বাংলা ফন্ট

উচ্চ মাধ্যমিকের বই জিম্মি ১৭ প্রতিষ্ঠানের কাছে!

15-07-2017
নিজস্ব প্রতিবেদক ঢাকারিপোর্টটোয়েন্টিফোর.কম

  উচ্চ মাধ্যমিকের বই জিম্মি ১৭ প্রতিষ্ঠানের কাছে!
ঢাকা: বই মুদ্রণের কাজ পাওয়া নিশ্চিত করতে এবং সরকারের রয়্যালিটি ফাঁকি দিতে জোট বেঁধেছে কয়েকটি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান। এ প্রতিষ্ঠানগুলো টানা তিন বছর ধরে একাদশ শ্রেণির বই ছাপার কাজ পাচ্ছে। প্রথমবার দরপত্রে অংশ নিলেও পরের দুবার দরপত্র অংশ না নিয়েই কাজ পেয়েছে এই প্রতিষ্ঠানগুলো। এতে কৌশলে জিম্মি করতে হয়েছে বই ছাপার তদারকি প্রতিষ্ঠান জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডকে (এনসিটিবি)। যদিও অনেকের মত, এনসিটিবির একটি চক্র এই ব্যবসায়ীদের অনৈতিকভাবে সহায়তা করছে।

গত পহেলা জুলাই থেকে একাদশের শিক্ষাবর্ষ শুরু হয়েছে। ওই দিন থেকে কলেজগুলোতে ক্লাসও শুরু হয়। কিন্তু বাজারে কোনো পাঠ্য বই পায়নি শিক্ষার্থীরা। শিক্ষাবর্ষের দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও দেশের সব জেলায় এসব বই পৌঁছায়নি।

একাদশ শ্রেণির তিনটি বই (বাংলা গদ্য ও পদ্য, বাংলা সহপাঠ, ইংলিশ ফর টুডে) দরপত্রের মাধ্যমে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ করতে হয়। এনসিটিবি দরপত্র আহ্বান ও বইয়ের মূল্য নির্ধারণ করে বেসরকারি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানে কার্যাদেশ দেয়। খোলা বাজারে বিক্রি হয় বইয়ের দোকানগুলোতে। এবার বাংলা গদ্য ও পদ্য ১১৩ টাকা, বাংলা সহপাঠ ৫৫ টাকা এবং ইংলিশ ফর টুডে বইয়ের মূল্য ৮১ টাকা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। এসব বই ছাপার অনুমোদন পাওয়ার পরে সাড়ে ১১ শতাংশ করে রয়্যালিটি এনসিটিবিকে দিতে হয়।

এনসিটিবি জানিয়েছে, ২০১৫ সালে দরপত্রের মাধ্যমে একাদশ শ্রেণির তিনটি বইয়ের ছাপার কাজ দেয়া হয় ১৭টি প্রতিষ্ঠানকে। এরপর থেকেই এসব প্রতিষ্ঠান কাজ পেতে একাট্টা হয়। পরের বছর ২০১৬ সালে একাদশ শ্রেণির এই বই ছাপার জন্য দরপত্র আহ্বান করলেও এসব প্রতিষ্ঠান কেউ দরপত্রে অংশ নেয়নি। অভিযোগ রয়েছে, এ ক্ষেত্রে অন্যদেরও দরপত্র আহ্বানে বিরত রাখা হয়েছে। দরপত্র প্রক্রিয়ার সময় না থাকার কারণে এ প্রতিষ্ঠানগুলোকে ডেকে বই ছাপার কাজ দেয়া হয়। চলতি বছরও একই চিত্র। যথাসময়ে দরপত্র আহ্বানে ব্যর্থ হয় এনসিটিবি। ফলে শেষ সময় এসে ওই ১৭ প্রতিষ্ঠানকে ডেকেই বই ছাপার কাজ দেয়া হয়।

এনসিটিবির এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এবার গার্হস্থ্যের বই ছাপার জন্য প্রস্তুত হয়নি যথাসময়ে। মে মাসের প্রথম সপ্তাহে গার্হস্থ্য বইয়ের পান্ডুলিপিটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটিতে যাওয়ার পর দেখা যায় বইয়ে ভুল রয়েছে। এ কারণে দরপত্র আহ্বান করা হয়নি। একাদশ শ্রেণির বইয়ের সাথে এই গার্হস্থ্য বইয়ের কার্যাদেশও দেয়া হয়।

তবে একাধিক মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান এনসিটিবিকে জানিয়েছে, দরপত্র আহ্বান করা হলেও আমরা এতে অংশ নেব না। এ কারণে বাধ্য হয়ে দরপত্র ছাড়াই ডেকে কাজ দেয়া হয়েছে।

