বাংলা ফন্ট

সে বড় সুখের সময় নয়

14-06-2018
রনদীপ রায় চৌধুরী

 সে বড় সুখের সময় নয়


কলকাতা ১৯৯৬
আড়াইশো চাল আর দুটো ডিম না কি রুটি তরকা?
সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছিলাম আমি।
একটা ক্ষমাহীন অপরাধবোধ কাজ করছে আমার মনে।
একের পর এক ইন্টারভিউ তে ব্যার্থতার সত্যিই কোনো মানে খুঁজে পাই না আমি।
“উইল গেট ব্যাক টু ইউ” কথাটার অর্থ পরিষ্কার এখন আমার কাছে। অথচ প্রথম প্রথম এই ‘গেট ব্যাক’ এর আশায় কি ভীষণ উৎকণ্ঠার মধ্যে কাটত আমার দিনরাত।
বায়োডেটায় দেওয়া ফোন নম্বরে কোনো খবর এসেছে কিনা জানতে প্রতিদিন একবার করে নতুন নতুন অছিলায় হাজিরা দিতাম মামার বাড়িতে।
এখন বিলক্ষণ বুঝে গেছি, গেট ব্যাক হচ্ছে ‘তোমাকে আমাদের পছন্দ হয়নি’ কথাটির নতুন ইংরেজি।
কেন যে আমাকে কারোরই পছন্দ হয় না কে জানে। আজকের লোকটা তো বেশ হেসে হেসেই কথা বলছিল প্রথম দিকে। পরে যেই না শুনলো, তেইশ বছরেই বিয়ে করে সংসার চালাতে নাজেহাল, বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছি ইত্যাদি ইত্যাদি, মুখটা কেমন যেন একটা গম্ভীর করে তাড়াহুড়ো করে শেষ করে দিলো ইন্টারভিউটা। ওর মুখ থেকেও নিঃসৃত হলো সেই অমোঘ বাণী। যে বাণী এতদিনে সঠিকভাবে হৃদয়ঙ্গম করে ফেলেছি আমি।
উইল গেট ব্যাক
চারটে রুটি আর হাফ প্লেট তরকা আড়াইশো চাল এবং দুটো ডিমের থেকে তিন টাকা বেশি দামী হলেও এই মুহূর্তে রান্না করার আনুষঙ্গিক খরচা যথা স্টোভের কেরোসিন তেল ইত্যাদির কথা ভেবে রুটি তরকা নেওয়াটাই যুক্তিসঙ্গত ভেবে আমি এগিয়ে যাই দোকানের দিকে।
রাত এগারোটা।
ফাঁকা শুনশান হয়ে যাওয়া শীতের রাতে বাঘাযতীন বাজারের রাস্তায় খাবারের ঠোঙা হাতে জীবনের একটা অদ্ভুত বাঁকের মুখে দাড়িয়ে আছি আমি।
যার অন্য দিকে কি আছে তার কিছুই বোঝা যায় না এধার থেকে।
পার্ক স্ট্রিটের বিশাল একটা কাঁচের দেওয়াল ওয়ালা দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আড়চোখে তাকিয়ে নিজের পুরো শরীরের প্রতিচ্ছবি দেখছি আমি এখন। শীতের পরিষ্কার নীল আকাশের ছবি সুন্দর ফুটে উঠেছে প্রকান্ড কাঁচের দেওয়ালটার গায়ে।
আসলে এইমুহূর্তে কাঁচের দেওয়ালে নিজেকে দেখে আমি বোঝবার চেষ্টা করছি,
