বাংলা ফন্ট

জালিয়াতি শনাক্তকরণের কায়িক পরীক্ষায়ও জালিয়াতি!

23-09-2017
নিজস্ব প্রতিবেদক ঢাকারিপোর্টটোয়েন্টিফোর.কম

 জালিয়াতি শনাক্তকরণের কায়িক পরীক্ষায়ও জালিয়াতি!
ঢাকা: চীন থেকে সম্প্রতি সাড়ে ৩৬ হাজার কেজি ভিডব্লিউ ফিটিংস (ইস্পাত পণ্য) আমদানি করে ঢাকার প্রতিষ্ঠান ডাইভার্স ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল। আগস্টের শেষের দিকে আমদানিকৃত এ চালানে রাজস্ব ফাঁকির সন্দেহে শতভাগ কায়িক পরীক্ষার উদ্যোগ নেয় কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। পরীক্ষার পর চালানটিতে প্রায় চার হাজার কেজি বেশি পণ্যের উপস্থিতি পান শুল্ক কর্মকর্তা মো. ইসহাক আলী। শুল্ক কর্মকর্তার প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ফাঁকিকৃত রাজস্বসহ জরিমানা আদায় শেষে চালানটি খালাসের অনুমতি দেয় কাস্টমস। পরবর্তীতে খালাসের শেষ পর্যায়ে এসে চালানটি আটক করে ফের কায়িক পরীক্ষা করে ১৫ হাজার কেজি ঘোষণার অতিরিক্ত পণ্য পান শুল্ক গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।

শুধু এ চালানেই নয়, এমন আরো বেশ কয়েকটি চালানে ফাঁকি শনাক্তের পরও ফের অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছেন শুল্ক গোয়েন্দা ও কাস্টমসের কর্মকর্তারা। আমদানি নথি ও ব্যাংক নথি জালিয়াতির মাধ্যমে ঘোষণাবহির্ভূত পণ্য আমদানি করে এসব পণ্য খালাস করে আমদানিকারক ও খালাসের দায়িত্বপ্রাপ্ত সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট কর্মীরা। আর এসব পণ্য খালাসে জালিয়াত চক্রের সঙ্গে শুল্ক কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততার প্রমাণও পাওয়া গেছে। সম্প্রতি দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হলেও অধিকাংশ অসাধু কর্মকর্তা থেকে যাচ্ছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। মূলত জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেয়া ও পণ্য শুল্কায়নের প্রতিটি ধাপে বিভিন্ন অজুহাতে নিয়মনীতি অমান্য করার কারণেই এ ধরনের ঘটনা ঘটছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন গোয়েন্দা তথ্যের পাশাপাশি আমদানিকৃত পণ্যের মধ্যে যেসব চালানে জালিয়াতি বা অনিয়ম থাকার আশঙ্কা রয়েছে, সেগুলো শতভাগ কায়িক পরীক্ষার পর ছাড় দেয়া হয়। এসব চালানে আমদানিকৃত পণ্যের ওজন, নাম, মূল্যসহ বিস্তারিত তথ্য শতভাগ খতিয়ে দেখে তা নথিভুক্ত করে প্রতিবেদন আকারে দাখিল করতে হয়। কিন্তু চালানে অনিয়মকৃত পণ্যের বিশাল একটি অংশ গোপন করে নামমাত্র ফাঁকির পরিমাণ দেখিয়ে ছাড় দেন কিছু অসাধু কর্মকর্তা। অনেকে আবার কোনো ধরনের ফাঁকি নেই মর্মেও প্রতিবেদন দাখিল করেন। এসব ক্ষেত্রে পণ্যের তথ্য গোপন করে যে পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকি দেয়া হয়, তার একটি অংশ পান অসাধু শুল্ক কর্মকর্তারা।

কাস্টমসের মামলার তথ্য অনুযায়ী, ডাইভার্স ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের ওই চালানে ৩৬ হাজার ৪৭২ কেজি পণ্য আমদানির ঘোষণা দেয়া হয়। ৩ আগস্ট আগামপত্র (বিল অব এন্ট্রি বা বি.ই নম্বার-১০০২৬২০) দাখিল করে খালাসের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠান ‘হাওলাদার ট্রেড করপোরেশন’। আগামপত্র দাখিলের পর চালানটিতে রাজস্ব ফাঁকির ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে শতভাগ কায়িক পরীক্ষার অধীনে আনে কাস্টমস। কিন্তু দীর্ঘ ২৫ দিন চালানটি বন্দরে বাড়তি মাশুল (ডেমারেজ চার্জ) গুনলেও খালাসের কোনো উদ্যোগ নেয়নি আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট।