দরপত্রে অংশ নিতে না পারা একটি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান এই প্রতিবেদককে জানিয়েছে, একাদশ শ্রেণির বই ছাপার জন্য একটি সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে। এরা এনসিটিবিকে নানাভাবে প্রভাবিত করে দরপত্র আহ্বান থেকে বিরত রাখে। ফলে দরপত্রে অংশ নেয়ার আগ্রহ থাকলেও সম্ভব হয়নি। এ অবস্থার অবসান হওয়ার দরকার বলে মনে করেন দরপত্রে অংশ নিতে না পারা ব্যবসায়ীরা।

দুই কোটি টাকা রয়্যালিটি হারাচ্ছে এনসিটিবি

নির্দিষ্ট ১৭ প্রতিষ্ঠানকে বই ছাপার কাজ দেওয়ায় প্রতিবছর দুই কোটি টাকারও বেশি রয়্যালিটি হারাচ্ছে এনসিটিবি। অভিযোগ, এই টাকা সরকারি কোষাগারে না থেকে যাচ্ছে ব্যবসায়ীদের পকেটে।

এবার সাড়ে ১২ লাখ শিক্ষার্থী একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হয়। সে হিসাবে প্রতিটি বই সাড়ে ১২ লাখ এবং বাফার স্টক হিসাবে আরো ৫ শতাংশ ছাপার কথা। কিন্তু এসব ব্যবসায়ী প্রতিটি বই মোট ৬ লাখ ছাপার কার্যাদেশ নিয়েছে। এনসিটিবির বক্তব্য, তারা প্রতিটি বই সাড়ে ১২ লাখই ছাপবে। কিন্তু রয়্যালিটি ফাঁকি দেওয়ার জন্য প্রতিটি বই ৬ লাখ ছাপার কার্যাদেশ নিয়েছে। বাকি সাড়ে ৬ লাখ বইয়ের রয়্যালিটি না দিয়েই ব্যবসায়ীরা পকেটে ভরবে। গতবছরও একইভাবে রয়্যালিটি ফাঁকি দিয়েছে ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলো।

তথ্য অনুযায়ী, বাংলা গদ্য ও পদ্য, বাংলাসহপাঠ ও ইংলিশ ফর টুডে এই তিনটি বই শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বিবেচনায় সাড়ে ৩৭ লাখ ছাপার কার্যাদেশ দেওয়ার কথা। কিন্তু এ ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান তিনটি বইয়ের মাত্র ১৮ লাখ ছাপার কার্যাদেশ নিয়েছে। এ কার্যাদেশ বাবদ এনসিটিবিকে রয়্যালিটি দিয়েছে ২ কোটি ৫ লাখ। কিন্তু রয়্যালিটি হবে এর দ্বিগুণ। অর্থাত্ ২ কোটি টাকার বেশি রয়্যালিটি হারালো এনসিটিবি।

এনসিটিবির সদস্য মিয়া ইমামুল হক সিদ্দিকী বলেন, ১৭টি প্রতিষ্ঠানকে ১৮ লাখ বই ছাপার কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি হলেও কম বই ছাপার কার্যাদেশ দেওয়া হলো এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এর চেয়ে বেশি কার্যাদেশ নিতে তারা রাজি নয়। তাদের বক্তব্য, কিছু প্রতিষ্ঠান নকল বই ছাপে। বই বেশি ছাপলেও বিক্রি হয় না।’

তবে পুঁথিনীলয় এর স্বত্বাধিকারী শ্যামল পাল বলেন, ‘আমরা প্রতিটি বইয়ের ৭ লাখ ছাপার কার্যাদেশ নিয়েছি। ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে ১০ শতাংশ ক্লাসে যায়  না। এ ছাড়া ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ শিক্ষার্থী পুরনো বই পড়ে। এ কারণে শিক্ষার্থীর সংখ্যা হিসাব করে সব বই ছাপা যায় না। এ ছাড়া বগুড়া, নোয়াখালী ও কুষ্টিয়ায় এক শ্রেণির অসাদু ব্যবসায়ী নকল বই ছাপে। এগুলো এনসিবিরি নিয়ন্ত্রণে নেই। বাজারে বইয়ের কোনো সংকট নেই।’

যে প্রতিষ্ঠান কাজ পেয়েছে: জুপিটার প্রিন্টার্স, ব্রাইট প্রিন্টিং প্রেস, হরফ পাবলিকেশন, আনন্দ প্রিন্টার্স, পুঁথিনীলয়, বই সামগ্রী, মাদার্স পাবলিকেশন্স, সাহারা আর্ট প্রেস, বুকম্যান প্রিন্টার্স এ্যান্ড পাবলিকেশন, আলমগীর প্রেস এ্যান্ড পাবলিকেশন, কচুয়া প্রেস এ্যান্ড পাবলিকেশন, সিটি আর্ট প্রেস, সাহিত্য সাগর, বর্ণমালা প্রকাশনী, ঝলক প্রকাশনী, প্রিয়াংকা প্রিন্টিং এ্যান্ড পাবলিকেশন ও স্বরবর্ণ প্রিন্টাস।

ঢাকারিপোর্টটোয়েন্টিফোর.কম/এইচএমএল


সর্বশেষ সংবাদ