বাংলা ফন্ট

বস্ত্রবালিকা

14-06-2018
অনন্ত মাহফুজ

 বস্ত্রবালিকা

কয়েকদিনের টানা বর্ষণে ম্রিয়মান ভাওয়ালের উদ্ভিন্ন নগরায়িত গ্রামের আকাশে সূর্য উঠে গেলে আষাঢ়ের কাছে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে প্রায় ঘর-বন্দী মানুষেরা মৃত মানুষের শরীরের মতো ফ্যাকাসে রাস্তায় নেমে আসে হাসিমুখে। তখন বিকেলের সূর্যের পাশে কয়েকখ- মেঘ উদ্যেশ্যহীন ঘুরে বেড়ায়। এই মেঘে বৃষ্টি না-ও হতে পারে এ রকম চিন্তারত ভাওয়ালের মানুষেরা আরামবোধ করলে ‘মাওলানা আজগর আলী টুপি নির্মাণ কারখানা’ থেকে হাসনাবানু ওরফে প্রতিমা রানী পাল গেটের ফাঁক গলিয়ে বেড়িয়ে আসে। তার চোখে সীমাহীন ক্লান্তি আর অনিশ্চয়তার ছাপটুকু নির্বিজ্ঞে পড়ে ফেলতে পারে আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজন। তবু কেউ তাকে কিছু জিজ্ঞেস করবার আগ্রহবোধ করে না কারণ সবাই তখন আষাঢ়ের বিকেল দেখতে দেখতে খানিকটা স্বস্তি অন্বেষণ করে। এখানে-ওখানে জমে থাকা জলের মধ্যে তারা তাদের প্রতিবিম্ব আবিষ্কারেও ব্যস্ত হয়। ফলে হাসনাবানু কিংবা প্রতিমা রানী পাল ওখানে দাঁড়িয়ে নিঃসঙ্গ ঠিকানাহীন মেঘের দিকে তাকিয়ে কাঁদলে আশেপাশের লোকজনেরা বৃষ্টি আসার বিষয়ে তাদের পূর্বের ধারণা থেকে সরে আসে এবং আবার বৃষ্টি হতে পারে এ রকম ধরে নিয়ে নিজেদের কাজে ব্যস্ত হয়ে যায়।
দ্বিতীয়বার পথে এসে দাঁড়ালেও মাওলানা আজগর আলীর কাছে প্রতিমা রানী পালের কৃতজ্ঞতার শেষ থাকে না। যেভাবেই হোক মাওলানা আজগর আলী প্রতিমা রানী পালকে পথের স্থায়ী বাসিন্দা হবার সম্ভাবনা থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছেন। কী এক অজ্ঞাত কারণে হঠাৎ গার্মেন্টসগুলোতে গ-গোল শুরু হলে তার চাকরি চলে যায়। অনেক মিছিল আর মিটিং, গুলি এবং মিলন নামের একজন মারা যাবার পর ফ্যাক্টরির কাজ ফেলে মিছিলে যাওয়া শ্রমিকদের অনেকের চাকরি থাকে না। মারা যাবার আগের দিন মিলনের সঙ্গে তার কথা হয়েছিল। রুমানা এবং মালতীও যাবে মিছিলে। মিলন তাকেও বলেছিল মিছিলে যেতে। তাকে অধিকার আর বঞ্চনার কথা শুনিয়েছিল মিলন। শরীর হিম করা এইসব কথা মিলন কোথায় শুনেছে তা একবার ভাববার চেষ্টাও করেছিল প্রতিমা রানী পাল। কিন্তু তখন প্রতিমা রানীর কাছে এইসব কথার চেয়ে চাকরি অনেক বড়ো একটা বিষয়। প্রতিমা রানী পাল ভেবেই নেয় অনেক স্বপ্নের কথা অনেকেই তো শুনিয়ে যায় এবং তাদের অনেক প্রতিশ্রুতিও দেয়। কিন্তু তার মতো হাজার হাজার মেয়ের ভাগ্যের চাকা আঠার মতো কাঁদায় লেপ্টে থাকে জন্ম আর জন্মান্তরে। সেই চাকা আর ঘোরে না। তবু হঠাৎ কেন এইসব শুনে তারও মনে হয়েছিল তারা আসলেই শোষিত এবং তার