কতটা ক্যাবলা হলে একটা মানুষ টানা সাতটা ইন্টারভিউ দিয়েও একটা চাকরি যোগাড় করতে পারে না।
দেখতে দেখতে কাঁচের ভিতরের নীল আকাশটা হঠাৎই একটা জল থইথই গভীর সমুদ্র হয়ে গেলো।
আর আমি হাত পা ছুড়তে ছুড়তে ডুবে যেতে লাগলাম সেই অতল সমুদ্রে।
আমার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিলো, আমি বেরিয়ে আসতে চাইছিলাম এই অতল গহ্বর থেকে।
ঠিক তখনই সমুদ্রের মাঝখানে একটা দরজা খুলে গেল, ভেতর থেকে একজন সুন্দরী সুবেশা মহিলা বেরিয়ে এসে আমার দিকে এইমুহূর্ত অবাক হয়ে তাকিয়ে থেকে হনহন করে হেঁটে চলে গেল রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা একটা গাড়ির দিকে।
শালা। মাথাটা এবার খারাপ হয়ে যাবে মনে হচ্ছে। ভাবতে ভাবতে আমি হাঁটতে থাকি পার্ক স্ট্রিটের মোড়ের দিকে।
আর এন মুখার্জী রোডে দু টাকায় চারটে রুটি আর তরকারি পাওয়া যায়। সঙ্গে একটা মিষ্টি খেলে তিন টাকায় পেট ভরে যায় একদম। আজকে মিষ্টি বাদ। পকেটে যা আছে তাতে মিষ্টি খেলে হেঁটে বাড়ি ফিরতে হবে নির্ঘাত।
টেলিফোন ভবনের পিছনের দিকটায় লাল দিঘির ধারে সঙ্গের ব্যাগটা মাথায় দিয়ে শুয়ে আছি আমি এখন। একটা লোক পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে হঠাৎ আমাকে দেখে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে জিজ্ঞেস করলো,
পাপুন না? “আমি বিলক্ষণ চিনতে পারলেও অবাক হওয়ার ভান করে উত্তর দিলামÑ না তো। আপনার বোধহয় ভুল হচ্ছে কোথাও।” লোকটা অবাক হয়ে আমাকে বললো “ভুল হচ্ছে? বাঃ। চমৎকার মিথ্যে কথা বলতে শিখে গিয়েছিস তো কলকাতায় এসে।” আমি কোনো কথা না বলে, অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে নিলাম। লোকটা কিছুক্ষণ ভ্যাবলার মত দাঁড়িয়ে থেকে আবার হাঁটতে শুরু করলো ট্রাম গুমটির দিকে।
লোকটা যখন অনেকটা দুরে চলে গেছে, আমি দৌড়োতে দৌড়োতে গিয়ে পেছন থেকে ওর হাতটা চেপে ধরে বললাম, “ও শান্তি কাকা, তুমি আমাকে এখানে এভাবে দেখেছো, বাড়িতে গিয়ে একদম বলবে না কিন্তু, মা ভীষণ কষ্ট পাবে তা হলে।”
ওরা সবাই আমার দিকে তাকিয়ে হাসছিল।
একই সঙ্গে।
এমন একটা ঘরে বসে আছি আমি এখন, যেখানে আমার বাল্য এবং কৈশোরের সমস্ত স্মৃতি আজও বন্দি এবং অমলিন।
