বাংলা ফন্ট

২০১৭ কীভাবে বদলে দিল ইরাক-সিরিয়ার মানচিত্র?

30-12-2017
নিজস্ব প্রতিবেদক ঢাকারিপোর্টটোয়েন্টিফোর.কম

 ২০১৭ কীভাবে বদলে দিল ইরাক-সিরিয়ার মানচিত্র?
ঢাকা: ইরাক এ মাসেই ঘোষণা করেছে যে তথাকথিত ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে তাদের যুদ্ধ শেষ, আর পার্শ্ববর্তী সিরিয়াতেও ওই জিহাদি গোষ্ঠীর প্রভাব এখন মাত্র কয়েকটি ক্ষুদ্র পকেটেই সীমাবদ্ধ।

যে রাকা-কে তাদের খিলাফতের ডি-ফ্যাক্টো রাজধানী বলে ধরা হত, সেই শহরের পতনকেও ইরাক ও সিরিয়াতে ইসলামিক স্টেটের চূড়ান্ত পরাজয়ের মাইলফলক হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।

রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও সিরিয়াতে সন্ত্রাসবাদীদের বিরুদ্ধে 'বিজয়' ঘোষণা করেছেন। বিশেষত তুরস্ক ও ইরানের সঙ্গে যে রাশিয়ার জোট মাত্র কিছুদিন আগেও অকল্পনীয় ছিল, সেই তিন দেশই হাত মিলিয়েছে ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধে।

ফেলে আসা ২০১৭তে এই ধরনের কূটনৈতিক পালাবদল কীভাবে সিরিয়া ও ইরাকের বিস্তীর্ণ অংশের মানচিত্রই আমূল বদলে দিল?

ইরাকের প্রধানমন্ত্রী হায়দার আল-আবাদি দিনকয়েক আগেই জানিয়েছেন, তার দেশের যে সামান্য কয়েকটি এলাকায় ইসলামিক স্টেটের নিয়ন্ত্রণ অবশিষ্ট ছিল, সেখান থেকেও ইরাকি সেনাবাহিনী ডিসেম্বরের গোড়াতেই তাদের নির্মূল করতে সক্ষম হয়েছে।

প্রায় তিন বছর আগে ইরাকের একটা বিরাট অংশ দখল করে নিয়েছিল তারা - এতদিনে সে দেশ থেকে তাদের প্রায় পুরোটাই হঠানো সম্ভব হল।

সিরিয়ার রাকা ছিল প্রথম বড় শহর, যা ইসলামিক স্টেটের দখলে আসে। আর সেটা ছিল ২০১৪র গোড়ার দিকে।

তারপর সে দেশের একটা বিস্তীর্ণ অংশ কব্জা করে নেয় তারা - পূর্বে ইরাক সীমান্ত থেকে পশ্চিমে প্রায় আলেপ্পো পর্যন্ত, আর উত্তর-পশ্চিমেও তাদের সাম্রাজ্য প্রায় তুরস্কের সীমানা ছুঁয়েছিল।

ইরাকেও ২০১৪ সালের জুনে মসুল দখলের পর ক্রমশ ইসলামিক স্টেটের নিয়ন্ত্রণ বিস্তৃত হতে থাকে দক্ষিণে রাজধানী বাগদাদের দিকে।

একটা সময় ছিল যখন সিরিয়া ও ইরাকে প্রায় ১ কোটি মানুষ ইসলামিক স্টেট নিয়ন্ত্রিত ভূখন্ডে বসবাস করতেন। কিন্তু ২০১৭র শেষে এসে তাদের সেই সুবিশাল রাজত্বের অতি সামান্যই টিঁকে আছে।

ইসলামিক স্টেটের এই বিপুল আধিপত্য যেভাবে খর্ব হয়েছে, কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে সেন্টার অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের সিনিয়র ফেলো জর্জ জফে কিন্তু তাতে আদৌ বিস্মিত নন।

