বাংলা ফন্ট

মুঘল হারেমে ফরাসি প্রেমিক

28-04-2018
জয়িতা দাস

 মুঘল হারেমে ফরাসি প্রেমিক

বার্নার্ড সাহেবের মন ভাল নেই। মুখ অন্ধকার। চোখে কালি। উসকোখুসকো চুল। পোশাক আলুথালু। দরবারের আমির-ওমরাহদের চোখে পড়েছে ব্যাপারটা। কী হয়েছে, জানার কৌতূহলও খুব। কিন্তু সাহেবের গম্ভীর মুখ দেখে এই নিয়ে কোনও প্রশ্ন করতে সাহস হচ্ছে না কারও। এমনিতেই সাহেবকে তাঁরা একটু তোয়াজ করেই চলেন। বাদশা জাহাঙ্গিরের ডান হাত কিনা! দরবারে এক দিন ডাক্তার গরহাজির হলেই বাদশা অস্থির।

বার্নার্ড সাহেব ডাক্তার। মুঘল দরবারের, এবং হারেমেরও। সুদূর ফ্রান্স থেকে হিন্দুস্তানে এসেছেন, জাহাঙ্গিরের রাজত্বের শেষ পর্বে। সাহেবের কপালও ভাল। এ দেশে পা রাখতে না রাখতেই মুঘল দরবারে হাকিমের চাকরি জুটে গেল তাঁর। কিছু দিনের মধ্যে বাদশার দিলও জয় করে ফেললেন। তাঁর ব্যবহার আন্তরিক। অর্ধেক রোগী তাঁর এই গুণেই সুস্থ হয়ে ওঠে। মেজাজখানাও বড়ই শরিফ। দরবারি তহ্‌জিব আর তকল্লুফও রপ্ত করেছেন ভালই। সবচেয়ে বড় কথা, কাজে অসাধারণ হাতযশ তাঁর। হিন্দুস্তানের হাকিমরা ইলাজ ভালই করেন, কাটাছেঁড়াও সামলান। তবে ইউরোপীয়দের মতো পটু নন। দরবারে তাই সাহেব চিকিৎসকদের ভারী কদর।

বার্নার্ডের অবশ্য আরও একটা গুণ ছিল। মানুষটা বিশ্বাসী। বেগমখানার চিকিৎসা তাঁর ওপর দিয়ে নিশ্চিন্ত থাকা যায়। বাদশার তাই বার্নার্ডকে ভারী পছন্দ।

হারেমে বেগানা পুরুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ। হারেম-কন্যারা পর্দানশিন কিনা! বেগমখানার অন্দরের সাফাখানা বা বিমারখানার ভার তাই মহিলা ডাক্তারদের ওপর। আছে মেয়ে ‘জারাহ’ বা শল্য চিকিৎসকরাও। তবে রোগীর অবস্থা যখন ‘জারাহ’দের আয়ত্তের বাইরে চলে যায়, তখন বাধ্য হয়েই পুরুষ হাকিমদের ডেকে পাঠাতে হয় বেগমখানায়। তাঁদের হারেমে নিয়ে যাওয়ার ঝক্কিও কম নয়! আপাদমস্তক কাশ্মীরি শালে মুড়ে প্রায় অন্ধের মত নিয়ে যাওয়া হয় অন্দরে। অবশ্যই সশস্ত্র খোজার প্রহরায়। এর পরও যে বাদশারা পুরোপুরি নিশ্চিন্ত থাকতেন এমন নয়। বিশেষ করে ভিনদেশি ডাক্তারদের একটু সন্দেহের চোখেই দেখতেন।