বাগানের দিকের জানালাটার পাশে একটা কালো চামড়া মোড়া পুরোনো চেয়ারে বসে আমি ওদের দিকে তাকিয়ে আছি আর ওরা সবাই ঠিক আগের মত করেই আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে।
ঘরের মধ্যে পড়ন্ত বিকেলের মরা আলো এসে পড়েছে জানালার ধারের ঝাঁকড়া ডালিম গাছটার পাতার ফাঁক দিয়ে।
সেই আলো আবছায়ায় ওরা সবাই আমাকে উদ্দেশ্য করে বলে ওঠে, “পারলে না তো, আমাদের ছেড়ে থাকতে। সেই তো আবার ফিরে আসতে হলো তোমায়।”
ঘরের কোনায় আমার পড়ার টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াই আমি। একটা একটা করে পড়ার বই তুলে ধরে দেখতে থাকি। বইয়ের পাতায় পাতায় পেন্সিলের দাগ জাগ্রত করে ছাত্রবস্থার স্মৃতি।
মায়া। বড় মায়া।
পুরোনো বইয়ের পাতায় নিজের কাঁচা হাতের লেখায় লেখা নাম আমাকে যেন আষ্ঠেপিষ্ঠে বেঁধে ফেলতে চায় আরও মায়ার বন্ধনে।
পরক্ষণেই মনস্থির করে ফেলি।
এ পরিবেশে বেশিক্ষণ থাকলে হয়ত পাগল হয়ে যাবো আমি।
আমি পালাতে থাকি। মা কে বলতে আসা কোনও কথাই আর বলা হয়ে ওঠেনা আমার।
পালাতে থাকি আর, বাল্য,কৈশোর এবং প্রথম যৌবনের সমস্ত স্মৃতি পেছন পেছন তাড়া করে আসে আমায়। করুণ স্বরে চিৎকার করে পিছু ডাকে, “যেও না, যেও না, ফিরে এসো।”
জংশন স্টেশনের অন্ধকার ওভারব্রিজ দিয়ে দৌড়তে দৌড়তে আমি শুনতে পাই, “সাতটা পঁচিশের হাওড়া যাওয়ার মেন লাইন লোকাল তিন নম্বর প্ল্যাটফর্ম থেকে ছাড়ছে।”
দৌড়ে গিয়ে একটা ফাঁকা কামরায় উঠে পড়ি। ট্রেন ছাড়ার তীক্ষ্ণ হুইসেলের শব্দে ঢাকা পড়ে যায় আমার ফুঁপিয়ে ওঠা কান্না।
ছিয়ানব্বই এর গ্রীষ্মঋতু আসে আবার চলেও যায়।
আশার বাতাস, অধীরতার হতাশার মর্মবেদনা, অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ভয় নিয়ে এগিয়ে চলে জীবন।
বর্ষা এসে যায়।।
“আসলে কি জানিস? সবাই ঠিকঠাক কাজ করলে জীবনে গরমিলের জগৎটা তো ফাঁকা হয়ে যাবে।
না না, তা বলে আমি বলছি না যে, তোরা চাকরি বাকরি করবি না,জীবনে উন্নতি করবি না। আমি যেটা বলতে চাইছি সেটা হলো, এ মুহূর্তে হয়ত এমন একটা সময় চলছে যেটা শত চেষ্টা করেও ঠিক করা যাচ্ছে না, আবার চেষ্টা না করতেই হয়ত এমন একটা সুযোগ এসে যাবে আর তার সিঁড়ি ধরে এমন তরতর করে উঠতে থাকবি তোরা সবাই, তখন এই সময়টার কথা আর মনেই পড়বে না কখনো।

