বাংলা ফন্ট

বিশ্বব্যাংকের পরামর্শে ত্রুটিপূর্ণ প্রকল্প

16-02-2017
ঢাকারিপোর্টটোয়েন্টিফোর.কম

বিশ্বব্যাংকের পরামর্শে ত্রুটিপূর্ণ প্রকল্প ঢাকা: বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে উপকূলে চিংড়ি চাষের প্রকল্প শুরু হয় ১৯৮৬ সালে। ২ কোটি ২০ লাখ ডলারের ওই প্রকল্পের মাধ্যমে দেশে চিংড়ি চাষের সুযোগ অবারিত করে দেয়া হয়। গাছপালা কেটে ও ফসলি জমিতে চিংড়িঘের গড়ে তুলতে থাকেন কৃষক।

শুরুতে এ প্রকল্পের মাধ্যমে আয়বর্ধন ও কর্মসংস্থান হলেও পরবর্তীতে তা ফিকে হয়ে আসে। চিংড়ি চাষের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয় উপকূলীয় প্রাকৃতিক বন। চিংড়িঘেরের লবণ পানি ঢুকে উর্বরা শক্তি হারায় পার্শ্ববর্তী জমি। চিংড়ি উত্পাদনও আর আগের মতো নেই। সেই সঙ্গে বিকল্প আয়ের সুযোগ না থাকায় উপকূলীয় অঞ্চলে দারিদ্র্য সেভাবে কমেনি। বাধ্য হয়ে তাই অন্য জেলায় অভিবাসী হচ্ছে চিংড়ি চাষ অধ্যুষিত উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ।

সবুজ ধ্বংসকারী চিংড়ি চাষই শুধু নয়, গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের উন্নয়নে বিশ্বব্যাংকের অনেক অবস্থানই ছিল ত্রুটিপূর্ণ। বিশ্বব্যাংক নিয়ে বাংলাদেশের মতোই অভিজ্ঞতা স্বল্প আয়ের প্রায় সব দেশের।

অর্থনৈতিক কৌশল হিসেবে ১৯৮০ সাল থেকে ‘কাঠামোগত সমন্বয়’নীতি বাস্তবায়ন করছে বিশ্বব্যাংক। এর আওতায় কঠিন সব শর্ত মেনেই সংস্থাটির কাছ থেকে ঋণ নিতে হয় দরিদ্র দেশগুলোকে। এসব শর্তের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, ভর্তুকি কমিয়ে আনা ও সরকারের বিভিন্ন পরিষেবা বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়া।

বিভিন্ন শুল্ক বাধা দূর করে সরকারি সম্পদ বিদেশী করপোরেশনগুলোর ক্রয়ের সুযোগও দিতে হয় শর্ত হিসেবে। পাশাপাশি সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে বিদেশীদের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হয় এবং ইচ্ছামতো মুনাফা স্থানান্তর করতে পারে তারা। এর মধ্য দিয়ে দেশগুলোর প্রবৃদ্ধি ও ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা বাড়বে বলে বিশ্বব্যাংক দাবি করলেও আদতে তা হয়নি।

সংস্থাটির কাঠামোগত সমন্বয়নীতি দরিদ্র দেশগুলোকে উন্নয়নের পরিবর্তে আরো খারাপের দিকে নিয়ে গেছে। এর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী সাব-সাহারা দেশগুলো।

বিশ্বব্যাংকের এ নীতি বাস্তবায়ন করতেই বাংলাদেশের পাট খাত সংকুচিত করা হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে একের পর এক পাটকল বন্ধ করে দেয়া হয়। বহু আলোচনা-সমালোচনার পরও বিশ্বব্যাংকের পরামর্শে ২০০২ সালে বন্ধ করে দেয়া হয় দেশের সবচেয়ে বড় পাটকল আদমজী।