পরবর্তীতে ২৯ আগস্ট চালানটির কায়িক পরীক্ষা করেন কাস্টমসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মো. ইসহাক আলী। শতভাগ কায়িক পরীক্ষার প্রতিবেদনে চালানটিতে ৩৬ হাজার ৪৭২ কেজি পণ্যের বিপরীতে ৪০ হাজার ৫৭২ কেজি (৪ হাজার ১০০ কেজি বেশি) দেখিয়ে আরো ১১ হাজার কেজি পণ্যের তথ্য গোপন করে খালাসের সুযোগ করে দেন এ শুল্ক কর্মকর্তা। যদিও পরবর্তীতে শুল্ক গোয়েন্দার কর্মকর্তাদের পরীক্ষায় ৫১ হাজার ৫৪৩ কেজি (১৫ হাজার ৭১ কেজি বেশি) পণ্যের উপস্থিতি নিশ্চিত হয়। অনিয়ম শনাক্তের পর ৬ সেপ্টেম্বর জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে কাস্টমস কমিশনারকে চিঠি দেন শুল্ক গোয়েন্দা কর্তৃপক্ষের অতিরিক্ত মহাপরিচালক একেএম নুরুল হুদা আজাদ।

এর আগে ঢাকার প্রতিষ্ঠান আল ছাহারা এন্টারপ্রাইজের একটি চালানেও একই ধরনের অনিয়ম পাওয়া যায়। প্রতিষ্ঠানটি চীন থেকে ৪৭ লাখ ২৪ হাজার টাকা মূল্যের আট ধরনের গৃহস্থালি পণ্য আমদানির ঘোষণা দেয়। কাস্টম হাউজে আমদানিকারকের পক্ষে আগামপত্র বা বিল অব এন্ট্রি (নম্বর-৯৮১৮৯৮) দাখিল করে খালাসের দায়িত্বপ্রাপ্ত সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট সাউথ বেঙ্গল ট্রেডিং। চালানে ৪২ হাজার ৩৫৯ কেজি পণ্য থাকলেও শতভাগ কায়িক পরীক্ষার প্রতিবেদনে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মাহমুদুর রহমান উল্লেখ করেন ৩৮ হাজার ৯৬২ কেজি পণ্যের কথা। পরবর্তীতে কাস্টম হাউজের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা শাখা এআইআরের (অডিট ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড রিসার্চ) কর্মকর্তারা ওই শতভাগ কায়িক পরীক্ষায়ও অনিয়ম পান। পরবর্তীতে চালানটির শুল্ক আসে ৩৪ লাখ টাকা।

অভিযোগ প্রসঙ্গে সাউথ বেঙ্গল ট্রেডিংয়ের ম্যানেজিং পার্টনার ইব্রাহীম শিকদার বলেন, ঘটনাটি অনিচ্ছাকৃত। ঘোষণায় যেসব পণ্য উল্লেখ ছিল, কায়িক পরীক্ষায় তা সঠিক বলে প্রমাণ হয়েছে। তবে পরিমাণে কিছু বেশি পণ্য চলে আসায় কাস্টমস মামলা দেয়। যদিও অতিরিক্ত পণ্য সম্পর্কে আমরা অবগত ছিলাম না। তারপরও কাস্টমসের নির্দেশ মোতাবেক অতিরিক্ত শুল্ক ও জরিমানা দিয়ে চালানটি খালাস করেছি।

এ প্রসঙ্গে কাস্টমসের যুগ্ম কমিশনার মো. রইচ উদ্দিন খান বলেন, সাধারণত সন্দেজনক চালানেই শতভাগ কায়িক পরীক্ষা করা হয়। শতভাগ কায়িক পরীক্ষায় শুল্ক কর্মকর্তাদের ভুল হওয়ার সুযোগ নেই। আল ছাহারা ও ডাইভার্স ট্রেড নামের দুটি প্রতিষ্ঠানের চালানে আমাদের দুজন শুল্ক কর্মকর্তার সম্পৃক্ত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টসহ শুল্ক কর্মকর্তাদের এসব ঘটনাকে ভুলবশত বা অনিচ্ছাকৃত বলারও সুযোগ নেই। এসব ঘটনায় জড়িত সবার বিরুদ্ধেই আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। মঙ্গলবার কাস্টমস কমিশনারের আদেশক্রমে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মো. ইসহাক আলী ও মাহমুদুর রহমানকে সাময়িক বরখাস্ত করার পাশাপাশি অতীতের অনিয়মের সঙ্গে আর কোনো কর্মকর্তা জড়িত ছিলেন কিনা, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

এদিকে শতভাগ কায়িক পরীক্ষায় কোনো ধরনের ফাঁকির প্রমাণ পাওয়া না গেলেও পরবর্তীতে ফের কায়িক পরীক্ষায় বড় ধরনের জালিয়াতি ধরা পড়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনায় কাস্টমসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জড়িত থাকার অভিযোগ ছিল। যদিও এসব নিয়ে কোনো ধরনের তদন্ত কমিটি গঠন করেনি কাস্টমস কর্তৃপক্ষ।

ঢাকারিপোর্টটোয়েন্টিফোর.কম/এইচএমএল


সর্বশেষ সংবাদ