যাই হোক, ছাড় ওসব কথা, সবার জন্য একটা করে চা বলে আয় কেউ, আর গৌতম, আমার সিগারেটটা আনতে ভুলো না বাবা। ক্লাসিক।”
পকেট হাতড়ে চমকে ওঠেন সন্দীপদা, “দেখেছো, অফিস থেকে বেরোবার সময় ভুল করে মানিব্যাগটা ড্রয়ারেই ফেলে রেখে এসেছি। তোরা আজ একটু ম্যানেজ করে নে বাবারা। যা ভুলো মন হয়েছে আজকাল আমার। আসলে বুড়ো হচ্ছি কি না। হাঃ হাঃ হাঃ।
আমরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে থাকি।
দ্বিপ্রাহরিক আড্ডা চলছিল নন্দন-রবীন্দ্রসদন চত্বরে।
আড্ডার মধ্যমণি আমাদের সন্দীপদা। সন্দীপ সেন।
কোনও একটা বেসরকারি কোম্পানিতে খুব উচ্চপদে না কি চাকরি করেন।
আজকাল আমার সকালগুলো লম্বা, দুপুর ঢিলেঢালা।
এইরকম ঢিলেঢালা অধিকাংশ দুপুরগুলোতেই আমি এসে বসে থাকি নন্দন-রবীন্দ্রসদন চত্বরে।
বর্ষার দুপুর। সকাল থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টি থেমেছে একটু আগেই। সকাল থেকে সূর্য ওঠেনি বলে কেমন যেন একটা বিষণœ ভাব চারিদিকে।
ঘোলাটে আলোয় মাখা রবীন্দ্রনাথের মূর্তিটা কেমন ঝাপসা দেখায় এখান থেকে।
হইহই করে গিটার বাজিয়ে গান করছিল একদল ছেলেমেয়ে। ওদের সামনে দাঁড়িয়ে শুনছিলাম সেই গান।
জীবনমুখী।
আব্রাহাম দৌড়তে দৌড়তে এসে বললো, “এই পাপুন, কখন থেকে ডাকছি তোকে,শুনতে পাচ্ছিস না? এদিকে আয় তাড়াতাড়ি, সন্দীপদা তোকে ডাকছে।“
সন্দীপদার পরনে ঝকঝকে দামি শার্ট আর ট্রাউজার। বিদেশি পারফিউমের গন্ধে ম ম করছে ওর চারপাশ। নিখুঁতভাবে কামানো মুখ, সযতœলালিত মোটা চকচকে গোঁফজোড়া দেখলে বোঝা যায়, সেটার পেছনেও উনি অনেকটা সময় ব্যয় করেন।
হাতের ক্লাসিক সিগারেটটায় শেষ টান দিয়ে গলগল করে মুখ থেকে একরাশ ধোঁয়া বাতাসে ছড়িয়ে দিয়ে সিগারেটের শেষাংশটা ছুড়ে দুরের ঝোপের মধ্যে ফেলে দিতেই একটা পাগল দৌড়ে এসে সেটা কুড়িয়ে নিয়ে টান মারতে লাগলো।
সেটা দেখে হালকা একটা হাসি হেসে আমার দিকে একটু সরে ঘনিষ্ঠ হয়ে বসলেন সন্দীপদা।
গলার আওয়াজ নিচু করে যেন কোনও ষড়যন্ত্র করছি আমরা, বললেন, “জানিসই তো, এখন চাকরি বাকরির বাজারের কি হাল। তাও আমার এক বন্ধুকে বলে কয়ে ওর কোম্পানিতে একটা ভেকেন্সি তৈরি করা গেছে। যদিও বেসরকারি সংস্থা, তবে খুব বড় আর নামকরা। মাইনে এখন খুব বেশি নয়, হাজার চারেক। আশাকরি তোর চলবে।”
কি করে বোঝাই সন্দীপদাকে, এই মুহূর্তে চার হাজার কেন, একটা দু হাজার টাকার চাকরি হলেও আমি তার কাছে চিরকাল ঋণী হয়ে থাকব। জীবনধারণের জন্য যা হোক কিছু একটা চাকরি আমার যে ভীষণ দরকার, এখনই।
আমি অসীম কৃতজ্ঞতায় সন্দীপদার হাত দুটো চেপে ধরে বললাম, “আমাকে আপনি বাঁচালেন সন্দীপদা। আপনি জানেন না এখনই একটা চাকরি যে আমার কি ভীষণ প্রয়োজন।”
আমার পিঠে হাত রেখে স্মিত হাসি হেসে সন্দীপদা বললেন “জানবো না কেন রে, তোরা কি ভাবিস,আমি কিছু বুঝি না ? তোদের মত পড়াশোনা জানা তাজা তাজা ছেলেগুলো যে সারাদিন আড্ডা দিয়ে সময় কাটাচ্ছিস, চাকরি নেই বাকরি নেই, ভবিষ্যতের কোনও ঠিক ঠিকানা নেই, এতে যে আমার কত কষ্ট হয়, তোদের বলে বোঝাতে পারব না।”
তারপর যেন হঠাৎ মনে পড়ে গেছে, এমন ভঙ্গিতে বললেন, “দেখছিস, একদম ভুলে গেছি বলতে, আর বলিস না, কি করে বলি বল তো। তুই আমার নিজের ছোট ভাইয়ের মতো। এই কোম্পানিতে আবার ইউনিয়ন এর ভীষণ প্রভাব। ইউনিয়ন না চাইলে একটা পিওনেরও চাকরি হওয়া মুশকিল এখানে। যাইহোক, ইউনিয়ন কে অনেক ধরে মাঝামাঝি একটা জায়গায় দাঁড় করানো গেছে ,বুঝলি?”
আমি কিছুই বুঝতে পারছিলাম না, তবুও বোকার মতো তাকিয়ে ছিলাম ওর দিকে।
“হাজার দশেক লাগবে বুঝলি। তবে এখনই পুরোটা দিতে হবে না, এখন পাঁচ আর চাকরি হওয়ার পর বাকি পাঁচ। কাল পরশুর মধ্যে দিতে হবে। তারপর ওরা এপয়েন্টমেন্ট লেটার ইস্যু করবে।”
আমি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলাম ওর দিকে, উনি হয়ত জানেন না, পাঁচ হাজার কেন, পাঁচশো টাকা জোগাড় করে দেওয়ার সামর্থ্যও আমার নেই।