প্রফেসর জফে বলছিলেন, "ইসলামিক স্টেটের বর্ণিত খিলাফত প্রতিষ্ঠার ভাবনাটাই অসম্ভব তা হয়তো বলা যাবে না, কিন্তু যে অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে তারা তা গড়তে চেয়েছিল সেটা অবশ্যই অবাস্তব ছিল। আর আইএস তাদের এলাকার লোকজনদের সঙ্গে যে পরিমাণ নিষ্ঠুরতা দেখিয়েছে, সেটাও ওই মানুষদের বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল।"

"কোনও প্রশাসনই তার মানুষদের সমর্থন ছাড়া টিঁকতে পারে না - কাজেই আইএস খিলাফতের পতন আমার মতে অনিবার্যই ছিল, এবং দুটো ফ্যাক্টর সে ঘটনাকে ত্বরাণ্বিত করেছে। প্রথমত, বিশেষত ইরাকে ও এমন কী সিরিয়াতেও সেনাবাহিনীকে নতুন করে গড়ে তোলা আর দ্বিতীয়ত, আমেরিকা যেভাবে বিভিন্ন দেশকে নিয়ে জোট করে আইএসের বিরুদ্ধে বিমান হামলায় নেতৃত্ব দিয়েছে।"

"সার্বিকভাবে আমি বলব, আইএসের মূল ভাবনাটা শুধু নয় - তারা যেভাবে নিজেদের আত্মরক্ষার পরিকল্পনা করেছিল সেটাও এই প্রকল্পটা বাঁচিয়ে রাখার জন্য যথেষ্ট ছিল না।"

তবে বিবিসির কূটনৈতিক বিশ্লেষক পল অ্যাডামস মনে করেন, সিরিয়া ও ইরাক থেকে ইসলামিক স্টেটকে চিরতরে মুছে ফেলা গেছে সে কথা বলার সময় বোধহয় এখনও আসেনি।

তার যুক্তি, "খিলাফতের স্বপ্ন আপাতত নিশ্চিহ্ন হলেও আই এসের আঘাত হানার ক্ষমতা এখনও আছে। তাদের নেতা আবু বকর আল বাগদাদির মৃত্যুর অজস্র খবর প্রচারিত হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তিনি এখনও জীবিতই আছেন।"

বিশ্বের বিভিন্ন গণমাধ্যমে নানা সময়ে আল বাগদাদির মৃত্যুসংবাদ প্রচারিত হলেও শেষ পর্যন্ত কেউই তা নিশ্চিত করতে পারেনি। পল অ্যাডামস বলছিলেন, অনুগামীদের উদ্দেশে তিনি বার্তাও দিয়ে চলেছেন অবিরত।

তার কথায়, "জিহাদি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার জন্য সমর্থকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে একের পর এক বার্তা পাঠাচ্ছেন আল বাগদাদি। আর সমর্থকরা তা শুনছেনও, যাদের সংখ্যা এখনও হাজার হাজার।"

"ফলে মধ্যপ্রাচ্যের ওই অঞ্চলে আরও বোমা বিস্ফোরণ কিংবা আত্মঘাতী হামলায় অসংখ্য নিরীহ মানুষের মৃত্যুর মতো ঘটনা আরও ঘটবে - এবং সেটা শুধু সিরিয়া বা ইরাকেও নয়, কারণ আইএসের সক্রিয় ফ্র্যাঞ্চাইজি রয়েছে আফগানিস্তান, ইয়েমেন বা লিবিয়াতেও। এমন কী রেহাই পাবে না পশ্চিমা দেশগুলোও।"

ইসলামিক স্টেট যখন প্রথম ইরাকে পায়ের তলায় জমি পেতে শুরু করেছিল তখন তার মূল রূপটা ছিল সে দেশে মার্কিন দখলদারিত্বের প্রতিশোধ নেওয়ার অভিযান। দ্বিতীয় রূপে তারা সেই আধিপত্যের একটা ভৌগোলিক চেহারা দিয়েছিল, যা এই সবেমাত্র পরাজিত হল।

