বাংলা ফন্ট

ষোড়শ সংশোধনী বাতিল নিয়ে যেসব বিতর্ক

26-08-2017
নিজস্ব প্রতিবেদক ঢাকারিপোর্টটোয়েন্টিফোর.কম

 ষোড়শ সংশোধনী বাতিল নিয়ে যেসব বিতর্ক
ঢাকা: বিচারপতিদের অপসারণসংক্রান্ত সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে দেওয়া হাইকোর্টের রায় বহাল রেখে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেছে।

রায় প্রদানকারী প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাসহ সাত বিচারপতির স্বাক্ষরের পর ১ আগস্ট মঙ্গলবার সকালে ৭৯৯ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়। রায়ে বিচারপতিদের অপসারণে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল বিধান বহাল রাখা হয়েছে।

গত ৩ জুলাই বিচাপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে এনে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করে হাইকোর্টের রায় বহাল রাখেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। ওইদিন সকালে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন সাত বিচারপতির আপিল বেঞ্চ এই রায় ঘোষণা করেন।

এর আগে গত ১ জুন সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে আপিল শুনানি শেষে মামলাটি রায় ঘোষণার জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়।

গত ৮ মে ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে আপিল শুনানি শুরু হয়। টানা ১১ দিন শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। আপিল শুনানিতে আদালতে মতামত উপস্থাপনকারী ১০ অ্যামিক্যাস কিউরির (আদালতের বন্ধু) মধ্যে শুধু ব্যারিস্টার আজমালুল হোসেন কিউসি সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর পক্ষে মত দেন।

অপর ৯ অ্যামিক্যাস কিউরি ড. কামাল হোসেন, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এম আই ফারুকী, আব্দুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া, প্রাক্তন অ্যাটর্নি জেনারেল এ এফ এম হাসান আরিফ, ব্যারিস্টার এম. আমিরুল ইসলাম, বিচারপতি টিএইচ খান, ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদ, ফিদা এম কামাল, এ জে মোহাম্মদ আলী সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর বিপক্ষে তাদের মতামত তুলে ধরেন।

গত ৮ ফেব্রুয়ারি ষোড়শ সংশোধনীর আপিল শুনানিতে অ্যামিক্যাস কিউরি নিয়োগ দেন আপিল বিভাগ। গত বছরের ১১ আগস্ট সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে দেওয়া রায় সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। পরে এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে রাষ্ট্রপক্ষ।

গত বছরের ৫ মে বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী, বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক ও বিচারপতি আশরাফুল কামালের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের বিশেষ বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ বলে রায় ঘোষণা করেন।

রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আইনসভার কাছে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা রয়েছে। দেশের সংবিধানেও শুরুতে এই বিধান ছিল। তবে সেটি ইতিহাসের দুর্ঘটনা মাত্র। রায়ে আরো বলা হয়, কমনওয়েলথভুক্ত রাষ্ট্রগুলোর ৬৩ শতাংশের অ্যাডহক ট্রাইব্যুনাল বা ডিসিপ্লিনারি কাউন্সিলরের মাধ্যমে বিচারপতি অপসারণের বিধান রয়েছে।

আদালত রায়ে আরো বলেন, বাংলাদেশের সংবিধানে ৭০ অনুচ্ছেদের ফলে দলের বিরুদ্ধে সাংসদেরা ভোট দিতে পারেন না। তারা দলের হাইকমান্ডের কাছে জিম্মি। নিজস্ব কোনো সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষমতা নেই। ৭০ অনুচ্ছেদ রাখার ফলে সাংসদদের সব সময় দলের অনুগত থাকতে হয়। বিচারপতি অপসারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও তারা দলের বাইরে যেতে পারেন না। যদিও বিভিন্ন উন্নত দেশে সাংসদদের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষমতা আছে।

রায়ে বলা হয়, মানুষের ধারণা হলো, বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে থাকলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হবে। সে ক্ষেত্রে বিচার বিভাগের প্রতি মানুষের আস্থা দুর্বল হয়ে যাবে। মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের বিধানটি তুলে দিয়ে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী পাস হয়। ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ৯৬ অনুচ্ছেদে পরিবর্তন এনে বিচারকের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে পুনরায় ফিরিয়ে দেওয়া হয়। যেটি ১৯৭২ সালের সংবিধানেও ছিল।