শেষ পর্যন্ত আমাদের গ্রুপের রাজার হয়ে গেল চাকরিটা। এখন ও সন্দীপদাকে পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে অপেক্ষা করছে এপয়েন্টমেন্ট লেটার পাওয়ার জন্য। সন্দীপদা কথা দিয়ে গেছে, দু তিন দিনের মধ্যেই ওর চিঠি এসে যাবে।

আজও খুব বৃষ্টি সকাল থেকেই। আড্ডায় পৌঁছতে দেরি হয়ে গেল অনেক। ঝিরঝির করে অবিশ্রান্ত ধারায় বৃষ্টি পড়ে চলছে এখনও। দূর থেকে দেখতে পাচ্ছি, একটা পুলিশের জীপ দাঁড়িয়ে রয়েছে রবীন্দ্রসদন চত্বরে। আমাদের বন্ধুবান্ধবেরা কেউ কেউ উত্তেজিত হয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছে কিছু। চায়ের দোকানের ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করাতে সে বললো, “আর বোলোনা! এক জালিয়াত না কি চাকরি দেওয়ার নাম করে অনেকের থেকে টাকা নিয়ে পালিয়েছে, তাই দুপুর থেকে হেস্টিংস থানার পুলিশ জনে জনে ,ধরে ধরে জিজ্ঞেস করছে তাকে কেউ চেনে কি না।”
আমি একটু সরে গিয়ে রবীন্দ্রনাথের মূর্তির নীচে এসে দাঁড়ালাম।
বর্ষাস্নাত সন্ধ্যার মরা আলোয় যেন পরিষ্কার দেখলাম, দাঁড়িওয়ালা বৃদ্ধ আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসছেন।
শীতকাল। উনিশশো ছিয়ানব্বই।
ওয়েলিংটন স্কোয়ার থেকে ট্রামে উঠে,ট্রামটা যখনই এসপ্ল্যানেডের মুখে এসে একটু গতি কমালো, ঠিক তখনই ভাড়া না দিয়ে টুক্ করে চলন্ত ট্রাম থেকে নেমে ভীড়ের মধ্যে মিশে গেলাম আমি।
ভীড় বলে ভীড়। শীতকালের দুপুর। সামনে বড়দিন। গ্র্যান্ড হোটেলের সামনের ফুটপাথ জুড়ে নানারকম পসরা সাজিয়ে চলছে কেনাবেচা। সারা পৃথিবীর লোক যেন এসে জড়ো হয়েছে আজ এই অঞ্চলে।
ভীড় ঠেলে এগোতে থাকি উদ্দেশ্যবিহীন ভাবে।
বড় রাস্তাটা পেরিয়ে মেয়ো রোডের ভিতর দিয়ে ময়দানে এসে একটা বড় গাছের নীচে টানটান হয়ে শুয়ে পড়ি।
খিদের জ্বালা যখন অসহ্য হয়ে ওঠে তখন সেন্ট পলস্ ক্যাথিড্রালের পেছন দিকের ফুটপাথে বসে পাঁচ টাকায় ভাত ডাল আর ভীষণ ঝাল আলুসেদ্ধ খেয়ে নিয়ে আবার হাঁটতে শুরু করি।
এই মূহুর্তে আমার জীবনের কোনও উদ্দেশ্য নেই। নেই কোনও বিধেয়।
যেটা আছে সেটা শুধুমাত্র টিকে থাকার সংগ্রাম। সেই সংগ্রামও আর কতদিন এভাবে চালিয়ে যেতে পারবো সেটা নিয়েও ভীষণ সন্দিহান এখন।