এক ইউরোপীয় ডাক্তার এ নিয়ে এক মজার গল্পও শুনিয়েছেন। সাহেব কেমন রোগী দেখেন, তা পরীক্ষা করার জন্য নাকি এক বাদশা নিজেই বেগমখানায় রোগী সেজে বসেছিলেন। ডাক্তার সাহেবের এ সব জানার কথা নয়। তিনি রোগিণীর নাড়ি পরীক্ষা করার জন্য সবে বেগমের হাতটা নিয়েছেন নিজের হাতে, কিন্তু এ কী! এ যে পুরুষের হাত! জোর দিয়ে বললেনও সেই কথা। সঙ্গে সঙ্গে হোহো করে হাসতে হাসতে চাদরের নীচ থেকে বেরিয়ে এলেন স্বয়ং বাদশা। ডাক্তারের স্বভাব-চরিত্র কেমন, বাদশা পরীক্ষা করছিলেন!

জাহাঙ্গির অবশ্য কোনও পরীক্ষা না নিয়েই বিশ্বাস করেছিলেন বার্নার্ডকে। সাহেবও হারেমের সহবত সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। বেগম-মহল নিয়ে যে মনে কৌতূহল দানা বাঁধেনি, এমন নয়। এই দুনিয়ায় কার মনে এই নিয়ে কৌতূহল নেই! তবে সে উৎসাহ কখনও লক্ষ্মণরেখা অতিক্রম করেনি। শাহি নিয়ম, বাতচিত করা যাবে না বেগমদের সঙ্গে। কোনও জিজ্ঞাসা থাকলে উত্তর জেনে নিতে হবে বেগমের বাঁদিদের কাছ থেকে। বার্নার্ড সাহেবও বেগমের খাস বাঁদির মুখে রোগের বিবরণ শুনতেন। সেই মতো ইলাজ। সাহেবের হাত ভাল, ইলাজের ফলও মিলত আশানুরূপ।

বেগম-মহলের ডাক্তার যিনি, তাঁর কি আর ঐশ্বর্যের অভাব হয়! বার্নার্ড সাহেবের আয় ছিল হিংসে করার মতো। যদিও তাঁর দৈনিক তন্‌খা মাত্র দশ ক্রাউন। রোগী যাঁর বেগম-মহল, সে আর তন্‌খার পরোয়া করবে কী! দরবার থেকে হারেম, সর্বত্র ভেট আর তোফার রেওয়াজ। প্রায়ই সাহেবের কাছে মুঘল হারেম থেকে তোফা আসে। দরবারের বাইরেও ডাক্তারের মস্ত পসার। শহরের রইস আদমি আর আমির-ওমরাহ মহলেও তাঁর খুব খাতির। কেউ বিমারে পড়লেই এত্তেলা আসে। আসে তোফা। মাঝে মাঝে এমনিতেও ভেট আসে তাঁর কাছে। বাদশার ঘনিষ্ঠ বলে সবাই তাঁকে খুশ রাখতে চায়। দস্তরখান থেকে শরাব পিনা, সবখানেই যিনি বাদশার সঙ্গী, তাঁর সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখতে কে না চায়!

সব মিলিয়ে সুখেই ছিলেন ডাক্তার। কিন্তু ওই যে একটা কথা আছে, সুখে থাকতে ভূতে কিলোয়! বলা নেই কওয়া নেই, হঠাৎ করে প্রেমে পড়লেন বার্নার্ড। আর তাও কিনা এক কাঞ্চনীর! সেই থেকে সাহেবের মুখ অন্ধকার। চোখে কালি। মন উচাটন।

কাঞ্চনীর প্রেমে পড়া কি অপরাধ! তা নয়। তবে কাঞ্চনীকে কামনা করা যে অপরাধ!  কাঞ্চনীরা মুঘল দরবারের নর্তকী। নাচিয়েরা সব কাঞ্চনবর্ণা, তাই কাঞ্চনী। শুধু কাঞ্চনবর্ণ হলেই হবে না, হতে হবে অপরূপ রূপসি। তা হলেই মিলবে কাঞ্চনী দলে নাম লেখানোর ছাড়পত্র। এক সাহেবের বক্তব্য অনুযায়ী, কাঞ্চনীরা এমন ঝলমলে আর জমকালো পোশাক পরত, দেখে মনে হত যেন রক্তমাংসের নারী নয়, এরা সব বেহেস্তের হুরি।

