঅলা ঘোড়া।
একদিন সকালে ঘুম ভেঙ্গে বাবার কথা খুব মনে পড়ে গেলে তাঁকে একটা চিঠি লেখার ইচ্ছা মনের ভিতর চাগিয়ে উঠবে। টেবিলের উপর মোবাইল সেটটাকে চিৎ হয়ে পড়ে থাকতে দেখে মনে পড়ে যাবে চিঠি লেখার দিন তো পার করে এসেছে সবাই। মোবাইল তুলে নিয়ে বাবাকে টেক্সট করলেই হয়। তন্ন তন্ন করে খুঁজেও লিস্টে পিতার কোন নম্বর পাওয়া যাবে না। সহসা মনে পড়বে-বাবা তো নেই! মনটা ভারী হয়ে আসবে। জানালা দিয়ে হু হু করে ঢুকে পড়া কুয়াশায় সে আর্দ্র হতে থাকবে।
সিগারেট খুঁজবে। পভবে না।তাহলে গত রাতে সিগরেট না নিয়েই ঘরে ঢুকেছে! মনে করতে পারবে না কিছুতেই।
ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ডিমেনশিয়ার মধ্যেও কিছু কিছু স্মৃতি প্রেমিকার মত এসে ছুঁয়ে দিয়ে যাবে।
টলটলে শান্ত একটা হ্রদ। অসম্ভব শান্ত-নিটোল। বিলাইছড়ির রাইখঙ লেক। পাহাড়ের কোলের কাছে, শিশু যেমন মাকে পেঁচিয়ে ধরে শুয়ে থাকে-জলাধারটা তেমন ত্যাড়াব্যাকা পড়ে আছে। আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ অথবা পূর্ণিমার পরের দিনও হতে পারে। চাঁদ আলতো করে আদর বুলিয়ে দিচ্ছে হ্রদের মসৃণ পিঠের উপর। বেহেশতি দৃশ্য। কে জানে বেহেশতে এমন সুন্দর দৃশ্য আছে কি না!
ঝিঁ ঝিঁ পোকাদের তারস্বর চিৎকার। কখনো তারা একযোগে থেমে গেলে ভয়ংকর নৈঃশ্বব্দ গিলে খায় পুরো দৃশ্যটাকে। এমন নীরবতা আর সৌন্দর্য দেখে অসহায় লাগে নিজেকে। খুব গলা ছেড়ে কাঁদতে ইচ্ছা করে।
ভাবতে থাকবে, এমত সুন্দর সে কোথায় দেখেছে! কোথায় ওগো সুন্দর আমার! এই যে ভদ্রমহিলা, আঁচলেবগলে একগাদা ছেলেপুলে নিয়ে যৌবনের যৌণ সংগী বলে দাবী করছে-সেও কি একদা অমন আরাধ্য সুন্দর কোন দৃশ্যের ভিতর প্রষ্ফুটিত ছিল? হায় যুগপৎ সুন্দর ও অসুন্দর- সবকিছু অধরাই রয়ে যাবে!
মেয়েলোকটি ‘গোলামের পুৎ গোলাম’ সম্বোধনে প্রবল বেগে গালিগালাচ করেই যাবে। ক্লাস্টার বোমার মত বর্ষিত হতে থাকবে গালিরাজি। ভদ্রমহিলা যতই গলা চড়াবে সে ততই কুঁকড়ে যেতে থাকবে। কুঁকড়ে যেতে যেতে- এই এতটুকুন হয়ে যাবে। কনকনে শীতের দিনে দুই পাহাড়ের মাঝখানে জমে থাকা কুমের পানিতে নামনের পর পুরুষাঙ্গখানি কুঁকড়ে যতটুকুন হয়ে যায়- তার থেকেও ছোট হতে থাকবে।
জড়ো হওয়া লোকজন জিরাফের ভঙ্গিমায় ঘেডির রগ টানটান করে দাঁড়াবে। কেউ কেউ মেয়ে মানুষটির পক্ষাবলম্বনপূর্বক তাকে ঠেসরাবে।
-অ কি! বৌয়ারপোলায় তো দেহি এক্কলে ব্যাদোম ধরছে। বোদ-চোদ নাই হালার! এ উক্তিটি বরিশালাগত কোন এক শ্রমজীবী যুবকের।
-হাউয়ার পোর-জবান বন্দ কেলা! উক্তিটি পুরাতন ঢাকার মুরগিটোলা বা নারিন্দা নিবাসী এক চিড়িংবিড়িং চ্যাংড়ার।
-ঠুয়ামুয়া খাইলে ঠিকই জবান খুই্লা যাইবোনে! বক্তার ঠিকানা শাহাবাগ-কাঁটাবনের দিকে।
একজন উচ্চবিত্ত কেরানি ভাত-সালুন ভর্তি টিফিন-বাটি হাতে হাঁটার গতি মন্থর করে দিয়ে বিড়বিড় করতে থ্কাবে-
ধইরা পুলিশে দে বাঞ্চোৎরে!