অবশ্যই মিছিলে যাওয়া উচিত আজ আর সে-সবের কিছু মনে করতে পারে না সে। অথবা মনে থাকলেও নতুন করে ভাববার কথা চিন্তা করে না কারণ এই বিষয়ে চিন্তা করে কোনো লাভ হবার সম্ভাবনা সে দেখে না। মিলন কেন গুলি খেয়ে মরে গেল, কার কার কতটুক লাভ হলো তার বিন্দু-বিসর্গও জানা হয় না প্রতিমা রানী পালের। এই রকম ক্ষেপাটে পাশের বাসার জানালার ফাঁক দিয়ে প্রতিমা রানী পাল একবার টেলিভিশনের পর্দায় দেখেছিল কেউ একজন বলছেন, “আমাদের গার্মেন্টস শিল্প ধংসের আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। আমি সবাইকে সজাগ থেকে পরিস্থিতি মোকাবেলার আহবান জানাচ্ছি। একদিকে অধিকারের কথা অন্যদিকে ষড়যন্ত্র-কোনটি সত্য তা বোঝা হয়ে উঠেনি প্রতিমা রানীর। তবে কোথাও একটা ফাঁক আছে এইটুকু সে আন্দাজ করে নিয়েছিল। তাহলে অধিকারের কথা, শ্রম-শোষণের নামে প্রতারণা? তারপর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এসেছিল বটে তবে গার্মেন্টস শ্রমিকরা অনেকেই আর আগের কারখানায় ফিরতে পারেনি। চাকরি চলে যাবার পর ঝরাপাতার মতো উড়তে উড়তে মাওলানা আজগর আলী টুপি নির্মাণ কারখানার সামনে এসে দাঁড়ালে মাওলানা আজগর আলী প্রতিমা রানী পালকে টুপি তৈরির কাজে লাগিয়ে দেন।
আবার আকাশে কালো মেঘ জমলে পশ্চিমদিকে লম্বা উঁচু একটা দালানের পিছনে ঝুপ করে নেমে যায় সূর্যটা। তখন ঢাকা টু ময়মনসিংহ রোডে অসংখ্য গাড়ির বাতি জ্বলে ওঠে এবং প্রতিমা রানী পাল মনে করতে চায় তার আপাতত দুই শত টাকা ভাড়ার মেসে যাওয়া দরকার। কিন্তু সে যেতে পারে না। আশেপাশের কারখানা থেকে মেয়েরা উড়না আর চুল গোছাতে গোছাতে পথে নেমে আসে। দুই একজন ছেলে সঙ্গী হলে কারো কারো ভাড়া করা মেসে ফিরতে খানিকটা আনন্দ বোধ হয়। তারা হাসে এবং কেউ কেউ ঢলে পড়ে যায় তার পরিচিত সহকর্মীর গায়ে। প্রতিমা রানী পাল এই আনন্দের উৎসের কথা ভাবে এবং তার দ্বিতীয়বার চাকরি চলে যাবার কথা স্মরণ হয়। বুকের ভিতর কিছু একটা হা হা করে উঠবার পর মাথা ঘুরিয়ে কারখানার দিকে তাকায় সে। তখন কেউ তাকে ডাক দেয়, “আমার নিগা খাড়াই রইছর?”
“হ্য, হ।”
“চল্, যাইগা।”
রুমানাকে বলা হয় না তার চাকরি নেই। মাওলানা আজগর আলী টুপি নির্মাণ কারখানায় তার চাকরি নেই এই কথা বলার আগে তার স্মরণ হয় রুমানাই তাকে এই কারখানায় ঢুকবার একটা পথ বাতলে দিয়েছিল।