সম্ভবত আকবরের আমল থেকেই দিল্লির খানদানি মহলে এদের রবরবা। প্রতি বুধবারে তাঁরা হাজির হতেন আম-খাসে, বাদশাকে সেলাম জানাতে। এই রেওয়াজ অনেক দিনের পুরনো। হয়ত আকবরই চালু করেছিলেন এই নিয়ম। তবে কাঞ্চনীরা ঠিক দরবারের বাঁধা নাচিয়ে নন। দরবারের বাইরেও নাচের আসর বসানোর অনুমতি ছিল এঁদের। যত্রতত্র নয়, শুধু খানদানি মহলে। আসর বসত আমির-ওমরাহ-মনসবদারদের বাড়িতে। কাঞ্চনীরা না থাকলে শহরের রইসদের বাড়ির বিয়ে কিংবা উৎসবের জৌলুস যেন ফিকে।

এর কারণও ছিল। এই খাতিরদারির কারণটা উল্লেখ করে গিয়েছেন এক ফরাসি পর্যটক। নাম, ফ্রাঁসোয়া বের্নিয়ে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কাঞ্চনবালাদের ‘দেহের গড়ন ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এমন নরম ও কোমল যে নৃত্যের প্রতিটি ভঙ্গিমা অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মধ্যে যেন লীলায়িত হয়ে ওঠে। তাল ও মাত্রাজ্ঞানও চমৎকার। কণ্ঠের মিষ্টতাও অতুলনীয়।’ মুঘল দরবার চিরকালই গান-বাজনার সমঝদার। এমন কলাপ্রেমীদের দরবারে কাঞ্চনীদের মতো শিল্পীদের কদর তো হবেই।

কাঞ্চনী দলের আইন-কানুন ছিল বড্ড কড়া। কাঞ্চনী হওয়ার প্রথম শর্ত, গেরস্থ ঘরের মেয়ে হতে হবে। ভদ্র ঘরের, তবে সম্পন্ন নয় কেউই। সাধ করে কি আর কেউ কাঞ্চনী হয়!  আর হ্যাঁ, এক বার কাঞ্চনী হলে তার আর সংসার পাতার উপায় নেই। কাঞ্চনীরা চিরকুমারী।

একে ভদ্র পরিবারের, তায় চিরকুমারী, নাচিয়ে-গাইয়ে মহলে তাই খাতির ছিল কাঞ্চনীদের। অবশ্য  হারেমের নাচিয়ে-গাইয়েরা তাঁদের একটু অবজ্ঞার চোখেই দেখত। কারণ, এরা যে ‘বাজারু আওরত’। অস্পৃশ্য। দশ জনের দিল বহ্‌লায়। হারেমে তবায়েফদের কোনও ঠাঁই নেই। হারেমের নাচিয়ে-গাইয়েরা শুধু জানে বাদশাকে। তাঁদের রূপ-যৌবন-শিল্পকলা, সব কিছুর ওপর অধিকার আছে মাত্র একজন পুরুষের। তিনি বাদশা। বেগমদের মনও তাঁরা বহ্‌লায় বই কী, কিন্তু পুরুষ ওই এক জনই। হাজার পুরুষের মনোরঞ্জন করে যারা, বেগমখানা তাঁদের ঠাঁই দিতে নারাজ।  