দু’মাসের বাড়িভাড়া বাকি পড়েছে। আজ কালের মধ্যে মিটিয়ে দিতে না পারলে বাড়ি ছেড়ে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে বাড়িওয়ালা। এই মূহুর্তে হাজার দুয়েক টাকার ব্যাবস্থা না করতে পারলে বোধহয় রাস্তায় গিয়ে দাঁড়াতে হবে।
খবরের কাগজের একটা বিজ্ঞাপন দেখে আজ ইন্টারভিউ দিতে গিয়েছিলাম ওয়েলিংটন স্কোয়ারের একটা বেসরকারি সংস্থায়।
গিয়ে দেখি ঠিক চাকরি নয় সেটা। কমিশন এজেন্টের কাজ। অর্থাৎ বিক্রি করতে পারলে কিছু টাকা পাওয়া যাবে নচেৎ নয়।
ধীরে ধীরে হতাশা যেন গ্রাস করে নিচ্ছে আমায়। শ্বাসরুদ্ধ করা একটা অনুভূতি যেন ক্রমশ বুকের মধ্যে চেপে বসছে ভারি জগদ্দল পাথরের মত।
জীবন মানেই কি শুধু ব্যর্থতা, বেদনা আর চোখের জল?
সাফল্যের সাতরঙা খুশীর ইন্দ্রধনু কেন আমার জীবনের আকাশে ওঠে না? এই মেঘ বৃষ্টির আকাশে কেন শুধু অনিশ্চিত আগামীর বিদ্যুৎ-চমক?
ঢিলেঢালা শীতের সকালে, মেঝেতে পাতা বিছানায় শুয়ে জানলা দিয়ে নরম রোদের নীল আকাশ দেখছিলাম আমি।
সামনের তিনতলা বাড়িটার জলের ট্যাঙ্কের গা বেয়ে ওঠা লতানো একটা গাছের কচি সবুজ রঙের পাতার ফাঁকে ফাঁকে ঝিলমিল করছে সূর্যের আলো। ছাদের পলেস্তরা খসা জীর্ণ প্রাচীরে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে বসে আছে দুটো শালিখ। নীল আকাশে অনেক অনেক উঁচুতে চক্রাকারে পাক খাচ্ছে একটা চিল। এখান থেকে একটা ছোট্ট কালো বিন্দুর মতো দেখাচ্ছে।
বিছানায় আমার বালিশের পাশে রাখা খামটার ভেতরের চিঠিতে লেখা আছেÑ

To
Mr. Ranodip Roy Choudhury
Based on our subsequent discussions and interviews, we are pleased to inform you that, you have been selected as an Executive (Marketing) for our Calcutta office. You are requested to join and complete all joining formalities on or before 1st January 1997.
With best regards,

For Tata Donnelly ltd.

ইড়সনধু

বিষাদসাগরে অর্ধ নিমজ্জিত যখন সৌভাগ্যের শক্ত হাত এসে টেনে তুলল জীবনের বালুকাবেলায়।
আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম, আমার শরীর থেকে ঝরে পড়া বিষাদবিন্দুগুলিকে ধীরে ধীরে শুষে নিচ্ছে সুসময়ের তপ্ত বালুকারাশি।
একটা উজ্জ্বল সূর্যের দিকে মুখ করে হাঁটতে শুরু করলাম জীবনের পথে।
হাঁটছি, হেঁটে চলেছি।

সর্বশেষ সংবাদ