মিলনের মৃত্যুর পর রুমানা খুব ভেঙ্গে পড়েছিল। বিয়ের কয়েকদিন আগে তারা যখন বিবাহিত জীবনের ভবিষ্যৎ চেহারা কল্পনায় কিংবা বাস্তবে আঁকতে শুরু করেছে ঠিক তখন শালবনের ভিতর আগুন লেগে যায়। প্রতিমা রানী পাল চাকরি হারায় কারণ তাকে কেউ কেউ মিছিলের সামনে দেখেছিল। শোনা যায় টিভি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে মিছিলের মুখগুলো শনাক্ত করা হয়, তারপর গণছাটাই। প্রতিমা রানী পাল চাকরি হারাবার পর শীতের ধুলো আর চোখভর্তি হাহাকার নিয়ে বেচারাম পাল লোকাল ট্রেনের বগির এক কোণায় বসে বিনা টিকেটে জয়দেবপুর নেমে অনেকটা পথ হেঁটে প্রতিমা রানী পালের দুই শত টাকা ভাড়ার মেসের সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল। খবরটা সে কার কাছে কেমন করে পেয়েছিল অনেক চেষ্টা করেও তা জানা না গেলেও বেচারাম পাল যে বার্তাটি মেয়েকে জানিয়ে যায় তা হলো তার একার উপার্জনে আট সদস্যের সংসার টানা তার পক্ষে দুর্বহ এবং তাড়াতাড়ি একটা চাকরি কোথাও সে যদি না জুটাতে পারে তবে উপোস করে মরা ছাড়া তাদের আর কোনো পথ সামনে খোলা থাকবে না। আর তখন প্রিয় মানুষ হারাবার সবটুকু কষ্ট কেমন পাথর-চাপা দিয়ে এই রুমানা হাসিমুখে প্রতিমা রানী পালের পাশে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল।
অতপর রুমানা তাকে নিয়ে গিয়েছিল মাওলানা আজগর আলী টুপি নির্মাণ কারখানায়। তবে নামটা পাল্টে নিতে হয়েছিল। রুমানা প্রতিমা রানী পালের নতুন নাম দিয়েছিল হাসনাবানু। নাম না পাল্টালে চাকরি হবে না তা রুমানা জানত। কিন্তু কয়েক মাস অতিবাহিত হবার পর আজ আবার তার চাকরি চলে যায়। রুমানাকে এই খবরটি দেবার সাহস তার হয় না কারণ এই ব্যাপারে প্রথমেই রুমানা তাকে সতর্ক করে দিয়েছিল।
“মন খারাপ ক্যান?”
“কই?”
“কিছু অইছে?”
“না, কিছু অয় নাই।”
“তর বাপ আইছিল ক্যান? ট্যাহার নিগা?”
“হ।”
বাপ এসে যে শুধু তার সর্বনাশ করে দিয়ে গেছে তা তো নয়। প্রকান্তরে বেচারাম পাল নিজেকেও সংসারসুদ্ধ অচেনা সংক্ষুব্ধ সাগরে ফেলে দিয়ে গেছে।
সন্ধ্যার আষাঢ়ের আকাশ পুনরায় মেঘাক্রান্ত হতে হতে ঢাকা টু ময়মনসিংহ রাস্তার ওপর ঢলে পড়তে চাইলে রুমানা আর প্রতিমা রানী পাল দ্রুত পা চালায়। বৃষ্টি নামার আগে মেসে ফেরা দরকার কারণ ভিজে গেলে আগামীকাল শুকনো কাপড়ে কারখানায় আসা হবে না।
রাত দশটার দিকে আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি নামে। প্রতিমা রানী পালের দুই শত টাকা ভাড়ার মেসের উঠোনে পানি উঠে বারান্দায় ঢেউ আছড়ে পড়ে। বৃষ্টির ঝাপটা মুখে মেখে সোহাগী বালিকার মতো ছোটো ছোটো ঢেউয়ের আছড়ে পড়া দেখে প্রতিমা রানী। এত বৃষ্টি সে গত কয়েক বছর দেখেনি অথবা বৃষ্টি ঠিকই হয়েছিল কেবল এমন করে দেখা হয়নি তখন। রুমানা নিঃশব্দে তার পাশে এসে দাঁড়ালে প্রতিমা রানী পাল কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে।
“কী অইল তর? কান্দস ক্যা?”
“আমার চাকরি নাই।”
“চাকরি নাই? ক্যান?”