নাই বা হলেন কাঞ্চনীরা বারবিলাসিনী। ভদ্রঘরের মেয়ে হলেও, দশ জন পুরুষের সামনে নেচেকুঁদে বেড়ায় তো! দরবারের নাচওয়ালিও বটে! হারেমের দরজা তাই তাঁদের জন্য বন্ধ। সম্রাট শাহজাহান ভঙ্গ করেছিলেন সেই নিয়ম। শাহি হারেমের ইজ্জত ক্ষুণ্ণ করে কাঞ্চনীদের ঠাঁই দিয়েছিলেন বেগম-মহলে। এমনকী কাঞ্চনীদের হারেমের মেলাতেও প্রবেশের অধিকার দিয়েছিলেন তিনি। বিরক্ত হয়েছিল বেগমখানা, তৎকালীন সমাজ। এমনকী বিদেশিরাও এর জন্য বাদশার সমালোচনায় মুখর। বিরক্ত হয়েছিলেন বের্নিয়েও। সাহেব লিখেছেন, ‘শাজাহান তাঁর হারেমে বাইরের নাচওয়ালিদের প্রবেশাধিকার দিয়ে নিশ্চয় শালীনতার সীমা লঙ্ঘন করেছিলেন বলতে হবে।’

এই প্রথম দরবারের চৌকাঠ পার হয়ে কাঞ্চনীরা পা রাখল হারেমে। বিদেশি হলেও এ দেশের রীতি-রেওয়াজকে ভালবাসতে শুরু করেছিলেন বের্নিয়ে সাহেব। তাই মনের ক্ষোভ আর চেপে রাখতে পারেননি তিনি। ‘সম্রাট শাহজাহান কেবল তাদের একবার দর্শন করেই মুক্তি দিতেন না। প্রায়ই তিনি সারারাত তাদের আটকে রাখতেন এবং রাজকর্মের শেষে তাদের নৃত্যগীত উপভোগ করতেন, তাদের সঙ্গে মসকরা করে সময় কাটাতেন।’

যে যাই বলুক, শাহজাহান পরোয়া করেননি। তবে সমস্ত সমালোচনার আঁতুড়ঘর যে তাঁর দরবার। সে কথা ঠিক বুঝতে পেরেছিলেন বাদশা। শাহজাহান রসিক লোক। এক দিন হাসতে হাসতেই দরবারিদের শুনিয়ে দিলেন এক ফারসি বয়েৎ— “মিঠাই নেক্‌ হর দোকান কিস্‌ বাসাদ!” যে দোকান থেকেই কিনে আনো না কেন, মিঠাই সমানই মিষ্টি!

শাহজাহানের পুত্র আওরঙ্গজেব আবার কট্টর গোঁড়া। বরাবর শিল্পকলার বিরুদ্ধে তিনি। নাচ-গান, আমোদ-প্রমোদ আলমগিরের দু’চক্ষের বিষ। তখ্‌ত-এ-তাউসে বসেই কাঞ্চনীদের হারেমে প্রবেশ নিষিদ্ধ করে দিলেন তিনি। তবে বুধবারে আম-খাসে তাঁদের হাজিরা দেওয়ার প্রথাটি অনেক দিনের পুরনো বলে সেটা বন্ধ হয়নি। তবে এখন আর সামনে এসে নয়, দূর থেকেই বাদশাকে সেলাম জানিয়ে বিদেয় হত তারা।

সে অবশ্য এক-দু’ পুরুষ পরের কথা। জাহাঙ্গিরের আমলে বাদশার পেয়ারের লোক বার্নার্ড সাহেব এমনই এক কাঞ্চন-সুন্দরীর প্রেমে পড়েছিলেন। টাকার অভাব নেই, রোজগারের অর্ধেকটাই তিনি ব্যয় করতেন সুন্দরী নর্তকীদের পিছনে। বাড়িতে এক দিন কাঞ্চনীদের আসর বসাতে না পারলে তাঁর মন ভরে না। শুধু কী আসর বসানো! দামি দামি তোফাও দেন তাঁদের। খাতিরদারিতে খুশি হত কাঞ্চনীরাও। কাঞ্চনী-মহলে সাহেবের ভীষণ কদর।   