সংবিধানে এই সংশোধনী হওয়ায় মৌল কাঠামোতে পরিবর্তন ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ করবে; এমন যুক্তিতে ওই সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে একই বছরের ৫ নভেম্বর হাইকোর্টে একটি রিট দায়ের করা হয়। ওই রিটের ওপর প্রাথমিক শুনানি শেষে হাইকোর্ট ২০১৪ সালের ৯ নভেম্বর রুল জারি করেন। গত বছরের ১০ মার্চ মামলাটির চূড়ান্ত শুনানি শেষে ৫ মে রায় দেন আদালত।

তবে রায় নিয়ে যেসব বিতর্ক
ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ের পর্যবেক্ষণে ইতিহাস বিকৃতি হয়েছে বলে মনে করেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ে দেশ একক কারও নেতৃত্বে স্বাধীন হয়নি বলে যে পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়েছে, সেটিতে ইতিহাস বিকৃতি হয়েছে বলে মনে করেন আইনমন্ত্রী। এবং এটা অসদাচরণ কিংবা অন্য কিছু কি না, সেটা খতিয়ে দেখার অবকাশ আছে। এখানে বঙ্গবন্ধু শব্দটি ব্যবহার করা হয়নি, তবে কোনো একক ব্যক্তির নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়নি বলে কথাটি আছে। ‘প্রথমত কথা হচ্ছে এই মামলায় এটা অপ্রাসঙ্গিক। দ্বিতীয়ত এটা ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এবং ফাইনালি এটা ইতিহাস বিকৃত করার সমান বলে মন্তব্য করেন মন্ত্রী।

সাবেক প্রধান বিচারপতি ও বর্তমানে আইন কমিশনের চেয়ারম্যান এ বি এম খায়রুল হক বলেছেন, বিচারপতি অপসারণ ক্ষমতা সংসদের হাতে ন্যস্ত করে আনা সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ে অপ্রাসঙ্গিক পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এই রায় দেশকে বিচারিক প্রজাতন্ত্রের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এর মাধ্যমে মার্শাল ল আমলে চলে যাওয়ার চেষ্টা চলছে। এ ছাড়া এ রায় অপরিপক্ব, পূর্বপরিকল্পিত ও অগণতান্ত্রিক বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ে উচ্চ আদালত কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ও অনভিপ্রেত পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন বলে মন্তব্য করেছে আওয়ামী লীগ। তাদের মতে, আদালতের এ ধরনের পর্যবেক্ষণ অনাকাঙ্ক্ষিত, অনভিপ্রেত ও অপ্রাসঙ্গিক।

আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য, কেন্দ্রীয় ১৪ দলের মুখপাত্র এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, ‘সংসদ, মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু নিয়ে রায়ে যে পর্যবেক্ষণ রয়েছে তা ১৪ দল প্রত্যাখ্যান করেছে। এ রায় বাতিলের দাবি জানিয়েছে ১৪ দল। এটি বাতিল করতে হবে। আমরা এটা আইনগত ও রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করব।’ তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে দেশের মানুষ জানে এবং এটা মীমাংসিত বিষয়। বঙ্গবন্ধু যে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তা চন্দ্র-সূর্যের মতোই সত্যি। এটা নিয়ে রায়ে যা বলা হয়েছে তা জনগণ মেনে নেবে না, ক্ষমা করবে না। সুতরাং এ রায়ের পুনর্বিবেচনা জরুরি।’