গতকাল প্রতিমা রানীর বাবা হঠাৎ হাজির হয় মেয়ের কারখানার সামনে। সংসার আর চলে না বলে বেচারাম পাল দ্বিতীয়বার ঢাকাগামী লোকাল ট্রেনে বিনা টিকেটের যাত্রী হয়। মেয়েকে মেসে না পেয়ে চলে যায় মাওলানা আজগর আলী টুপি নির্মাণ কারখানায়। আর বিপত্তির শুরু সেখানেই। দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করলে সে জানায় এই কারখানায় কোনো হিন্দু কারিগর নেই। তবু বেচারাম পালের নাছোড়বান্দা আকুতির পর খবর পাঠানো হয় ভিতরে। কেউ একজন ভিতরে গিয়ে প্রতিমা পালের নাম উল্লেখ করলে হাসনাবানু ওরফে প্রতিমা রানী পালের দম বন্ধ হয়ে আসে। তবু কাজ ফেলে যে মেয়েটি দৌড়ে নিচে নামতে থাকে তাকে এক পলক দেখবার তাগিদ কেউ থামাতে পারে না। ফলে মাওলানা আজগর আলী টুপি নির্মাণ কারখানায় কিছুক্ষণের জন্য নীরবতা নেমে আসলে সবাই বিষয়টিতে কিছুটা মনোনিবেশ করতে চায়। কেউ কেউ এ রকম একটি ঘটনার পশ্চাতে ভিন্নমাত্রার ষড়যন্ত্রের গন্ধ আবিষ্কার করে নিজের বুদ্ধিমত্তার জন্য তৃপ্তি বোধ করে।
এবং আজই মাওলানা আজগর আলী তাকে ডেকে পাঠান। এই প্রথম টুপি কারখানার মালিকের কক্ষে প্রতিমা রানী পাল প্রবেশ করবার সুযোগ পায়। এই প্রথম কোনো মালিক তাকে ডেকে পাঠালেন তার কক্ষে। সিনেমা হলে কী একটা ছবিতে এ রকম একটি সুবিশাল এবং সাজানো ঘর দেখেছিল প্রতিমা রানী। ঘরের সুবাসিত ঠান্ডা বাতাসে শরীরের নোনা ঘাম নিমেষে শুকিয়ে গেলে প্রতিমা রানী পাল হালকা অনুভব করে। আর তখন মাওলানা আজগর আলী তার দিকে তাকিয়ে অস্বাভাবিক নম্র কণ্ঠে বলেন, “তুমি কাজটা ঠিক করনি প্রতিমা। পরিচয় গোপন করে আমার প্রতিষ্ঠানে ঢোকা তোমার উচিত হয়নি। আমি নিজে শ্রমিক বাছাই করি এইসব কিছু কারণে। এই কারখানা আর দশটা কারখানা থেকে আলাদা। এখানে কিছু ধর্মীয় বিষয় জড়িয়ে আছে। তুমি কি আমার কথা বুঝতে পারছ?”
“জ্বি, বুঝবার পারছি।”
“এই টুপি হাজার হাজার মুসল্লি মাথায় দিয়ে মসজিদে যায়। নামাজ পড়ে। মাদ্রাসার ছেলেরা কোরান তেলাওয়াত করে। তুমি কি আমার কথা বুঝতে পারছ?”
“জ্বি, বুঝবার পারছি।”
“একজন অমুসলিমের হাতে গড়া টুপি মাথায় দিয়ে মসজিদে বা মাদ্রাসায় যাওয়া কি ঠিক?”
“জ্বি না, ঠিক না।”
“এই কারণে আমার ফ্যাক্টরিতে কোনো অমুসলিম কারিগর নাই। আমি তোমারে চাকরিতে রাখতে পারলে আমারই ভালো লাগত। কিন্তু আমি অপারগ। আজ মাসের আঠারো তারিখ। আমি তোমাকে পুরো মাসের বেতনই দিচ্ছি। তোমাকে আর রাখতে পারছি না। সত্যি বলছি, আমার খারাপ লাগছে। কিন্তু আমি অপারগ। তুমি অন্য কোথাও চাকরি খোঁজো।”
রুমানা এবং প্রতিমা রানী পাল জানে একটার পর একটা গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কয়েক মাস আগের তোলপাড় করা ঘটনায় চাকরি হারিয়েছে অনেকে। অনেক আশা নিয়ে ঢাকায় আসা শ্রমিকেরা আশাভঙ্গের কষ্ট নিয়ে ফিরে গেছে গ্রামে। তারও কি গ্রামে ফিরতে হবে কি না এখনো জানে না সে। তবু মাওলানা আজগর আলীর কাছে মনে মনে কৃতজ্ঞ হয় প্রতিমা রানী পাল। তিনি তো ইচ্ছে করলে মিথ্যে বলার অপরাধে বেতনের টাকা না-ও দিতে পারতেন। খারাপ ব্যবহার করতে পারতেন। তা তিনি করেননি। বেতন দিয়ে সসম্মানে বিদায় দিয়েছেন।
প্রথম আষাঢ়ে এমন বৃষ্টি আর কখনো হয়েছে? বৃষ্টির কথা এমন করে আর কখনো মনে আসেনি প্রতিমা রানী পালের। বৃষ্টির ছাঁট-লাগা প্রতিমা রানীর বিষণ্ন শরীরে হাত রাখে রুমানা। পঁচিশ ভোল্টের স্রিয়মান বাতির নিচে বারান্দা ছুঁয়ে জমে থাকা জলের মতো কেঁপে কেঁপে ওঠে প্রতিমার রানীর শরীর। রুমানার হাত প্রতিমা রানী পালের নেতিয়ে আসা শরীরটাকে পরম মমতায় ঠেকিয়ে রাখতে সাহায্য করে।

সর্বশেষ সংবাদ