এ পর্যন্ত সব কিছু ঠিকই চলছিল। কিন্তু হঠাৎ করে এক কাঞ্চনীর নাজুক অদা-র ফাঁদে পড়ে গেলেন বার্নার্ড। আর তখনই হল মুশকিল। প্রেমে পড়তে না পড়তেই সাহেব উদ্‌ভ্রান্ত। সারা ক্ষণ বুক আনচান করে। মন পড়ে থাকে কাঞ্চনীর চরণতলে। কিন্তু কাঞ্চনী যে নিষ্ঠুর! প্রেমিকের এই হাল দেখেও ভ্রুক্ষেপ নেই তার। সাহেবের প্রেম প্রত্যাখ্যান করার সময় এক বারও বুক কাঁপেনি সুন্দরীর। গুস্তাকি অবশ্য কাঞ্চনীর নয়, তাঁর দলের উসুলের। কাঞ্চনীরা চিরকুমারী। সাহেবের প্রেমে সাড়া দিয়ে সেই নিয়ম নর্তকী ভাঙে কী করে!

সাহেব জানেন, এই নিয়ম ভঙ্গ করলে কেয়ামত হয়ে যাবে। মনমরা হয়ে এ দিক-ও দিক ঘুরে বেড়ান। দরবারিরা লক্ষ করেন সব। সাহস করে দু’এক জন তার কারণ জানার চেষ্টাও করেছিলেন। দায়সারা উত্তর মিলেছে, তবিয়ত ঠিক নেই আজকাল। ডাক্তার সাহেবের নিজেরই কিনা তবিয়ত ঠিক নেই! এ যে আজব তামাশা! আমিরদের ঠোঁটে বাঁকা হাসি।

বিষণ্ণ মনে রোজই সাহেব হাজিরা দেন দরবারে। এক বুধবারে হাজির হয়েছেন, সে দিন কী কারণে বাদশার মনটা ভারী প্রফুল্ল। হঠাৎ বার্নার্ড সাহেবের দিকে তাকিয়ে জাহাঙ্গির ঘোষণা করলেন, সাহেবের কাজকর্মে খুব খুশি তিনি। হারেমের এক বেগমকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে এনেছেন বার্নার্ড। দরবারে, সবার সামনে তাই তাঁর এই একনিষ্ঠ খাদিমকে ইনাম দিতে চান বাদশা।

আমির-ওমরাহরা ‘কেয়া বাত, কেয়া বাত’ করে উঠলেন। ইনামের কথা শুনে খুশি ছলকে উঠেছে সাহেবের চোখেমুখেও। দরবারিরা সব সাহেবের শুকনো মুখে হাসি ফুটতে দেখে অবাক। ইনামের কথা শুনেই তবে সাহেবের মুখে হাসি!

কথাটা মিথ্যে নয়। তবে আশরফির প্রতি কোনও মোহ নেই বার্নার্ডের। তাঁর মনে তখন অন্য চিন্তা। নিজের কিসমত পালটানোর এই তো মস্ত সুযোগ! সেই সুযোগ বার্নার্ড নষ্ট করবেন কেন! কপাল ঠুকে বলেই ফেললেন কথাটা বাদশাকে। আগে অবশ্য ঘটা করে তসলিম করলেন, সকরিয়া জানালেন। এর পরেই পাড়লেন আসল কথা। বাদশার দোয়ায় তাঁর এই বান্দার আজ আর কোনও কিছুরই অভাব নেই। তবে আজকাল ঘরে ফিরলে বড় সুনা-সুনা লাগে। মনে হয়, আহা! তাঁরও যদি এক জন বেগম থাকত, বেশ হত। নিকাহ করার জন্য একটি মেয়েকে ইতিমধ্যে তিনি পছন্দও করে ফেলেছেন। সে দাঁড়িয়ে আছে বাদশার সামনেই, ওই কাঞ্চনী দলে। এ দিকে বাদশার খাদিমের এমনই সৌভাগ্য যে জাঁহাপনা নিজেই ইচ্ছে প্রকাশ করেছেন তাঁকে ইনাম দেবেন। এখন শাহেনশা যদি দয়া করে কাঞ্চনী দলের ওই খুবসুরত মেয়েটিকে তাঁর হাতে তুলে দেন, তা হলে সাহেবের জীবনটা ধন্য হয়ে যায়।