বিশ্বব্যাংকের এ পরামর্শ বাস্তবায়নের কারণে কর্ম হারাতে হয় প্রায় এক লাখ মানুষকে। অথচ একই সময়ে অন্য একটি দেশের পাট শিল্পের উন্নয়নে নানা সহায়তা দিয়েছে সংস্থাটি।

বিদেশী চক্রান্তের অংশ হিসেবেই বিশ্বব্যাংক আদমজী বন্ধের পরামর্শ দেয় বলে মন্তব্য করেন বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম।

তিনি বলেন, দেশের পাট খাতকে ধ্বংস করতেই ঐতিহ্যবাহী এ পাটকল বন্ধের পরামর্শ দেয়া হয়। বিশ্বব্যাংকের এ ধরনের কার্যক্রম শুধু ত্রুটিপূর্ণই নয়, উদ্দেশ্যমূলকও বটে।

বিশ্বব্যাংকের পরামর্শে ত্রুটিপূর্ণ প্রকল্প নেয়া হয়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতেও। বিদ্যুৎ খাতে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে প্রবেশের সুযোগ করে দিতে ১৯৯৭ সালেই বিশ্বব্যাংক আকর্ষণীয় কিছু প্রস্তাব দেয়। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (পিডিবি) বেসরকারীকরণ, বিতরণ ব্যবস্থাকে বাণিজ্যিকীকরণ ও করপোরেটাইজেশনের পরামর্শ দেয় বিশ্বব্যাংক।

নব্বইয়ের দশকে দেশে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) ও গ্যাস খাতে বহুজাতিক কোম্পানির (এমএনসি) উপস্থিতি দ্রুত বাড়তে থাকে। শেভরনসহ অন্যান্য কোম্পানির অংশগ্রহণ বাড়ানো হয়। আবার বিশ্বব্যাংকের সিদ্ধান্ত অনুসারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো কিংবা গ্যাসের দাম না কমানোর কারণে সাধারণ মানুষকে ক্ষতির শিকার হতে হচ্ছে।

বিশ্বব্যাংকের নীতি ও এর প্রভাব নিয়ে একাধিক গবেষণা করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এবং তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির কেন্দ্রীয় সদস্য সচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ।

তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই ত্রুটিপূর্ণ নীতি ও ঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে বিশ্বব্যাংক। বাংলাদেশও এ থেকে মুক্ত নয়। তারা একটি ঋণ ফাঁদ তৈরি করেছে। বিশ্বব্যাংক গ্রুপের অর্থায়নের প্রকল্প আর্থসামাজিক উন্নয়নে কী ভূমিকা রাখতে পারে এবং পরিবেশের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলছে, তার সামগ্রিক কোনো মূল্যায়ন নেই। অবকাঠামো উন্নয়নের নামে প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংস করা হচ্ছে। বাণিজ্যিকীকরণের নামে স্বাস্থ্য, চিকিত্সা ও শিক্ষাকে সাধারণ মানুষের অধিকারের বাইরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তাদের পরামর্শে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বিদেশীদের আধিপত্য বেড়েছে।

বিশ্বব্যাংকের মডেল থেকে বাংলাদেশ বেরিয়ে আসতে পারে কিনা এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, কয়েক বছরের ব্যবধানে লাতিন আমেরিকার বেশ কয়েকটি দেশে বিশ্বব্যাংকের কার্যক্রম স্থগিত করেছে। এসব দেশের মধ্যে নিকারাগুয়ায় বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন বন্ধ করে দেয়ার পর শিক্ষার হার দ্রুত বেড়েছে। স্বাস্থ্য সুবিধা সব ধরনের মানুষ গ্রহণ করতে পারছে। একই চিত্র দেখা যাচ্ছে একুয়েডর, বলিভিয়া ও ভেনিজুয়েলায়। আর্থসামাজিক অবস্থান ও কর্মক্ষমতার নিরিখে বাংলাদেশেরও বিশ্বব্যাংকের কার্যক্রম থেকে অবশ্যই বেরিয়ে আসার সুযোগ রয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশ্বব্যাংকের ভ্রান্ত নীতির কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প-কারখানার পাশাপাশি পানি, জ্বালানি, শিক্ষা, যোগাযোগ খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের সুপারিশ অনুসারে নদী শাসন প্রকল্প কিংবা ভূগর্ভস্থ পানিনির্ভর সেচ প্রকল্প গ্রহণ করার মাধ্যমে নদ-নদীগুলো বিপন্ন হয়েছে। এসব নদ-নদী এখন অনেকটাই মরা খালে পরিণত হচ্ছে।