জাসদের সভাপতি ও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেন, ‘সর্বোচ্চ আদালতের রায় হয়ে যাওয়ার পর তা জনগণের সম্পদ হয়ে যায়। সে সম্পদ নিয়ে আলোচনা সমালোচন হতে পারে। তা কোনোভাবেই আদালত অবমাননা নয়, অন্যায় নয়। এ রায়ে জাতীয় সংসদকে কটাক্ষ করা হয়েছে, বঙ্গবন্ধুর ভূমিকাকে খাটো করা হয়েছে। সুতরাং এটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, বিষয়বহির্ভূত ও অপ্রাসঙ্গিক। মুক্তিযুদ্ধ ও জনগণের শক্তিকে ম্লান করার জন্যই এ রায় দেয়া হয়েছে’। তিনি বলেন, ‘ষোড়শ সংশোধনী থাকলেও ক্ষতি ছিল না বরং বিচারপতিদের কেউ একে অন্যের প্রতি অবিচার করলে তার সঠিক বিচারের সুযোগ ছিল। সুতরাং এ রায় বাতিল হওয়া জরুরি।’

জাতীয় পার্টির (জেপি) সাধারণ সম্পাদক এবং সাবেক মন্ত্রী শেখ শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘এই রায়ে শুধু ১৪ দল নয় সারাদেশ সংক্ষুব্ধ। সুতরাং রায় বাতিল হোক’। সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক মন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া বলেন, ‘এ রায়ে সংসদকে অবমাননা করা হয়েছে। আমি জানি না মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে প্রধান বিচারপতি কোথায় ছিলেন? আসলে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে তিনি জানেন না বলেই দুঃসাহস দেখিয়েছেন। বিএনপি-জামায়াত যেন চক্রান্ত করতে পারে সে সুযোগ করে দিয়েছেন।

ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, ‘প্রধান বিচারপতি বলেছেন এ রায় নিয়ে রাজনীতি করা অনুচিত। কিন্তু দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে রায়ে যে কথা বলা হয়েছে তা উপেক্ষা করে থাকা অনুচিত কি না। সুতরাং আমরা কোন বোধ নিয়ে এগুবো তা নিয়ে ভাবতে হবে’।

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ বলেন, ‘এই রায়ে জনগণের অধিকারকে হরণ করা হয়েছে। সংবিধানে আছে সবকিছুর মালিক জনগণ সুতরাং জনগণের প্রতিনিধিদের হাতেই ক্ষমতা থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। বলা যায় রায় সংবিধান পরিপন্থী।

নৌমন্ত্রী শাজাহান খান বলেছেন, ঘোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় হলো একটি ঐতিহাসিক দুর্ঘটনা, যার মাধ্যমে মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী অর্জন করে যে সংবিধান রচনা করা হয়েছে, তাকে প্রশ্ন বিদ্ধ করা হয়েছে। যারা এই প্রশ্নের সম্মুখীন করেছে, তা একটি অর্বাচীনের মতো কাজ।

তবে ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় ঐতিহাসিক বলে মনে করে বিএনপি
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়কে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন এ রায় ঐতিহাসিক। এই রায়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনীতি ও সমাজের চিত্র উঠে এসেছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ বলেছেন, সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলে আপিল বিভাগের রায় ঐতিহাসিক। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যেখানে একটি ফ্যাসিবাদী সরকার ক্ষমতাসীন, সেই প্রেক্ষাপটে এই রায় দেশের সকল শ্রেণির মানুষের মনের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটিয়েছে।

ষোড়শ সংশোধনীর রায় নিয়ে সংসদে ক্ষোভের সমালোচনা
সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় নিয়ে জাতীয় সংসদে সংসদ সদস্যদের প্রতিক্রিয়ার সমালোচনা করে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলেন, “পার্লামেন্টে যে আলোচনা হয়েছে, তার এখতিয়ার পার্লামেন্টের নেই। যে আলোচনা হয়েছে, তা আলোচনা করতে গিয়ে সম্ভবত সাংসদরা নিজেরাই নিয়ম-কানুন ভঙ্গ করেছেন।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন, “আমরা আজকে এখানে যারা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলছি, তারা বিচার বিভাগের সামনে দাঁড়িয়েছি আসামি হয়ে। কোন কোন ক্ষেত্রে বিচার বিভাগ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে আমাদের আসামি হিসেবে দাঁড় করিয়েছে। তারপরও বিচার বিভাগের পক্ষে সোচ্চার হওয়ার প্রয়োজনে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলতে হবে।”

ঢাকারিপোর্টটোয়েন্টিফোর.কম/এইচএমএল



সর্বশেষ সংবাদ