স্পষ্টতঃ ঠাট্টা-মস্করা শুরু হয়ে যাবে।
তখন শরীরে এসে লাগবে পথের ধূলা। কানের ভিতর গরম সিসার মত ঢুকতে থাকবে গাড়ির হর্ন, কোলাহল-চিৎকার-চেঁচামেচি-খেমটি-ভেংচি-বাক্যবাণ!
চোখের সামনে ভেসে উঠবে নানা কদাকার দৃশ্য! মহিলার কুচযুগল কোন এক জাতফকিরের ঝোলার মত লৎপতৎ করতে থাকবে ধূলামলিন অন্তর্বাসের নীচে।
কিছুক্ষণ পূর্বে চোখের সামনে ভেসে ওঠা অপরূপ সুন্দর পাহাড়ি জলাধারখানি মুছে গিয়ে সেখানে দেখা দেবে একটা ভাগাড়! অসংখ্য পচা-গলা লাশ! রায়েরবাজার বধ্যভূমির সামনে যেমন অসংখ্য কৌতূহলী মানুষ নাকে রুমাল বা হাতের তালু চেপে ধরে দাঁড়িয়ে ছিল সেদিন-সেও দেখতে পাবে তাকে ঘিরে দাঁড়ানো উৎসাহীজনতা পকেটের ভাঁজকরা লালনীল রুমাল দ্বারা নাকমুখ চেপে ধরে রেখেছে। আর তখন নিজেকে মনে হবে একটা গলিত লাশ!
ভদ্রমহিলা ক্রমাগত অভিযোগ করেই যাবে।
দ্যাখেন। দ্যাখেন আপনেরা। এই খানকির পোলায় আদর করনের সুম আমারে ডাকত-ময়না। অহন আমারে চিনেই না!
লোকজন ভারি মজা পাবে। হাসবে কুলকুল শব্দে। তারা তাদের তলপেটে একধরনের শিরশিরানি টের পাবে। লোকজন আরো কিছু রসাস্বদনের উদ্দেশ্যে আরো কিছুক্ষণ নিজেদের দেরি করিয়ে দেবে।
ভদ্রমহিলার আঁচলের খুট ধরে দাঁড়িয়ে থাকা সাত-আট বছরের বালকটির দিকে ক্ষণকাল নিষ্পলক তাকিয়ে থাকবে সে। যেন নিজ শৈশবের ভিডিও ক্লিপ দেখছে! তার যখন অতটুকুন বয়স- তখন দেশে দুর্ভিক্ষ চলছিল। সে মায়ের আঁচলের খুট ধরে ঠিক অমন করেই নঙ্গরখানার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকত।
একপর্যায়ে সে সাহস সঞ্চয় করে ছেলেটিকে জিজ্ঞাস করবে- তোমার মায়ে যা বলছে-তা কি ঠিক, বাবা? বাবা সম্বোধন শুনে ছেলেটির চোখ কি একটু ছলছল করে উঠবে? ছেলেটি মায়ের ওমের নিচে আরো সেঁদিয়ে যাবে।
পাশ থেকে কেউ একজন খ্যাঁকখ্যাঁক করে উঠবে।
-অরে জিগান ক্যা! দুধের বাচ্চায় কি কইব! নিজেই কন না।
নিজে কি বলবে? কেমন করেই বা বলবে? সে যে কিছুই মনে করতে পারছে না। মাথা চুল্কাতে চুল্কাতে সে কুঁকড়ে এতটুকুন হবে। কুঁকড়ে কুঁকড়ে দূরে কোথাও বিন্দুর মত মিলিয়ে যেতে থাকবে।
চট্টেশ্বরী। ফেব্রুয়ারি ২০১৮

সর্বশেষ সংবাদ