কিন্তু প্রফেসর জর্জ জফে বলছেন, এর বাইরেও আই এসের একটা 'তৃতীয় রূপ' আছে - যাকে পরাস্ত করা অত সহজ নয়।

তার কথায়, "এই তৃতীয় রূপটা কিন্তু অবধারিতভাবে টিঁকে থাকবে - আর সেই রূপটা হল ভার্চুয়াল খিলাফত। এই ভার্চুয়াল খিলাফত হল প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে এবং যে সব দেশ ইসলামের সাবেকি ভাবনার সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ নয়, তাদের বিরুদ্ধে জিহাদি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার একটা আদর্শিক প্ল্যাটফর্ম - চেতনার স্তরে, এবং সাইবার দুনিয়াতেও।"

"ভার্চুয়াল খিলাফতের কিন্তু ইতিমধ্যেই অস্তিত্ত্ব আছে - আছে সাইনাইতে, সাহারায় বা আফগানিস্তানেরও কিছু অংশে। এই খিলাফত একটা প্রতিরোধ আন্দোলন হিসেবে নিশ্চিতভাবেই আরও ছড়িয়ে পড়বে।"

লন্ডনে কিংস কলেজের অধ্যাপক শিরাজ মাহেরও মনে করছেন, সিরিয়া ও ইরাকের ভূখন্ড থেকে ইসলামিক স্টেটকে হয়তো প্রায় পুরোটাই নির্মূল করা গেছে - কিন্তু বিপদের একটা ভিন্নতর মাত্রা রয়েই যাচ্ছে।

মাহের বলছিলেন, "সিরিয়ার রাকা বা ইরাকের মসুলের মতো এলাকায় তারা ছিল একটা রাষ্ট্রব্যবস্থার অংশ। পাশাপাশি সিরিয়া বা ইরাকের মতো দেশে ইসলামিক স্টেট একটা বিদ্রোহী আন্দোলনও বটে। আর আমাদের মতো পাশ্চাত্যের দেশগুলোর কাছে তারা একটা সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠী।"

"এই তিনটে মাত্রাই তাদের পাশাপাশি ও একই সঙ্গে ছিল - এবং একটা স্টেট বা রাষ্ট্র হিসেবে তারা পিছু হঠেছে মানেই বাকি দুটো মাত্রারও নিরসন হয়ে যাবে, ব্যাপারটা মোটেও সেরকম নয়।"

বিবিসির বিশেষজ্ঞ পল অ্যাডামসও বলছিলেন, ২০১৭তে ইসলামিক স্টেটকে মানচিত্র থেকে প্রায় মুছে দিতে পারলেও সিরিয়া ও ইরাকের অন্য সমস্যা কিন্তু রয়েই যাচ্ছে।

তিনি বলছেন, "সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ থামার কোনও লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না। ইরাকও ভীষণভাবে বিভক্ত, উত্তরে কুর্দীরাও নিজেদের স্বাধীনতার পক্ষে বিপুল ভোটে রায় দিয়েছে। আর শুধু তাই নয়, বড় বড় শক্তিগুলোও ওই এলাকায় নিজস্ব এজেন্ডা নিয়ে প্রবলভাবে আসরে নেমে পড়েছে - রাশিয়া, আমেরিকা, ইরান ও তুরস্ক প্রত্যেকেই নিজেদের আলাদা আলাদা স্বার্থ আর উদ্দেশ্য নিয়ে সিরিয়া আর ইরাকে হস্তক্ষেপ করতে শুরু করে দিয়েছে।"

ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অভিযানে রাশিয়া, তুরস্ক ও ইরান হাত মেলাতে পারে তা মাত্র কয়েকমাস আগেও একেবারেই ভাবা যায়নি। প্রফেসর জর্জ জফে বলছিলেন, ২০১৭ কীভাবে সেই অসম্ভবকে সম্ভব করেছে।