১৯৮৫ সালের ৭ মে অনুমোদন পায় বিশ্বব্যাংকের ‘থার্ড ফ্লাড কন্ট্রোল অ্যান্ড ড্রেনেজ’ শীর্ষক প্রকল্প। প্রায় ৪ কোটি ৮০ লাখ ডলারের এ প্রকল্পের মাধ্যমে বাঁধ নির্মাণ ও পুনর্নিমাণ, পানি নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো ড্রেনেজ এবং সেচ সুবিধা প্রদানই ছিল প্রধান লক্ষ্য। এ ধরনের প্রকল্পের ফলে প্রাকৃতিক উত্স থেকে মাছ আহরণ যে কমে যেতে পারে, প্রকল্পের সারমর্মেও তা উল্লেখ করা হয়। গত কয়েক দশকে প্রাকৃতিক মাছ আহরণে যে বিপর্যয়, তার অন্যতম কারণও এ ধরনের প্রকল্প।

যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে সম্ভাবনাময় খাত রেলপথ। বিশ্বব্যাংকের পরামর্শে সড়ক যোগাযোগের ওপর বেশি মনোযোগ দেয়ায় রেল যোগাযোগ বিকশিত হতে পারেনি। সুযোগ থাকার পরও রেলপথে পণ্য পরিবহন বাড়ছে না।

এ অবস্থায় বিশ্বব্যাংক থেকে সরে আসার সময় এসেছে কিনা জানতে চাইলে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, বিশ্বের অনেক দেশ এ বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ শুরু করেছে। তাদের অর্থ ছাড়াই বাংলাদেশ পদ্মা সেতুর কাজ শুরু করেছে। তবে বাংলাদেশ এখনই পুরোপুরিভাবে সরে আসতে পারবে কিনা, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য উচ্চপর্যায়ের থিংকট্যাংক রয়েছে। তারা যথার্থ মূল্যায়ন করেই এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেবে।

পদ্মা সেতু প্রকল্পের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংক আমাদের শত্রু নয়। তবে পদ্মা সেতু প্রকল্পে ঋণ ইস্যুতে দুর্নীতির অভিযোগ এনে বিশ্বব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠান অপরিপক্বতার পরিচয় দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি যথার্থ সিদ্ধান্ত না নিয়ে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ও অর্থনৈতিক ক্ষতি করেছে।

উল্লেখ্য, বিশ্বব্যাংকের ত্রুটিপূর্ণ অবস্থান শুরু থেকেই প্রত্যক্ষ করছে বিভিন্ন দেশ। প্রতিষ্ঠার পর প্রথম দেশ হিসেবে বিশ্বব্যাংক থেকে ঋণ নেয় ফ্রান্স। ঋণ নিতে গিয়ে দেশটিকে কঠিন শর্তের বেড়াজালে আটকানো হয়। দেশটির তত্কালীন বাজেটে ব্যাপক কাটছাঁট করা ছাড়াও ঋণ পরিশোধকালে দেশটি যেন অন্য যেকোনো ঋণদাতার চেয়ে বিশ্বব্যাংককে বেশি অগ্রাধিকার দেয়, সে শর্ত রাখা হয়। ঋণ অনুমোদনের আগে ফরাসি সরকারে কমিউনিস্ট পার্টি অব ফ্রান্সের সব সদস্যকে বিতাড়ন করা হয়।

ঢাকারিপোর্টটোয়েন্টিফোর.কম/এইচএমএল

সর্বশেষ সংবাদ