শুনে আমির-ওমরাহদের সে কী হাসি! সাহেবটা সত্যিই বোকা থেকে গেল। এত দিনেও দরবারি আদব-কায়দার কিছুই রপ্ত করতে পারেনি বেচারা। বাদশার ইনাম প্রত্যাখ্যান করা যে মস্ত অপরাধ। সেই জ্ঞানটুকু যদি থাকত, তবে কি আর এমন গুস্তাকি করে বসে! আর এ দিকে সে যে খ্রিস্টান, এ কথাটাও বুঝি বেমালুম ভুলে গেল! খ্রিস্টান হয়েও কিনা এক মুসলমান কন্যার দিকে নজর দেয়! এত স্পর্ধা তাঁর!  এ বার বুঝি আর ছাড় নেই, বাদশার কোপে পড়তেই হবে তাঁর প্রিয় বান্দাকে।

বার্নার্ডের শাস্তির কথা ভেবে অনেকেরই তখন বুক ধুকপুক। কারও ঠোঁটের কোণে বিদ্রুপের হাসি! কাঞ্চনীর প্রতি লোভ, শাস্তি তো পেতে হবেই।

দরবার জুড়ে খামোশি। যেন ছুঁচ পড়লেও শোনা যাবে তার শব্দ। হঠাৎ সেই নিস্তব্ধতা ভেঙে হোহো করে হেসে উঠলেন বাদশা। তাঁর চোখে-মুখে কৌতুক। সাহেবের আর্জি মঞ্জুর করছেন তিনি। কিন্তু একটা শর্ত আছে— দরবার থেকে এই কাঞ্চনীকে কাঁধে করে বয়ে নিয়ে যেতে হবে বার্নার্ড সাহেবকে।

তাই হল। সভাসুদ্ধ লোক হইহই করতে করতে কাঞ্চনীকে নিয়ে এসে বসিয়ে দিল বার্নার্ডের কাঁধে। সাহেবও হাসতে হাসতে বীরদর্পে তাঁর মেহবুবাকে কাঁধে নিয়ে ছুটলেন বাড়ির দিকে। এই প্রথম কোনও কাঞ্চনবালা বেগম হল। সাগরপারের এক ভিনদেশির বেগম। বন্ধুর সম্মানে দীর্ঘ দিনের পুরনো নিয়ম ভঙ্গ করে তাঁর অভিলাষ সে দিন মঞ্জুর করেছিলেন বাদশা জাহাঙ্গির।

বার্নার্ড সাহেব সে দিন পেয়েছিলেন তাঁর মনের মানুষ কাঞ্চনীকে। তবে সব কাঞ্চনীর তো আর সাহেব প্রেমিক মেলে না। কারও সুসময়ও তো অনন্ত কাল থাকে না। এক কালে ভদ্রঘরের মেয়ে বলে গর্ব ছিল যাঁদের, মুঘল দরবারের রবরবা কমতে তাঁদেরও পড়তে হল দুর্দশায়। সেই
জৌলুস আর রইল না। পরবর্তী একশো বছরে শুধু ‘কাঞ্চনী’ নামটুকুই বজায় রইল, হারিয়ে গেল তাঁদের আভিজাত্য। আর দশ জন বারবিলাসিনীর সঙ্গে কাঞ্চনীদের আর কোনও পার্থক্য রইল না তখন। যুগ আর জমানা বদলের সঙ্গে সঙ্গে বিস্মৃত হলেন তাঁরা।

ঢাকারিপোর্টটোয়েন্টিফোর.কম/এইএমএল


সর্বশেষ সংবাদ