তার কথায়, "রাশিয়ার ক্ষেত্রে তাদের মূল লক্ষ্য ছিল এটা দেখানো যে মধ্যপ্রাচ্যে তারা একটা বড় ভূমিকা পালন করতে পারে - এবং সেটা আমেরিকার চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে। আবার তুরস্কের বেলায় ওই অঞ্চলে তাদের যে আধিপত্যবাদী উচ্চাকাঙ্ক্ষা আছে, তা পূরণ করার জন্য তাদের একজন অংশীদার দরকার ছিল - রাশিয়ার মধ্যে তারা সেটাই খুঁজে পেয়েছে, দুপক্ষের মধ্যে প্রাথমিক সংঘাতটা তাতে ছায়া ফেলতে পারেনি।"

"আর ইরান শুধু তাদের এই সব বৈদেশিক সমঝোতাগুলোর থেকে ফায়দা লুটতে চেয়েছে - কারণ সৌদি আরবের সঙ্গে তাদের টক্কর নেওয়ার ক্ষেত্রে এগুলো দরকার। ফলে আমি বলব, যদিও ইসলামিক স্টেট ছিল এই তিন দেশেরই আক্রমণের নিশানা - সেটা আসলে ছিল অজুহাত। এই তিন দেশের ভিন্নতর আলাদা আলাদা স্বার্থই তাদের কাছাকাছি আনার ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করেছে।"

গত সোয়া তিন বছরে মার্কিন-নেতৃত্বাধীন জোট ইরাকের ইসলামিক স্টেট প্রভাবিত এলাকায় তেরো হাজারেরও বেশি বিমান হামলা চালিয়েছে, আর সিরিয়াতে সংখ্যাটা প্রায় চোদ্দ হাজারের কাছাকাছি।

এ বছরের আগস্ট মাসে শুধু সিরিয়াতেই চোদ্দোশোরও বেশি বিমান-হামলা চালানো হয়। রাশিয়া এই আন্তর্জাতিক জোটের অংশ না-হলেও তাদের যুদ্ধবিমানও গত বছর থেকে সিরিয়ার সন্ত্রাসবাদীদের বিরুদ্ধে হামলা চালিয়ে আসছে।

প্রফেসর জর্জ জফে বিশ্বাস করেন, ওই অঞ্চলে রাশিয়া-তুরস্ক-ইরান অক্ষশক্তির ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল!

তার কথায়, "এই জোট স্থায়ী হতে যাচ্ছে, কারণ তুরস্ক কিন্তু আমেরিকা আর ইউরোপ উভয়ের উপরই প্রচন্ড ক্ষুব্ধ। এই দুই বৃহৎ শক্তির সঙ্গে তুরস্ক আগে যেভাবে সহযোগিতা করে চলত, এর্দোয়ানের সরকার মোটেই আর তা করতে প্রস্তুত নয়। ফলে তাদের কাছে রাশিয়াই একমাত্র সম্ভাব্য বিকল্প।"

"পাশাপাশি ইরানও খুব ভাল করে জানে তারা কিছুতেই আমেরিকার সঙ্গে বোঝাপড়ায় আসতে পারবে না, ফলে বাইরের জগতে তাদের অন্য বন্ধু দরকার। আর রাশিয়ারও এটা জানা আছে, মধ্যপ্রাচ্যে তাদের প্রভাবশালী ভূমিকা বজায় রাখতে হলে ইরান ও তুরস্কের সঙ্গে এই সমঝোতাগুলো টিঁকিয়ে রাখতে হবে। এমন কী এই অক্ষে চীনের ভূমিকা আছে, সেটাও ভুললে চলবে না।"

ফলে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা অনেকেই মনে করছেন - ২০১৭তে সিরিয়া ও ইরাকের ভূখন্ড থেকে ইসলামিক স্টেটের বিলুপ্তি বিশ্বে বৃহৎ শক্তিগুলোর পারস্পরিক সমীকরণেও একটা বিরাট ওলটপালট নিয়ে আসছে।

আর সেই প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে আমেরিকার - আন্তর্জাতিক পরিসরে যাদের প্রভাব বলয় অনেকটাই সঙ্কুচিত হয়ে আসছে।

ঢাকারিপোর্টটোয়েন্টিফোর.কম/এইএমএল


সর্বশেষ সংবাদ